page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

“দুটি কথা ক্রমাগত সকলে বলে। প্রথমটি ইসলাম, আরেকটা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ।” — আহমদ ছফা

আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকারটি ১৯৯৫ সালে  ‘দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা’য়  ছাপা হয়েছিল। সাক্ষাৎকার গ্রহণ:  ব্রাত্য রাইসু


ব্রাত্য রাইসু

বর্তমান যে রাজনৈতিক অবস্থা, আপনারা যারা লেখক-বুদ্ধিজীবী আছেন, আপনাদের করণীয় কী?

আহমদ ছফা

বুদ্ধিজীবীদের কথা আমি বলতে পারবো না, আমি আমার কথা বলি। একটা বিষয় নিশ্চিত যে, আমাদের জনগণ আগের চাইতে অনেক সচেতন হয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগে এ ধরনের ডেডলক তৈরি হলে রাস্তায় রাস্তায় পাঁচ হাজার বঙ্গবন্ধুর শহীদের লাশ পেয়ে যেতাম, পাঁচ হাজার শহীদ জিয়ার সৈনিকের লাশ পেয়ে যেতাম।

এখন রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল করছে কিন্তু মানুষকে টানতে পারছে না। অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের সীমাবদ্ধতা বোঝে। কিন্তু দেশে তো একটা রাজনীতি দরকার। এখন রাজনীতিক প্রক্রিয়াটাই একটা অচল অবস্থার মধ্যে এসে গেছে। স্বামী-স্ত্রী দু’জন থাকে, তারা ঝগড়াও করে, এটা স্বাস্থ্যের লক্ষণ। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে যখন কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না, একজন আরেকজনের প্রতি উদাসীন হয়ে যায় সেটা হচ্ছে একটা অ্যালার্মিং ব্যাপার।

রাইসু

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও কি তাই নাকি?

ছফা

এটা তো রাজতন্ত্র না। সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর কথা বলার অধিকার আছে। তাদের ভোটে দাঁড়াবার অধিকার আছে। দেশ চালাবারও অধিকার আছে। এখন যে সরকার আছে সে সরকারটি তো চিরন্তন কোনো ব্যাপার না। যখন লোকে চাইবে না, তাদের চলে যেতে হবে। এবং তাদের প্রতি ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের একটা শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত। তারা যদি মাইনরিটিও হয়। কারণ শ্রদ্ধা এবং আস্থাবোধ—এটি হচ্ছে গণতন্ত্রের অক্সিজেন।

আমি ক্ষমতা চালাচ্ছি বটে কিন্তু যে বাইরে আছে তার মতামতের মূল্য আমি দেবো। যেহেতু ওদের না দিয়ে জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে, আমার মতামতের মূল্য দিয়েছে। অথচ সরকারও বুঝতে রাজি না অন্যের মতামতের মূল্য দেবে কেন।

রাইসু

সরকার তো খালি ‘আপোসহীনতা’ বলে।

sofa-razzak

প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের গুলশানের বাসায় আহমদ ছফা। ছবি. ব্রাত্য রাইসু ১৯৯৫

ছফা

বিরোধীদলগুলোও সেটা বলছে, বলছে সরকার না তাড়িয়ে থামবে না। অর্থাৎ রাজনীতি মানে ক্ষমতা দখল করার একটা অসুখ। এখন বাংলাদেশের যে টোটাল অবস্থা তার ভিত্তিতে আমি মনে করছি খালেদা এবং হাসিনা ইলেকশান করতে বাধ্য হবেন। কীভাবে কোন টার্মে হবে তা আমরা জানি না। ইলেকশান করাটা তাদের নিয়তি। কারণ আমরা যে সমস্ত দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল তারা চাইছে এরা ইলেকশান করুক।

রাইসু

কেন চাচ্ছে তারা?

