আমার মেজোখালা ময়মনসিংহ শহরের সব হিন্দু মালিকানার দোকানের লোকদেরে দাদা বইলা ডাকতেন।

আমার বড়ভাই বলতেন ছোটখালামণি (আমার খালা বোনদের মধ্যে মেজো আর আম্মা সবচেয়ে ছোট দেইখা আমাদের খালা হিসাবে উনি ছোট, আমরা উনারে ছোটখালামনি বইলা ডাকি) নাকি মুসলমান দোকানদারদেরেও ‘দাদা’ বলেন।

কলিকাতা
কলিকাতার নিউমার্কেটে ব্যাগ কিনতে

ভাইয়ার এই কথার ভিত্তি কী তা অবশ্য আমরা তখন যাচাই করি নাই। কারণ আমরা বইনেরাই মা-খালাদের সঙ্গে মার্কেটে যাইতাম, ভাইয়া যাইতেন না।

বাংলাদেশে বাপের বাপরে দাদা ডাকা হয়, পশ্চিমবঙ্গে দাদা শব্দের অর্থ বড়ভাই। বাংলাদেশের হিন্দুরাও বড়ভাইরেই দাদা বলেন। আমি অবশ্য অনেক মুসলমান ফ্যামিলিতে দেখছি বইনের জামাইদেরে দাদা ডাকেন। পশ্চিমবঙ্গের কোন চলচ্চিত্র নিয়া কিছু জিগাইলে আমার বইন স্ট্রেইট বলে, “আমি দাদাদের ছবি দেখি না।”

আমি এই বছর ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গে গেলাম, জীবনে প্রথম দাদাদের দেশে। আমরা যেমন রাস্তাঘাটে অপরিচিত কারো লগে কথা কইতে গেলে বলি, “এই যে ভাই”, পশ্চিমবঙ্গে সেইটা হবে “এই যে দাদা”। এই সম্বোধনের লগে সম্মান জড়িত। ভাই বললে উনারা ছোটভাই বুঝেন।

কলিকাতা

আমি গেছিলাম শান্তিনিকেতন, আমার যমজ বইন মুমুর লগে। ফেরার পথে আমরা কলিকাতা থাকলাম দুই রাইত। বইলা রাখা ভাল আমার নিজের কলিকাতা নিয়া ভাল রকমের ফ্যাসিনেশন আছে। উনাদের ভাষারে আমি স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে মানি না সেইটা ঠিক। কিন্তু উনাদের সাহিত্য প্রচুর পড়াতে জায়গাটা সম্পর্কে আমার বিপুল আগ্রহ তৈরি হইছে। ছোটকালে কেউ হাকলবেরি ফিন পড়লে নিশ্চয়ই তার মিসিসিপি নদী দেখতে ইচ্ছা করবে, ব্যাপারটা তেমন। বরং তারচেয়ে অনেক বেশিই।

কেননা কলিকাতার লোকজন বাংলা বলেন, যদিও অন্যভাবে, কিন্তু ভাষাটা বাংলাই। আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধবদের পূর্বপুরুষেরা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থাইকা আসছেন। আবার হিন্দু বন্ধুদের অনেকের কাকাজ্যাঠারা চইলা গেছেন ওই পাড়ে। পশ্চিমবঙ্গের লগে আমগর সম্পর্ক মোটামুটি গভীর বলা চলে।

প্রকৃতি আর বুশরা আমাদেরে সি অফ করল

বোলপুর স্টেশন থাইকা মুমুর ননদ প্রকৃতি আর তার বান্ধবী বুশরা (দুইজনেই বিশ্বভারতীতে পড়ালেখা করেন) আমাদেরে ট্রেইনে তুইলা দিলেন। আমরা সুন্দরমত লেডিজ কম্পার্টমেন্টে জায়গা পায়া গেলাম।

ট্রেইন ছাড়ার কিছুক্ষণ পরে হলুদ পাঞ্জাবি আর পাগড়ি পরা এক বাউল আইসা একতারা বাজায়া গান শুরু করলেন, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।”

আমি আর মুমু স্বাভাবিকভাবেই সকল ফেরিওয়ালার কাছ থাইকা সব রকমের খাদ্য খাইতে খাইতে ব্যক্তিগত পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়া কথা কইতে কইতে গেলাম।

আমার ফেইসবুক ফ্রেন্ড সুবীর মজুমদার কলিকাতার ছেলে। ফেইসবুক মেসেজে তার সঙ্গে আলাপ হইল। ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা’য় যাবার ইচ্ছা ছিল, সুবীর জানাইল সেইদিন রবিবার মেলার শেষ দিন।

আমি আর মুমু হাওড়া স্টেশন থাইকা বাইর হইয়া প্রিপেইড ট্যাক্সি নিয়া মারকুই’স স্ট্রিটে গেলাম। প্রকৃতি আমাদের জন্য গেস্ট হাউজ বুকিং দিয়া রাখছিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা সেই গেস্ট হাউজ পাইলাম।

