page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
আন্তর্জাতিক

জোনায়েদ সাকি আগেই জিতে আছেন যেভাবে

আমাদের এলাকার যে দোকান থিকা মাঝে মাঝে মোবাইলে টাকা ভরি সে দোকানে সেদিন দেখলাম জোনায়েদ সাকির একটা প্রচারপত্র স্কয়েচ টেপ দিয়া সাঁটানো আছে। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, আপনে কি সাকিরে ভোট দিবেন?

উনি “হ্যাঁ” বললেন।

তারপর আমি জানতে চাইলাম, আপনি কি ওনার দল করেন?

উনি “না” বললেন।

আমি জিগাইলাম, তাইলে ভোট দিবেন কেন?

লোকটা বলল, “বিএনপি বাদ, এবার এদেরই ভোট দিমু।” আমি “আইচ্ছা ভালো, দিয়েন” বইলা চইলা আসলাম। 

salahuddins1

মনে মনে ভাবলাম, উনি আগে বিএনপির ভোটার ছিলেন, এবার আর তাদের ভোটার নাই। লোকটার বয়স আমার সমান হবে, বেশি না। একবার দেখলাম খুব যত্নে খরগোশ পালতেছেন। বিনয়ী, মাথা নিচু করে রাখেন সবসময়। ভালো কিছু একটা চান তিনি, আমার এমন মনে হয়। আদব লেহাজ ভালো। কোনো রকমে একটা মোবাইলে টাকা ভরার ব্যবসা নিছেন হয়তো। তার তো আরও ভালো এবং বড় কিছু করার কথা ছিল। পারলেন না যে কেন? সাকি বা তার দলেরে তিনি এমন সময়ে খুঁজে নিলেন, এরও তো একটা হিসাব আছে। কী সেটা?

এর আগে জোনায়েদ সাকির নির্বাচনী প্রচারণার পক্ষে লিখছিলাম। মোটামুটি এর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই আমি পাইছি। আশপাশের লোকেরা খুশি হইছে। বিভিন্ন মহলে জোনায়েদ সাকির প্রতি তার দলের বাইরের লোকেদের সমর্থন একটা আলাদা প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।

একজন বললেন, আমি জোনায়েদ সাকির এত সমালোচক ছিলাম, আজ আবার তার সমর্থক হয়ে গেলাম। আমি বুঝলাম এ দেশে সমালোচনাবিহীন সমর্থন কিম্বা একচেটিয়া সমালোচনার রেওয়াজ আছে। এটা তো এমনকি বাম দলগুলারেই বেশি চর্চা করতে দেখছি। প্রগতিশীলরা কিছুতেই তাদের মঞ্চের কিম্বা তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে দেন নাই। এখনও দেন না। আবার যার সমালোচনা করা হইল তো হইলোই, তাদের চলন কিছুতেই সোজা ঠেকবে না আর।

নোট উছিলায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে গিয়া নির্বাচনী প্রচার শুরু নিয়া এক সমালোচনায়ও আমি জড়াইছিলাম। মসজিদে বা মন্দিরে যামু না বইলা শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধে গেলাম বিষয়টা কি এমন? আমি ভাইবা একটা উত্তর বাইর করছি। জোনায়েদ সাকিদের যে রাজনীতি, যে কারণে তারা বাম হিসাবে জনমনে পরিচিত, ঠিক মার্ক্সিস্ট না, বাম তারা যে কারণে, সেটা হইল লড়াই বা সংগ্রাম। তারা স্ট্রিট ফাইট, মুক্তির সংগ্রাম এসবের রাজনীতিই করেন। তাদের দিক থিকা এমন কোনো মিনারে যাওয়া ঠিকাছে। এটা মসজিদে না যাওয়ারে উৎসাহিত করাও না আবার মসজিদরে এড়ায়া গিয়াও না।

মসজিদ তো এ দেশে নামাজ পড়ার জায়গা। এরে বরং দলীয় কাজে ব্যবহার করাটা সেকেন্ডারি। বায়তুল মোকাররমরে কেন্দ্র কইরা নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন হইতে দেখা যায়। কিন্তু মাজার বা মসজিদ মূলত এবাদতের জায়গা। সেখান থিকা নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর বিষয়েও আপত্তি আছে। স্মৃতিসৌধ বা শহীদ মিনাররে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ব্যবহারও সেকেন্ডারি ব্যবহার। এ উপলক্ষ্যে মসজিদে যাওয়া যেমন রিলিজিয়ন ট্রিট করা হয় মিনারে যাওয়াটাও রিলিজিয়াস কাজ। উভয় জায়গা নিয়া প্রশ্ন আছে, সেখান থিকা নির্বাচনী প্রচারণারই বা দরকার কী।