ছফা

আগে তারা ক্যু চাইতো। এখন যেহেতু কম্যুনিস্ট-উত্তর অবস্থায় সামরিক বাহিনী খুব মাইনর শক্তিতে পরিণত হয়ে গেছে এখন তারা ডেমোক্রেসি চায়।

রাইসু

তো সেক্ষেত্রে বাইরের দেশগুলি তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইলেই তো আর এত সমস্যা হয় না।

ছফা

প্রশ্নটা হচ্ছে, তাদের চাওয়ার তো একটা তরিকা আছে। সেই তরিকায় সমস্ত কিছু খাপ খেতে হবে। এখন তাদেরকে ইলেকশান করতে হবে। কীভাবে করবে সেটা আমার জানা নেই। ইলেকশান না করার মতো পরিস্থিতি যদি তারা সৃষ্টি করে তবে তারা রাজনৈতিকভাবে এতিম হয়ে যাবে, দেউলিয়া হয়ে যাবে। তাদের সাপোর্ট বেজ নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ এখন দেশের সচেতন মানুষদের মধ্যে যে পলিটিক্স চলে এসেছে, তাতে একটা প্রশ্ন অব্শ্যই আসবে: এই রাজনীতির আমাদের প্রয়োজন কী, এই রাজনীতি চলবে কিনা।

‘সংবাদ’ আজকে লিখেছে দেশে এখন শক্তি তিনটা—সরকার, বিরোধী দল এবং জনগণ। এই রাজনীতিটাকে মানুষ মনে মনে নিগেট করে ফেলেছে। এই রাজনীতির কাছে তারা কিছু প্রত্যাশা আর করছে না। কিন্তু এরপরও তো একটা প্রত্যাশা থাকে। দেশে বিকল্প রাজনীতি নেই। সামরিক সরকার কিংবা প্রফেসর ইউনূসকে নিয়ে কেয়ারটেকার সরকারের কথা হচ্ছে। কিন্তু এরা যতোই স্বৈরাচারী হোন, হাসিনা-খালেদা, আমি তাদের ওপরই নির্ভর করবো। একটা সামরিক সরকার বা তথাকথিত এনজিওদের সরকারের ওপর আমি নির্ভর করতে পারবো না। বর্তমান যে রাজনীতিক নেতানেত্রী আছেন বরং এদের ওপর নির্ভর করতে চেষ্টা করবো।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি আওয়ামী লীগ যদি সরাসরি গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতো তাহলে তারা জনগণের ভেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে পার্লামেন্টে চলে আসতে পারতো। তাদেরকে কে বুদ্ধি দিলো যে কেয়ারটেকার গভমেন্ট করতে! আইডিয়াটা জামাতের। আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতের আন্দোলনে গেছে কিন্তু নিজের রাজনীতিটাকে বিকশিত করার জন্য কোনো কিছু করে নি।

পলিটিক্যালি তার ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি। এবং দেশের মধ্যে একমাত্র পলিটিক্যাল পার্টি আওয়ামী লীগ। আমাদের একটা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া থেকে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে। এবং আওয়ামী লীগ যদি টোটালি পলিটিক্যালি বিহেভ করতো অন্য পার্টিগুলো পলিটিক্যালি বিহেভ করতে বাধ্য হতো। কিন্তু আওয়ামী লীগ এমন একটা পজিশানে পড়েছে তার ডান পাশে জামাত বাঁ পাশে জাতীয় পার্টি। এ দুটি পার্টি রাইটিস্ট।

জামাত হচ্ছে এক্সট্রিম রাইটিস্ট, জাতীয় পার্টি হচ্ছে সেন্ট্রিস্ট রাইটিস্ট। এবং বিএনপি তো রাইটিস্ট পার্টিই। এখন দেশের পলিটিক্সটাকে সার্বিকভাবে একটি সাম্প্রদায়িক খাতে তারা নিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের ভুলের জন্যে সাম্প্রদায়িক খাতে চলে গেছে।

আওয়ামী লীগের একটি জাতীয় চরিত্র ছিল। একটি গণতান্ত্রিক চরিত্র ছিল। একটা ফ্যাসীবাদী চরিত্র ছিল। এবং তার একটি ইসলামী পরিচয়ও ছিল। জামাত এবং জাতীয় পার্টির সঙ্গে চলতে গিয়ে আওয়ামী লীগকে দেখাতে হচ্ছে সে ইসলাম মানে। এবং এগুলো করতে গিয়ে রাজনীতির যে খাতটা ছিলো একেবারে রাইটিস্ট কোটে চলে গেছে। এ কথাটি কেউ বলছে না। এটা খুব বেদনার কথা।

