page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

জনি ডেপ—‪জন ক্রিস্টোফার ডেপ দ্যা সেকেন্ড

শুটিং নিয়ে সবাই যখন মহাব্যস্ত, সবাইকে চমকে দিয়ে তরুণ হিথ লেজার তখন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে এক মধ্যরাতকে বেছে নিলেন। শুটিং চলতে থাকা ছবিটির নাম ছিল—‘দ্যা ইমাজিনারিয়াম অফ ডক্টর পারনাসাস’।

তখনও ‘দ্যা ডার্ক নাইট’ মুক্তি পায় নি। কিন্তু ডার্ক নাইটের মুক্তি সবার হাহাকারকে যেন আরো মুক্ত করে দেয়। আর ডক্টর পারনাসাসের পরিচালক বিখ্যাত ব্রিটিশ কমেডি গ্রুপ ‘মন্টি পাইথন’ এর সদস্য টেরি গিলিয়াম যেন আরো বেশি দুমড়ে পড়লেন।

বন্ধু হিথ লেজার মারা যাওয়ায় সেই ছবি শেষ করার আশা তিনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু লেজারের শেষ ছবি বলেই কিনা, দর্শকদের প্রতি একটা দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। কাহিনীতে এক অনন্য পরিবর্তন করে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন—এই ছবি শেষ করতে হবে।

shadhin-ahmed-logo

গল্পটা এরকম—হিথ লেজার একটা সার্কাসের কর্মচারি হিসেবে চাকরি করে। সেই সার্কাসের বিশেষ আকর্ষণ হলো, একটা আয়নার ভেতর দিয়ে জাদুকরি এক জগতে ঘুরে আসা যায়। হিথ লেজার রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কাস্টমার জোগাড় করেন। সুদর্শন আর চতুর হওয়ায় মেয়েরা খুব সহজেই তার সার্কাসের সেই আয়নার জগত ভ্রমণে রাজি হয়ে যায়। তিনি তাদেরকে নিয়ে সেই আয়নায় ঢুকে পড়েন।

depp-guiter-2

গিটার হাতে তরুণ জনি ডেপ।

nightmare-1

এ নাইটমেয়ার অন এলম স্ট্রিট (১৯৮৪) ছবিতে তরুণ জনি ডেপ।

ফ্যান্টাসি এই ছবিতে আয়নার সেই পৃথিবীকে বাস্তব হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেখানে মেয়েরা আক্ষরিক অর্থেই তাদের কল্পনা জগতে ঘুরে আসতে পারে, সঙ্গী হিসেবে থাকে হিথ লেজার। কিন্তু ছবির এই চমকপ্রদ অংশে এসেই হিথ লেজার মারা যান। তাই টেরি গিলিয়াম তার কল্পনারসকে আরো ঘন করে তোলেন।

তিনি দেখান, যে মেয়েগুলি সেই আয়নার ভেতর প্রবেশ করে, তাদের কল্পনামাফিক হিথ লেজারের চেহারা পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে তিনি সেই মুহূর্তগুলিতে হিথের বদলে অন্য অভিনেতাদের নেবার সুযোগ পাবেন। মোট তিনজন মেয়ে থাকায় তিনি তিনজন অভিনেতার সাথে যোগাযোগ করেন। যেহেতু ছবিটা নিতান্তই ব্যক্তিগত উৎসাহ থেকে করা, তাই তিনি তার কাছের তিন বন্ধুকে বিষয়টা জানান। তারা একবাক্যে রাজি হয়ে যান। এমনকি সেই ছবির জন্য বরাদ্দ তাদের পারিশ্রমিকও তারা হিথ লেজারের মেয়েকে উপহার হিসেবে দিয়ে দেন। এই তিনজন অভিনেতার মাঝে দুইজন হলেন, কলিন ফেরেল ও জুড ল’। আর তৃতীয়জনের ঘটনাটা একটু বিচিত্র।