আমার উত্তর হইল: মসজিদে বা মিনারে যে যার ধর্ম পালন করুক। আমার দিক থিকা যে যার ধর্মসহ কে প্রো-পিপল সেটা বিচার করনের কাম। কিছুই না করার একটা রোগ আছে দেখছি। সামনাসামনি কিছু করবে না কিন্তু তলে তলে অমুক-তমুক দল করবে, এমন বুদ্ধিবৃত্তিপনা তো সমাজে আছেই। তার চাইতে কিছু একটার পক্ষে প্রকাশ্যে থাকা সমাজের জন্য ঘটনা হিসাবে ভালো। অন্তত নির্বাচনের সময় থাকাটা তো মামুলি থাকা। এটুক থাকারও জবাবদিহিতা আছে দেখতেছি, সেটাও ভালো।

যখন লেখাটা লেখতেছিলাম, একজন বলতেছিলেন সব প্রার্থী নামাজ পড়তে গেছে, বামেরা যায় নাই। আমি চিন্তা কইরা দেখলাম এটা কি গুরুত্বপূর্ণ, আমার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে? নাহ, কে নামাজ পড়ল কে পড়ল না এটা নিয়া আমি চিন্তিত না। বরং কে কার পড়া, না-পড়ায় বাধা দিল সেটা নিয়া আমি চিন্তিত। তবে সামাজিক থাকার জন্য নামাজ পড়ার কৌশল পলিটিশিয়ানরা নিতে পারেন। বিশ্বাস থিকাও নামাজ পড়েন তারা। অনেক দলের নেতারা নিয়মিত নামাজ পড়েন, জুম্মার নামাজটা হইলেও পড়েন। নামাজ পড়া নেতা বামেও নিশ্চয় আছেন। তারা হয়তো প্রপাগান্ডার মধ্যে পড়ে গেছেন, ফলে বোঝা যায় না তাদের লোকেরাও নামাজ পড়ে। অথবা তারা যে সেক্যুলারিজম দাঁড় করাইতে চান, এমন মিনারে গিয়া, সেখানে তো বেশিরভাগ মানুষই যায় না। মসজিদে অনেকেই যায়। ফলে বোঝাপড়ার কিছু সমস্যা যা আছে তারা সেগুলা মিটাইতে পারেন নাই।

সমাজের ‘আলোকিত অংশ’ যারা নাটক অথবা শিল্প করেন, যারা প্রকাশ্যে মিনারে যাওয়ার কালচার আর গোপনে মন্দির ও মসজিদরে নিয়া দলীয় বা ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের রাজনীতি করনেওয়ালাগো লগে যোগাযোগ রাখেন—এমন ‘প্রগতিশীল’গো লগে দূরত্ব তৈরি না হওয়ায়, সমালোচনা না করায়, তারা জনমনে বুঝাইতে পারেন না যে তারা আসলে কী। মানে তারা যে এখনকার ‘ব্লগার’ না, এটা মানুষের কাছে পৌঁছায় না তেমন। কিন্তু আমি তো বুঝি। ফলে আমার সমর্থনে সমস্যা দেখা দেয় নাই।

আমার কাছে বিষয়টা এমন, ওদের কর্মীরা যখন লড়াই-সংগ্রাম করবে তখন তাদের নিজস্ব মিনার থাকবে। আগেভাগে, এসব শর্তে কাউকে খারিজ করে দেয়ার সময় আমার হয় নাই। বা কোনও পূর্বানুমান নিয়াও কাউরে খারিজ কইরা দিলে তো আর আলাপের কিছু থাকল না।

ভাষা নিয়েও একটা বিতর্ক দেখলাম। কিন্তু সেখানে না জড়ায়ে এখানে একটা ব্যাখ্যা দিতে ইচ্ছা হইল। এটা ঠিক সাধারণত যে ভাষা গণসংহতি কিম্বা তার পন্থীরা ইউজ করেন তাতে একটা ‘শুদ্ধ’ ব্যাপার থাকে। আচরণেও তারা যথেষ্ট প্রমিত। বিএনপি বা আওয়ামী লীগের বেশিরভাগেই প্রমিত না। তারা দেখেন না, কেমন ভাষায় কথা বলে। পোশাকেও দেখবেন তারা কেমনে কেমনে জানি জেনারেল থাইকা গেছে। তাদের যারা স্যুট-টাই পরতেছে তারা তরুণ হিসাবে আলাদা তকমা পায়। বিএনপি বা জামায়াত পোশাকে আলাদা করা যায়। বামেরা প্রথাগত প্রগতিশীলদের রিপ্রেজেন্টিটিভ। এটাও আমার জন্য সমস্যা না। আমি তো রাজনীতিটা দেখতে চাই। বাস্তবতাটা বুঝতে চাই। ভাষায় আমার সমস্যা নাই, যদি না সেটা চাপায়া দেয়া হইল অথবা শ্রেয় বলা হইল।

