page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

জনাব শফি

এক শুটিং ইউনিটে সিনেমা আর্টিস্ট এফডিসির গুলশান আরা আপা রাতের বেলা হঠাৎ ব্লাস্ট করে বসল। সবাই তার দিকে মনোযোগ, কী হলো? ডিরেক্টর ছুটে এল।

গুল আপা: কক্ষন চা চাইছি প্রোডাকশানের এগুলা হারামজাদারা আমার সামনে চা আনতাছে, যাইতাছে আমারে চা দেয় না।

ডিরেক্টর নিজে উদ্যোগী হয়ে প্রোডাকশানকে বলে দিলেন, এক্ষনি চাআ দে বাকিটা পরে দেখতেছি। বলার বাকি প্রোডাকশান চা নিয়ে রেডি। গুলশান আপাকে দেয়, আপা তো আর খায় না। কেন?

whomayuns logo

গুল আপা: নাহ্‌ এখন তো আমি কাব না। একবার আরেক শুটিং-এ এরকম চা দেয় না দেইখা বয়রে গালাগালি করছিলাম। পরে চা দিল। সেই চা কাইয়া আমি তো বেঁহুস, বাপরে বাপ! এখন তো এই চা আমি কাব না মাপ চাই।

উনার কথা শুনে সবাই হাসলাম প্রোডাকশানশসুদ্ধ।

প্রোডাকশান ম্যানেজার, বয় নিয়ে বহুৎ কিস্‌সা, মিথ আছে। অনেকের কাছে শোনা, সুজন ভাইয়ের কাছ থেকেও শোনা, বাংলাদেশে যেবার আমির খান আসলেন ঐ ইউনিটে সুজন ভাইদের প্রোডাকশান বয় কাজ করছিল। শুটিং-এ তার ব্যবহার, স্কিল, পারফর্মেন্সে এত মুগ্ধ হইছিলেন তাকে ইন্ডিয়ায় কাজের অফার করলেন। ওস্তাদের প্রতি বিশ্বস্ত ছেলেটা গেল না।

পরে ইন্ডিয়া গিয়েও তাকে কল করা হইছিল, ভাল অঙ্কের টাকা সাধা হল। সে বিনয়ের সাথে বলল, কেমনে সম্ভব!

আজকে যার কথা বলতেছি সে আদর্শলিপি ইউনিটের প্রডাকশান বয় শফি। ধারাবাহিক ‘ছোট ওয়ান’-এর নাম বদলে রাখা হইছে ‘আদর্শলিপি’। নতুন নতুন আরো ক্যারেক্টার ঢুকছে।

জনাব শফি সবসময় ভ্রু কুঁচকে মুখ খিঁচে চেহারা এমন দলিত-মথিত বানাইছে, মনে হয় চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে বহুদিন ধরে বিরক্ত ও ক্লান্ত। বাধ্য হয়ে আমি তাকে চা দিতে বলে আর তাকাইতাম না।

অ্যাক্টর ম.ম তাকে বলে, কীরে তোর কী হয়চে? নেপালের ভূমিকম্পে তুই খুব মর্মাহত নাকি? নাকি ওখানে তোর নিকটাত্মীয় মারা গেছে? চেহারা কেমন ভংচায়া গেছে।

আমি শফির দিকে তাকাইলাম। চেহারা যত করা যায় আরো তিতা করে তাকাইল।

আদর্শলিপির বিজ্ঞাপন

আদর্শলিপির বিজ্ঞাপন

ম.ম ভাই বলল, আমার চেহারাও এমন… তো আমি তো মনে কর সামাজিক, পারিবারিক নিষ্পেষণে কখন কবে চেহারায় ডেস্ট্রাকশান আর ফ্রাস্ট্রেশনের ছাপ পড়ে গেছে টের পাই নি। তোর কী হয়চে বাছা, বল আমাকে খুলে বল?

অ্যাক্টর ম.ম’র বর্ণনায় শফিকে কিছুটা তুলে ধরতে পারছি তো। ঢাকার কাঁঠাল পাকা গরমে আমাদের শুটিং-এর প্রপ্‌স কিছু মুরগি মারা গেছে। এমন গরমেও সে অলমোস্ট রেক্সিনের একটা ফুল হাতা শার্ট পরে ঘুরবে। বেছে বেছে কমলা বা কড়া নীল কালার পরবে। তাকাইলে চোখে আর অন্য কিছু দেখি না। একদিন একলা, দূরে বইসা আছি। সে এসে আস্তে করে বলল, বস মন কি খুব উদাস!

তার আচমকা উপস্থিতি, মোলায়েম ভঙ্গিতে আমি মজা পাইয়া হাসলাম। বললাম, খুব না, একটু উদাস! কী করা যায়?

সে একটু ভেবে বলল, একটা কাজ করতে পারেন। আপনার গালফ্রেনরে একটা কল দেন।

এর দেখি গিরায় গিরায় মজা। বললাম, ঠিক কইছেন। এখনি দিতাছি।

“দেন। আর আমি আপনের জন্য চা নিয়া আসতেছি।” বলে চলে গেল।

বুইঝা গেলাম চেহারার লগে এর ক্যারেক্টার যায় না। এ অন্য মাল। রসিকলাল। আমি কিছুক্ষণ পর পর চা খাই, শুটিং-এও। আর কিছু না খাইলেও চলে। এরপর থেকে চা খাইতে চাইলে তারে খুঁজি। ডাক দিলাম ‘প্রোডাকশান।’

সে পাশ থেকে আমার কাছে ঘেষে আস্তে করে বলল, “বস আমার নাম শফি।”

নাম জানতাম না, এটা ভুল হইছে। বললাম, ও। শফি ভাই দুধ নাকি শস্তা বাজারে?