ছবিতে হিথ লেজার পাল্টে যখন সেই অভিনেতা চলে আসেন, তখন প্রথম এক-দুই মিনিট দর্শকেরা বুঝতেই পারে নি যে তিনি হিথ লেজার নন। আসলেই, এই অভিনেতার সাথে হিথের চেহারায় অদ্ভুত মিল। দু’জনের চেহারার এই সাদৃশ্যটা ঠিক ‘লুক-অ্যালাইক’ জাতীয় নয়। বরং মনে হয় যেন একে অপরের আত্মীয় তারা।

ninth-gate-21

দ্যা নাইনথ গেট (১৯৯৯) ছবিতে জনি ডেপ।

একই রকম ঘটনা আগেও ঘটেছিল। ২০০৩ সালে পরিচালক টেরি গিলিয়ামেরই ছবি ‘দ্যা ব্রাদার্স গ্রিম’-এ হিথ লেজারকে নেয়া হলে, তার বড় ভাইয়ের চরিত্রে গিলিয়াম সেই অভিনেতাকেই নিতে চেয়েছিলেন। কারণ লেজারকে দেখেই গিলিয়ামের কাছে মনে হয়েছিল তাকে একদম সেই অভিনেতার ছোট ভাই মনে হয়। কিন্তু প্রযোজকেরা তাতে সায় দেন নি। কারণ হিসেবে তারা জানান—সেই অভিনেতা কোনও তারকা নন, বক্স অফিসে তার তেমন জনপ্রিয়তা নেই। ফলে গিলিয়ামকে মুখ গোমড়া করেই লেজারের ভাই হিসেবে ম্যাট ড্যামনকে নিতে হয়।

সেই রহস্যময় অভিনেতার নাম ‘জন ক্রিস্টোফার ডেপ দ্যা সেকেন্ড’। সবাই জানে ‘জনি ডেপ’ নামে।

২.
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থাকছে—যে জনি ডেপের সব ছবি বিশ্বময় সাড়ে সাতশ’ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে, যে জনি ডেপ ২০১১ সালে তার ‘পাইরেটস অফ দ্যা ক্যারিবিয়ান’ এর চতুর্থ কিস্তির জন্য সাড়ে সাত কোটি ডলার পারিশ্রমিক নিয়ে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখালেন, যে জনি ডেপ পিপল সাময়িকীর হিসেবে দুই-দুইবার ‘সেক্সিয়েস্ট ম্যান অ্যালাইভ’ নির্বাচিত হলেন—সেই জনি ডেপ কীভাবে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বক্স অফিসে পিছিয়ে থাকেন?

সত্যি কথা বলতে, ২০০৩ সালের আগে ক্যারিয়ারের প্রেক্ষাপট এমনটাই ছিল।

jack-sparrow-1

পাইরেটস অফ দ্যা ক্যারাবিয়ান: অন স্ট্র্যান্জার টাইডস (২০১১) ছবিতে জনি ডেপ।

১৯৮৪ সালে বন্ধু জ্যাকি আর্ল হেলির সাথে বিখ্যাত হরর ক্লাসিক ‘এ নাইটমেয়ার অন এলম স্ট্রিট’ এর অডিশনে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বন্ধুর অডিশনে তাকে সঙ্গ দেয়া। কিন্তু তার বন্ধুকে অবাক করে দিয়ে ছবির পরিচালক জনিকেই ছবির অন্যতম মূল চরিত্রের জন্য বাছাই করলেন। ছবিটির ব্যাপক সাফল্য থেকে কিছুটা তিনিও ভাগাভাগি করে নেন। ভাগ্যের জোরে তার জীবন যে নতুন সংস্করণ খুঁজে পেয়েছিল, তা আজও হারায় নি।

তার দুই বছর পর তাকে দেখা যায় অলিভার স্টোনের ক্লাসিক ওয়ার মুভি ‘প্লাটুন’-এ। সেই ছবিতে অবশ্য স্বল্পদৈর্ঘ্যের একটি চরিত্রে তাকে ঠিকমত কেউ দেখতেই পারে নি। কিন্তু এরপরই তিনি টিভি সিরিজ ‘টুয়েন্টি ওয়ান জাম্প স্ট্রিট’-এ সুযোগ পেয়ে যান। তিন বছর সেখানে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করে টিন-এজারদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু এই একমুখি পরিচিতি তাকে অভিনেতা হিসেবে বিষণ্ণ করে তোলে। আর তারপরই তার ক্যারিয়ারে কিছুটা বৈচিত্র্য আসে।