মনসুখ গেস্ট হাউজ

গেস্ট হাউজের নাম ‘মনসুখ’ আর ম্যানেজারের চেহারা অবিকল বলিউডের অভিনেতা সৌরভ শুক্লার মতন। মজার ব্যাপার হইল উনার কাউন্টারের পেছনের দেওয়ালে সেই অভিনেতার ইন্টারভিউয়ের পেপার কাটিং পেস্ট করা। ভদ্রলোক সম্ভবত দাড়িটা ইচ্ছা কইরাই সৌরভ শুক্লার মতন কইরা রাখছেন। যারা ‘বরফি’ ছবিটা দেখছেন তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ভুঁড়িওয়ালা পুলিশ অফিসারের কথা—উনিই সৌরভ শুক্লা।

গেস্ট হাউজে জিনিসপত্র রাইখা আমরা তড়িঘড়ি বাইর হইয়া গেলাম। সুবীর আমাকে বুঝায়া দিছিল কোন রুটে আমরা সল্টলেক যাইতে পারব। কিন্তু সেইভাবে যাইতে আমাদের বেশ সময় লাগত, লোকজনরে জিগায়া জিগায়া যাইতে হইত। তাই আমরা একটা ট্যাক্সি নিয়া নিলাম। সল্টলেক পর্যন্ত যাইতে ভাড়া লাগল দুইশ রুপি। সেইদিন রবিবার হইলেও বিকালে জ্যাম থাকার সম্ভাবনা ছিল। আমরা অবশ্য খুব দ্রুতই বইমেলায় পৌঁছাইয়া গেলাম।

কলিকাতার লোকজন সম্পর্কে আমগর যে স্টিরিওটাইপড ধারণা তাতে ধইরা নেওয়া হয় যে দাদারা খুবই হিসাবী। যারা ইউফেমিজম ইউজ করেন না, তারা বলেন, “খেয়ে এসেছেন না গিয়ে খাবেন?”

এইগুলা যে নিতান্ত বাজে কথা তা আমার আগেই মনে হইছিল। কেননা যে মমেনসিঙের মানুষের হসপিটালিটির এত সুনাম, সেই মমেনসিঙের অনেক বন্ধুবান্ধব আমাদের আছিল যাদের বাসায় গেলে তারা ভিতরে ঢুকতেও বলত না, “দাঁড়া, আইতেছি” বইলা স্যান্ডেল পায়ে দিয়া “আম্মা, বাইর হইলাম” ধরনের একটা হাঁক দিয়া বাইর হইয়া আসত, বাসায় ঢুকতেও কইত না।

এমন আত্মীয় আমাদের আছে যাদের বাসায় গিয়া তিন চাইর ঘণ্টা আড্ডা দিয়া আইলেও এক কাপ চা সাধেন না। কাজেই কলিকাতার দাদারাই খালি মক্ষিচুষ আর বাংলাদেশের মানুষ খুব দিলদরিয়া এমন ধারণা অকাট্য মনে করাটা আসলে বোকামিই হবে।

সুবীর বয়সে ছোট বইলা আমাদের উচিৎ চা,কফি, ফিশ ফ্রাই ইত্যাদির দাম দেওয়া — এই যুক্তি না মাইনা সে আতিথেয়তা করল, যা যা খাইলাম কিছুর দাম দিতে দিল না। এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত যাইবার বাসে উঠায়া দিয়া কই নামলে আমরা নিউ মার্কেট হাইটা যাইতে পারব তাও বুঝায়া দিল।

কলিকাতা
কলিকাতা বইমেলার বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন

কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশ অংশটা বেশ বড়, সেইখানে প্রচুর ভিড়ও। আমরা অবশ্য সেইদিকে গেলাম না। বাংলাদেশের কী কী বই কলিকাতায় পাওয়া যাইতেছে সেইটা দেইখা আর কী করব?

আমরা পেঙ্গুইনের স্টলে গেলাম, ডিস্কাউন্টে অনেকগুলা বই কিন্যা ফেললাম। মার্গারিট অ্যাটউডের হ্যাগ-সীড নামে একটা উপন্যাস দেইখা লোভ সামলাইতে পারলাম না। ঢাকার বড়লোকি অনেক দোকানে এই সকল বই পাওয়া যায়, দাম থাকে আকাশে উঠানো। অমিতাভ ঘোষের দ্য শ্যাডো লাইনস  খুব কমন বই, আসল পাইরেটেড সবই ঢাকায় পাওয়া যায়। কিন্তু কলিকাতায় আইসা ঘোষবাবুর একটা বই না কিনাটা অন্যায় হবে বইলা মনে হইল। তাছাড়া আমার নিজের কপিটা কয়েকদিন ধইরা খুইজা পাইতেছিলাম না।

