page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি

আমাদের পুরান ঢাকায় যেমন দেশের অনেক পুরনো ঐতিহ্য, কোর্ট কাচারি, বনেদীয়ানা, বনেদী সব খাবারের দোকান ছাড়াও সব পাইকারী, খুচরা ব্যবসার অজস্র মার্কেট—ম্যানহাটানের ডাউন টাউন হল নিউইয়র্কের ঠিক তেমনি অংশ। ডাউন টাউন হলো পুরনো শহর। দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনা ঢাকার লালবাগ কেল্লার ঐতিহাসিক বিশাল চওড়া প্রাচীর ভেঙে গাড়ি প্রবেশের গেইট বানানো হলেও এই দেশে তেমন ক্ষমার অযোগ্য ভুল করার কথা কোনও পাগলও ভাববে না। এই দেশে সব পুরনো স্থাপনাগুলিকে ল্যান্ড মার্ক হিসাবে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় এসবের আকৃতির কোনো রকম পরিবর্তন না করে সংরক্ষণ করা হয়।

murad hai 3 logo

পৃথিবীর সব পুরনো শহরগুলির ভিতর আমি অনেক মিল খুঁজে পাই। পুরান ঢাকার সদরঘাট, ইসলামপুরের সাথে ডাউন টাউন ম্যানহাটানের সাউথ স্ট্রিট সী পোর্ট, চায়না টাউন, লিটল ইটালি, ক্যানাল স্ট্রিটের অনেক মিল আছে। কোর্ট কাচারি, ওয়াল স্ট্রিট, সব পণ্যের পাইকারি মার্কেট সব এই ডাউন টাউনে। বিদেশী ট্যুরিস্টরা এই শহরে বেড়াতে এলে অবশ্যই ডাউন টাউন ম্যানহাটান দেখবেই। ওখানে রাস্তার পাশে চেয়ার-টেবিল পাতা ছোট ছোট রেঁস্তোরায় বসে খাওয়া, পাবে বসে পান করা, রাস্তার পাশের দোকানপাট থেকে কেনাকাটা করা ট্যুরিস্টদের অনেক বেশি প্রিয় এই শহরে।

নিজে সরাসরি সেই এলাকায় ব্যবসায় না জড়ানোর আগে পর্যন্ত আমার কোনো ধারণা ছিল না ব্যবসার ধরন সম্পর্কে। কিছুদিন ডাউন টাউনের ক্যানাল স্ট্রিটে ঘুরে ফিরে এত মানুষের ভিড়, দোকানপাটে উপচে পড়া কাষ্টমার দেখে আমার মনেও ওখানে একটা ব্যবসা খোলার লোভ জাগল। মনে হয়েছিল, এই এলাকায় একটা দোকান দিতে পারলে খুব অল্প দিনে টাকার পাহাড় বানিয়ে ফেলতে পারব।

canal-3

সাথে দুই অংশীদার নিয়ে আমি ক্যানাল স্ট্রিটে খুঁজে পেতে সুবিধাজনক অবস্থানে একটা দোকান পেয়ে গেলাম। দ্রুত বড় লোক হবার স্বপ্নে পরিশ্রম করে জমানো একশত ভাগ হালাল আয়ের সব পয়সা খরচ করে ট্যুরিস্টদের পকেট কাটার জন্য মালের পসরা সাজিয়ে বসে গেলাম।

নিজে সরাসরি ব্যবসায় জড়ানোর আগে পর্যন্ত সেই এলাকার আসল ব্যবসা সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। মাথায় একটাই চিন্তা কাজ করেছে—যেখানে বেশি ট্যুরিস্ট হাঁটাহাঁটি করে, সেখানে ব্যবসা হতে বাধ্য। এই কথা সত্যি যে ক্যানাল স্ট্রিটে অনেক বেশি ট্যুরিস্ট যায়, কেনাকাটা করে। নিজে সেখানে থেকে টের পেলাম, ওরা ওখানে যায় শুধু নকল জিনিস কিনতে।

