page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

জাহানারা ইমাম কাদের লোক?

গত বছর যখন শাহবাগের আন্দোলন চলতেছিল তখন দেখলাম জাহানারা ইমামের এক বিশাল ছবি টানানো হইছে। কোনও গণজমায়েতে একটা আইকনিক ফিগার থাকতেই পারে, একটা লিজেন্ডারি পারসোনালিটি ইনস্পিরেশনের জোগানদার হয়ে ওঠাটাও স্বাভাবিক। আমাদের এখানে বিশেষত মিডলক্লাসের মুভমেন্টে এসব আইসা গেছে। মোট কথা তাদের একটা বাইরের কিছু লাগে, নিজেদের ভিতরে অনুপ্রেরণা পাওয়ার জন্য তাদের একটা খুঁটির দরকার হয়।salahuddins1

সেটা আবার বস্তুগতও হইতে হয়। আধ্যাত্মিক থাকা যাবে না, তাদের এমন জ্ঞান অর্জনের ফলাফল বিশিষ্ট ব্যক্তি বা স্থাপনারে গ্লোরিফাই করে। একটা সমাজ যেসব শর্তের উপর গড়ে ওঠে, তা পূরণে দরকার জাহানারাকে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলার শিক্ষিত সমাজের গড়ে ওঠার কেন্দ্র জাহানারা ইমাম।

jahanara-iamam-3

স্বামী শরীফ ইমাম ও সন্তানদের সঙ্গে জাহানারা ইমাম

তবে এখানে মধ্যবিত্তের বাইরে বস্তুগত বিগ্রহের বাসনা নাই তেমন। গরীবরা এখানে বরং মিথ ভাঙে ক্রমাগত। তারা ক্যালাস। যুদ্ধ কিম্বা বিক্ষোভ তাদের মনে থাকে সারাউন্ডিংসের মধ্যেই। এ থেকে তাদের বিচ্ছেদ হয় না। মধ্যবিত্তের তো আসলে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করা, ব্যাখ্যা করা হয় নাই তেমন আর। বরং স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে তাদের একটা বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। এই বিচ্ছেদ স্মরণ করার জন্য তাদের একজন জাহানারা ইমামকে দরকার হয়।

ঢাকার বাইরে অমধ্যবিত্ত জনগণের আবার তাকে দরকার হয় না। তারা সেক্যুলার জীবন চর্চা এবং ধর্মীয় রেওয়াজ আলাদা করতে পারছে। এরে গুলায়া ফেলে নাই।

jahanara-iamam-1

“একটা সমাজ যেসব শর্তের উপর গড়ে ওঠে, তা পূরণে দরকার জাহানারাকে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলার শিক্ষিত সমাজের গড়ে ওঠার কেন্দ্র জাহানারা ইমাম।”

মিডলক্লাস যেমন সেক্যুলারিজমকে রেওয়াজে পরিণত করছে, তেমন চর্চা গরীবী সমাজে নাই। মাজার পদ্ধতিও যেটা আছে, তা বলবৎ আছে নানা কারণে। এর ডাইভারসিফিকেশন যেমন আছে, ক্ষয়ও আছে। আগের মতো আর মাজার জমতেছে না কিম্বা নতুন মাজার তৈরির সম্ভাবনাও তো নাই আসলে।

মিডলক্লাসের দিক থেকে বরং নতুন নতুন মাজার হওয়ার সম্ভাবনা আছে। মিডিয়া এখন এতই সামাজিক হয়ে গেছে যে, কোনও ব্যক্তিরে মহিমান্বিত করা একটা সহজ ব্যাপার।

noor-hossain-2

“নুর হোসেন তো স্রেফ গণতন্ত্রের জন্য শহীদ। গ্ল্যামারলেস। তার ছবি বিশাল করে টানানো হবে না।”

বিক্ষোভ বা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে ফিগার পাওয়ার কথা ছিল তার লাস্ট সেনাপতি জাহানারা ইমাম মনে হয়। নুর হোসেন তো স্রেফ গণতন্ত্রের জন্য শহীদ। গ্ল্যামারলেস। তার ছবি বিশাল করে টানানো হবে না। বরং সে বাংলাদেশে নতুন শাসনামলের ফটক। তারে দিয়া শুরু এমন আওয়ামী বা বিএনপি শাসন। সে যা না তারে তাই কইরা তোলার কারবার এখানে গণতন্ত্র নামে পরিচিত।