সে বলল, হ ছড়াছড়ি।

চা পাতার কী অবস্থা?

চা পাতা এট্টু শর্ট আছে। অসুবিধা নাই টিব্যাগ আছে। আপনি বসেন আমি এখনি চা দিতাছি। আর কিছু লগে?

আর কিছু চাইলে সারাদিন লাগাবে। চা-ও খাওয়া হবে না। হাইসা কইলাম, “না শফি ভাই, শুধু চা।”

২.
এই ইউনিটের আরেকজন তারেক ভাই। বিশালদেহী, ব্যবহার বইয়ের মত রাবীন্দ্রিক। অবসরে শফিকে কাছে ডাকলাম। তারেক ভাই কার সাথে ফট ফট করতেছিল। কখন শফিকে কী বলে বসে, সে তারেককে দেখায়া আমারে কইল, ভালো এক্টিং করে।

তারেক ভাই খেয়াল করে নাই। তাকে ডেকে বলল, এই চা দাও। চায়ের সাথে কী আছে?

শফি: কিছু নাই ভাই।

তারেক: তাইলে আনাও। যাও বাইরে থেকে আনাও।

সে যাবার সময় ইশারায় দেখায়া বলল, বেশি ভাল এক্টিং করে না।

অন্য দিন। চা চাইলাম। শফি জানাইল, এট্টু ধেরি হবে।

বললাম, ধেরি হবে কেন?

shadhu may 28 d

জনাব শফি

স্পেশাল একটা চা দিতাছি, সেরকম।

অপেক্ষায় রইলাম সেরকম চায়ের। এরপর যে চা সে দিল সেটা ঠাণ্ডা।

বললাম, এটা স্পেশাল চা? গরম চা ঠাণ্ডা করে তারপর দিছো। বানাইতে কষ্ট হইছে না?

সে বলল, না কষ্ট হয় নাই। এসিতে ছিল।

এজন্য স্পেশাল! গরমে কোল্ড টি।

৩.
তারেক ভাইয়ের ডায়াবেটিস। কিছুক্ষণ পর পর খাইতে হয়। তিনি সলিড কিছু খাইতে চাইলেন। শফি আমাদের কারো দিকে না তাকিয়ে চিন্তা করার ভঙ্গি করে প্রোডাকশানের আরেকজনকে বলল, ডায়াবেটিস রোগী… তাইলে ঝালমুড়ি খাইলে ভাল হইব।

বিকালে ঝালমুড়ি আনার কথা প্রোডাকশানের আগে থেকে। ঝালমুড়ি ডায়াবেটিস রোগীর জন্যেও না, সলিড খাবারও না। ঝালমুড়ি আনবে সেটা তারেক ভাইয়ের নাম দিয়া চালায়া দিল। তারেক ভাই আমার দিকে তাকায়া হাসল।

আমি খাবার নিয়া প্যারাপেরি করি না। শফি আমাকে স্পেশাল লেবু চা দিয়ে চলে যাচ্ছিল। পাশ থেকে তারেক ভাই বলল, “এই আমাকে এক কাপ… স্পেশাল।”

শফি: চা বেশি খাইলে রঙ কালো হয়ে যাবে, আর শরীর কষা হয়ে যাবে।

ঘন কালো বর্ণের তারেক ভাই ধমকে উঠলেন, “তুমি জানো? আগে ডাক্তারি পেশার সাথে ছিলা? কোন ডাক্তারের সাথে কাজ করতা? এত ডাক্তারি মারাও!”

শফি নগদ—হ্যাঁ এক্টা ডাক্তারের সাথে চেম্বারে আড়াই বৎসর আছিলাম। ডেন্টাল।

কুঁচকুঁচে কালো বর্ণের তারেক ভাইয়ের মুখে কথা আটকে গেল, শুধু তাকায়া থাকল। কী বলবে বুঝতে পারতেছে না। তারেক ভাই কথার কথা বলছিল, এখন দেখা যায় শফি সত্যিই কাজ করছে!

শফি চলে যাচ্ছে, আমি সাইড থেকে দেখলাম সে গাল ভরে হাসতেছে।

৪.
শট শুরুর সময় কাছে বা দূর থেকে শফির আওয়াজ পাওয়া যায়।

“এই কুয়াইট!” “যে যার যার জায়গায় খাড়ায় থাকি, লড়বেন না!” “শট রেডি,অকে যাই!”

shadhu may 28 b

আদর্শলিপির সেটে

এর আগে যেটা হইছিল, শটের সময় তার কথা শোনা যেত। কখনও গুন গুন কখনও মোবাইলে, কখনও খাবার নিয়া অন্য বয়ের সাথে। হয়তো শট চলেতেছে, শটের মাঝে ‘কেউউউঁত’ অদ্ভুত আওয়াজ! খোঁজ নিয়ে দেখা গেল শফি দরজা ঠেলে ঢুকতেছে।

ডিরেক্টর একদিন গরম হয়া তারে সেট থেকে বের করে দিল।

এরপর থেকেই তার এক্সট্রা কেয়ার। সবাইকে কোয়াইট রাখা, অবাঞ্ছিত কেউ ফ্রেমে ঢুকে পড়তেছে নাকি, দরজা ঠেলে ‘কেউঁত কুঁত’ করতেছে নাকি এগুলা তদারকির গুরুদায়িত্ব নিয়া নিছে শফি।

খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে ঝাউরামিগুলা করে।

আমি যেহেতু দেখি, সে আমার দিকে তাকায়।

আমি হাসলে সে বোঝে ঠিকঠাক আছে, না হেসে অন্যভাবে তাকালে সেও বোঝে ঝামেলা হইছে, মুখ ঘুরায়া নেয়।

About Author

হুমায়ূন সাধু
হুমায়ূন সাধু