অল্পদিন পরেই টের পেলাম, ক্যানাল স্ট্রিটের আসল ব্যবসা হলো লুকিয়ে নকল জিনিস বিক্রি করা। ক্যানাল স্ট্রিটে ঢাকা ইসলামপুর, নবাবপুরের মত গায়ে গায়ে লাগিয়ে ব্যাঙের ছাতার অনেক দোকানপাট। এদের শো কেসে যে সব পণ্য থাকে, তার বিক্রি নিতান্তই কম। মূল ব্যবসা চলে পর্দার অন্তরালে।

canal-2

বাক্সের ভিতরে নকল coach পার্স।

ক্যানাল স্ট্রিটের কমবেশি সব দোকানে নকল পণ্য বিক্রি করে। মেয়েদের পছন্দের বড় ব্র্যান্ডের হ্যান্ডব্যাগ যেমন লুই ভুটন, মাইকেল কোরস, গুচি, প্রাডা, কোচ, রোলেক্স ঘড়ি, নকল পারফিউম, নকল ব্র্যান্ডেড সানগ্লাস—সব কিছুই পাওয়া যায়।

দোকানের ভিতর এসি চালিয়ে আমি সারাদিন বসে মাছি মারি। আমাকে মাসের শেষে বিশাল ভাড়া গুনতে হয়। আমার দোকানের বাইরে সাইডের ওয়াল ভাড়া নিয়ে এক দিকে একজন বিক্রি করে বাচ্চাদের খেলনা ঘড়ি। অন্য দেয়ালে আরেক দেশী ভাই বিক্রি করে কিছু সাধারণ সুগন্ধি। আমি ভাবি ওরা কেমন করে এসব জিনিস বিক্রি করে সারভাইব করে।

ট্যুরিস্টদের কেউ কেউ মাঝে মাঝে দয়া করে আমার দোকানের ভিতর ঢুকে এসির বাতাসে ঠাণ্ডা হয়ে বের হয়ে যায়। কারো ইচ্ছা হলে কিছু কিনে অনেক কম দাম দিতে চায় ক্যানাল স্ট্রিটের স্টাইলে। ওদের ধারণা, বাইরের নকল জিনিসের মত সব কিছুই এখানে যেমন খুশি দাম দিয়ে কেনা যায়। ব্যবসা হচ্ছে না দেখে বিলের ভয়ে আমি এসি চালানো বন্ধ করে দিয়ে গরমে বসে ঘামতে থাকি। বাসা থেকে বাটিতে করে নিয়ে আসা ভাত গরম করে খাই। বাইরে তাকিয়ে দেখি রাস্তার পাশেই টুলে বসে আমার দেশী ভাইরা হাত দিয়ে ভাত, মাছ, শুটকি মাখিয়ে বড় লোকমা গোগ্রাসে গিলছে আর জোরে জোরে কে কত বেচলো, কারে কেমন ঠকাইল আঞ্চলিক বাংলায় সেই গল্প করছে হাসিমুখে।

canal-17

এখন আর এমনটা দেখা যায় না। আগে মানুষ ওভারকোট পরে ভিতরে পিন দিয়ে আটকে নকল রোলেক্স ঝুলিয়ে রাখতো। কাস্টমার পেলে কোটের বোতাম খুলে ভিতরে ঘড়ি দেখিয়ে দিত। পছন্দ হলে খুলে বিক্রি করত। পুলিশ দেখলেই ভদ্রলোক হয়ে হাঁটা শুরু করতো। – লেখক

ঢাকায় চাকুরি করার সময় দেখেছি, দুপুরে লাঞ্চ আওয়ার হলেই মতিঝিল এলাকায় টোকাইদের মানুষের দুপুরের খাবার ভর্তি রুপালি রঙের তিন/ চার বাটির টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে এই অফিস, ওই অফিসে ছুটাছুটি করছে। ক্যানাল স্ট্রিটে দেখেছি দুপুর হলেই কিছু বয়স্কা বাঙালি মহিলা বাসা থেকে রান্না করে ডিসপসেবল লাঞ্চবক্স ভর্তি করে তার উপর হাতে লেখা মেন্যুর নাম লাগানো খাবার চাকাওয়ালা ট্রলিতে ভরে এনে বিক্রি করছে দোকানে দোকানে ঘুরে। এসব খাবারের ভিতর থাকে মাছ, মাংশ, সবজি, শুটকি, গরুর ভুঁড়ি, খাসীর মাথা, ইলিশ মাছ ভাজি, নানা রকমের ভর্তা, ডাল সব কিছু। পাঁচ-ছয় টাকায় এই লাঞ্চ বক্স বিক্রি হয়। আমাকেও এসে জিজ্ঞেস করে আমি কী খাবো। বললাম, আমার লাগবে না। ভেবেছে হয়ত আমার কাছে টাকা নাই, তাই বলে, এখন না দিলেও হবে। মাস শেষে দিয়েন। কথা শুনে বুঝলাম, মার্কেটিং ভালই জানে।

canal-13

কাগজে ডিজাইন দেখে ব্যাগ দরদাম চলছে। দাম ঠিক হলে ভিতর থেকে ব্যাগ এনে দেওয়া হবে। – লেখক