জোনায়েদ সাকি। ছবি. হাবিবা নওরোজ ২০১২।

জোনায়েদ সাকি। ছবি. হাবিবা নওরোজ ২০১২।

একজন আমারে বলতেছিলেন, ওরা তো অদিতি ফাল্গুনীরে গুরুত্ব দিতো এক সময়, এখন জাকির তালুকদাররে দেয়, শাহীন আখতাররে দেয়। এই পন্থী সাহিত্যিকদের দিকে তাগো ঝোঁক বেশি। আমাদের তো ওরা নিবে না। আমি ভাইবা দেখলাম, ইতিহাসে এসব কথার সত্যতা আছে। কিন্তু এখানে তো আসলে এটা সত্য যে, ওরা যা সে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় আমি তাদের সমর্থন করতেছি কিনা? আমার মতো হয়া ওঠার পর আমি তাদের সমর্থন দিতে গেলে তো আমারে ওদের পার্টি করতে হবে। আমি লিবারাল না হইলে অন্যের কাছ থিকা আশা করি কেমনে? ওদের আমলে লেখালেখির অবস্থা ভালোই হবে। ওদের একটা প্রকাশনা আছে।

এখন আমাদের এলাকার সেই মোবাইলে টাকা ভরা লোকটার লগে সাকিদের কমিউনিকেশন কেমনে ঘটবে সেটা তাদের ব্যাপার। আমার ভূমিকা নাই প্রায়। আমি নিজেরটা বুঝি, সেটা শেয়ার করি। তাতে কারুর লাভ হইলে ভালো। ক্ষতি না হোক। আমার নিজের রাজনীতি এখানে আমি স্থগিত রখতেছি আপাতত। অবলোকন করতেছি। বুঝতেছি সাকি জিতে গেছেন উত্তরে।

উত্তরের অপরাপর প্রার্থীদের চাইতে তিনি মোর পলিটিক্যাল। পাবলিক পালস নিয়া নাড়াচাড়া করছেন। এমনকি মাহীরে যদি বিএনপি সমর্থন দিতো তাইলেও সাকির জিত ছিলো। বাকিদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার বেশি দিনের না। মূলত ব্যবসায়ী। এদের মাঝে আমরা একজন রাজনীতিবিদ পাইলাম। তার তো ব্যবসা নাই, ফলে আমাদের নিয়া ভাবার সুযোগ তারই বেশি।

কিন্তু তিনি যে জিতলেন সেটা পাবলিক হবে কেমনে? এটা তার দলের ব্যাপার। এটারে সত্য প্রমাণ কইরা তোলার জন্য ভোটের দরকার। মানে ফলটা গাছে আছে, এটারে নিচে না পড়তে পারলে তো আর গাছে থাকাটা একটা মিথ হিসাবেই থাকা। এখন এসব মিথ ভাঙার উপায় আবিষ্কার তাদের কাজ। সাকি যোগ্য বা ভালো এসব মিথ ভোটে আইসা সত্য প্রমাণ হবে। তখন আর মিথ থাকবে না।

আগেও একবার লিখছিলাম কোথায় জানি। আমার আগে অর্থনীতিবিদরাও লিখছিলেন যে, রাজনীতি আর ব্যবসা আরও ঘনিষ্ঠ হবে, ক্রমে এখন এক হবে। ব্যবসায়ীরা নানাবিধ ক্ষমতা অর্জনের মওকা খুঁজবে। তাদের চাপে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে উঠবে আমাদের জন্য। ফলে আমাদেরও তো একটা ওয়ে আউট দরকার আছে। ঢাকার উত্তরে তো সেই ওয়ে জোনায়েদ সাকি। এখন তিনি কীভাবে সেটা জনভাষ্যে রূপান্তর করবেন সেটা তার বিষয়।

এর জন্য অনেক কিছুরই দরকার আছে আমার মনে হয়। কোনও কিছুরে আঁকড়ায়া ধইরা রাখার দরকার নাই।

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।