ডায়াবেটিস রোগীদের শরীরের অন্যতম সংবেদনশীল অঙ্গ হলো পা। নার্ভ ড্যামেজ বা নিউরোপ্যাথি হলে তারা পায়ে ব্যথা অনুভব করেন না। রক্ত চলাচলের গতি ধীর হয়ে যাওয়ার ফলে কোথাও ক্ষতের সৃষ্টি হলে তাও দ্রুত সারে না। ফলে তারা প্রতিমুহূর্তেই ইনফেকশনের ঝুঁকিতে থাকেন। তাই পায়ের পরিপূর্ণ খেয়াল না রাখলে ইনফেকশন থেকে ফুট আলসার পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। আবার না জানার ফলে পায়ের যত্ন নিতে গিয়ে অনেকের হিতে বিপরীত হয়। যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের পায়ের যত্ন নিতে কী কী করা উচিৎ বা অনুচিত, তা নিয়ে কয়েকটি পয়েন্ট।

১. অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা তাপমাত্রায় খালি পায়ে থাকবেন না

পা গরম করার জন্য হিটপ্যাড, হেয়ারড্রায়ার কিংবা গরম পানিতে ভেজানো জলপট্টি ব্যবহার করবেন না। একইভাবে আইসপ্যাক অথবা ঠাণ্ডা পানিতে ভেজানো জলপট্টিও ব্যবহার করা থেকে দূরে থাকবেন। এসবের ব্যবহার আপনার চামড়ার প্রদাহের কারণ হতে পারে।

কেন?

ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে পায়ের সংবেদনশীলতা হারানো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। যখন এমনটা হয়, সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের পায়ে গরম বা ঠাণ্ডার পার্থক্য অনেক কম অনুভূত হয়। এসময় হিটপ্যাড, হেয়ারড্রায়ার কিংবা লাইট থেরাপি নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কেননা এসবের ব্যবহারে তাদের পায়ে স্কিনবার্ন দেখা দিতে পারে।

একইভাবে চিকিৎসকরা আইসপ্যাক কিংবা ঠাণ্ডা পানিতে ভেজানো জলপট্টি ব্যবহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা তাপমাত্রার সংস্পর্শে এলে আমাদের স্কিনটিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি বেশি সময় ঠাণ্ডা থাকলে পায়ের চামড়ায় আইসবার্ন হতে পারে।

বেশি সময় ধরে পা ভিজিয়ে রাখবেন না। এর ফলে আপনার চামড়া কুঁচকে অথবা ফেটে যেতে পারে। পা ডুবিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত ফুট বেসিনগুলিতেও অনেক জীবাণু থাকে। যা আপনার পায়ের সূক্ষ্ম ফাটলে ঢুকে ইনফেকশনের সৃষ্টি করতে পারে।

এর পরিবর্তে কী করতে পারেন?

পায়ে যদি অনেক বেশি ঠাণ্ডা অনুভূত হয়, তাহলে পুরু একজোড়া সুতির মোজা পরে থাকুন। পা ভিজিয়ে রাখার আগে হাতের কনুই দিয়ে পানির তাপমাত্রা পরীক্ষা করে নিন। অথবা অন্য কাউকে পানির তাপমাত্রা নির্ণয়ে সাহায্য করতে বলুন।

২. খালি পায়ে কিংবা স্লিপার পায়ে দিয়ে বাইরে বের হবেন না

খালিপায়ে কিংবা স্যান্ডেল পরে চলাফেরা করলে পায়ের বেশিরভাগ অংশই খোলা থাকে। ফলে ঘরের বাইরে বহু জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ধারালো বস্তুর সাথে লেগে আপনার পা কেটে কিংবা ছড়ে যেতে পারে। আর ক্ষতস্থান দিয়ে জীবাণু প্রবেশ করে ইনফেকশনের সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে পায়ের সংবেদনশীলতা হারানোর ফলে ডায়াবেটিস রোগীরা কেটে যাওয়া স্থানে ব্যাথা অনুভব নাও করতে পারেন। আর অধিক সময় ধরে খেয়াল না করার ফলে সেই ক্ষত ভবিষ্যতে ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিতে পারে।

এর পরিবর্তে কী করতে পারেন?