বইমেলায় সুবীর মজুমদারের লগে দেখা হইলো। ফেইসবুকে যুক্ত আছি ছয় বছর ধইরা।

ক্লাসে পড়ানোর সময় মুক্তাদিরের (আমার সহকর্মী) কাছ থাইকা ধার নিয়া পড়াইছি। এই উপন্যাস আমার খুব পছন্দের, আমার পাঠ্য ছিল সময় একবার পড়ছি, পরে একবার মনে হইছিল এই বইটা অনুবাদ করা দরকার। আমার আম্মার মতন যে সকল পাঠক ফিকশন পড়তে পছন্দ করেন কিন্তু ইংরেজি বই পড়ার অভ্যাস নাই উনাদের উপকার হবে। শুধুমাত্র ভাষার দূরত্বের জন্য এত চমৎকার একটা উপন্যাস কেউ পড়তে পারবে না এটা ভাবতেও আমার খারাপ লাগতেছিল। তখন অনুবাদ করার জন্যে আরেকবার পড়ছি (বলা বাহুল্য, সেই অনুবাদ কোনোদিন শেষ হয় নাই, পরে শুনছি সাহিত্য আকাদেমি থাইকা একটা অনুবাদ বাইর হইছে, আম্মার জন্যে সেইটা খুইজা পাইনাই অবশ্য) শেষবার পড়ছি যখন পড়াইতে হইছে তখন।

দ্য শ্যাডো লাইনস-এ কলিকাতার যে বর্ণনা আছে তার সঙ্গে আমার দেখা কিছুতেই মিলবে না। সেইটা সিক্সটিজের কলিকাতা, বাংলাদেশের জন্মের সাত বছর আগে কাশ্মীরের হজরতবাল মসজিদ থাইকা মহানবীর চুল চুরি যাওয়া সংক্রান্ত গুজব ছড়ানোর পরে যে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হইছিল সেই দাঙ্গায় মারা যায় উপন্যাসের নায়ক ত্রিদিব। ত্রিদিবের খালাত ভাইয়ের ছেলের জবানিতে লেখা এই উপন্যাসে ঢাকার অনেক বর্ণনাও আছে, আছে বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী লন্ডন শহরের কিছু ছবিও। কিন্তু কলিকাতার যে প্রাণবন্ত বর্ণনা সেইটা মনে থাকতে বাধ্য।

আমরা কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা থাইকা বাইর হইয়া নিউ মার্কেট এলাকায় ফিরা কস্তুরী নামের রেস্টুরেন্টে খাইতে গেলাম। মুমুর ননদ আমাদেরে পুরা এলাকার ম্যাপ আইকা দিছিল। কোথায় গ্রিন লাইনের কাউন্টার, কোথায় রেস্টুরেন্ট, কোনদিকে গেলে কী পাওয়া যাবে সব। মারকুই’স স্ট্রিটে আমি ফোনে রিচার্জ করলাম মোড়ে বসা এক অবাঙালি যুবকের কাছ থাইকা। ছেলের নাম নাসার।

সে এতই মৃদুভাষী যে নাম বলার সময় আমি শুনলাম আসিফ। ইন্টারনেটের প্যাকেজ চালু করতে না পাইরা তার সাহায্য নিতে গেলে সে আমার ফোন থাইকা নিজের ফেইসবুকের আইডি বাইর কইরা দেখাইল। সেইখানে দেখলাম তার নাম আসলে নাসার, ডাকনাম নূর। তার কোন এক বন্ধু মক্কায় চাকরি করে, সে নিজের ফোনে দেখাইল সেই বন্ধু ভিডিও কল দিছে, সেই ছেলে যে হোটেলে কাজ করে তার জালনা দিয়া কাবা ঘর দেখা যায়। দেখানোর সময় সে যখন বলল মক্কা, শুনতে পাইলাম তার উচ্চারণটা ‘মেক্কা’ আর ‘ম্যাক্কা’র মাঝামাঝি। সে নিজেও সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের কোনো জায়গায় কাজ করত।

কলিকাতা
ঊর্দুভাষী যুবক নাসারের সঙ্গে সেলফি তুললাম, সে ভীষণ অবাক হইল

পরে যখন কখনো সে ফেইসবুকের ইনবক্সে নক করল তখন বুঝলাম যে সে বাংলায় কথা কইতেছে না, হিন্দি বা উর্দুতে বলতেছে। আমারে জিগাইল আমি হিন্দি পারি কিনা। আমি ইংরেজিতে টাইপ কইরা কইছি বুঝি কিন্তু কইতে পারি না। হে কইল হে বাংলা কইতে পারে, পড়তে পারে না।

আগেরবার শিলং গিয়া দেখছিলাম সেইখানে বেশি টুরিস্ট, কারণ দার্জিলিঙে বাংলা বাধ্যতামূলক করা হইতেছে বইলা গণ্ডগোল তাই দার্জিলিঙের টুরিস্টরা সব শিলং চইলা গেছে। এইবারে দেখলাম খোদ কলকাতায় এক ছেলে বাংলা পড়তে পারে না। হের লগে খুব বেশি আলাপ হয় নাই। হইলে জিগাইতাম ইশকুলে কোন জায়গায় পড়ছে। এমন অবশ্য হইতে পারে যে এই ছেলে আগে অন্য কোনো স্টেটে থাকত, এখন ব্যবসায়িক কারণে কলিকাতায় আইছে।

বাসার বাইরে গেলে আমি সাধারণত রাতে ঘুমাইতে পারি না খুব একটা। না ধোয়া কাপড়ের জন্যেই হোক, কিংবা হোটেলের বিছানা আর বালিশের কারণেই হোক, রাইতে আমার ঘুম একেবারেই হইল না। ভোরের দিকে অল্প একটু ঘুমায়া নিলাম।

কলিকাতা
এই বাড়িগুলা দেখলেই আমার মনে হয়, এখানে থাকতে কেমন লাগবে?

