চুড়ি জিনিসটা অামার লাগে ঘ্যানঘ্যানা পোলাপানের মতো। যারা সারাক্ষণই কিছু না কিছুর জন্য কানতে থাকে। চুড়ির ওই অহেতুক ঝন ঝন করতে থাকায় অামার মাথা ধরে। তারপরে পায়ে যেইটা পরে মেয়েরা, নূপুর। এই জিনিস তো অারো বিরক্তিকর।

এগুলির সাথে অামার কোনো ভাল স্মৃতি নাই। বরং, বিপদে পড়তে হইছে। সব খারাপ স্মৃতি। বিরক্তি এই কারণেও থাকতে পারে।

জীবনে অামি প্রথম চুড়ি পরছি বোধহয়, অামার জন্মের পরপর। অামার মা সখ কইরা তার বিশালায়তনের বাচ্চার জন্য এক জোড়া রূপার চুড়ি এবং নূপুর বানায়া অানলেন। চুড়ি হাতে লাগে, কিন্তু অামি সেইটা গায়ে-মুখে ঘইষা ছাল তুইলা ফেলতে শুরু করলাম। অাম্মা বুঝলেন, সৌন্দর্য হইতে মেয়ের ছাল বাঁচানো অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তারপর থেইকা ওই যে ওই চুড়ি অার নূপুর তিনি অামার গা থেইকা খুইলা অালমারি তুইলা রাখলেন, তা অার অামার হাতে পা অার কেউ কোনোদিন ওঠাইতে পারে নাই।

দ্বিতীয় এবং শেষবার অামারে যখন চুড়ি পরানো হইল, অামি তখন ক্লাস থ্রি তে পড়ি। স্কুলে কালচারাল অনুষ্ঠানে অামারে পার্টিসিপেট করতে হবে। মানে, অামারে নাচতে হবে, গান গাইতে হবে, একক অভিনয় করতে হবে।

অথচ গান গাওয়া বাদে বাকি দুইটার একটা সম্পর্কেও অামার কোনো ধারণা নাই। অামার স্কুল টিচাররা অার অামার মহা শয়তান অাম্মা—সকলেই তাদের সিদ্ধান্তে অটল, অামারে তারা নাচাইয়াই ছাড়বে।

অনুষ্ঠানের কয়দিন অাগে অামার অাম্মা অামারে অালমারি থেইকা অামার চাচার বিয়া উপলক্ষে কিন্না দেওয়া জামা নামক এক সাদা রঙের পুতি-পাত্থরওয়ালা বস্তা বাহির কইরা দিয়া কইলেন, তুমি নাচার সময় এইটা পরবা, সাথে সাদা কাচের চুড়ি।

অামার সঙ্গে সঙ্গে কান্দা চইলা অাসল। হ্যাঁ? অামি এই ঝুপ্পা পইরা ঘুরব! এই জিনিস অামি চাচার বিয়াতেই পরছি মাত্র এক ঘণ্টা, অার বাকি পুরাটা সময় ওইটা বদলাইয়া শর্টস অার টিশার্ট পইরা হ্যার থেইকা পলাইয়া থাকছি। এখন বলে অাবার এই বস্তা পরতে, তাও সে এইবার সারাক্ষণ অামার লগে লগে ঘুরবে। এর থেইকা তো যুদ্ধের পোশাক পরা ভালো!

অামি এই নিয়া চরম দুঃখী। পুতিওয়ালা জামা এবং চুড়ি পরার কষ্টে অামি কারোর সাথেই কথা বলি না। সুযোগ পাইলেই চিপায় গিয়া ফুঁপাই অার ভাবি—অামাকে কেউ ভালোবাসে না, অামি একদিন বাসা থেকে পালাব!

তো, অনুষ্ঠানের অাগের দিন অামার অাম্মা অামাদের এক প্রতিবেশীরে কইলেন, এত্তগুলা জায়গায় ঘুরছেন সাদা চুড়ি তিনি এখনো পান নাই। কী অবস্থা, অথচ কালকেই মেয়েটার অনুষ্ঠান, তার কতই না মন খারাপ হবে এই কথা জানলে!

অামি এই কথা শুইনা ফেললাম। মনে হইল এই দুনিয়াতে তখন অামার থেইকা সুখী অার কেউ নাই। অামারে অার বাসা ছাইড়া পালাইতে হবে না।

অামার অাম্মা খুবই মন খারাপ করলেন। সান্তনা দিলেন অামারে। ফরে পুরা একটা দিন অামারে মন খারাপের অ্যাক্টিং কইরা যাইতে হইল।

অনুষ্ঠানের দিন সকালে, অামি রেডি হইছি। চুড়ি না পরতে হইলেও ওই সাদা বস্তাটা পরতে হইছে, তাই অামি অর্ধেক কষ্টে অাছি।

এমন সময় অামার অাম্মা কোত্থেইকা হন্তদন্ত হইয়া বাসায় ঢুকলেন। তিনি বেজায় খুশি। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ।

অামি জানিও না সে যে বাইরে গেছিল।

তিনি অাইসা দ্রুত ব্যাগটা খুইলা ভিতর থেইকা কাগজে মোড়ানো কী জানি বাইর করলেন। এরপরেই ওইখানে দেখি অজস্র চুড়ি! অামি শক খাইয়া দাড়াইয়া অাছি, এই জিনিস কই পাইল সে!