জাহানারা ইমামের আবার এমন সমস্যা নাই। এখানে তার উপর কথা নাই। যে কারণে তিনি বিশাল। এত বিশাল ছবি তার টানানো হইল শাহবাগে। শাহবাগ আন্দোলনের ছবি মানে স্মিতহাস্য জাহানারার মুখ।

শাহবাগের আন্দোলনের সঙ্গে একেবারে জড়াজড়ি করে আছে আওয়ামী লীগ। অনেকেই বলতে চান প্রথম কয়েকদিন আসলে এমন ছিল না। তাদের এমন চাওয়ার সঙ্গে বাস্তবতার ঢের অমিল। তাদেরও আগে থেকেই এসব কর্মসূচির আওয়ামীকরণ ঘটে গেছে। শুধু কিছু বিভ্রান্তি ছিল। বাংলার বামেরা সেই বিভ্রান্তির জন্য দায়ী। সেই ফেরে পড়ে মনে হত বুঝিবা এটা আসলে যা ভাবা হচ্ছে তা না, বরং আমাদের মনে যা ছিল তা-ই। কিন্তু মন দিয়ে তো আর রাস্তা মাপা চলে না। জাহানারা ইমামের এত বড় একটা ছবি দিয়েও কিন্তু নিজেদের সেই নিউট্রালিটি প্রমাণ করা গেল না, সেই মাছ ঢাকা গেল না।

আওয়ামী লীগ থাকতে না-চাওয়ার যে বাসনা এত বড় ছবিতে ফুটে উঠবে বলে ভাবা হয়েছিল, বাস্তবে তা ঘটল না। কারণ ছবিতেই ভূত ছিল।

jahanara-iamam-5

প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬

যে জাহানারা তৈরি করতে চান এ দেশের আওয়ামীপ্রবণ, বামের লোকেরা তারা এটুকু বুঝতে পারেন না যে জাহানারা ইমাম আওয়ামী লীগের বাইরের কেউ নন। তিনি ছহি আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধকে স্রেফ একটা যুদ্ধ বা খুনাখুনির গণিত দিয়ে বোঝা এবং তার বিচারে আবদ্ধ রাখতে পারা, তার দাবির পক্ষে জনসমাবেশ ঘটানোর কৃতিত্ব জাহানারার আছে। বাংলাদেশের নষ্ট রাজনৈতিক চরিত্রদের মধ্যে এমন দৃঢ়তাও দেখা যায় না।

ফলে তিনি ব্যক্তিত্ব হিসেবে আকর্ষণীয়। যে ঘটনা ঘটিয়েছেন তারও গুরুত্ব অনেক।

কিন্তু তাতে তো ‘বিপ্লব’ পাওয়া যায় না। দেশের বেশিরভাগ মানুষরেও পাওয়া গেল না। একটা মোটামুটি সামাজিক পরিবর্তনের আভাসও নাই বলতে গেলে। গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতিশ্রুতি নাই। বেশিরভাগ মানুষের অধিকার সংরক্ষণের দাবিও তাতে ছিল না।

যারা শাহবাগে গেছেন তারা কিন্তু এই ছবি উত্তোলনের মাধ্যমে আরও কিছু প্রশ্ন উস্কায়া দিছেন জনমনে। এবং তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা জাহানারা ইমামকে আওয়ামী লীগের লোক ভাবাটা সহজ করে দিয়েছে বরং। তিনিসহ তার পক্ষের লোকেরাও দলবিহীনতার ফাঁদে পা দিয়েছেন। কারণ দলবিহীনতার হাওয়াই মিঠাই যতই ফুলানো হোক না কেন, সমাজে তা সামান্যেই থাকে। দলবিহীন থাকা খুব দুষ্কর একটা কাজ। এটা অনেকটা সাধু-সন্তুরা পারেন। জাহানারা ইমাম নিজে দলবিহীন থাকার শত কসরৎ কিন্তু সে সময়ে চালিয়েছিলেন, তা তো তিনি থাকতে পারেন নাই। তা পারতে পারার তো কথাও না।

jahanara-iamam-4

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জাহানারা ইমামের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শফি ইমাম রুমী।

বামপন্থীরাও তার কদর সবসময়েই করেন দেখেছি। কিন্তু সেটা একটা স্রোতে গা ভাসানো তোয়াজি। এর কোনও বামপন্থী ব্যাখ্যা কেউ হাজির করেন নাই। জাহানারা ইমামেরা যখন আন্দোলনটা শুরু করেছিলেন তখন এবং এর পরের শাহবাগ, এ দুই সময়েরই অন্তরে গোপন ছিল একটা ক্ল্যাসিক্যাল শ্রেণীর উত্থান ঘটানো। তাদের জারিজুরির প্রভাব বাড়ানো। রবীন্দ্রনাথ প্রধান, ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের সাংস্কৃতিক ব্যবসা বাড়ানো। এসব আন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের অনেকেই সুবিধাভোগী ও নানা শিল্প-সাহিত্যের ব্যবসাদার। একটা তালিকা করুন সেই সময়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়াদের এবং তাদের আজকের সামাজিক অবস্থানের। তাহলে কি কিছুটা পরিষ্কার হয় এরা কারা?

