page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

টুইটারে ট্রলের শিকার মোহাম্মদ আলি

১.
৩ জুন, ২০১৬, শুক্রবারে ৭৪ বছর বয়সে মারা গেছেন স্পোর্টস লিজেন্ড মোহাম্মদ আলি। তিনবার হেভিওয়েট বক্সিং এর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন মোহাম্মদ আলি। তার দেশ আমেরিকা সহ সারা পৃথিবীতেই তিনি একজন আইকন।

মোহাম্মদ আলি ছিলেন মুসলমান। তার মৃত্যুতে মুসলিম-বিদ্বেষী হিসাবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পও টুইটারে টুইট করেছেন। ট্রাম্প টুইটারে লিখেছেন, মোহাম্মদ আলি ৭৪ বছর বয়সে মারা গেছেন! সত্যিই একজন গ্রেট চ্যাম্পিয়ন ও চমৎকার মানুষ। সবাই তাকে মিস করবে।

mohammad-ali-71

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফেসবুক পেজ থেকে ছবি: “উইথ মাই ফ্রেন্ড মোহাম্মদ আলি”—মে ৮, ২০১৫।

কালোদের গৌরবের পক্ষে আলির একরোখা সমর্থন বা জেদের কথা ট্রাম্প অবশ্য উল্লেখ করেন নাই।

তার আগের নাম ছিল ক্যাসিয়াস ক্লে। ১৯৬৪ সালে মোহাম্মদ আলি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশন অব ইসলাম’ সংগঠনের সদস্য হন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মুসলমান হওয়ার পরে তার নাম হয় মোহাম্মদ আলি।

১৯৬৭ সালে আলি যখন খ্যাতির শীর্ষে তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, কোনো ভিয়েত কং এর বিরুদ্ধে আমার কোনো কিছু নেই; কোনো ভিয়েত কং আমাকে কখনো ‘নিগার’ ডাকে নি।

যুদ্ধে যেতে আস্বীকৃতি জানানোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মিডিয়ায় আলিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং তার প্রতি নিন্দা জানানো হয়। মোহাম্মদ আলির এই রকম মনোভাবের কারণে তখন আরেক বিখ্যাত বক্সার ফ্লয়েড প্যাটারসন আলির নিন্দা করে বলেন, আমি বিশ্বাস করি না ঈশ্বর কাউকে ঘৃণা করার জন্য আমাদের এখানে পাঠিয়েছেন। ক্যাসিয়াস ক্লে নিজেকে এবং পুরো নিগ্রো জাতিকে লাঞ্ছিত করছেন।

১৯৬৭ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করায় ও যুক্তরাষ্ট্রের আর্মিতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় মোহাম্মদ আলির বক্সিং লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হয়।

১৯৬০ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রে কালোদের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। বক্সিং লাইসেন্স কেড়ে নেওয়ার টাইমে, ১৯৬৭ সালেও, দেশটির অনেক জায়গায় সাদা এবং কালোদের জন্য আলাদা আলাদা নীতি বহাল ছিল।

ali-1967

১৯৬৭ সালের ২৮ এপ্রিল, আর্মিতে যোগ দিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর পরে হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ আলীকে হাউসটনের আর্মড ফোর্স এক্সামিনিং অ্যান্ড এনট্রান্স স্টেশন থেকে এসকর্ট করে নিয়ে যাচ্ছেন স্টেশনের কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট কর্ণেল জে ম্যাক কী । আলী বলেছিলেন তিনি একজন ন্যায়বান লোক, যে দেশ তার গোত্রের মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে দেখে, সে দেশের আর্মিতে তিনি যোগ দিবেন না।

বক্সিং লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া পর মোহাম্মদ আলি বলেছিলেন: “আমি আর্মিতে যোগ দেওয়ার নিয়ম এড়িয়ে যাচ্ছি না। আমি পতাকা পোড়াচ্ছি না। আমি কানাডায়ও পালিয়ে যাচ্ছি না। আমি এখানেই থাকছি। আপনারা আমাকে জেলে পাঠাতে চান? ফাইন, আপনারা তা করুন। আমি ৪০০ বছর ধরে জেলে আছি। আমি আরো ৪ বা ৫ বছর সেখানে থাকতে পারব, কিন্তু ১০ হাজার মাইল দূরে গিয়ে অন্য দেশের গরীব মানুষদের মারতে পারব না।”

তিনি বলেন, “আমি যদি মরতে চাই, আমি এখানেই মরব, এখনই মারা যাব, আপনাদের সাথে লড়াই করতে করতে মারা যাব। আপনারাই আমার শত্রু, কোনো চাইনিজ, কোনো ভিয়েতকং, কোনো জাপানি আমার শত্রু না।”