বেদনার কথা এজন্য যে আগামীকাল যে রাইটিস্ট একটিভিস্ট জন্মাবে এদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী কিংবা সেক্যুলার পলিটিক্স তৈরি হতে পারে এটা খুব দুরাশার ব্যাপার হয়ে গেছে। এবং আওয়ামী লীগ যদি ইলেকশানে জিতেও—কেউ যেহেতু অর্ধেকের বেশি মেজরিটি পাবে না—তখন তাকে যদি জাতীয় পার্টি কিংবা জামাতের সঙ্গে কোয়ালিশন করতে হয় তাহলে জিতেও তার লাভ নেই।

রাইসু

তার মানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে কোনো লাভ হচ্ছে না?

ছফা

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চেয়ে যে জিনিসটা বড়, কেউ নির্বাচনে কারচুপি করবে না, সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করবে না সেটা। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আওয়ামী লীগকে কোনো হেল্প করবে না। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা এসেও যদি ক্ষমতা দখল করে যারা রিগিং করবার তারা করবেই। যারা জোর চালাবার তারা চালাবেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছে, কিন্তু মাসল শক্তির অপব্যবহার এবং কালো টাকার অপব্যবহার সম্পর্কে তো কেউ কোনো কথা বলছে না। এখন যে অবস্থাটা এসেছে, সকলেই একটা প্রশ্ন করছে যে এই পলিটিক্যাল বিহেভিয়র চলতে পারে কিনা।

রাইসু

আচ্ছা পলিটিক্যাল পার্টির ক্ষেত্রে আপোসহীনতা জিনিসটা চলে কিনা?

ছফা

sofa-raisu-1

হবিগঞ্জ সফর থেকে ফেরার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক দিনের যাত্রাবিরতি, ব্রাত্য রাইসুর সঙ্গে আহমদ ছফা। ছবি. ইকবাল খান চৌধুরী ১৯৯৫।

আমি মনে করি, বিশেষ বিশেষ মুহূর্ত ছাড়া সব পলিটিক্সই আপোস এবং সমঝোতার ব্যাপার। পলিটিকস মানেই সব সময় আপোস। সব সময় সমঝোতা করা। এমনকী যারা খুব লড়াকু পার্টি, এমনকী আমাদের বাংলাদেশ মুভমেন্টের সময় যুদ্ধের আগের দিন পর্যন্ত আপোসের কথা বলতে হয়েছে। যে একটা সমাধান বেরিয়ে আসে কিনা। ইয়াহিয়া বলেছেন শেখ মুজিব আলোচনা করেছেন। কিন্তু ইয়াহিয়া তলায় তলায় সৈন্য ভর্তি করে এনে ক্র্যাক ডাউন করেছে। এটা খুব আনফরচুনেট ব্যাপার।

আমি খুব ছোট মানুষ, আমার বড় কথা বলা ঠিক হবে না। যারা খেলার বাইরে থাকে তারা তো গোল দিতে পারে না। পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর নিজেদের ভেতরের যে একটা বোঝাপড়া সেটার সম্পর্কে বাইরের লোকের কোনো ধারণা নেই। যেটায় ভালো হবে মনে হয় সেটা আমরা চাপিয়ে দেই। বলি যে খালেদা-হাসিনা আপোস করুক। একটা আইডিয়াল সিচ্যুয়েশন সবাই কামনা করে, কিন্তু আইডিয়েল সিচ্যুয়েশন কখনো থাকে না।

এখন পরিস্থিতির মূল্যায়ন শুধু এই যে, তাদেরকে নির্বাচন করতে হবে। কারণ আমাদের প্রভুরা নির্বাচন চাপিয়ে দিয়েছে। এখন একটা মিডল ক্লাস তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। এই মিডল ক্লাসের একটা বক্তব্য জন্মে গেছে। পলিটিক্যাল পার্টির জন্য জান দিতে কেউ আর যাচ্ছে না।

