তখন দুর্গাপূজার ছুটিতে আমরা সবসময় দাদুর বাড়ি যাই। শুধু আমরা না, দাদুর চোদ্দগুষ্টির সবাই তখন ওই বাড়িতে যায়। আর বিশাল বিশাল বিছানা করা হয়।

আমার দাদুর বাড়ি মোটামুটি জমিদার বাড়ি। সেইখানে সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা রুম। বিশাল বৈঠকখানা, খাবার ঘর, রান্না ঘর—তার মধ্যে আবার একটা গ্যাসের চুলার ঘর, একটা মাটির চুলার ঘর, নিচে শোবার রুম কম—দুইটা। বাকিগুলা উপরে। নিচে লাকড়ি রাখার ঘর আছে। পাশেই একটু দূরে গরুদের রুম, ছাগলদের রুম, আবার খড় রাখার রুম—রুমের শেষ নাই।

আমরা গেলে থাকতাম উপরে। উপরে একটা ঘণ্টার রুম, একটা পূজার রুম আর চারটা শোবার রুম। এর মধ্যে একটাকে আমরা মানে বাচ্চাকাচ্চা-কিশোর-নওজোয়ান—এদের রুম বানায়ে ফেলছিলাম।

ওই রুমে কিছু ছিল না। মেঝেতে লম্বা করে চাটাই বিছানো ছিল। সেইখানে আমরা সবাই যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক তারা শুয়ে বসে আন্তাসারি খেলতাম। সেই নানা বয়সীদের মধ্যেও নানা রকম গ্রুপিং ছিল। আমার গ্রুপিং ছিল রিয়েল মামার সাথে। যদিও সে আমার মামা, কিন্তু বয়স তার খুব বেশি না। সে আর আমি সবসময় মিলিটারি প্যান্ট পড়তাম। আর জিন্সের শার্ট ছিল আমাদের বেশি প্রিয়। অবশ্য আমার মা আমাকে বেশিরভাগ সময় লাল টিশার্ট আর নীল জিন্স পড়ায়ে রাখত। তারপরেও সুযোগ পেলেই আমরা আর্মি মিলিটারি সেজে থাকতাম। এমনকি চুলও কাটতাম ওইরকম গলাছিলা মুরগির মতন করে।

আমাদের সবচেয়ে খাতির ছিল ঘুরাঘুরির ব্যাপারে। ঘুরতে—জায়গা না চিনে, কোনো কিছু না জেনে, গন্তব্যহীনভাবে মাইলের পর মাইল হাঁটতে আমাদের কোনো জুড়ি ছিল না।

দাদুর যে গ্রাম—আনোয়ারা জয়কালীহাট, সেটা একটা অসাধারণ সুন্দর গ্রাম। কাফকো আর পারকির চরের খুব কাছেই। আমি আর রিয়েল মামা প্রতিদিন নানা জায়গা ভ্রমণ করতাম। সূর্যাস্তের সময় আমরা দিগন্তবিস্তৃত মাঠের ওপর রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতাম—সূর্যকে ধরার জন্য। সূর্যকে ধরতে পারতাম না কখনোই কারণ হয় আমরা হাঁপায়ে যেতাম, না হয় আমাদের সামনে কোনো একটা জলাপুকুর এসে পড়ত। তবে আমাদের মনে দৃঢ়বিশ্বাস ছিল একদিন ওই ব্যাটাকে ধরবোই। আর রাত হতে দিব না।

সূর্যের সাথে শত্রুতার একটা কারণ ছিল। সকাল বেলা উঠে তো আমরা পূজামণ্ডপে যেতাম। সেখানে ঢাক ঢোল বাজায়ে, পূজা অর্চনা করে আমাদের সময় কেটে যেত। দুপুরে খেয়ে দেয়ে সবাই যখন ঘুমাত, আমরা পা টিপে টিপে বের হতাম নতুন জায়গা আবিষ্কারে। ফিরতাম সন্ধ্যার আগেই। বাসায় না ফিরে পূজামণ্ডপেই যেতাম। সেখানে সন্ধ্যা থেকেই ঢাক ঢোল বাজায়ে, ধূপ ধুনো নিয়ে বেশ নাচানাচি হত।

পারমিতা হিম
সে সময়ের আমি

আমরা গিয়েই নাচানাচি শুরু করে দিতাম। কেউ কিছু টেরই পেত না। ওই গ্রামে আমার কয়েক হাজার মামা ছিল। সবাই আমাদের জামায় সেফটিপিন দিয়ে টাকা আটকায়ে দিত। খুব বেশি না, হয়ত দুই টাকা, পাঁচ টাকা—কিন্তু তাতেই আমরা মহাখুশি হইতাম। দশটার মধ্যে বাসায় ফিরে টাকা গোনা শুরু করতাম।