swiny-t2

সুইনি টড: দ্যা ডেমন বারবার অফ ফ্লিট স্ট্রিট (২০০৭) ছবিতে জনি ডেপ

পরিচালক টিম বার্টন তার নতুন ছবির জন্য অভিনেতা খুঁজছিলেন। এক পর্যায়ে প্রযোজকদের নির্দেশে তারকা টম ক্রুজের সাথে কথাও বললেন, কিন্তু ক্রুজ সাহেব ‘হ্যাপি এন্ডিং’ এর দাবিতে ছবিটি করতে নারাজ হন। বার্টনের মনে বার বার ডেপের নামই ঘুরছিল। তাই পূর্বপরিচিতি না থাকলেও শেষ সুযোগ হিসেবে তিনি ডেপকে তার চিত্রনাট্য পাঠান। একঘেয়েমিতায় আক্রান্ত ডেপ সেই চিত্রনাট্য পড়তে পড়তে আবেগী হয়ে গেলেন। ‘এডওয়ার্ড সিজরহ্যান্ডস’ নামক সেই ফ্যান্টাসি ছবির বিচিত্র চরিত্রটি ডেপের ক্ষুদ্র অভিনয় জীবনে এক নতুন ধারা শুরু করে দেয়। আর হিচকক যেমন জিমি স্টুয়ার্টকে পেয়েছিলেন, স্করসেজি যেমন পেয়েছিলেন ডি নিরো ও ডিক্যাপ্রিওকে, তেমনি টিম বার্টনও তার জনি ডেপকে খুঁজে পেলেন। জনির ভাষায় তাদের শুরু হওয়া সেই সম্পর্কটি “দু’জন ভাইয়ের সম্পর্ক, এক নগণ্যের সাথে একজন সাহসী মানুষের বন্ধুত্বের সম্পর্ক।”

tim-depp

টিম বার্টনের সঙ্গে।

নব্বইয়ের দশকেই ডেপ ও বার্টন একসাথে আরো দুইটি ছবি করেন। এর একটি হলো ‘এড উড’, যা জনিকে তার প্রজন্মের সেরা অভিনেতাদের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করে। আর অন্যটি হলো ‘স্লিপি হলো’, যা বক্স অফিস ও সমালোচকদের সমানভাবে আপ্লুত করে। এর মাঝেই তিনি বেশকিছু স্বল্পব্যয়ী ও ইন্ডিপেনডেন্ট ছবিতে কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে তাকে তিনটি চমৎকার ছবিতে দেখা যায়। একটি ‘বেনি এন্ড জুন’, যেখানে তার অভিনয় ছিল রাণবীর কাপুরের ‘বারফি’ চরিত্রের মূল অনুপ্রেরণা। দ্বিতীয়টি আমার জীবনে দেখা সেরা ছবিগুলোর একটি—‘হোয়াট’স ইটিং গিলবার্ট গ্রেপ’, যেখানে তিনি লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও’র বড় ভাইয়ের ভূমিকা পালন করেন। আর সবশেষে মুক্তি পায় কিংবদন্তী পরিচালক এমির কুস্তুরিকা’র প্রশংসিত ছবি ‘আরিজোনা ড্রীম’।

johny-joli-28

মায়ের সঙ্গে জনি ডেপ।

এরপর তিনি ‘নিক অফ টাইম’ নামের একটি কমার্শিয়াল ছবি করেন। যা বক্স অফিসে ব্যর্থ হলেও আব্বাস-মাস্তান তাদের ‘বাদশাহ’ ছবিতে সেই ছবির গল্প চুরি করতে ঠিকই সফল হন। প্রখ্যাত পরিচালক জিম জার্মুশ তার ‘ডেড ম্যান’ নামের ভিন্নধর্মী ওয়েস্টার্ন ছবিতে ডেপকে নিয়েছিলেন, কিন্তু ছবিটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া পায়। তারপর একে একে দুই গডফাদারের সাথেই তার পরিচিতি ঘটে। প্রথমে মার্লন ব্রান্ডো’র সাথে ‘ডন হুয়ান ডিমার্কো’ ছবিতে অভিনয় করেন, যা ছিল ব্রান্ডোর জীবনের সবচাইতে বাজে অভিনয়-প্রদর্শনীগুলির একটি। ফলে ব্রান্ডোর মত কিংবদন্তীকে পাশ কাটিয়ে বিজ্ঞরা জনি ডেপের সু-অভিনয়েই মগ্ন হয়ে পড়েন। আর আল পাচিনোর সাথে তার দেখা হয় অসাধারণ গ্যাংস্টার ছবি ‘ডনি ব্রাস্কো’তে একসাথে কাজ করতে গিয়ে।