রাইসু

জান দিতে দিতে বিরক্ত হয়ে গেছে লোকজন।

ছফা

হ্যাঁ, এবং আরো যদি প্রোটেস্ট আসে জনগণের ভেতর থেকে তখন পলিটিক্স শুদ্ধ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কামাল হোসেন যখন ভিন্ন রকম পলিটিকস শুরু করলেন, যে, সিভিল সোসাইটি তৈরি করবেন, তিনি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করবেন, সমস্যা দূর করবেন—এ সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে যখন আসছিলেন, মানুষের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ সঞ্চার হয়েছিল। পরে কামাল হোসেন এগুলো বাদ দিয়ে যে পথে গেলেন—তিনি একটা ট্র্যাডিশনাল পলিটিক্যাল পার্টি তৈরি করলেন। কিন্তু আরেকটা ট্র্যাডিশনাল পার্টির ব্যাপারে জনগণের কোনো আগ্রহ নেই। তখন গণফোরাম রইলো গণফোরামের জায়গায়, কামাল হোসেন স্বদেশ-বিদেশ করতে থাকলেন।

এখন পলিটিক্যাল কর্তা যারা আছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলি—কারণ শ্রদ্ধা না রাখলে কে কার কথা শোনে—দেশের এই অবস্থাতে সবচাইতে আগে দরকার সমাজের ভেতর পারস্পরিক আস্থা। আমি তার দল করি না বটে কিন্তু তারা একটা ভালো কাজ করলে তাকে সম্মান করতে পারবো না কেন? এই আস্থাটা না থাকার কারণে হাওয়াতে হাওয়াতে গোটা দেশটাকে এখন সরাসরি আমরা দক্ষিণপন্থী কোটের মধ্যে ফেলে দিয়েছি। আওয়ামী লীগকে ইসলামের নামে ইলেকশান করে জিততে হবে। জামাতে ইসলামকে তো বটেই। এবং ইসলামের দাবিদার তো একজন নয়। কিন্তু আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধ করেছি তখন ইসলামের কথা না বলেও মুক্তিযুদ্ধ করতে পেরেছি। জনগণ আমাদের সাপোর্ট করেছে। তারপর আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের যে প্রতিশ্রুতি, যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, তারা তো ভেঙেছে। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধ যারা করেছেন, তারা কী পরিমাণ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন সেই হিসাবটা তারা নিজেরাও করে দেখেন না।

এবং আরো একটা প্রচণ্ড জিনিস, জনগণের দাবি এবং জনগণের প্রয়োজন এটার বদলে দুটি কথা ক্রমাগত সকলে বলে। প্রথমটি ইসলাম, আরেকটা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি মুক্তিযুদ্ধ আমার মা। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতি একটা ইতিহাসের মধ্যে ঢুকেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, একটা সুস্থ সমাজ, একটা সন্ত্রাসহীন সমাজ, জনগণের অধিকার, জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি, এগুলোর কোনটাই বা আমরা করতে পেরেছি। অথচ ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতি’র কথা সকলে বলে।

রাইসু

কথাটার অর্থ কী?

ছফা

এটাও একটা ক্লিশে হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েছে এজন্য যে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে প্রতিদিন টিভিতে নাটক হয়। খুবই মেধাহীন লোকেরা, লোভী লোকেরা এগুলো লেখে, লোভী লোকেরা এগুলো প্রচার করে। ওতে মুক্তিযুদ্ধের কোনো এসেন্স থাকে না। থাকে তাদের বোকামি, তাদের লোভ, তাদের স্থূলতা। অথচ মুক্তিযুদ্ধের এসেন্সটা বাঁচিয়ে রাখা, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে এর পরিচয় করিয়ে দেয়াটা আমাদের ব্যাপক কর্তব্য ছিলো। আরো একটা জিনিস, আমি শত্রুতায় বিশ্বাস করি না। জামাত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলো বলে তাদের পলিটিক্স ব্যান করতে হবে এটায় আমি বিশ্বাস করি না, কিন্তু জামাতের মস্তবড় অপরাধ আমি মনে করি, তারা তাদের একাত্তরের ভূমিকাতে লজ্জিত নয়।

আজকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জামাতকে সামনে নিয়ে এসে আওয়ামী লীগ একধরনের পলিটিক্যাল হারিকিরি করছে। সেটা আমাদের বেদনা। আমি বার বার বলেছি আওয়ামী লীগ যখন জিতে তখন শেখ হাসিনা তথা কিছু মুষ্টিমেয় নেতা জিতেন, আর আওয়ামী লীগ যখন হারে গোটা বাংলাদেশ পরাজিত হয়। আমি আওয়ামী লীগের নই, কিন্তু আওয়ামী লীগের পলিটিক্যাল কনটেন্ট আউটলিভ করার মত কোনো পলিটিক্স আমরা তৈরি করতে পারি নি। আওয়ামী লীগ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ভিন্ন রকম রাজনীতি সৃষ্টি করার চেষ্টা আমরা করেছি—করতে পারি নি।

রাইসু

কারণ কী?

ছফা

কারণ অনেক। কারণ আওয়ামী লীগ নিজেই। ভারতীয় কংগ্রেস পার্টি ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। কংগ্রেস পার্টি তার আসনে এখনো ৫০ বছর পর্যন্ত ক্ষমতায়। মাঝখানে ১ বছর ২ বছরের জন্য জনতা পার্টি এসেছে। সুকর্নর পার্টি প্রায় ২০ বছর ২৫ বছর একনাগাড়ে রাজত্ব করেছে। আলজিরিয়ার বেনবেরলা অনেকদিন রাজত্ব করেছেন। ঘানায় নক্রুমা অনেকদিন ক্ষমতায় ছিলেন। হাবিব বরগুইবা অনেক দিন তিউনিসিয়ায় ক্ষমতাসীন ছিলেন।

কিন্তু আওয়ামী লীগকে ৩ বছরের মাথায় ক্ষমতাচ্যুত হতে হলো। এটা বাংলাদেশের জন্য অভিনব ঘটনা। কোনো একটি যুদ্ধের মধ্যে বিজয়ী দল ক্ষমতা দখল করে ৩ বছরের মধ্যে পলিটিক্যালি সম্পূর্ণ অরফেন হয়ে যাওয়ার এরকম কোনো দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে নেই। খুব সম্ভবত আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে পলিটিক্যালি ডিমরালাইজড। তাদের মধ্যে একটা অপরাধী বিবেক ছিল।

রাইসু

কী বিষয়ে?

ছফা

তারা হয়তো বাড়াবাড়ি করেছে। তারা ‘একদল’ করেছে এবং তারা এক ধরনের পার্টি ডিকটেটরশিপ কায়েম করেছে। এগুলো করতে গিয়ে যে রুট থেকে আওয়ামী লীগের উদ্ভব সেই রুটটাই তারা অস্বীকার করেছে। শেখ মুজিব যখন ‘একদল’ করলেন তখন তাকে ভায়োলেন্ট ওয়েতে সামরিক লোকেরা সপরিবারে হত্যা করলো। এটা জাতীয় জীবনের একটা মস্ত বড় কলঙ্কের বিষয়। যেই মানুষ দেশের স্বাধীনতার জন্যে ৪০ বছর বলতে গেলে সংগ্রাম করেছেন জাতি যদি তাকে অপছন্দ করতো, তাকে রিজেক্ট করতো, জাতি যদি কোর্ট বসিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড দিতো সেটাও মানা যেত, কিন্তু রাতের অন্ধকারে আনকোড়া তরুণ মিলিটারিরা এসে তাকে খুন করে গেল। জাতি দায়ী থাকবে কেন।

শেখ মুজিবকে হত্যা করে মিলিটারি ক্ষমতা দখল করেছিল এবং তারা ইনডেমনিটি বিল পাস করিয়েছে। এর পরেও আওয়ামী লীগকে ইনডেমনিটি বিল মেনে নিয়ে পলিটিক্স করে যেতে হচ্ছে। আমার বিশ্বাস ছিল যদি আওয়ামী লীগ সরাসরি প্রথমেই বলত যে আমরা ‘একদল’ করে ভুল করেছি, আমরা বাড়াবাড়ি করে ভুল করেছি, আমরা জনগণের কাছে আমাদের অতীতের ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাই—সেটি আওয়ামী লীগের যোগ্য কাজ হতো। ইন্দিরা গান্ধী যখন পার্লামেন্টে নির্বাচিত হতে পারলেন না সঞ্জয় গান্ধীর বাড়াবাড়ির জন্যে, জনগণের কাছে জোড়হাত করে বললেন, আমি অনেক অপরাধ করেছি তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও, আরেকটি চান্স আমাকে দাও। ভারতীয় জনগণ তখন তাকে আরেকবার নির্বাচিত করেছিল।

আমার একটা ধারণা আওয়ামী লীগ যদি জনগণের কাছে এই ক্ষমাটি চাইতে পারত তাকে আজকে জামাতের সঙ্গে আঁতাত করতে হতো না। টোটাল সিচ্যুয়েশনটা হলো এই। কারণ আমাদের মানুষ অনেক ম্যাচিউর হয়ে গিয়েছে। তাদের অধিকার রক্ষার জিনিসটা তৈরি হয়েছে, এটাই বাংলাদেশের একটা মস্ত বড় ভবিষ্যৎ। এই যে ইয়াসমীনকে নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া হলো গোটা দেশে এরকম প্রতিক্রিয়া পাঁচ বছর আগে আশা করা যেত না। এই যে ফরহাদ মজহার যে সরকারি সশস্ত্র বাহিনীর একটা অংশকে চ্যালেন্জ করলো এগুলো হচ্ছে আমাদের জনগণের ম্যাচিউরিটির চিহ্ন।

রাইসু

আমাদের জনগণ ম্যাচিউর হয়ে গিয়েছে, কিন্তু পলিটিক্যাল পার্টিগুলো হয় নি?

ছফা

জনগণের ম্যাচিউরটি যদি জিওম্যাট্রিক রেশিওতে প্রোগ্রেস করে পলিটিক্যাল পার্টির প্রোগ্রেসটা তাহলে অ্যারেথম্যাটিক। এই যে জিনিসটা আমি যদি আগামী লেখাটি ভাল না লিখি লোকে আমাকে রিজেক্ট করবে। প্রতিদিন লড়াই করতে হয় ‘আহমদ ছফা’র পরিচয়টা টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু খালেদা জিয়াকে এটা করতে হবে না। কারণ জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করে তিনি সারা জীবনের গ্যারান্টি পেয়ে গেছেন। এবং হাসিনাকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। তিনি বঙ্গবন্ধু-তনয়া এবং তার কোনো ভুল হতে পারে না।

প্রফেসর আনিসুর রহমান এটাকে বলেন মহারাজা কালচার। এগুলো হচ্ছে ডেমোক্রেটিক চিন্তার নেগেশান। সরাসরি সামন্ততান্ত্রিক চিন্তার একটা প্রকাশ। সুতরাং এগুলোকে চ্যালেন্জ করার অবস্থাও মানুষ চিন্তা করছে। এবং চিন্তাটা মানুষের মস্ত বড় হাতিয়ার। এবং এসব শুধু বিরোধী দলগুলোই করে নি। সরকার-বিরোধীদল মিলিয়ে যে পলিটিক্যাল প্রসেস তার রেজাল্ট হচ্ছে এই। এবং রাজনীতিকরা চিন্তা করতে পারছে না বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে একটা বেটার পজিশনে যাচ্ছে।

রাজনীতির কাজটা হচ্ছে মিডিয়েট করা। ব্যবসার সাথে, বাণিজ্যের সাথে, শিক্ষার সাথে, সংস্কৃতির সাথে। অর্থাৎ সমস্ত কিছুর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করার ভূমিকা হচ্ছে রাজনীতির। কিন্তু আমাদের এখানে রাজনীতি হচ্ছে মহারাজার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