বিদ্যুৎ নাই এমন একটা গ্রামে রাত দশটা মানে অনেক রাত। অবশ্য দাদুবাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল কিন্তু সেটা কখনোই রাতে থাকতো না। আমরা শহরে থেকে অভ্যস্ত। রাত দশটায় আমাদের ঘুম আসা অসম্ভব। বাইরে নানা পোকামাকড়ের ডাকাডাকি। নিঝুম নীরব একটা জায়গা। কিছুই করার নাই। তার চেয়ে দিনের বেলাই ভালো। কিছু না কিছু হইহল্লা চলতে থাকে। তাছাড়া হারিকেন, কূপি এইসবের আলোয় আমার ভয়ানক ডিপ্রেসন হয়। সহ্য করতে পারি না আমি। রিয়েল মামারও বোধ হয় এ অবস্থা। সেইজন্য সূর্যকে ধরার জন্য আমরা এত ব্যাকুল ছিলাম। কত সূর্যাস্তের সময় আমরা ওই ব্যাটার পিছে পিছে দৌড়ে গেছি!

সেদিন সপ্তমী দিন। সন্ধ্যায় গেছি পূজামণ্ডপে। দেখি কারা যেন বলাবলি করছে ‘সিঙ্গারা’ গ্রামের পূজাই (মানে প্রতিমাই) সবচেয়ে সুন্দর হইছে। আমার মামাদের খুবই মন খারাপ। তারা বলতে শুরু করল যে আমাদের গ্রামের লোকজন টাকাই দেয় না। তাই পূজাও সুন্দর হয় না। শাড়িটা আরেকটু দামি কিনতে পারলেও হত। প্রতি বছরই এইসব আলোচনা হয়। কিপটামির এইসব অভিযোগ চলতেই থাকে। তাই আমরা এসবে একটুও আগ্রহ পাইলাম না। আগ্রহ হল ‘সিঙ্গারা’ নামটাতে।

আমরা বললাম—সিঙ্গারা কী? গ্রাম?

মামারা বলল—হ ওই পাশের একটা গ্রাম।

আমি আর রিয়েল মামা তো মহাখুশি।

—গ্রাম? গ্রামের নাম সিঙ্গারা?

—হুমম, গ্রামের নাম সিঙ্গারা।

আমার আর রিয়েল মামার চোখে চোখে বোঝাপড়া হয়ে গেল কাল আমরা ঘুম থেকে উঠেই ওই গ্রামে রওয়ানা দিব। পূজার ঝামেলায় আমাদের কেউ খুঁজবেও না।

পরদিন সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে ভাল জামা কাপড় পরে, খেয়েদেয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম সিঙ্গারা গ্রামের দিকে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না। ভাবল আমরা মণ্ডপে যাব। আগের দিন পাড়াতো মামা যেদিকে মাথা নেড়ে ‘ওইদিক’ দেখাচ্ছিল সেইদিকে দুজনে হাঁটা দিলাম।

দুর্গাপূজার ছুটিতে
কলকাতায় দেবী দুর্গার প্রতিমা

সুন্দর পিচঢালা রাস্তা। মাঝে মাঝে দুএকটা লক্করঝক্কর বাস কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে যায়। দুপাশে ক্ষেত, পুকুর, গাছ, জঙ্গল। আরো অনেক কিছু মিলে ঝিলে আমরা ‘ওইদিকে’ হাঁটতে থাকলাম। মাঝে মাঝে দোকান পেলে সেখানে পানি বিস্কুট পুরি এইসব খেলাম। নাচানাচি করে আমরা তখন অনেক টাকার মালিক। সেগুলাই খরচ করলাম। কিন্তু সিঙ্গারা গ্রামের দেখা নাই।

পথে যতজন পাইলাম জিজ্ঞাসা করলাম—আর কতদূর?

তো তারা বলে, আর বেশি না আধা ঘণ্টার মতন লাগবে। কেউ বলে, দশ পনের মিনিট লাগবে।

পথচারীরা যে কী হিসাবে পথের দূরত্ব বলে আমি আজো বুঝি না! আমার মনে হয় তাদের যা মনে আসে তাই বলে দেয়। অজানা অচেনা মানুষের কাছে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করতে ভালো বোধ করে না হয়ত। তাই যা খুশি তাই বলে। বাস্তবতার সাথে মিল না রেখেই।

আমার দূরত্ব মাপার ক্ষমতা এখনো অনেক কম। আমি বাপু সরাসরি বলে দেই যে আমি বলতে পারব না কতদূরের পথ। কত সময় লাগবে। ধরেন কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার বাসা কত স্কয়ার ফুট? আমি কিছুক্ষণ হা করে বলে দেই যে, আমি জানি না।
ধারণা? না না আমার এইসব ফুট ইঞ্চির ধারণা নাই।

