page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

জ্যামিতিক ঢেউ ও মাছরাঙা মানুষের মত সূর্য

এইবার শ্রীমঙ্গল।

আমার সাথে গেছিলেন ‘ঢাকা মাথা খারাপ গ্রুপ’-এর কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। মাথা খারাপ গ্রুপের প্রেসিডেন্ট মাধবপুর লেকের কালো পানি দেইখা ব্যাগ, ফোন, টাকাপয়সা, ওয়ালেট, আই-প্যাড ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড সমেত তিন কেজি বোরখা নিয়া পানিতে ‘ইয়াহু’ বইলা লাফ দিয়া পড়লেন।

আমি উনারে চিনি না এমন ভঙ্গী কইরা দূরে দাঁড়ায় থাকলাম। হাতে ক্যামেরা থাকায় অবশ্য বেশিক্ষণ ‘চিনি না’ নাটক জমল না।

01. logo nadia png

আমাদের বাকি দুইজনও পাহাড়ের মাথায় বইসা কাউরে চিনেন না এমন বিরস দৃষ্টি নিয়া প্রকৃতি ও গাছপালা পানি মাছরাঙা ইত্যাদি দেখলেন।

ততক্ষণে আমাদের আশেপাশে একটা ছোটোখাটো ভিড় জইমা গেছে। একসাথে এত পাগল সচরাচর তো আর চোখে পড়ে না!

srimangal-2324

“ন্যাশনাল আইডি কার্ড সমেত তিন কেজি বোরখা নিয়া পানিতে ‘ইয়াহু’ বইলা লাফ দিয়া পড়লেন।”

লাল শার্ট পরা একটা শুকনামত বাচ্চা ছেলে আমারে সহানুভূতির সুরে কইলেন, উনার মামিও পাগল। তবে উনি পানি ভয় পান। উনারে বাসার সবাই কালো বোরখা পরাইয়া রাখেন। উনি মাঝেমাঝেই সব খুইলা ন্যাংটা হইয়া যান।

তো ম্যাডাম প্রেসিডেন্টের উত্তেজনা শেষ হইলে উনি পানি থিকা উঠলেন, এর আধা ঘণ্টা পরে উনার খেয়াল হইলো—বোরখার তলে ব্যাগ এবং ব্যাগের ভিতর উনার যাবতীয় সম্পত্তি আছে। তখন শুরু হইল দ্বিতীয় দফা হাউকাউ।

এরপর রেস্ট হাউসে আইসা পুরা এলাকাবাসীরে তৃতীয়বারের মত জানান দিয়া হেয়ার ড্রায়ার দিয়া টাকাপয়সা ও ফোনের সিম-কার্ড ও কাপড় চোপর শুকানো হইল। আমি মনে মনে ভাবলাম, চুলের যন্ত্রপাতি নিয়া ঘুরার মত ন্যাকামির জন্য মানুষের কাছে জীবনে বহুত গালি শুনছি। আজকে শ্রীমঙ্গল আইসা আমার রঙ করা চুলের এবং চুলের যন্ত্রপাতির চলমান জীবন সার্থক হইল।

srimangal8

বন্ধুর আম্মা খালি ফোন দিয়া বললেন, “দেখো, রাত্রে চাবাগানে যেয়ো না, বাঘ টাঘ যদি ধরে!”

শ্রীমঙ্গলে আমার বন্ধুদের কেউ আসতে চান নাই। বন্ধুর আম্মা খালি ফোন দিয়া বললেন, “দেখো, রাত্রে চাবাগানে যেয়ো না, বাঘ টাঘ যদি ধরে!”

উনিই একমাত্র যিনি শ্রীমঙ্গলে বাঘের সন্ধান পাইছিলেন, অন্য কেউ বাঘবিহীন বেহুদা শুকনা চাপাতা দেখতে আগ্রহী ছিলেন না মোটেও।

সিলেট আইসাও আমার বন্ধুরা সবাই রেস্ট হাউসে পর্দা টানায়া ঘুমাইয়াই দিন কাটাইলেন। আমি একলা একলা ঘুরলাম বাইক্ক্যার বিল, খাসিয়া পল্লী, লাউয়াছড়া আর মনিপুরি বস্তিতে।

srimangal-1

“আমি একলা একলা ঘুরলাম বাইক্ক্যার বিল, খাসিয়া পল্লী, লাউয়াছড়া আর মনিপুরি বস্তিতে।”

তীব্র সূর্যের ভিতর একলাই হাঁটলাম বাচ্চা আনারস আর লেবুর বাগানের মাথা খারাপ করা গন্ধের আর মাতাল মাছিদের ভনভনের মাঝখানে। চৈত্রর রাত্রি অন্ধকার হইয়া গেলে মাঠের মাঝখান দিয়া ঘুইরা আসলাম ঘুমন্ত একটা গ্রাম। গ্রামের কুকুর ও ঝিঁঝি পোকারা অবশ্য ঘুমান নাই তখনো। অনেক দূর দূর থিকা তখনো অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ম্যাচের রেডিও ধারাভাষ্য শোনা যাইতেছিল চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফতের নাকি গলায়। কুয়াশার জ্যামিতিক ঢেউয়ের ভিতর দিয়া মালবাহী ট্রাক নাকি ট্রাকের ভিতর দিয়া কুয়াশারা পিছলায় যাইতেছিলেন একটু পর পর।

srimangal-31

“আমার মনে হইল দুনিয়ার সব রাস্তা মানুষরে একলাই ঘুরতে হয়।”

আমার মনে হইল দুনিয়ার সব রাস্তা মানুষরে একলাই ঘুরতে হয়।

খুব ভোরে মাধবপুর লেকে চাবাগানের শ্রমিকরা পানিতে প্রদীপ জ্বালাইয়া পূজা করেন। হাতে ক্যামেরা ছিল, জিন্সের পকেটে দুইটা আইফোন। কী কারণে জানি না, আমি আর ছবি তুলি নাই। “মাছরাঙা মানুষের মত সূর্য”র মত লাইন দুনিয়ায় একজন ছাড়া আর কারও লেখা যেইরকম পসিবল না, কিছু কিছু দৃশ্যরও তেমন কোনো প্রকার রিপিটেশানের প্রয়োজন নাই লাইফে।

তাছাড়া আমি ছবি তুলিও খারাপ! তাই ঐ দৃশ্য শুধু আমার একলার মাথাতেই থাক!

About Author

নাদিয়া ইসলাম
নাদিয়া ইসলাম

ফ্যাশন ডিজাইনার। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক সাইন্স থেকে পাশ করে এখন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। ২০০৭ থেকে ইংল্যান্ডে আছেন। এর আগে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। জন্ম লিবিয়ার সির্তে। মিছুরাতায় থাকতেন। ১১ বছর বয়সে লিবিয়া ত্যাগ করেন।