ভালো ছবি তোলা এক জিনিস-সেটাকে এডিট করা আরেক জিনিস। এখন আমরা প্রায় সবাই সোশয়াল মিডিয়া, ইনস্টাগ্রামে কমবেশি ছবি আপলোড করে থাকি। আর ছবি আপলোড দেওয়ার আগে আমরা সেটাকে ফিল্টার করি, স্যাচুরেশন কমিয়ে দেই–তারপরে পোস্ট দেই। ছবিটাকে সুন্দর দেখাবে – যদি আসলেই এমন কিছু আমরা চাই তাহলে একজন প্রফেশনাল এডিটর সেই কাজ করে দিতে পারে। এখন হয়ত ছবি তোলার সময়ে একটা স্মার্ট অ্যালগরিদম সেই কাজ করে দিবে।

এমআইটি বা ম্যাসাচুয়েটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং গুগল নতুন একটি মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম বের করেছে, এই অ্যালগরিদম ছবি তোলার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা নিজেই নিজেই একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের মত ছবির সবকিছু ঠিক করে দিবে। অর্থাৎ, আপনি একটা ছবি তুললেন, আর আপনার ডিভাইসে চালু থাকা নিউরাল নেটওয়ার্ক নির্ধারণ করবে ছবিটিকে কিভাবে দেখতে সুন্দর করা যায় – প্রয়োজনমত কন্ট্রাস্ট বাড়িয়ে দিবে, ব্রাইটনেস হয়ত কমিয়ে দিবে- এবং যাই করুক, সবকিছু করবে মাত্র ২০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে।

এই রিসার্চের প্রধান লেখক এবং এমআইটির ডক্টোরাল স্টুডেন্ট মাইকেল ঘারিব বলেছেন, এই সময়টুকু এক সেকেন্ডের পঞ্চাশ ভাগ। ঘারিবের এই অ্যালগরিদমটি এত দ্রুত আপনার ছবিটিকে পালটে দিবে যে আপনি ছবিটিকে তোলার আগেই এর এডিটেড ভার্সন দেখতে পাবেন।

নিউরাল নেটওয়ার্ক কিভাবে নির্দিষ্ট ফটোগ্রাফিক স্টাইলগুলিকে শিখতে পারে সেটা আবিষ্কার করার জন্য ঘারবি গত বছর গুগলের গবেষকদের সাথে কাজ শুরু করেন। একই ধরনের কাজ ২০১৫ সালে জার্মান গবেষকরাও করেছিল। তারা একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক বানিয়েছিল যেটা যেকোনো ছবি তোলার সময় ভ্যান গগ ও পিকাসোর স্টাইলকে অনুসরণ করতে পারে।

ঘারবি জানিয়েছেন এই অ্যালগরিদমের উদ্দেশ্য হল কোনো এডিটিং অ্যাপ্লিকেশন ওপেন না করেই প্রফেশনাল ধরনের ছবি তোলা। এই অ্যালগরিদম একটা অটোমেটিক ফিল্টারের কাজ করে এবং এর কাজ অনেক বেশি সূক্ষ্ম। বেশিরভাগ এডিটিং ফিল্টার সম্পূর্ণ ছবিটাকেই একই রকমভাবে এডিট করে, যদি ছবিটির সব জায়গায় একইরকমভাবে এডিট করার প্রয়োজন নাও থাকে তবুও বেশিরভাগ ছবি পুরো ছবিটিকেই একরকমভাবে এডিট করে। ঘারবি’র অ্যালগরিদমে আলাদা আলাদা অনেক ফিচার থাকছে যেগুলি একই ছবির যেখানে যেটা প্রয়োজন তাই করবে। এবং প্রয়োজন অনুসারে সঠিক জায়গায় পরিবর্তন ঘটাবে।