সকাল সকাল রুম থাইকা বাইর হইতে চাইলাম, যেহেতু একদিনের বেশি কলিকাতায় থাকা হবে না, আশেপাশের এলাকাটা যতখানি সম্ভব দেইখা নেওয়ার জন্য। মুমু কইল সে ঘুমাইতে চায়। অগত্যা আমি একাই কলিকাতার রাস্তায় বাইর হইলাম।

আমাদের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডক্টর বিজয় ভূষণ দাস স্যার আমাকে কিছু টাকা দিয়ে দিছিলেন কয়েকটা ওষুধ কিনার জন্যে। উনি পিয়ারলেস হাসপাতালে চিকিৎসা করান। সেইখানের ডাক্তারদের দেওয়া ওষুধপত্র অনেক সময়ই বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। আমি মির্জা গালিব স্ট্রিট আর মারকুই’স স্ট্রিটের ক্রস রোড থাইকা একটা রিকশা নিলাম নিউ মার্কেটে যাওয়ার জন্য। আগে খালি সিনেমায় দেখছি, সত্যিকারে মানুষ টানা রিকশায় চড়তে কী রকম জানি ভয় ভয় লাগল। আমি উঠার সময় সশব্দে কইলাম, “বিসমিল্লাহ”। তখন রিকশাচালক বললেন, “‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’, পুরা পড়ো, আধা মাত পড়ো।” যে কোন কঠিন কাজের আগে আমার সশব্দে বিসমিল্লাহ বলা নিয়া নানান ব্যঙ্গ বিদ্রুপ সহ্য করতে হইছে আমারে। এইটা নিয়া অন্যসময় বলব। এখন মুহাম্মদ জাফরের কথা বলি।

মানুষে টানা রিকশা নিয়া একটা কথা শুনছি, সত্যাসত্য জানি না — টুরিস্টদের দেখানের জন্য নাকি অল্প কয়টা টানা রিকশা নিউ মার্কেট এলাকায় চালানো হয়। এমনিতে কলিকাতার আর কোথাও মানুষটানা রিকশা চলে না। হইতেও পারে, নিউ মার্কেট এলাকায় কিছু ক্যামেরা হাতে সাদা চামড়ার মানুষরে দেখছি আগ্রহ নিয়া সেইসব রিকশায় ঘুরতেছে আর খুচখাচ ছবি তুলতেছে।

সত্যজিৎ রায়ের শেষ ছবি আগন্তুক-এ উৎপল দত্ত ধিক্কারের সুরে বলতেছিলেন যে বহুদিন প্রবাসী থাইকা দেশে ফিরার পর তিনি স্বদেশের অগ্রগতি দেইখা মুগ্ধ — কলকাতার রাস্তায়  চলতেছে মানুষটানা রিকশা। ঘোড়ার কাজ মানুষকে দিয়া করানোর অমানবিকতায় রাগে দুঃখে অন্ধ হওয়া মানবিক মানুষ সকলে হইতে পারে না — একজন শিল্পীর পক্ষেই অত মহৎ হওয়া সম্ভব — এমন একটা মেসেজ কি আমরা পাইতে পারি সত্যজিতের ছবির এই দৃশ্য থাইকা? এইটা নিয়া বিস্তর বাহাস চলতে পারে। সত্যজিৎ রায় আসলে একজন এলিটিস্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা — এমন কথা আমি অনেক বোদ্ধারে কইতে শুনছি।

আমি এইরকম টানা রিকশার চালকরে নিয়া বানানো একটা ছবি দেখছিলাম স্কুলজীবনে। ছবির নাম সিটি অফ জয়। দোমিনিক লাপিয়েরের লেখা কলিকাতাকেন্দ্রিক উপন্যাস ভিত্তি কইরা বানানো হলিউডি ছবি। রিকশা চালকের ভূমিকায় ছিলেন ওম পুরি আর ডাক্তারের ভূমিকায় প্যাট্রিক সোয়েজি। শাবানা আজমিও ছিলেন সেই ছবিতে। আর বইটাও সম্ভবত আমার পড়া প্রথম ইউরোপীয় উপন্যাস। ইশকুল কলেজে পড়ার সময় আমাদের দৌড় তো কলিকাতার উপন্যাস পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বদৌলতে আমরা কিছু বিশ্বসাহিত্য পড়ার সুযোগ পাইতাম। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়ায়া মানুষরে আলোকিত করার হাস্যকর ধারণার সঙ্গে একমত না হই