বাইরে বের হওয়ার আগে একজোড়া মোজা পায়ে দিয়ে বের হতে চেষ্টা করুন। ঘাম শোষিত হতে পারে যাতে এজন্য জুতা পায়ে দেয়ার আগে সুতি মোজা পরে নিন। জীবাণুর বিস্তার ঠেকাতে প্রতিবার ব্যবহারের পরে মোজা পাল্টান। বাসায় থাকা অবস্থায় পা সুরক্ষিত রাখার জন্য নরম স্লিপার ব্যবহার করুন। তাছাড়াও নিয়মিত আয়নার সাহায্যে পা পরীক্ষা করে দেখুন, সেখানে নতুন কোনো ক্ষত কিংবা আঘাতের চিহ্ন আছে কিনা।

৩. নুড়ি বিছানো পথে হাঁটবেন না এবং ফুট রিফ্লেক্সোলজি ম্যাসাজ নিবেন না

গরমের দিনে নুড়ি পাথর বিছানো ফুট রিফ্লেক্সোলজির পথগুলো অনেক উষ্ণ হয়ে থাকে। এই ধরনের ম্যাসাজ আপনার পায়ে তীব্র প্রদাহ কিংবা ইনফেকশনের কারণ হতে পারে। ফুট রিফ্লেক্সোলজির অমসৃণ পথ অথবা নুড়ি পাথরের মাঝখানে লুকিয়ে থাকা কোনো ধারালো বস্তুতেও আপনার পা কেটে যেতে পারে। এমনকি এই ধরনের ম্যাসাজ গ্রহণের সময় পায়ের ওপর যেই পরিমাণ চাপ পড়ে, তাও আপনার পা আহত করতে পারে।

৪. সমুদ্রের পানিতে পায়ের ক্ষত পরিষ্কার কিংবা ফিশ-স্পা থেরাপি গ্রহণ করবেন না

সমুদ্রের পানি অথবা ফিশ-স্পা, কোনোটার পানিই জীবাণুমুক্ত না। সমুদ্রের পানি দিয়ে পা পরিষ্কার করলে পায়ে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। আর ফিশ-স্পা’গুলোতে একই মাছ একাধিক লোকের পায়ের মৃত চামড়া খুঁটে খুঁটে খায়। এভাবে একজন মানুষের শরীরের জীবাণু আরেকজনের শরীরে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এর পরিবর্তে কী করতে পারেন?

ড্রেসিং করা কিংবা পট্টি বাঁধার আগে পায়ের ক্ষত জীবাণুমুক্ত পানি কিংবা স্যালাইন দিয়ে পরিষ্কার করে নিন।

৫. ক্ষত কিংবা কাটাছেঁড়া স্থান খোলা বাতাসে শুকাতে দিবেন না

এভাবে ক্ষতস্থানে জীবাণুর সংক্রমণ হয়। সেখানে মাছিও বসতে পারে। আর ফ্যান অথবা হেয়ার ড্রায়ারের সাহায্যে ক্ষত শুকানোর চেষ্টা বাস্তবে খুব একটা ফলদায়ক হয় না। পরিবর্তে সেখান থেকে নানারকম জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। বরং যত বেশি সময় ধরে ক্ষতস্থান খোলা অবস্থায় থাকবে, ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা ততই বাড়বে।

এর পরিবর্তে কী করতে পারেন আপনি?

ইনফেকশন থেকে বাঁচতে ক্ষতস্থান সবসময় জীবাণুমুক্ত ড্রেসিংয়ের মাধ্যমে ঢেকে রাখুন।

৬. প্রচলিত প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে দূরে  থাকুন

বাজারে প্রচলিত মলম বা অয়েন্টমেন্ট ক্ষত সারানোর পক্ষে উপকারী এমন দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এমনকি প্রচলিত এসব ওষুধে ব্যবহৃত অনেক উপাদান ক্ষতস্থানের অবস্থা আরো খারাপ দিকে নিয়ে যেতে পারে। ফলে এসব থেকে দূরে থাকুন।

এর পরিবর্তে কী করতে পারেন?

শরীরের কোথাও কাটাছেঁড়া হলে আগে আয়োডিন দিয়ে তা পরিষ্কার করুন। এরপর জীবাণুমুক্ত পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থান ড্রেসিং করুন। ক্ষত যদি না শুকায় বা খারাপের দিকে যায় তাহলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।