লাঞ্চ খাওয়ার সময় পুরো এলাকায় শুটকি, মুরগীর মাংসের গন্ধে মৌ মৌ করে। প্লেটে ঢেলে হাত দিয়ে খেয়ে নিয়ে প্লেটে পানি ঢেলে হাত ধুয়ে সেই পানি আবার খেয়ে নেয়। কারণ ওটা নাকি সুন্নত। মজার ব্যাপার হলো, খাওয়ার সময় এরা কোনো কাষ্টমার নেয় না। কেউ কিছু চাইলেও পরে আসতে বলে দেয়।

আমি আমার দোকানের ভিতর বসে কাচের দরজা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখি, আর অবাক হই। আর ভাবি, আমি কই এসে পড়লাম। যারা বাইরে নকল জিনিস বিক্রি করে, তাদের মালিকেরা কিন্তু সেখানে বসে থাকে না। দেশ থেকে মাত্র আসা মানুষেরা পয়সার জন্য বেপরোয়া হয়ে এসব কাজগুলি করে। মালিকেরা দূরে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে সিগারেট টানে আর ফোনে কথা বলে। নইলে পাশেই কারো অফিসের পিছনের রুমে বসে তাস খেলে সময় কাটায়।

নিশ্চয়ই ভাবছেন, মালিকেরা কেন তাদের দোকানে থাকে না। না থাকার কারণ হল, নকল জিনিস ধরতে এসব দোকানে প্রায়ই পুলিশ রেইড দেয়। যাকেই দোকানে পায় নকল জিনিসসহ তাকেই ধরে নিয়ে যায়। এক সাথে অনেক পুলিশের গাড়ি আসে। পুরো এলাকা সিল করে দিয়ে সব দোকান সার্চ করে। যত মাল পায়, সাথে সব কাজ করা মানুষদের হাতে হাতকড়া পরায়ে পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায়।

canal-11

লাগেজের ডালা খুলে নকল জিনিস বিক্রি। পুলিশ এলেই বাক্সের ডালা বন্ধ করে এরা ট্যুরিস্ট হয়ে যায়। – লেখক

এমন দৃশ্য দেখে আমার চোখ ছানাবড়া হয়। ভাবি, আহারে, নিরীহ মানুষগুলি জেলে গেল কাজ করতে এসে। কিন্তু যাদের ধরছে ওরা কিন্তু মোটেও ভয় পাচ্ছে না, কিংবা ছেড়ে দেয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করছে না। হাসিমুখে পুলিশ ভ্যানে ওঠে। কারণ তাদের এমন অ্যারেস্টের অনেক অভিজ্ঞতা আছে। এমন কেইসে কারো জেল-ফাঁসি হয় না। দুই দিন পরই ছাড়া পেয়ে চলে এসে আবার কাজে যোগ দেয়।

আমি কোনো নকল কিছু বিক্রি করি না। তবুও পুলিশ দেখলেই আমার খুব নার্ভাস লাগে। পুলিশ মাঝে মাঝে আমার দোকানে ঢুকে এদিক-ওদিক তাকিয়ে চেক করে আমি কী বিক্রি করি। ওদের দেখলেই ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যায়। ভাবি, যদি কোনো কারণে আমাকে হাতকড়া পরায়, তখন কী হবে!