রিকশাচালক মুহাম্মদ জাফর আর আমি, মনসুখ গেস্ট হাউজের সামনে

য়াও, ইশকুলের পোলাপানরে সিলেবাস মাফিক স্পুন ফিডিং সিস্টেমে সাহিত্য পড়ানের মেথডের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ কইরাও আমি কিছু কিছু বই পড়তে পারার জন্য এই সংস্থার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অবশ্য সিটি অফ জয় এর লেখকের উপরে খুব ক্ষিপ্ত। ইউরোপের এক জায়গায় তিনি এক সাদা চামড়া মহিলার আক্রমণের শিকার হইছিলেন। মহিলা দোমিনিক লাপিয়েরের বইয়ের উল্লেখ কইরা বলতেছিলেন, তোমাদের দেশে রাস্তায় বাচ্চারা না খাইতে পাইয়া মারা যায়, মাদার তেরেসা সেইখানে মানুষের সেবায় জীবন উৎসর্গ করছেন আর তোমরা এইখানে আইসা বেড়াইতেছ আর দামি ওয়াইন খাইতেছ, তোমাদের লজ্জা করে না?

সুনীল বলতেছিলেন, এই লাপিয়ের নামের লোকের মতন কিছু ব্যক্তি সব সময়ই ভারতের দারিদ্র দেখায়া এক পদের ইম্পেরিয়ালিস্ট আনন্দ পায় আর কিছু ম্যাসোকিস্ট ইউরোপিয়ান সেইগুলা পইড়া খুব আহা উহু করে।

যেইটা বলতেছিলাম, মুহাম্মদ জাফরের বাড়ি পাটনা। সেইখানে তার স্ত্রী আছে, ছেলেরা বড় হইয়া গেছে, বিয়া কইরা ‘জুদা র‍্যাহতে হ্যাঁয়’। কলিকাতায় রিকশা চালায়া তার যে রোজগার হয় তা দিয়া ‘বিয়ি’সমেত এই শহরে থাকা সম্ভব না। তার ভাষাটা সম্ভবত হিন্দি, রবীন্দ্রনাথের গল্পে যেইটাকে বলা হয় ‘হিন্দুস্তানি’। সেই আমলের বাংলা সাহিত্যে এক পদের নাক উঁচা জমিদারি প্রবণতা ছিল। হিন্দুস্তানি ভাষাকে মুটেমজুরের ভাষা হিসাবে দেখানের চেষ্টা ছিল। কিংবা হয়ত আসলেই হিন্দিভাষী বলতে বাঙালিরা খালি খাইটা খাওয়া শ্রেণির লোকেদেরেই বুঝত। অমিতাভ ঘোষের সী অফ পপিজেও অবশ্য আছে, নীলরতন হালদার নামের যে জমিদার সম্পত্তি নিলাম হইয়া জমিদারি হারায়া সাজা-এ-কালাপানি পাইয়া মরিশাসে যাইতে বাধ্য হইতেছে সে ইংরেজিটা খুব ভাল জানলেও ভোজপুরী ভালমত শিখে নাই। ভোজপুরী তার কাছে খুব মিষ্টি ভাষা মনে হইলেও তার বাপের কড়া নিষেধ ছিল এই ভাষা যেন ছেলে না শিখে।

আমি আর মুমু

কলিকাতা যায়া আমার মনে হইল হিন্দি ভাষা যেন বাংলার এই পাপের শাস্তি দিতেছে। ইচ্ছামতন শোধ তুলতেছে বাংলার এই দেমাগের। কলিকাতায় আর বেশি মানুষ হিন্দি বলে না। বাঙালিও এমন হীনম্মন্য জাতি যে যারা হিন্দি পারে তাদেরেই বেশি স্মার্ট মনে করতেছে ইদানীং। এই বিষয়ে একটা বিতর্ক হইছে কলিকাতায়। বাংলা ভাষার পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে কিনা এই টপিকে। সেইখানে বেশ কয়েকজন জ্ঞানীগুণী মানুষ বলতেছিলেন কীভাবে বাংলা ভাষা বিকৃত হইয়া যাইতেছে, হিন্দি সিনট্যাক্সে বলা হয় কেননা মানুষ ইদানিং হিন্দিতেই ভাবে, আর কলিকাতা শহরে কোনো বনেদি রেস্টুরেন্টে ওয়েটারেরা ইংরেজিতেই কথা বলে কাস্টমার চাইলেও বাংলা দিয়া চালাইতে পারে না ইত্যাদি বিভিন্ন রাগ ক্ষোভের কথা। ফেইসবুকে অনেকে এই বিতর্কের ভিডিও শেয়ার দিছেন বইলা আমার চক্ষুগোচর হইছিল।

আমি একটু বিরক্ত হইছি বাংলাদেশের মানুষের এই ভিডিও শেয়ার করার হিড়িক দেইখা। বিতর্কের বিষয় হওয়া উচিৎ ছিল “পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে”। বাংলাদেশে বাংলা ভাষার পিঠ কোথাওই ঠেইকা যায় নাই।