একটি ছবি করেই মার্লনের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তাই জনি যখন প্রথমবারের মত চলচ্চিত্র পরিচালনায় যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন মার্লনের কাছ থেকে একটি অতিথি চরিত্র আদায় করে নিতে মোটেও সমস্যা হয়নি। ‘দ্যা ব্রেভ’ নামের সেই মুভিটি বোদ্ধাদের কাছে তেমন আলোড়ন না ফেলায় রিক্তমনে তিনি ছবিটিকে এক রকম লুকিয়েই ফেলেন। খ্যাতির জন্যে চলচ্চিত্রে আসেন নি, তাই যেসব চরিত্র তার বোধে টোকা দিত, শুধু সেগুলোতেই অভিনয় করতেন। ফলাফল হিসেবে তারকা তকমাটা গায়ে আঁটে নি তখনও। কিন্তু ২০০৩ সালে সব এলোপাথাড়ি হয়ে যায়।

depp-and-dad

বাবার সঙ্গে জনি ডেপ।

হিউ জ্যাকম্যান এর কথা চিন্তা করে লেখা হলেও, ডিজনির কথামতে ‘পাইরেটস অফ দ্যা ক্যারিবিয়ান’ ছবিতে ‘জ্যাক স্প্যারো’ চরিত্রে ডেপকে নেয়া হয়। ফলে ছবিটি নিয়ে বিজ্ঞরা দোটানায় পড়ে যান। এত বড় বাজেটের ছবিতে জনি ডেপের মত ‘কাল্ট আর্টিস্ট’কে নেয়া কি ঠিক হলো? এই বিশাল ফ্লপ ডিজনি সামাল দিবে কীভাবে?

অথচ এই ছবিটি এককভাবেই হলিউড থেকে হারিয়ে যাওয়া ‘পাইরেটস’ জঁনরাটিকে আবার ফিরিয়ে আনে। জনি ডেপ হুট করেই ‘এ-লিস্টেড’ তারকাদের কাতারে চলে আসেন, আর সেই সাথে পান প্রথমবারের মত অস্কার মনোনয়ন।

৩.
তিনবার অস্কারের জন্য মনোনীত হওয়া এই অভিনেতা ৯ জুন, ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। চারজন সন্তানের জনক-জননী তার বাবা-মা পেশায় ছিলেন যথাক্রমে সিভিল ইন্জিনিয়ার ও ওয়েট্রেস। সবার ছোট ছিলেন, তাই মা স্নেহের তাড়নায় ১২ বছর বয়সে জনিকে একটি গিটার উপহার দেন। গিটারের আবেশে নিজের মাঝে গান নিয়েই ক্যারিয়ার গড়বার ইচ্ছা জাগে। বন্ধুবান্ধব নিয়ে একটি ব্যান্ডও দাঁড় করিয়ে ফেলেন। ১৫ বছর বয়সে যখন বাবা-মা আলাদা হয়ে যান, তখন তিনি হুট করেই স্কুল ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন।

এমন না যে বাবা-মার বিচ্ছেদ তাকে আচ্ছন্ন করেছিল, বরং মিউজিশিয়ান হবার ইচ্ছাতেই পড়ালেখাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ফেলেন। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর কিছুটা সংবিৎ আসে, নিজের বোকামি ধরতে পারেন। সাহস যুগিয়ে চলে যান হেডমাস্টারের কাছে, উদ্দেশ্য—মাফ চেয়ে আবার স্কুলে ভর্তি হবার আবেদন করবেন। কিন্তু অবাক হলেন, যখন হেডস্যার তাকে স্কুলের পরিবর্তে সঙ্গীতেই মনোযোগ দেবার পরামর্শ দিলেন।

স্যারের এই পরামর্শ যেন তার প্রতিভার তুলায় বাতাসের মত কাজ করল। তার ব্যান্ডদলটি স্থানীয়ভাবে বেশ জনপ্রিয়তাও পায়। একসময় তার ব্যান্ডের বেজ গিটারিস্টের ছোট বোনের প্রেমে পড়ে যান।

deep-lora

প্রথম স্ত্রী লরি অ্যান উইলসনের সাথে বিয়ের দিন জনি ডেপ

অল্পবয়সী ছিলেন, আবেগের বশেই ১৯৮৩ সালের এক বিকেলে তার কিশোরী ভালোবাসাকে বিয়ে করে ফেলেন। মেয়েটার নাম ছিল লরি অ্যান। দু’জনের সংসার চালানোর মত সামর্থ্য তাদের কারোরই ছিল না। লরি অ্যান চলচ্চিত্রের মেক-আপ আর্টিস্ট এর চাকরি নিলেন, আর জনি নানান আঙ্গিকের পেশায় জড়িয়ে গেলেন। একসময় অর্থাভাবে টেলিমার্কেটার হিসেবে কলম বিক্রি করেও চলতে হয়েছে। তারপর একদিন স্ত্রী তাকে প্রখ্যাত অভিনেতা নিকোলাস কেজ এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। কেজ সাহেব তার প্রতিভা কীভাবে ধরতে পেরেছিলেন তা অজানা, কিন্তু তিনিই প্রথম ডেপকে অভিনয়ে যাবার পরামর্শ দেন।

১৯৮৫ সালে লরি অ্যানকে তালাক দেবার পর থেকে তার সংসার জীবনে শুরু হয় এক অনির্দিষ্ট দোলাচল। মোটামুটি যতজন সুন্দরীর সাথেই তার সম্পর্ক খানিকটা গভীরে গিয়েছে, তিনি ততজনের সাথেই লিভ-টুগেদারে সময় কাটিয়েছেন। অভিনেত্রী জেনিফার গ্রে, শেরিলিন ফেন আর উইনোনা রাইডার থেকে শুরু করে সুপার মডেল কেট মস পর্যন্ত সবাই সেই তালিকায় আছেন। তারপর ‘৯৭ সালে এসে কী মনে করে যেন অভিনেত্রী ভ্যানেসা পারাদিসের সাথে একত্রে থাকা শুরু করেন, যা ১৮ বছর স্থায়ী হয়। ধীরে ধীরে তারা একটি মেয়ে ও একটি ছেলের বাবা-মা হন।

কিন্তু ২০১২ সালে ‘দ্যা রাম ডায়েরি’ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে আবেদনময়ী অ্যাম্বার হার্ডের দেখা পেয়ে ডেপ সাহেব আটকা পড়ে যান। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে বিয়েই করে ফেলেন!

ট্যুরিস্ট ছবির প্রমোশনে জনি ও অ্যানজেলিনা জোলি

মাদ্রিদে ২০১০ সালে ট্যুরিস্ট ছবির প্রমোশনে জনি ও অ্যানজেলিনা জোলি। জোলি অ্যাম্বার হার্ডকে বিয়ে করতে মানা করেছিলেন জনিকে। তিনি বলেছিলেন, অ্যাম্বারকে বিয়ে করে বড় একটা ভুল করতে যাচ্ছে জনি ডেপ।

৪.
সঅভিনীত চরিত্রগুলোর মত ডেপের ব্যক্তিগত জীবনও বিচিত্রতায় ভরপুর। এই বিচিত্রতার ধারা তার ক্যারিয়ারেও বজায় আছে। ২০০৩ সাল থেকে বক্স অফিস কাঁপানোর যে প্রথা তিনি শুরু করেছিলেন, তা ২০১১ সাল পর্যন্ত অবিরতই ছিল। কিন্তু তারপর থেকে ২০১৫—টানা সাড়ে তিন বছরে তার কোনো ছবিই আয়ের দিক দিয়ে সফল হয় নি।

এর কারণ হিসেবে নানা কারিগরি যুক্তির পাশাপাশি আরেকটি সহজ জিনিসের কথা বলা যায়—দুর্ভাগ্য। টিম বার্টনের সাথে করা ‘ডার্ক শ্যাডোজ’ ছবিটি অ্যাভেন্জার্সের তোপে বক্স অফিসে ব্যর্থ হলো, অথচ এই জুটির কোনো ছবিই তখন পর্যন্ত ফ্লপের চেহারা দেখে নি। এরপর ‘দ্যা লোন রেন্জার’ বক্স অফিসে এনিমেটেড ছবি ‘ডেস্পিকেবল মি টু’ এর সাথে পাল্লা দিয়ে হেরে যাওয়ায় ডিজনির যেন প্রায় ভিত্তিই নড়ে গিয়েছিল।