কিন্তু এগুলোকে নেগেট করার মত অবস্থা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি যেটা ভয় পাচ্ছি, এখানে পলিটিকসটা যখন টোটাল রাইটিস্ট অরবিটের মধ্যে চলে যায় সেখানে অন্য কারো ভবিষ্যৎ থাকে না, চরম দক্ষিণপন্থীদের ছাড়া। এবং সকলে মিলে এরা চরম দক্ষিণপন্থী কোটের মধ্যে পলিটিক্সটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমার আশঙ্কা মৌলবাদীরাই তাদের আকাঙ্ক্ষাটা পূর্ণ করবে। আর অন্য দিকের এলার্মিং সাইড যেটা—প্রফেসর ইউনূস ইত্যাদি লোকেরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফরে তাকে প্রেসিডেন্ট করার কথা হচ্ছে। প্রফেসর ইউনূসের আন্তর্জাতিক খ্যাতি—তিনি যেন ক্রমাগত ম্যাজিক দেখিয়ে যাচ্ছেন এবং একটা করে পুরস্কার পাচ্ছেন। প্রফেসর ইউনূসের ভাগ্যে তথা বাংলাদেশের ভাগ্যে প্রতিদিন একটা করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসছে, এবং এইবার বেইজিং নারী সম্মেলনে প্রমাণ করা হলো যে ইউনূস সাহেব একটা মহানারী।

বাংলাদেশের দুইটি ক্ষেত্রে তিনি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন। এক, বিদেশী আস্থা অর্জন করা এবং তাদের কাছ থেকে অর্থ আনা, দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের গরীব জনগণকে একটা ধনতান্ত্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা। নিউইয়র্কের কোন একটা অর্গানাইজেশন তাকে সেইন্ট অব দ্য পুওর বলেছে। কিন্তু এই সেইন্ট শতকরা বিশ পার্সেন্ট সুদ খায় এবং সেটা যখন কিস্তিতে কিস্তিতে নেয় তখন বত্রিশ পার্সেন্ট-এ ওঠে। অর্থাৎ বোঝা গেল যে এই সেইন্ট সেইন্ট বটে, কিন্তু সেইন্টনেসের মাঝখানে একটা ইহুদি, কুসীদজীবী ইহুদিত্ব আছে। এরকম একজন লোক, বিদেশী অর্থে যার এই অবস্থা তাকে দেশের কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান করার কথা ভাবা এটা খুবই অন্যায়।

বিদেশীরা অনেক কিছুই চাইছে। অনেক কিছুই আমাদের করতে হচ্ছে। কিন্তু বিদেশীরা চাইছে বলে তাকে কেয়ারটেকার প্রধান করা… নীতিগতভাবে একজন লোকও যদি এর প্রতিবাদ করে আমি সেই ব্যক্তি। বিদেশী টাকার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল কোনো ব্যক্তি এই দেশের কোনো কল্যাণ করতে পারে না। তার বদলে হাসিনা খালেদার যতোই দুঃশাসন হোক সেটাও আমি মেনে নিতে রাজি আছি।

রাইসু

এগুলো কি আপনি ঈর্ষা থেকে বলছেন?

ছফা

ঈর্ষা থেকে বললেও ক্ষতি নেই। সত্যি বলছি কিনা, ন্যায্য কথা বলছি কিনা সেটাই বড় কথা। ইউনূস সাহেবের জন্য আমি গর্ববোধও করি। আমাদের অনেক কিছুই নেই। অন্তত পক্ষে আমরা ফিল করতে চাই আমাদের পলিটিক্যাল স্ট্রাগলটা। একজন হাইকোর্টের বিচারক, এমনকি কূটকৌশলী ফয়েজকেও মেনে নিতে রাজি হবো, ইউনূসকে না। গ্রামীণ গরীবদের শ্রমশক্তিকে দেশের ধনীরা কখনো ধনতন্ত্রের সঙ্গে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পুঁজির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে নি। অর্থাৎ এরা প্রাক পুঁজি রিলেশানের মধ্যে থেকে গিয়েছিল। ইউনূস সাহেব এটাকে একটা পুঁজিবাদী শেপের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। ইউনূস সাহেবের কৃতিত্ব এটাই। এইজন্যই আমেরিকা তথা পশ্চিমা দেশগুলি তাকে এভাবে অনর্গল পুরস্কার দিয়ে যাচ্ছে।

নভেম্বর ১৯৯৫

About Author

ব্রাত্য রাইসু
ব্রাত্য রাইসু

কবি, বুদ্ধিজীবী, চিত্রশিল্পী, সাক্ষাৎকারগ্রহীতা ও বিদূষক।