তিনি অানন্দিত গলায় অামারে বললেন, অাল্লা কী বোকা অামি, অামার তো বেলীর কথা মনেই নাই। ও তো চুড়ি পরে। বেলীর অাম্মা একটু অাগে চুড়ি পাই নাই শুইনা অামার ধমক মারছে, ওনার মেয়েরগুলি দিছে তোমার অনুষ্ঠানে পরার জন্য।

অামি বাথরুমে গিয়া এইবার সত্যি সত্যি কাইন্দা দিলাম। অার বেলীর উপর অামার খুবই মেজাজ খারাপ হইল। বেলীর বাচ্চা বেলী,অাজকে যদি ওর চুড়ি না থাকত, অামারেও পরত হইত না, সব ওর দোষ!

অামার মা অামারে বস্তা পরায়া সাজাইতে বসলেন। দুনিয়াতে অামি সবচেয়ে ভয় পাই এই জিনিস। অামারে ওইদিন তিনি খালি পুতিওয়ালা জামা অার চুড়িই পরাইলেন না, সঙ্গে চোখে কাজল অার ঠোঁটে লিপস্টিকও দিয়া দিলেন। অামি সাজ চলাকালীন ভিতরে ভিতরে কানলাম, অার সিদ্ধান্ত নিলাম, অনুষ্ঠানের পর দিন অামি সবাইরে ছাইড়া চইলা যাব।

অামার নাচের সময় ঘটল এক দুর্ঘটনা। অামি দুঃখে লাফাইতেছি, কারণ অামি নাচের কিছুই জানি না অার এইটা জানা সত্ত্বেও প্রোগ্রামে অামারে এই’ই করতে বলা হইল। জর্জেট ওড়না বারবার পিছলাইতে ছিল। একপর্যায়ে নাচতে নাচতেই ওইটা ঠিক করতে গিয়া কেমনে জানি চুড়ির সাথে অাটকাইয়া গেল। অামি হাত পা ছুঁড়তে শুরু করলাম। তাতে, পায়জামার নিচের ভাঁজ করা বাড়তি অংশ খুইলা পায়ের নিচে গেল গা। অামি স্টেজে অাছাড় খাইয়া পড়লাম। দর্শকেরা হাইসা উঠল। স্টেজের কোণা থেইকা বিজ্ঞানের স্যার অামারে দ্রুত উইঠা গিয়া অাবার নাচ শুরু করতে ইশারা করলেন। হায় জীবন! অামিও অাবার উইঠা অামার লাফালাফি জারি রাখলাম। যেন কিছুই হয় নাই!

এরপর থেইকা অামি অার কোনোদিন চুড়ি পরি নাই। তবে, ইদানীং কাচের চুড়ি কেন জানি খুব টানতেছে। কয়দিন অাগে অামার এক ফ্রেন্ডের জন্মদিন উপলক্ষে তার জন্য দুই ডজন সাদা নীল কাচের চুড়ি কিনছি। তবে ওগুলা তারে দেই নাই।

গত পরশু বেইলিরোডে গেছিলাম। ফুটপাতে কাচের চুড়ি দেইখা অার থাকতে পারলাম না। তিন ডজন লাল রঙের কাচের চুড়ি কিন্না ফেললাম সঙ্গে সঙ্গে।

বাসায় অাইসা সেগুলার ছবি তুইলা এক ভদ্রলোকরে পাঠাইলাম ইনবক্সে। খুব এক্সাইটমেন্টের সাথে তারে বললাম, অাজকে কী কিনছি দেখবা?

তিনি বললেন, দেখাও। তবে একটু পরে।

তার ‘একটু পর’টা হইল অনেকক্ষণ পরে। ওই তিন ডজন চুড়ির ছবি তুইলা তারে পাঠাইলাম। ভদ্রলোক অামারে জানেন, অামি যে এগুলির ধারে কাছে নাই!

অামি অপেক্ষা করতেছি তিনি কী বলেন। একটু পরে চুড়ির ছবি দেইখা ওই মহাব্যস্ত ভদ্রলোক বললেন—হুম!

অামি ওইদিন রাতেই চুড়িগুলি হাতে পইরা দেখলাম। তারপর খুইলা রাইখা অামার অাম্মারে গিয়া বললাম—এইবার বৈশাখে অামি শাড়ি পরব, চুড়ি পরব। অার শাড়ির জন্য ব্লাউজ কিনতে হবে, টিশার্ট দিয়া অার পরব না।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here