page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

ড তে ডায়েরি

তখন ক্লাস টু তে পড়ি। আমার বাসায় আনা ফ্রান্কের ডায়েরি আসলো । বড়রা সবাই একজনের পর একজন পালাক্রমে সেই ডায়েরি পড়া শুরু করলো। আমার আবার তখন বড় হওয়ার খুব শখ। তাই বড়দের দেখাদেখি আমিও আনা ফ্রান্কের ডায়েরি নিয়ে বসলাম।

পড়ি তো মাত্র ক্লাস টু তে। তাই সেই ডায়েরির মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝি নাই। পুরাটা পড়িও নাই। দুই পেইজের মতো পড়ছিলাম।

তারপর ক্লাস থ্রিতে কে যেন আমাকে একটা ডায়েরি গিফট করে। সুন্দর তালা লাগানো গোলাপি রঙের ডায়েরি। সেইটা বাচ্চাদের ডায়েরি বলে আমার পছন্দ হয় না। বড়দের সবার মোটা মোটা শক্ত কভারের ডায়েরি ছিল। আমারও ঐরকম ডায়েরি পছন্দ। তো শেষমেশ কেউ একজন একটা বড়দের ডায়েরি আমাকে দিয়ে দিলো।

logo tithi 3

ক্লাস ফোরে আমি ডায়েরি লিখা শুরু করি। শুরুতে খুব আগ্রহী ছিলাম। ভাবতাম এইসব দিনলিপি অনেক বছর পর যখন দেখবো তখন অনেক মজা হবে।

ডায়েরি লিখার সময় আমার সবসময় একটা ঝামেলা হতো। আমার শুধু মনে হতো কেউ একজন আমার ডায়েরিটা পড়ে ফেলতেছে। দেখা যেত, আমিও সেই “কেউ একজন”এর উদ্দেশ্যেই ভদ্রভাবে ডায়েরি লিখতেছি। দেখা গেল, প্রতিদিনের দিনলিপিতে মোটামুটি একই কথা লিখা। সকালে উঠলাম, স্কুলে গেলাম, বাসায় আসলাম, দুপুরে ঘুমালাম….. এইসব। একরকম বিরক্ত হয়েই ডায়েরি লিখা বন্ধ করে দিলাম। কারন তখন ডায়েরি মানেই হচ্ছে অন্য কেউ সেটা পড়ে ফেলবে। তাই অবশ্যই বিশেষ কিছু লিখতে হবে। তাই প্রতিদিনের ডায়েরি লিখা বাদ দিয়ে পহেলা বৈশাখ কিংবা কারো জন্মদিন এরকম বিশেষ বিশেষ দিনে ডায়েরি লিখতাম। পরে দেখা গেলো আমি তাতেও বিরক্ত। নিজের লিখা পড়ে নিজেই বিরক্ত হতাম । তো একদিন মহা বিরক্ত হয়ে আমি আমার ডায়েরির সব লিখা ছিঁড়ে ফেলে দিলাম।

কিন্তু ডায়েরি তো লিখতেই হবে। ক্লাস সিক্স থেকে আমি একটু অন্যরকমভাবে ডায়েরি লিখা শুরু করি। তখন বেশ বইটই পড়তাম। কোন বইয়ের কোন লাইন ভালো লেগে গেলে সেটা লিখে রাখতাম। গানের লাইন, সিনেমার ডায়ালগও লিখে রাখতাম। কিছু কিছু মানুষের কথাও লিখে রাখতাম। কিন্তু আবারও কিছুদিন পর যখন নিজের লিখা পড়তে বসতাম, তখন রাগ লাগতো। এইসব ছাতা মাথা কি লিখি আমি! তাই লিখালিখি বাদ। আবারও পুরানো লিখা গুলি ডায়েরি থেকে ছিঁড়ে ফেলে দিলাম।

তারপর ক্লাস সেভেনে আমি একদিন ডায়েরি খুলে বসি। এইবার নতুন কিছু লিখবো। মোটামুটি দুই পাতার একটা গল্পও লিখে ফেললাম আমার স্কুল নিয়ে। গল্পটা আমার খুবই ভালো লাগলো। নিজের প্রতিভায় নিজে এতোই মুগধ হলাম যে, প্রতিদিন নতুন গল্প লিখার উদ্দেশ্যে ডায়েরি খুলে বসলেও দেখা যেত আমি পুরানো গল্পটাই মন দিয়ে বার বার পড়ে যাচ্ছি। এই এক গল্প নিয়ে অনেকদিন কেটে গেলো। আমার নতুন গল্প লিখা আর হইলো না। দেখা যেত, নতুন কিছু লিখতে বসলেও আমি ঐ পুরানো গল্পের মতোই কিছু একটা লিখার চেষ্টা করতেছি। শেষ মেষ আমি বুঝলাম ঐ গল্পই সর্বনাশের মূল। তাই ঐ গল্পও ছিঁড়ে ফেলে দেয়া হলো। কিন্তু তাতেও কোন লাভ নাই। আমার ডায়েরি খালিই পড়ে ছিলো পরের প্রায় ৩ বছর।

ক্লাস টেনে উঠার পর একদিন আমি আর আমার বন্ধু তন্ময় মিলে ঠিক করলাম দুইজন মিলে একসাথে উপন্যাস লিখবো। আবার নতুন করে ডায়েরি খুললাম। তখন ডায়েরিতে আর মাত্র কয়েকটা পৃষ্ঠাই আছে। তাতেই লিখা শুরু করলাম। প্রথম তিন পাতার মতো আমি লিখলাম। এরপর তন্ময়ের লিখার পালা। সেও দেড়/দুই পাতা লিখলো। এরপর আমার লিখা শেষ হবার পরই তন্ময় আমাকে ধাপ্পা দিলো। তন্ময়ের ইউনিভার্সিটির এডমিশনের জন্য আমাদের উপন্যাস আর আগালো না।

৩ মে ২০১৫ তে আমরা বাসা চেঞ্জ করলাম। আমাদের বাসা ভর্তি বইখাতা আর কাগজপত্র। অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে মা খুবই বিরক্ত। আমার ঘাড়ে দায়িত্ব পড়লো সব অপ্র‍য়োজনীয় কাগজ একটা বস্তায় ভরে বস্তাটা বুয়াকে দিয়ে দেয়ার। আমি সব অপ্র‍য়োজনীয় কাগজের সাথে আমার ঐ ডায়েরিটাও বস্তায় ভরে বুয়াকে দিয়ে দিলাম।

আমার কাছে এখন দুইটা ডায়েরি আছে। তার একটাতে মানুষের ফোন নাম্বার (যেহেতু বারবার ফোন হারাই) আর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র লিখা। আরেকটা মোটামুটি খালি। এই মাস থেকে নতুনভাবে ডায়েরি লিখা শুরু করলাম। এখন প্রতিদিন যেসব আজব আজব জিনিস স্বপ্নে দেখি, ঐগুলি লিখে রাখি।

তবে এখনও আমার “ডায়েরি মানেই অন্যজন পড়ে ফেলবে” এই ধারনা যায় নাই। তাই এখন ডায়েরি লিখা এখন অনেকটা স্ট্যাটাস লিখার মতো হয়ে গেছে। সবশেষে বলা যায়, আমি সত্যিকার অর্থে ডায়েরি ঐ একবারই লিখছিলাম। ক্লাস সেভেনের গল্পটা। সেইটাও আবার আমি ছিঁড়ে ফেলছি। কি দুঃখ!

About Author

সুচিস্মিতা তিথি
সুচিস্মিতা তিথি

জন্ম. চট্টগ্রাম, জুন ১৯৯৮। চট্টগ্রামের বাওয়া স্কুলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াশুনা। চকরিয়া থেকে জেএসসি এবং ঢাকার আজিমপুর গভমেন্ট গার্লস স্কুল খেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাস। এখন ঢাকার মতিঝিলে আইডিয়াল কলেজে পড়ছেন।