বামপন্থীরা বলে আওয়ামী লীগ জাহানারা ইমামের সঙ্গে বেঈমানি করেছে। যেদিন তিনি মারা গেলেন সেদিন তারা নিজামীর সঙ্গে বৈঠক করেছে। মানে আওয়ামী লীগ তো আসলে এটা করার কথা না, কেন করল সেই সালিশ তারা দাবি করে। এতদিন পরে এসেও সেই অভিযোগ জারি। অথচ জাহানারা ইমাম যা চেয়েছিলেন, তার সবটা না হোক অনেকটা তো পূরণ হয়েছে। আওয়ামী লীগই করেছে। সেই বেঈমানির কাফফারা তো তারা দিলই, এখন আবার তাদের বেঈমানি বোঝানোর জন্য পুরান কান্না গলায় তোলার দরকার হয় কেন? ছহি আওয়ামী লীগ হইতে চাওয়া, অথবা আওয়ামী লীগকে ছহি বানানোর চেষ্টা করা ছাড়া এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কী?

"যে জাহানারা তৈরি করতে চান এ দেশের আওয়ামীপ্রবণ, বামের লোকেরা তারা এটুকু বুঝতে পারেন না যে জাহানারা ইমাম আওয়ামী লীগের বাইরের কেউ নন। তিনি ছহি আওয়ামী লীগ।"

“যে জাহানারা তৈরি করতে চান এ দেশের আওয়ামীপ্রবণ, বামের লোকেরা তারা এটুকু বুঝতে পারেন না যে জাহানারা ইমাম আওয়ামী লীগের বাইরের কেউ নন। তিনি ছহি আওয়ামী লীগ।”

মানুষ যত গরীব এ দেশে তার তত জাহানারার দরকার হয় না। তার এমনকি কোনও ফিগারেরই তেমন দরকার হয় না। মিডলক্লাসকে মনে মনে সে একটু আগায়া রাখে। তাদের কাণ্ড-কারখানা দেখে। তারা যারে নিয়া আলাপ করে তারে দেখে ছবিতে। যেনবা বুঝছে এমন একটা ভাব করে। দিন শেষে সে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কিম্বা জামায়াতের পক্ষে থাকে। এই পক্ষপাত নিয়া তার অস্বস্তি নাই। মুক্তিযদ্ধের সময়ও তারা আওয়ামী লীগ করবে না আর এমন কোনও দিব্যি দেয় নাই। নিজের উপর বিপদ যখন আসছে তখন তারে মোকাবিলা করছে। নিজের দেশ, সম্পদ, সতীত্বের দায়িত্ব পালনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ সে নিছে। পাকিস্তান খেদাইছে। কিন্তু ক্ষমতার দিকে সে চায় না। এখনও চায় না। ক্ষমতার কারবার মিডলক্লাসের। পাকিস্তান যখন ছিল তখনও, স্বাধীন বাংলাদেশেও।

এই মিডলক্লাসরে অপ্রস্তুত রাইখা দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর তারা যখন কিছু একটা ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেছিল, তখন জাহানারা ইমাম ছিলেন তাদের অবলম্বন। খেয়াল করলে বোঝা যায়, জাহানারার আগে এখানে মিডলক্লাস পাওয়া যাইত না। তিনি একে একে জোগাড় করলেন সবাইরে। গরীবদের কিন্তু এই অপ্রস্তুত দশা নাই। তারা জানে কীসের কীসের হেফাজত তাদের করতে হবে।

এটা আবার বাংলাদেশে ক্যাপিটালিজম বিল্ডাপের জন্যও দরকারি। একদিকে ক্রেতা, পণ্য, মডেল, আর্ট সব মিলায়া রাজধানীকেন্দ্রিক যে ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলার বিস্তর অবকাশ ছিল, তা পূরণ হইতে থাকল জাহানারারে দিয়া। প্রমিত জীবন ও ভাষা নির্মাণেও তার দোয়া আছে।

ফলে জাহানারা ইমাম আমাদের এখানে বড়লোক।

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।