পশ্চিমবঙ্গে বাংলার পিঠ দেওয়ালে ঠেকার ব্যাপারটা যে ঠিক তা আমি নিজেই দেখছি। কাজেই উনাদের রাগ ক্ষোভরে আমি অমূলক বলতেছি না।

নিউ মার্কেট থাইকা ফেরার সময় রিকশা চালক মুহাম্মদ জাফরকে নিয়া চা বিস্কুট খায়া ফিরলাম । সে আমার কাছ থাইকা অবিশ্বাস্য রকমের ভাড়া আদায় করল এবং জানতে চাইল আমি সেইখানে কার লগে গেছি । পরিবারের তথ্য পায়া উপদেশ দিল,“শোহর কে সাথ মিল জুলকে রাহোগে তো অর ভি বাচ্চে প্যায়দা হোঙ্গে।”

আমি কইলাম, আমার আর বাচ্চা দরকার নাই।

সে কইল, “দো বাচ্চে কাফি নেহি হ্যাঁয়”।

কলিকাতা
পার্কস্ট্রিটের মাসালা পনির আর রুমালি রোটি

গেস্টহাউজে ফিরার পর আমি আর মুমু আবার বাইর হইলাম গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে। পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথে খাবারের গাড়ি ছিল অনেকগুলা। সেইখান থাইকা রুমালি রুটি আর মাসালা পনির খায়া ব্রেকফাস্ট সাইরা নিছিলাম। কই থাইকা মেট্রোরেলে চড়তে হবে তা খুইজা পাইতেছিলাম না আমরা। তখন গর্গকে ফোন করল মুমু। সে বলল রাস্তায় কাউরে ফোনটা ধরায়া দিতে। তারে কই যাইতে হবে বইলা দিলে সেই আমাদেরে দেখায়া দিতে পারবে।

গর্গের বাড়ির এলাকার নাম ‘চেতলা’। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা অন্য কোন কলিকাতাবাসী লেখকের লেখায় এই জায়গার নাম আগে পড়ছি। বানান দেইখা ভাবছি উচ্চারণ হয়ত তেতলার সঙ্গে রাইম করে। আসলে উচ্চারণ হইল, চেত-লা। আমরা কেউ রাইগা গেলে যেভাবে বলি, “চেতলা ক্যান?”

চেতলার গর্গ বেশ চেতল এবং ফোনে কথা কইতে রাজি হইল না কারণ আমরা যে ছেলেরে ফোন ধরায় দিছিলাম সে হিন্দিভাষী, বাংলা জানে না। গর্গ হিন্দি ভালই জানে কিন্তু কলিকাতায় বইসা হিন্দি সে বলবে না, এইটা তার পলিটিক্যাল স্ট্যান্স। সে তৃণমূল কংগ্রেসের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক, মমতাদিদির ভক্ত। আমরা নাইন/টেনে পড়া একটা বাচ্চা ছেলের দলরে পাইলাম, সেইখানে মাত্র একজন বাংলা জানে। তার কাছে ফোন দেওয়ার পরে দেখা গেল যে সে তোতলা। সে বেচারা তোতলায়াই আমাদেরে সাহায্য করল। টিউব স্টেশনে ঢোকার রাস্তা দেখায়া দিল।

অমিতাভ ঘোষের দ্য শ্যাডো লাইনস উপন্যাসের ন্যারেটর একবার মাটির নিচের একটা ঘরে ঢুইকা রোমাঞ্চিত হইবার অনুভূতি বর্ণনা করতেছিল এক জায়গায়। লন্ডনের মেট্রোরেলে জার্নি নিয়াও বলছিল। সেই সময়ে মনে হয় কলিকাতায় মেট্রো ছিল না।

আমি মনে করার চেষ্টা কইরা দেখলাম আমি আগে কখনো আন্ডারগ্রাউন্ড গেছি কিনা। ময়মনসিংহ শহরের প্রেসক্লাব কমপ্লেক্সে একটা মোবাইলের মার্কেট আছে, দোজখের মতন গরম, সেইখানে একবার ঢুকছিলাম। আর কারওয়ান বাজারের আন্ডারপাস দিয়া দুই একবার যাতায়াত করছি। কিন্তু পাতাল রেলে চড়ার অভিজ্ঞতা আমার সেইটাই প্রথম। আমার বাচ্চাদের জন্যে অবশ্য একটু মন খারাপ হইছে। ওরা সাধারণ ট্রেনেও চড়ে নাই। ইদানীং বাসেই যাতায়াত করা হয়।

আমরা যে স্টেশনে নামলাম সেইটার নাম মনে নাই। নাইমা আবার টেম্পো ধরনের একটা যানে কইরা আরেকটু যাইতে হইল। সেইখানে নাইমা একটা ব্রিজ ধইরা নাইমা রিকশা কইরা গর্গের বাড়ি পৌঁছাইলাম।

কলিকাতা
গর্গর বাসার ব্যালকনি থাইকা দেখা যায় পুরানা আমলের এক বাড়ি

 

কলিকাতা
গর্গর বাড়ির এলাকার নাম চেতলা, সে বলতেছিল “এটা একটা পাড়া, বুঝেছ তো?”