আলি বলেন, “যখন স্বাধীনতা চেয়েছি আপনারা তার বিরোধিতা করেছেন। যখন ন্যায়বিচার চেয়েছি, আপনারা আমার বিরোধিতা করেছেন। যখন সাম্য চেয়েছি আপনারা আমার বিরোধিতা করেছেন। আপনারা আমাকে চান আপনাদের হয়ে অন্য কোথাও গিয়ে যুদ্ধ করি? আপনারা এই আমেরিকাতেই আমার অধিকার এবং আমার ধর্ম বিশ্বাসের জন্য আমার পক্ষে দাঁড়াতে পারেন না। আপনারা আমার অধিকারের জন্য আমার নিজের দেশেই আমার পক্ষে দাঁড়াতে পারেন না। ”

২.
তার মুসলিম ধর্মপরিচয়ের কারণে টুইটারে তাকে নিয়ে ট্রল করা হয়েছে।

JohnGGalt নামে একজন টুইট করেছেন, “মোহাম্মদ আলির মৃত্যুর পর তার ধর্মীয় পরিচয় ভুলে যাওয়া হয় নি।”

Joseph LeRoux নামে আরেক জন লিখেছেন, “ক্রাইস্টের রক্ত ছাড়াই একজন মুসলিম হিসেবে মোহাম্মদ আলি মারা গেছে। আমাদের মনে রাখা উচিৎ ধনী এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদেরও জেসাসকে প্রয়োজন। খুবই দুঃখের ব্যাপার।”

((( F. Jeffery))) নামে একজন টুইট করেছেন, “একজন কালো মুসলমান মারা গেছে বলে সারা দুনিয়া শোক করছে? আপনারা কি জানেন সাদা এবং কালোদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্কের বিরোধিতা করার জন্য KKK (ক্লু ক্লাক্স ক্ল্যান নামের সাদাদের পক্ষের সহিংস অর্গানাইজেশন) মোহাম্মদ আলির প্রশোংসা করেছিল?

Deportationbot Servo নামের একজন উইকিপিডিয়ার একটি অংশের ছবি দিয়ে বলেন, “আলি যুক্তরাষ্ট্রের আর্মিতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং পাবলিকলি নিজেকে ন্যায়বান প্রতিবাদী হিসাবে ঘোষণা করেন। আলি বলেন, যুদ্ধ কোরআনের শিক্ষার বিরোধী। আমি এই চিন্তার সাথে কোনো চাতুরি করার চেষ্টা করছি না। আল্লাহ অথবা তার মেসেন্জারের আদেশ ছাড়া আমাদের কোনো যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কথা না। আমরা কোনো ক্রিশ্চিয়ান যুদ্ধে বা অবিশ্বাসীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি না। দৃঢ়ভাবে তিনি তার সেই বিখ্যাত কথাটি বলেন, ভিয়েত কং দের সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই—কোনো ভিয়েত কং আমাকে কখনো নিগার ডাকে নি। যুদ্ধের বিরোধিতা করার জন্য এই কথাটি অনেককে অনুপ্রেরণা দেয়।

আরো পড়ুন: বক্সিং মুভি ‘রকি টু’ (১৯৭৯) দেখার পর মোহাম্মদ আলি

এই অংশ পোস্ট করে Deportationbot Servo লিখেছেন, “চাতুরি করা মোহাম্মদ আলি ছিলেন একজন মাত্র ৭৮ আইকিউর মুসলমান।”

MattyKaye নামের একজন লিখেছেন, “ক্যাসিয়াস ক্লে—এই সকল ঝামেলা স্বেচ্ছায় মাথা পেতে নেয়ার আগে—৭৮ আইকিউর একজন বর্ণবাদী ব্যক্তি।”

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সান বার্নারডিনো শ্যুটিং ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন; পারকিনসন অসুখে ভুগতে থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদ আলি তখন বিবৃতি দিয়েছিলেন—যারা ইসলামকে তাদের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ব্যবহার করে, মুসলিম হিসাবে আমাদের উচিৎ তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। একটি প্রেস রিলিজে মোহাম্মদ আলি এ কথা বলেন।

সেই প্রেস রিলিজে তিনি আরো বলেন, যে আমাকে কখনো পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের জন্য অভিযুক্ত হতে হয় নি, সেই আমি বিশ্বাস করি ইসলাম ধর্ম বোঝার জন্য আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের উচিৎ তাদের অবস্থানকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা, এবং রাজনৈতিক নেতাদের উচিৎ এই সব খুনীরা যে ইসলাম আসলে কী তা নিয়ে মানুষের ধারণাকে ভুল পথে নিচ্ছে ও নষ্ট করছে তা স্পষ্ট করা।

এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প মোহাম্মদ আলিকে তার ‘বন্ধু’ উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু ২০১৬ এর শুরুর দিকে ওবামা যখন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমান স্পোর্টস হিরোও আছে, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ওবামার এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক