page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

ড্রোনের সাহায্যে বছরে ১০০ কোটি গাছ লাগাবেন নাসার প্রাক্তন প্রকৌশলী

পৃথিবীব্যাপী প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৬ বিলিয়ন গাছ কাটা হয়। এর পেছনে নগরায়ন, কাঠসংক্রান্ত ব্যবসা, কাগজ উৎপাদন, কৃষিভূমির চাহিদা পূরণ ব্যতীত অন্যতম কারণ হল অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা স্থাপন। এই ঢালাওভাবে বনভূমি ধবংসের ফলে জীববৈচিত্র হ্রাস, মাটিক্ষয় বৃদ্ধি, গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমনসহ জীব ও পরিবেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানাবিধ ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে।

drone biocar

ড্রোন হাতে নাসার প্রাক্তন প্রকৌশলী লরেন ফ্লেচার

গাছ কাটা তুলনামূলকভাবে সহজ কিন্তু ঐ পরিমাণ গাছ লাগানো বেশ সময়সাপেক্ষ এবং শ্রমসাদ্ধ। বনায়নের প্রচলিত পদ্ধতিগুলি যেমন বীজ হাতে রোয়া এবং বাতাসে ছড়ানো সাধারণত ধীরগতির এবং ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। তাই বনভূমি ধ্বংসের ব্যাপক ক্ষতিকারক প্রভাব এড়ানো সভ্যতার জন্য বরাবরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে এই জটিলতাকে কমিয়ে আনতে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। নাসার প্রাক্তন প্রকৌশলী লরেন ফ্লেচার উদ্ভাবিত বায়োকার্বন প্রকৌশল এক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। হাতে রোয়া এবং বাতাসে ছড়ানো এই দুই প্রচলিত পদ্ধতির সমন্বয়ে রবোট ড্রোনের মাধ্যমে নতুন করে বনায়ন করবে শিল্পকারখানাগুলি। বলা যেতে পারে, বিশ্বজনীন গৃহীত পরিবেশনীতি ‘polluter pay principle’ এর মূলভাব অনুসরণ করে শিল্পায়নের সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে এবার শিল্পকারখানাগুলিই প্রধান ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।

drone Mapping

তথ্যসংগ্রহ: যেসব ভূমিতে গাছ আবার লাগানো যাবে তার একটি উন্নত ত্রিমাত্রিক ম্যাপ তৈরির জন্য বায়োকার্বন ইঞ্জিনিয়ারিং পুরো ভূ-খণ্ডের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবারে ড্রোন বছরে আনুমানিক ১০০ কোটি গাছ লাগাবে। এর ফলে আগের চেয়ে কম সময়ে ও কম খরচে বনায়ন সম্ভব হবে। যদিও খরচ কমানো ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজ হাতে গাছ লাগানোর চেয়ে এই উপায় শ্রেয়, এমনটা মনে করেন না ফ্লেচার। যদি সম্পূর্ণভাবে কাজ়ে লাগানো যায়, তাহলে ড্রোনের মাধ্যমে বনায়ন করে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে ১৫% পর্যন্ত ব্যয় কমানো যেতে পারে।

এ পদ্ধতিতে ড্রোন ঢালাওভাবে বীজ বর্ষণ কিংবা রোপণ করবে না। শুরুতে কোনো অঞ্চলের ভূখণ্ড এবং স্থানীয় গাছপালা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ঐ অঞ্চলে কত সংখ্যক গাছ লাগানো সেখানকার মাটির জন্য উপযোগী তা ঠিক করা হবে। এটা নির্ণয়ের পর অঞ্চলটি যখন বীজ রোপণের উপযোগী হয়ে উঠবে, ড্রোনের মাধ্যমে বীজ ছড়ানোর একটা পথের ম্যাপ তৈরি হবে তখন।

ড্রোনগুলি মাটির দুই-তিন মিটার উপর থেকে এই পথ অনুসরণ করে মিনিটে ১০টি করে বীজ বর্ষণ করবে যা থাকবে আগে থেকেই অঙ্কুরিত এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ তরলে আবৃত। যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে দৈনিক সর্বোচ্চ ৩০০০ বীজ রোপণ করা যায়, ড্রোনের মাধ্যমে দিনে প্রায় ৩৬০০০ বীজ রোপণ সম্ভব হবে।

drone panting

রোপণ: ম্যাপের তথ্য ব্যবহার করে যথাযথ মাত্রায় বৃক্ষ রোপণ

তবে এই প্রজেক্টে ড্রোনের কাজ শুধু বীজ রোপণেই সীমিত নয়! সময়ে সময়ে ড্রোন রোপিত গাছের ওপর নিরীক্ষা চালাবে। ড্রোনের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ কতটা কাজে লাগল তা বোঝা এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের উন্নয়ন করা যেতে পারে তা ঠিক করার জন্য এই নিরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