২০১৪ সালে বছর বেরোয় ‘ট্রানসেন্ডেন্স’, যা ব্যাপক সম্ভাবনা দেখালেও শেষমেশ দর্শক-সমালোচকদের কাছ থেকে নিন্দা ছাড়া আর কিছু কামাতে পারে নি। ২০০৫ সালে অস্কারজয়ী চিত্রনাট্যকার ডেভিড কোয়েপ-এর পরিচালনায় চমৎকার সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘সিক্রেট উইন্ডো’ ছবিতে অভিনয় করে সমাদৃত হয়েছিলেন। কিন্তু তার সাথেই যখন ‘মর্টডেকাই’ নামের কমেডি ছবিতে কাজ করলেন, মুক্তি পাবার পর তা ‘ট্রানসেন্ডেন্সে’র চাইতেও ভয়াবহ আকার ধারণ করলো।

গত বছরের শেষে মুক্তি পায় ‘ব্ল্যাক মাস’। স্কট কুপারের পরিচালনায় গ্যাংস্টার এ ছবিতে আমেরিকার বস্টনের কুখ্যাত সন্ত্রাসী ‘হোয়াইটি বালজার’ এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিনি। এখানেও ভারি মেক-আপের নিচে ছিলেন, কিন্তু বহুদিন পর ফ্যান্টাসি থেকে বেরিয়েছেন। বহুদিন পর সাফল্যও এসেছে।

“আমি আসলে এসবের সাথে নিজেকে ঠিক মানাতে পারি না। যারা আমার ছবি আর অটোগ্রাফ নিতে আসে, তাদের একজনকেও ফিরিয়ে দিতে প্রচণ্ড খারাপ লাগে। কিন্তু বিশালদেহী বডিগার্ডরা আমাকে তাদের সাথে বেশিক্ষণ থাকতে দেয় না।”

depp-rosy

মেয়ে লিলি-রোজ মেলোডি ডেপ এর (জন্ম. ১৯৯৯) সঙ্গে জনি ডেপ। লিলি জনি ও ফরাসি অভিনেত্রী, গায়িকা ও মডেল ভ্যানেসা পারাদিসের সন্তান।

আশির দশকের এক সাক্ষাৎকারে তাকে বিনয়ী ভঙ্গিতে এই কথাগুলি বলতে দেখেছিলাম। কিন্তু সেই জনি ডেপের সাথে আজকের জনি ডেপকে এক করতে চাইলে অঙ্ক মিলবে না। আজকের জনি ডেপ টেরি গিলিয়াম, রোমান পোলান্সকি, এমির কুস্তুরিকা ও মাইকেল মানের মত পরিচালকের সাথে কাজ করেছেন। আজকের জনি ডেপ স্করসেজির মত নির্মাতার ছবি প্রযোজনা করেন।

আজকের জনি ডেপের শিডিউল পাওয়াকে সবাই সৌভাগ্যের সাথে তুলনা করে। আজকের জনি ডেপের মাঝে এক মিশ্র অহংবোধ কাজ করে। বয়স ৫০ পেরিয়েছে তিন বছর হয়ে গেল, অথচ পোশাক কিংবা ভঙ্গিমায় তার ছাপ রাখেন না একদমই।

তবে হ্যাঁ, সুযোগ পেলেই তিনি তার ঠুনকো অহংবোধের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসেন। তাই মাঝে মাঝে তার মেয়েকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনা হাসপাতালে এক মিলিয়ন ডলার দান করে দেওয়া বা মৃত্যুপথযাত্রী বহু শিশুকে অশ্রুমাখা গলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প পড়ে শোনানোর মত তারকাসুলভ চ্যারিটি দেখান—যা দেখতে ভালো লাগে।

deep-art

সেলফ পোর্ট্রেট।

অনেকের কাছে তথ্যটি নতুন লাগবে—তবে ডেপ সাহেবের আঁকার হাত কিন্তু অসাধারণ। তিনি মেথড অভিনেতা—এ ধরনের অভিনেতাদের চরিত্রের সাথে মিশে যাবার জন্য আক্ষরিক অর্থেই বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়। নতুন কোনো চরিত্রে কাজ শুরু করার আগেই তিনি জলরঙ নিয়ে বসে যান। এরপর সেই চরিত্রটিকে নিজের মাঝে কল্পনা করে সযত্নে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন। এতে করে নাকি তার মনের ক্যানভাসেও চরিত্রটি স্থায়ীভাবে আঁকা হয়ে যায়। এছাড়াও সঙ্গিনী ভ্যানেসা প্যারাদিস, বন্ধু টিম বার্টন, মার্লন ব্রান্ডো থেকে শুরু করে আত্মপ্রতিকৃতি—সবকিছুই তার তুলির আঁচড়ে নিজের মত করে এসেছে।