ঘারবি বলেছেন, সাধারণত প্রতিটা পিক্সেলকে একইভাবে বদলে দেওয়া হয়। যখন আপনার ছবিগুলির নির্দিষ্ট জায়গায় প্রয়োজনমত পরিবর্তন করা হয়, সেটা বেশি ইন্টারেস্টিং।

এই অ্যালগরিদম নিজে নিজে শিখতেও পারে। যেমন, কোনো সেলফিতে উজ্জ্বল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে ছবিতে থাকা চেহারা-কে উজ্জ্বল করে দিবে। পানির ছবি নেওয়ার সময় সেই অংশের স্যাচুরেশন বাড়িয়ে দিবে অথবা কোনো ল্যান্ডস্কেপ ছবিতে গাছের সবুজ রঙ বাড়িয়ে দিবে।

ঘারিবের এই অ্যালগরিদম এই কাজ করতে পারেছে কারণ ঘারিব অনেকগুলি ম্যানুয়ালি এডিট করা ছবি দিয়ে এই অ্যালগরিদমকে ভিজ্যুয়াল সূক্ষ্মতার ব্যাপারে ট্রেনিং দিয়েছেন। এই নিউরাল নেটওয়ার্কটিতে গবেষকরা ৫০০০ এডিটেড ছবি ঢুকিয়েছেন। এই ছবিগুলির মাধ্যমে এই অ্যালগরিদমটি ছবি এডিট করার নিয়মগুলি শিখেছে। এখন আপনি যদি এই নিউরাল নেটওয়ার্কে আপয়ান্র এডিটেড ছবিগুলি ঢুকান, এটা আপনার নিজস্ব ফটোগ্রাফিক স্টাইল শিখে নিতে পারবে।

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল, এই সফটওয়্যার এতই হাল্কা যে এটা মোবাইল ফোনেও চলবে। ঘারিব বলেছেন, এটাকে দ্রুতগতিতে বাস্তবে চালানোর ক্ষেত্রে মূল ব্যাপারটি হল একটা ছবির সবগুলি পিক্সেলকে প্রসেস করতে হয় না।  একটা ছবির লাখ লাখ পিক্সেলকে প্রসেস করার বদলে, ঘারিবের অ্যালগরিদমটি ছবিটির একটা কম-রেজ্যুলেশন ভার্সন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় কোন কোন অংশ ঠিক করতে হবে। নিউরাল নেটওয়ার্কে থাকা নিয়মগুলির মাধ্যমে অ্যালগরিদমটি ডিসিশন নেয় ছবির কোন অংশের জন্য কিরকম কনট্রাস্ট, কিরকম উজ্জ্বলতা, কিরকম কালার ও কিরকম স্যাচুরেশন রাখতে হবে। এরপরে প্রয়োজনমত ছবিটির পরিবর্তন ঘটিয়ে ছবিটিকে আবার হাই-রেজ্যুলেশনে কনভার্ট করে। যেহেতু সম্পূর্ণ ছবিকে প্রসেস করতে হয় না, তাই খুবই দ্রুত কাজ করতে পারে।

এই অটো-এডিটিং ফিচারটি এখনো গবেষণার অধীনে আছে। তবে প্র্যাকটিকালভাবেই এই জিনিসটি ক্যামেরা ফিচারগুলিকে আরো দ্রুতগতির ও দক্ষ করে তুলবে। ঘারবি জানিয়েছেন অ্যালগরিদমটি এইচডিআর ফটো এত দ্রুত প্রসেস করে যে আপনাকে হাই ডেফিনেশন ছবির জন্য আধা সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে হবে না। এই প্রজেক্টের সম্ভাবনা ও গভীরতা বিবেচয়ান করেই গুগল এর সাথে জড়িত হয়েছে। অ্যান্ড্রয়েডের আগামী ভার্সনগুলিতে এই ফিচারটি থাকবে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত করে ঘারবি কিছু বলেননি, তবে জানিয়েছেন যে আমরা আশা করতে পারি।