মনে মনে ভাবি, এই এলাকায় আসা মস্ত বড় ভুল হয়েছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে সব ফেলে দিয়ে খিঁচে দৌড় দিয়ে পালিয়ে যাই। চাইলেই কি আর সেটা সম্ভব?

canal-14

নকল মাল জব্দ করেছে পুলিশ – লেখক

ক্যানাল স্ট্রিটে আসলেই অনেক ট্যুরিস্ট আসে, এটা সত্যি। ওরা আসেই শুধু নকল জিনিস কিনতে। ওরা আমার কাছ থেকে লাইসেন্স করা ‘আই লাভ নিউইয়র্ক’ টি শার্ট কিনতে আসে না চড়া মূল্যে। কর্মচারীর বেতন, ট্যাক্স, ইউটিলিটি বিল, মালের দাম, মাস শেষে অনেক টাকা ভাড়া দিতে আমার নাভিঃশ্বাস অবস্থা। আর নকল জিনিস বিক্রির মালিকেরা মাঝে মাঝে আমার দোকানে এসে বলে, ভাই কেমন আছেন? ওদের প্যান্টের দুই পকেটে রাবার ব্যান্ডে মোড়ানো টাকার বান্ডেল বাইরে থেকেই বোঝা যায়। এর ওর মুখে শুনি, কেউ লং আইল্যান্ডে বাড়ি কিনেছে। ঢাকায় কোটি টাকার ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছে—এসব গল্প।

ক্যানাল স্ট্রিটে ভিয়েতনামি, চাইনিজ মানুষের একটা চক্র আছে। এরা এক ধরনের মাফিয়ার মত সংঘবদ্ধ দল। পুরনো বিল্ডিংগুলির আসল বাড়িওয়ালা হল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইহুদিরা। এই মাফিয়া চক্র ইহুদিদের কাছ থেকে এসব পুরনো বিল্ডিং কম পয়সায় লম্বা সময়ের জন্য লিজ নেয়। সাথে থাকে কিছু লইয়ার। তারপর এসব বিল্ডিংগুলিকে ছোট ছোট ভাগ করে দোকান বানিয়ে অনেক টাকায় ভাড়া দেয়। এভাবে মাস শেষে একটা মোটা অংকের টাকা কিছু না করেই মাস শেষে তাদের পকেটে চলে যায়। এত বড় ফাও অর্জন দিয়ে এরা খুব বিলাসবহুল জীবন কাটায়।

canal-9

মেয়র ব্লুমবার্গ নকল জিনিস ধরার পর দোকানপাট বন্ধ করার ঘোষণা দিচ্ছেন। – লেখক

এসব মাফিয়াদের যোগ সাজশেই চায়না থেকে আসল মালের কভারে জাহাজভর্তি করে নকল মাল আসে। এসব বিল্ডিং-এ গোডাউন বানিয়ে নকল মাল মজুত করে। মাঝে মাঝে এদের কিছু গুদাম ধরে পড়ে সব মাল জব্দ হয়। তাতে মনে হয় না তাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়। যতটুকু বাজারজাত করতে পারে, তার লাভের পরিমাণ এতই বেশি যে তাদের সব ক্ষতি পুষিয়ে যায়।

নিউইয়র্কের আগের মেয়র ব্লুমবার্গের সময় আইন তৈরি করে পুলিশ এমন ব্যবসা করে অনেক বিল্ডিং সিলগালা লাগিয়ে অন্ধ করে দিয়েছে বাড়িওয়ালাদের মোটা অংকের ফাইন করে। এছাড়াও আইন করেছে, শুধু যারা নকল পণ্য বিক্রি করবে তারাই নয়—যে সব মানুষ এসব নকল পণ্য ক্রয় করবে ধরা পড়লে তাদেরও জেল হবে। এই আশঙ্কায় খোলাখুলি ভাবে নকল পণ্যের বিক্রি বন্ধ হলেও লুকিয়ে এখনো চলছে। তবে ধরা পড়ার ভয়ে ক্যানাল স্ট্রিটে ট্যুরিস্টের যাতায়াত অনেক কমে গেছে।

murad-hai-015

মুরাদ হাই (২০১২)

দুই বছর চেষ্টা করে টাকার পাহাড় বানানো দূরের কথা, নিজেদের সমস্ত বিনিয়োগ হারিয়ে কানে ধরে ওঠাবসা করে বাড়িওয়ালার হাতে পায়ে ধরে অনেক সাধের ব্যবসা ছেড়ে পালিয়েছি জান নিয়ে—কিন্তু মাল নিয়ে নয়। সব হারালেও তখন শুধু মনে হয়েছে “ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি।”

নিউইয়র্ক, ৩০ জুলাই, ২০১৫

About Author

মুরাদ হাই
মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।