টিম বার্টন তাকে নিয়ে ছোট্ট একটা কবিতা লিখেছিলেন—

There was a young man,
Everyone thought was quite handsome.
So he tied up his face,
And he held it for ransom.

He made everyone back up 20 feet,
Then he ran off
With his head down a darkly lit street.

The whole town wndered,
Why he’d threatened his face!
They couldn’t understand
… It was that kind of place.

আসলেই, ব্যক্তি জনি ডেপের সাথে দূরত্ব কমাতে এর চেয়ে সহজলভ্য কোনও সূত্র হয়ত আমরা দর্শকরা আর খুঁজে পাব না।

আমরা দর্শকরা অভিনেতাদের জানি তাদের অভিনীত চরিত্রগুলি দিয়ে। এর বাইরে তাদের নিয়ে তাবৎ ধারণাই জনশ্রুতি বা মিডিয়ার বহু মাধ্যমে পরিশোধিত হয়ে আসে। হয়তো তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সামান্যতম প্রত্যাশাও অপ্রকৃত হতে পারে। তবুও তাদের সাফল্য অনুপ্রেরণা দেয় ভক্তদের, ব্যর্থতা হতাশ করে।

গত মাসের ২০ তারিখ ডেপের মা মারা যান। এর তিনদিনের মাথায় স্ত্রী অ্যাম্বার হার্ড তাকে ডিভোর্স দেওয়ার আপিল করেন। একপর্যায়ে ডেপের নামে মামলা করা হয়, তিনি নাকি ডিভোর্সের একদিন আগে স্ত্রীকে তার মোবাইল ফোন দিয়ে আঘাত করেছেন। প্রমাণ হিসেবে অ্যাম্বার তার আহত মুখের ছবি দেখিয়েছেন। শুনানি এই মাসের ১৭ তারিখ।

deep-amber2

জনি ডেপ ও অ্যাম্বার হার্ড।

স্বাভাবিকভাবেই জনি ডেপ সবকিছু অস্বীকার করেছেন। জনি ও অ্যাম্বারের বন্ধুরা তাদের দিক থেকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন নিজ নিজ বন্ধুদের। আর দশটা ডিভোর্স আর শারীরিক নির্যাতন মামলার মত এখানেও অ্যাম্বার হার্ডের পক্ষ থেকে ধনী স্বামীর কাছে ক্ষতিপূরণের জন্য অর্থ দাবি করা হয়েছে। বহু পক্ষের মতামতে আপাতত সব ঘোলাটে। কোর্টের রায় পরিষ্কার করবে অনেক কিছুই।

জনি ডেপ সবকিছু থেকে দূরে তার ব্যান্ডদল ‘হলিউড ভ্যামপায়ার্স’ নিয়ে ইউরোপজুড়ে কনসার্ট করে বেড়াচ্ছেন। সাথে সময় দিচ্ছেন বন্ধু টিম বার্টনও।

তার ‘সুইনী টোড’ চরিত্রটি আমার সবচাইতে পছন্দের। ২০০৪ সালের ছবিটিতে বিবর্ণ সেই নাপিত যখন চুলের বদলে মক্কেলদের কণ্ঠনালীতে ক্ষুর চালিয়ে দেয়, তখন তার পাংশু চোখের ফুটন্ত লাভা পর্দাসহ পোড়ায় সব। আমি তার পাঁড় ভক্ত। এমনকি আমার মোবাইলে তার ওয়ালপেপারের আধিক্য দেখে অনেকে আমার শারীরিক অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

“আপনার প্রিয় অভিনেতা কে?”

—কখনো এরকম ভিত্তিহীন প্রশ্ন শুনলে দীর্ঘ একটি শ্বাস নিয়ে হয়তো এখনো তার নামটাই বলব।

 

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন