যে মহিলাটি গত কয়েক মাস যাবৎ শয্যাশায়ী বাবার যাবতীয় শুশ্রূষা করতেন, তাঁর নিয়োগ খানিকটা অবধারিতই ছিল।

যে মহিলাটি গত কয়েক মাস যাবৎ শয্যাশায়ী বাবার যাবতীয় শুশ্রূষা করতেন, তাঁর নিয়োগ খানিকটা অবধারিতই ছিল। প্রথম কারণ, মা কিছুতেই মনে করতেন না যে এজেন্সি থেকে কোনো ‘আয়া’ নিয়োগ দিলে সেই কর্মজীবী যথেষ্ট প্রযত্ন নিতে চাইবেন বাবার। কোলকাতায় এসবের এজেন্সি সুপ্রতিষ্ঠিত। বলাই বাহুল্য, মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে এজেন্সিগুলো এই কর্মজীবীর আয়ের বড় একটা অংশ খেয়ে নেয়। সেই একই কথা আসলে ঢাকার সিকিউরিটি, কিংবা অধুনা গৃহশ্রমিক, যোগানদাতাদের বেলায়ও সত্য। কিন্তু সেই খেয়ে-ফেলা আয়ের অংশ নিয়ে মায়ের যত দুশ্চিন্তা, তার থেকে অনেক দুশ্চিন্তা এই ধরনের রুগির প্রতি শুশ্রূষাকারীর সম্ভাব্য অযত্ন নিয়ে। মায়ের গবেষণা থেকে তেমন প্রমাণ মিলেছে কিনা আমি জানি না অবশ্য। আরেকটা দেশে থেকে এসব নিত্যনৈমিত্তিক যোগাড়যন্তে আমি কর্তৃত্ব নিই না কখনো সেটাও সত্য। ফলে, শহরের প্রান্তে যে এলাকায় মা থাকেন, সেখানকারই কাউকে তাঁর অধিকতর নির্ভরযোগ্য মনে হওয়াকে আমার সঙ্গত লাগল। এমনকি বাবার স্বাস্থ্য নিয়ে মায়ের লাগাতার উৎকণ্ঠার মধ্যে এজেন্সি ও শ্রমিকদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে কোনো গুরুতর আলাপ তোলারও পরিবেশ আছে বলে মনে হয়নি। তারপরও মা-কে আমি আশ্বস্ত করেছিলাম অন্তত এটুকু বলে যে মায়ের দেয়া টাকাটার মধ্যে কেউ ভাগ বসাতে আসবেন না অন্তত। ভাল নিয়োগ।

কিন্তু বাস্তবে এই নারীটির, ধরা যাক তাঁর নাম ভগবতী, দিকে তাকালে তাঁকে শুশ্রূষা দানকারী মনে হবার চাইতে গ্রহণকারী মনে হওয়াই অধিক সঙ্গত লাগবে। তিনি বিপুলা, প্রকৃতই বিপুলা, সম্ভবত কঠোর হাই ব্লাড প্রেশারেরও রুগি। দুজন নাতনি কিছুক্ষণ পর পরই তাঁর খোঁজ নিতে আসে। আমার মা বা আমার বা সকলের সঙ্গেই দারুণ মিষ্টি মেয়ে দুটো। বুদ্ধিমান, চটপটে। ওদের বাবা কিছু একটা শ্রমঘন কাজ করেন। সম্ভবত বিদ্যুৎ-মিস্ত্রি কিংবা তিনচাকার যানচালক কিংবা কিছু একটা এখন আমার মনে নেই। ওদের মা, অর্থাৎ ভগবতীর পুত্রবধূ, কয়েক মাস আগে আগুনে পুড়ে মারা যান। আগুনটা এসেছিল দেবতার প্রদীপ থেকে, একটা সিনথেটিক শাড়ির আঁচল বেয়ে। আর সেই দেবতা ছিলেন একটা সচ্ছল বাড়ির গৃহেই, যেখানে কোনো একটা পূজা হচ্ছিল। সেই নারী, ভগবতীর নাতনিদের মা, নিজেও একজন গৃহশ্রমিকই ছিলেন। তো নানান কিছু থেকে আন্দাজ করা যায় যে ভগবতীর এই দুর্নিবার কর্মযোগ আসলে নাতনিদের জীবনকে অপেক্ষাকৃত সুলভ করে দেবার জন্য। কিংবা হয়তো যে দুর্ভার বোঝা তাঁর পুত্র স্ত্রীসমেত বইতেন, সেই বোঝাটির কিছু অংশ স্ত্রীহীন কালে পুত্রের কাছ থেকে ভাগাভাগি করার জন্য। মানে কিছু একটা হবে। এই যে কিছু একটা তার বোধগম্য ব্যাখ্যা বের করা এমন কিছু পরিকল্পনা বা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞের কাজ নয়। আপনি বা আমি যে কেউই বুঝে যেতে পারব বলে আশা রাখা যায়।

বাবার সঙ্গে লেখক

বাবার প্রতি এই মহিলার কর্মকাণ্ডকে ‘দরদ’ বা ‘প্রযত্ন’ হিসেবে চিত্রিত বা চিহ্নিত করা চলে। তিনি যা যা কাজ করতেন তা অতিশয় দুরূহ। বিশেষত বাবার ক্রমহ্রাসমান জীবনীশক্তি, চলৎশক্তিহীনতা, বোধহীনতা, অত্যধিক যন্ত্রণা, ভাষাহীনতা সব কিছু বিবেচনা করলে। শেষের দিকে বাবা কেবল ভাষা বা চলতাই হারাননি, তিনি ক্ষুধা হারিয়েছিলেন, এমনকি খেতে হয় কীভাবে সেই কৌশলগুলো ভুলে গেছিলেন। ক্রমাগত শক্ত হতে থাকা তাঁর শরীরের মাপ কমে আসছিল, আর বিচিত্র নিয়মে ওজন বেড়ে যাচ্ছিল। অর্থাৎ, তাঁকে নড়ানো দুঃসাধ্যতর হয়ে উঠছিল। এর সঙ্গে জড়ো হয়েছিল ত্বকের পচন। এই সীমাহীন দুর্গতিতে সব থেকে নাজুক ছিলেন মা, যদি আবেগপ্রবণতা আর মায়ার গুরুত্ব আমরা দেখি। তিনি তাঁর পাঁচ দশকের নিষ্ঠাবান কোমল সাথিকে ছাড়তে নারাজ ছিলেন; আবার এই যন্ত্রণাকাতর জীবন থেকে তাঁর পরিত্রাণের প্রয়োজনীয়তা বুঝতেন। ফলে মা বুঝতেন না যে আসলে কী ঠিক কামনা হওয়া উচিত মায়ের। মা নিজের ক্রমক্ষয়িষ্ণু শরীরেই অসম্ভব সব যত্নআত্তি করতেন বাবার। তুলনায়, ভগবতীর কর্মজগৎ অধিক সুস্পষ্ট ছিল; কিন্তু ছিল দুঃসাধ্য। সেই কাজটা নিজের দুর্গতিসমেতই করে চলেছিলেন ভগবতী। গত কয়েক মাস।

ভগবতীর চুক্তিটি ছিল দিনভিত্তিক। তিনি একদিনে ১২ ঘণ্টার জন্য বাবার সঙ্গে থেকে কত নেবেন তার দৈনিক মজুরি ধার্য ছিল। তবে টাকাটা সংগ্রহ তিনি দিনপ্রতি করতে চাইতেন না। অন্তত ৭ বা ১০ দিনের পর একত্রে সেটা নিয়ে আসছেন। তিনি, বলাই বাহুল্য, প্রতিবেশী হবার সুবিধায়, এই ১২ ঘণ্টার মধ্যে কয়েক ঘণ্টা নিজের বাসায় যাতায়াত করে খরচ করতে চাইতেন। বলা উচিত, মায়ের সঙ্গে তাঁর কর্মচুক্তির পয়লা ও মুখ্য দরকষাকষি ছিল এই ঘণ্টার প্রকৃত হিসাব বিষয়ে। আবার এই দরকষাকষিতে ভগবতীকে যে বিশেষ কসরৎ করতে হয়েছে তাও নয়। বাবার প্রতি ভগবতীর দায়িত্ববোধকে চাঙ্গা রাখতে মা-ও ভগবতীকে নিজ গৃহে, নাতনিযুগলের কাছে, যেতে দেয়াকে একটা উপায় হিসেবে দেখেছেন। সেই বিচারে এটা মায়েরও দরকষাকষি হিসেবে দেখা চলে। মায়ের উপর মহত্ত্বের অর্থ আরোপ করে একে ‘দয়ালু’ আচরণ হিসেবে দেখারও চল সমাজে আছে। তবে খুব সূক্ষ্ম বিচারে একে একটা উভপক্ষ বিজয়ী, বা উইন-উইন, চুক্তি হিসেবে দেখা দরকার বলে আমি মনে করি। মা একজন পাড়াওয়ালিকে নিয়োগ দিয়ে ও তাঁকে নিজ গৃহে বারংবার প্রত্যাবর্তনের সুযোগ দিয়ে অসুস্থ স্বামীর প্রতি অধিক দায়িত্বশীলতা পেতে চেয়েছেন। ভগবতীও এজেন্সি বহির্ভূত একটা পাড়াতুতো কাজে এজেন্সি-ফি ব্যতীত একটা কাজ পেয়ে থেকেছেন এবং নাতনিদের সঙ্গে প্রাত্যহিক খানাপিনা সাংসারিক যোগাযোগ বজায় রাখতে পেরেছেন।

ভগবতী অবশেষে আরেকটি গুরুতর দরকষাকষিতে আসতে পেরেছিলেন। পেরেছিলেন সম্ভবত নভেম্বরের ৪ তারিখ। কারণ ওই দিনই আমার মা আমাকে ফেসবুক বার্তা দেন। খানিকটা হয়তো অনুমোদনের জন্য, খানিকটা জানানোর জন্যই যে ভগবতী দিনপ্রতি আরো ৫০ টাকা বাড়তি নিতে আগ্রহী। বা তিনি আরো ১০০ টাকা করে চাইছিলেন, মা আরো ৫০ করে রফা করতে পারবেন বলে ভাবছিলেন। এটাও আবারো উইন-উইন পরিস্থিতিই ছিল। বাবার দেহের দুর্দশা, স্বাস্থ্যের দুর্দশা (আত্মা ও চিত্তের তো বটেই) যে হাল পেয়েছিল তাতে মায়ের পক্ষে কোনো শুশ্রূষাকারীই পাওয়া দুর্লভ হয়ে যেত। আর ভগবতী টাকার অধিকন্তু বাবার অনড় ও পচনশীল দেহখানিকে যথাসম্ভব দক্ষতায় সামলানোর যোগ্যতার জন্য একটা দাম আন্দাজ করতে পারছিলেন। আন্দাজ করা যায়, মা ওইদিনই, অর্থাৎ নভেম্বরের ৪ তারিখ ভগবতীর কাছ থেকে নতুন মজুরিপ্রস্তাব পান; অথবা তার আগের দিন। আর আমার সঙ্গে আলাপের পর মা সেই মজুরিপ্রস্তাবে সম্মত হন; অথবা হয়েই ছিলেন।

পরদিন নভেম্বরের ৫ তারিখ, দুপুর নাগাদ, বাবা মারা যান। বোনের কাছে শুনেছিলাম যে বাবা শেষ মুহূর্তে, অন্যান্য এপথযাত্রীদের মতোই, ঊর্ধ্বপানে তাকিয়ে ছিলেন। জল খাওয়ানোর প্রচেষ্টাতে কয়েক ফোঁটা জল তাঁর মুখে গিয়ে থাকতে পারে। তাঁর নিঃশ্বাস, অন্যান্য যাত্রীদের মতোই, দ্বিধাগ্রস্ত অনিচ্ছুক ছিল। এবং তারপর তাঁর অসাড় ভঙ্গি কিংবা নিঃশ্বাসহীনতা দেখেই বোন ও মা আন্দাজ করে থাকবেন যে বাবার জীবনচক্র শেষ হয়েছে। তবে পাশে ভগবতী থাকাতে আরো সুনিশ্চিতভাবে সেই বার্তা মা ও বোনের কাছে পোক্ত হবার কথা। ভগবতী আর যাই হোক এইরকম মহাপ্রস্থানের দর্শক হিসেবে অনেক অভিজ্ঞ।

কিন্তু বাস্তবিকবিচারে, দরকষাকষিতে ভগবতী সফল হবার পরের দিন থেকেই তিনি আসলে কার্যত চাকুরিহীন হয়ে পড়েছেন।

(৮ নভেম্বর ২০১৯।। রাজারহাট-গোপালপুর, কোলকাতা ১৩৬ )

পুনশ্চ: বৃদ্ধ মায়ের সংসারের বর্তমান ব্যবস্থাপনায় ভগবতীর শুশ্রূষাকারী (আয়া) পদের পুনর্বিন্যাস ঘটেছে এবং নতুন পদমর্যাদা হয়েছে রাঁধুনির, আপৎকালীন ও স্বল্পস্থায়ী। মায়ের ‘প্রকৃত’ রাঁধুনি সদ্য কিশোরপুত্রবিয়োগে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ আছেন বলে এই পদবিন্যাস সম্ভব হয়েছে। ‘প্রকৃত’ রাঁধুনির ১৩ বছরের পুত্র যে বিজয়া দশমীর দিন কোনো রকম আগাম সতর্কতা ছাড়াই জলে ডুবে মারা গেল সেই কাহিনীকে এখানে জুড়ে দেয়া অসম্ভব।

#
কভারের ছবি. বাবা চিত্ত রঞ্জন সাহা চৌধুরী ও মা রত্না সাহা চৌধুরীর সঙ্গে লেখক