এই পদ্ধতির আরেকটি সুবিধা হল প্রচলিত পদ্ধতির মত গাছের নিয়মিত যত্ন নেয়া এবং পানি দেয়ারও প্রয়োজন পড়বে না। ফ্লেচার জানান, তাঁরা এমন স্বনির্ভর ইকোসিস্টেম তৈরি করার কথা ভাবছেন, যার ফলে গাছ পরিবেশ থেকে আপনাআপনি প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারবে।

drone monitoring

পর্যবেক্ষণ: ড্রোনের মাধ্যমে রোপণের কাজ দেখভাল করা হবে। তা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ইকোসিস্টেমের অবস্থা সম্পর্কে দ্রুত মূল্যায়নে সহায়তা দেবে।

এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে ‘সুপরিকল্পিত বনায়ন’ বা precesion forestry. জীব ও পরিবেশের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রত্যেক অঞ্চলের জীববৈচিত্রের শর্তের সাথে সঙ্গতি রাখতে বিজ্ঞানী দলটি স্থানীয় বৃক্ষরোপণ সংগঠনগুলির সাথে কাজ করার কথা ভাবছে। এছাড়া ফ্লেচার বলেন, “আমরা ইকোলজিস্টদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করে থাকি যাতে কোনো পরিবেশে উপযুক্ত প্রজাতির বীজরোপণ করছি কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারি।”

ব্রাজিল কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে শুরু হতে পারে আগামী ১২ মাসে ১০০ কোটি গাছ লাগানোর প্রথম অভিযান। ফ্লেচারের মতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল গাছকে পুরোপুরি বাড়ার নিশ্চয়তা দিতে পারা। তিনি বলেন, “আশা করি এরপর গাছ লাগানোর খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনতে পারব যাতে এ ধরনের পরিকল্পনা হাতে নেয়ার ক্ষেত্রে সরকার আগ্রহী হয়।”


বায়োকার্বন ইঞ্জিনিয়ারিং – ইউটিউব ভিডিও

ড্রোনের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণের এই আইডিয়া প্রথমবারের মত সামনে আসে ইউএই ড্রোনস ফর গুড এওয়ার্ড ২০১৫ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। বনভূমি উজাড় রোধে এটি একটি ভাল সমাধান হতে পারে; তবে নানাবিধ কারণে অনেকেই মনে করছেন এটি হল মূল সমস্যাকে এড়িয়ে কেবল সমস্যার প্রভাব কমানোর চেষ্টা।

প্রথমত, পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক বিদ্যমান। একটি বন উজাড়ের ক্ষতির পরিমান শুধু সেখানকার গাছগুলি ধবংস হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এর সাথে অবধারিতভাবে ধ্বংস হয় ঐ গাছের ওপর নির্ভরশীল নানা প্রজাতির প্রাণী এবং অনুজীব। তাই, বনভূমি উজাড় জীব ও পরিবেশের যে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে তার অনেকটাই অপূরণীয়। দ্বিতীয়ত, এই বীজ রোপণের জন্য যে পর্যাপ্ত খালি জায়গা দরকার শিল্পকারখানা স্থাপন ও জনবসতি নির্মাণের কারণে পৃথিবীর বহু অংশে এখন তা পাওয়া দুষ্কর।

তাই কম সময়ে কম খরচে গাছ লাগানোর প্রক্রিয়া একটি চমৎকার উপায় হওয়া সত্ত্বেও, বনভূমি উজাড় রোধ করাই অধিক কাম্য।

About Author

তাশমিয়া সাবেরা
তাশমিয়া সাবেরা

পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। ১৫তম হিউম্যান রাইটস সামার স্কুলে অংশ নিয়েছেন। ঢাকা ল রিভিউতে আইন বিষয়ক লেখার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। আগ্রহের বিষয় সাহিত্য ও দর্শন। গল্প লেখা তার অন্যতম ভালো লাগার জায়গা।