 

কলিকাতা
চেতলা জায়গাটা যে কোনো মফস্বলের মতন, শান্তি শান্তি লাগে

 

বুঝা গেল সেইটা আসলে কলিকাতার মূল শহর না, শহরতলী ধরনের কোনো জায়গা। সেইখান থাইকা খুব কাছেই হইল কালীঘাট। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের দূরবীণ খূব জনপ্রিয় উপন্যাস বাংলাদেশে। আমরাও ইস্কুলে থাকতে পড়ছি। সেইখানে নায়কের নাম ধ্রুব, তার পূর্বপুরুষেরা আসছিলেন বাংলাদেশ থাইকা। কালীঘাটে ধ্রুবর পিতামহ হেমকান্তের দ্বিতীয় স্ত্রী রঙ্গময়ী থাকতেন, তাকে ধ্রুবর বাপ মনুপিসি বইলা ডাকতেন।

কালীঘাটে আমি মুমু আর গর্গ

মজার ব্যাপার হইল, হেমকান্তের বাড়ি ছিল ময়মনসিংহ শহরে।

কালীঘাটে গিয়া আমরা একটা বাজার দেখলাম, বাজারের নাম রিফিউজি মার্কেট, বাংলায় লেখা ‘সর্বহারা বাজার’। দেইখা আমার খুব মনখারাপ হইছে। বাংলাদেশের মানুষেরা এইখানে আইসা বসতি পাতছে, মূল কলিকাতার লোকেরা তাদেরে রিফিউজি বইলা নাক সিটকাইছে, নানাভাবে শেইমিং করছে, বাঙাল বইলা গাইল দিছে। অথচ এইখানে আইসা পড়ার সিদ্ধান্তটা হেগর নিজের আছিল না।

কালীঘাট মন্দিরে যাইবার সময় আমরা সর্বহারা বাজারে অনেক দোকান দেখলাম যেখানে লেখা ‘ইসলামপুরের কাঁসার বাসন এবং তৈজসপত্র পাওয়া যায়’। গর্গ আমারে কইল, “এখানে তোমার দেশের মানুষ পাবে।”

কলিকাতা
ঢাকার জিনিস পত্রের দোকান

আমার মনটা আরো খারাপ হইয়া গেল। এই মানুষগুলা কত যুগ যুগ ধইরা এই দেশে থাকতেছে, কিন্তু এখনো এরা ভারতীয় হইতে পারেন নাই। বাঙ্গালই রইয়া গেছেন। উনাদের মূল পরিচয় তারা বাংলাদেশের রিফিউজি। যদিও গর্গ খুব স্বাভাবিকভাবেই এই কথা বলছে, কোন ব্যাঙ্গ কিংবা প্যাট্রোনাইজিং সহানুভূতি আছিল না। তবু আমার মনে পড়ছে সুনীলের অনেক আত্মজৈবনিক উপন্যাসের কথা। নীললোহিত ছদ্মনামে লেখা কোনো এক উপন্যাসেও তিনি বলছেন, “আমি রিফিউজি বাড়ির ছেলে, যে যা খেতে দেয় সোনামুখ করে খেয়ে নিই।”

কলিকাতা
কালীঘাট পালায়া বিয়া করার লাইগ্যা প্রসিদ্ধ, তাই বিবাহের সরঞ্জাম পাওয়া যায় দোকানগুলিতে

কালীঘাটের মন্দিরের ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ। তাই এমনেই ঘুইরা আসলাম। জায়গায় জায়গায় পাঁঠা বলি হইতেছে। কোরবানি ঈদের সময় আমাদের দেশের অলিগলিগুলার যেমন অবস্থা হয়, মন্দিরের কিছু অংশ সেইরকম, রক্ত, পানি, কাদা মিল্যা এক বিতিকিচ্ছিরি দশা। আমি সেইখানের দোকান থাইকা কিছু স্যুভেনির কিনতে চাইলাম। গর্গ বলল সেই জিনিসগুলা আসলে চীনে তৈরি, কালীঘাট থাইকা কিনার কিছু নাই। আসলেই সেগুলা আমাদের স্বদেশী বাজারেও পাওয়া যায়। কিন্তু কালীঘাট মন্দির ভক্তিপরায়ণ হিন্দুর কাছে অনেক জরুরি ব্যাপার। সৌদি আরব থাইকা মানুষ টার্কিতে তৈরি জায়নামাজ কিন্যা আনে না?

কলিকাতা
নাপিতের দোকানের মজার ব্যানার, এইটাও কালিঘাটে যাইবার পথে

কালীঘাটের একটা মন্দিরে গিয়া খুব ভাল লাগছে। বেহুলা লখিন্দরের মন্দির সেইটা। মহিলারা সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় হওয়ার জন্যে পূজা দিতেছেন, মানত করতেছেন। দুপুরে গর্গ আমাদেরে খাওয়াইল রাজলক্ষী নামের এক রেস্টুরেন্টে। দেইখাই আমার মনে পড়ছে নায়করাজ রাজ্জাকের কথা, উত্তরায় উনার একটা বিল্ডিং আছে সম্ভবত এই নামে। এই রেস্টুরেন্টের মালিক শরৎচন্দ্রের ভক্ত হইয়া থাকতে পারেন। খাবার অত্যন্ত উপাদেয় ছিল। মচমচা কইরা ভাজা আলু আমরা কয়েকবার চায়া নিলাম। আমাদের এখানে হিন্দু রেস্টুরেন্টে শুধু নিরামিষ পাওয়া যায়, সেইখানে তা না, মাছমাংস সবই পাওয়া যায়। কালীভক্ত বা শাক্তরা নিরামিষাশী হন না।

কলিকাতা
কেওড়াতলার শ্মশানে যাইবার রাস্তা

কেওড়াতলা শ্মশানে গিয়া দেখলাম সেইটা বন্ধ। রবিবারে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালসহ প্রায় সব টুরিস্ট আকর্ষণের কেন্দ্রগুলা খোলা থাকে বইলা সোমবারে সেগুলা বন্ধ। অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির সমাধিস্তম্ভ আছে সেইখানে, তাই ঢুকতে না পাইরা হতাশ হইলাম।

আদিগঙ্গার জীর্ণ শীর্ণ দূষিত শাখাটা দেইখা যারপরনাই কষ্ট পাইছি। যে পতিতপাবনী গঙ্গা এত গুরুত্বপূর্ণ তার আদি শাখাটারে মানুষ এমন নষ্ট কইরা ফেলছে কেমনে?

কলিকাতা
আদিগঙ্গায় ময়লা না ফেলার অনুরোধ। কেউ পাত্তা দেয় বইলা মনে হইল না

 

কলিকাতা
আদিগঙ্গার করুণ দশা

 

বিকালের মধ্যে নিউ মার্কেট এলাকায় ফিরলাম, সেইদিন আর কলেজ স্ট্রিট যাইবার মতন এনার্জি ছিল না। ভাবলাম পরের বার কলিকাতা গেলে অবশ্যই যাব। সেই সন্ধ্যায় নিউ মার্কেট থাইকা কিছু জিনিস কিন্যা রাস্তায় চাউমিন আর মোমো খাইয়া আমরা ডিনার সাইরা ফেললাম। আগের রাতে যে রেস্টুরেন্টে খাইছিলাম সেইখানের ওয়েটার আমাদেরে একটু অপমান করার চেষ্টা করছিল শুধু শাকসবজি দিয়া খাইছি দেইখা। তারে টিপস দিয়া বড়লোকি দেখাইতে হইছে। খাবার সেইটাও বেশ ভালই ছিল, কিন্তু ৭৫ রুপির চাউমিন পরিমাণে এত বেশি যে আমাদের দুইজনেরই পেট ভইরা গেছিল।

স্যারের দুইটা ওষুধ সকালে যে দোকানে পাইছিলাম সেই দোকান থাইকা ফোন করল তিন নম্বর ওষুধটা নিতে যাইবার জন্যে। কিন্তু আমি আর সেইটা খুইজা পাইলাম না।

কলিকাতা
আদিগঙ্গার সামনে বিভিন্ন প্রতিমা

মারকুইস স্ট্রিটে ফেরার পরে রিকশা চালক মুহাম্মদ জাফরের লগে দেখা। সে কইল সে নাকি আমারে খুঁজতেছে। কী কারণে খুঁজতেছে জিগাইলে সে আমারে চা খাওয়াইল আর বাচ্চাকাচ্চা পয়দা করা সংক্রান্ত আরো কিছু উপদেশ দিতে চাইল। আমি সেইগুলা না শুইনা কইলাম, “আমার দেরি হইয়া যাইতেছে, কালকে সকালে চইলা যাব। দোয়া কইরেন, আল্লাহ হাফেজ।”

পড়ুন: উম্মে ফারহানার লেখা ‘শান্তিনিকেতনের পথে পথে’

পরদিন সকালে বাসে উইঠা বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা করলাম। সেইদিন ছিল ফেব্রুয়ারির তের তারিখ, বাংলাদেশের হিসাবে পহেলা ফাল্গুন। বসন্তের প্রথম দিনটা বাসেই কাইটা গেল। ঢাকা আইসা পৌঁছাইলাম রাইত দশটায়। তারপরে প্রতিজ্ঞা করলাম, আর যদি কোনোদিন কলিকাতা যাই, তাইলে ফ্লাইটে যামু। আর ফ্লাইটে যাইবার সামর্থ না হইলে যামুই না।

কভার. বেহুলা লখিন্দরের মূর্তি সিন্দুরে ঢাইকা গেছে।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here