কিন্তু আমাদের কপালে যেইসব পথচারী পড়ল তারা সকলেই বলল আর মাত্র আধাঘণ্টার পথ। দুই ঘণ্টা ধরে আমরা সেই আধা ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলাম। তারপর যখন সব আশা ছেড়ে দিয়ে একটা চায়ের দোকানে বসে হাঁপাতে শুরু করছি, ঠিক সেই সময় দেখলাম আমার মাথার উপরে দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা—‘সিঙ্গারা, আনোয়ারা’।

একই গ্রাম। একই সবুজ। একই পুকুর। একই ঘরবাড়ি। একই ভাষা। একই মানুষ। আচ্ছা এই পাশেরই তো গ্রাম। সব একই হবে সেটাই স্বাভাবিক।

আমি বললাম, সিঙ্গারা খেয়ে দেখি। সিঙ্গারা গ্রামে এসে সিঙ্গারা না খেলে কি মজা!

তো একটা সিঙ্গারার দোকান খুঁজে বের করতেও আরো অনেকদূর যেতে হল। দেখলাম সিঙ্গারাগুলো আমাদের গ্রামের সিঙ্গারার চেয়ে বড় সাইজের। অনেক আগ্রহ নিয়ে খেলাম আমরা দুইজন। পুরো পথ খেতে খেতে আমাদের পকেটের টাকা প্রায় শেষ। কিন্তু বিধি বাম! সিঙ্গারার ভেতরে শুধুই আলু, সিঙ্গারা গ্রামের সিঙ্গারাও শুধুই যে কোনো সিঙ্গারা! দুইজনে এত বিরক্ত হলাম বলার মত না।

এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কোনো কিছুই অন্যরকম না পেয়ে আমরা বাড়ির পথে রওয়ানা হলাম। দুপুর তখন শেষের দিকে। ধীরে ধীরে নরম হয়ে যাচ্ছে রোদ। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। এখন ফেরা মানে নির্ঘাৎ ধরা। নানারকম কৈফিয়ত দিতে হবে। কারণ দুপুরের খাবারের সময় পার হয়ে গেছে। সবাই জানে যে আমরা বাসায় যাই নি। মণ্ডপেও নিশ্চয় খোঁজ নেয়া হয়ে গেছে।

আমরা দুজনে মিলে বুদ্ধি বের করলাম আগে মামার দোকানে যাব। সেটা দাদুর বাড়ি পার হয়ে আরো বিশ মিনিটের পথ। সেখানে আমরা প্রায় সময়ই যাই। আমি তো রীতিমত দোকানদারি করি। একদিকে পান বেচি আরেকদিকে ক্যান্ডি খাই। ভাবলাম কিছুক্ষণ দোকান থেকে ঘুরে আসলে বাসায় গিয়ে কৈফিয়ত দিব যে আমরা সাতসকালে মামার দোকানে চলে গেছিলাম।

মামার দোকানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে একদম বিকেল পার হয় হয় অবস্থা। মামা নাই। কর্মচারী মামা আছে।

—মামা কই? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

কর্মচারী মামা খুব ব্যস্ত হয়ে বলল, কীরে তোমরা কোত্থেকে? কোথায় গেছিলা?

আমরা মিটি মিটি হেসে বললাম—এক জায়গায়।

উনি দোকান থেকে ঘাড় ধরে আমাদের বের করে দিলেন। বললেন, তাড়াতাড়ি বাসায় যাও।

আমরা বললাম, মামার সাথে দেখা করে যাই।

উনি চিৎকার করে বললেন, সবাই তোমাদের খুঁজে খুঁজে অস্থির। এক্ষুনি বাসায় যাও। বলে দশ টাকা দিলেন হাতে। আর বললেন, রিকশা নিয়ে যাও।

কে আর যায় রিকশা নিয়ে! দশ টাকার চকচকে নোট এমনি এমনি হাতে চলে আসা কি সহজ ব্যাপার! তাছাড়া হাজিরা যখন দেয়া হয়েই গেছে, তাড়াহুড়া করে যাবার দরকার কী আর! আমি আর রিয়েল মামা হেলেদুলে গল্প করতে করতে, রাস্তার ফুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে, ফুল ছিঁড়ে মধু খেতে খেতে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম।

সেদিন মহাঅষ্টমী। যেসব পাড়ায় পূজামণ্ডপ আছে সেখানে মাইকে মাইকে ঢাক-ঢোল-কাঁসার শব্দ কিংবা ভজন সঙ্গীতবাজছে। কে কান দেয় সেসবে! আমরা আমাদের নানা গল্প করতে থাকি।

পুকুরের মধ্যে একটা বেগুনী রঙের অদ্ভুত ফুল দেখিয়ে রিয়েল মামা আমাকে বলল, এটা কী ফুল জানিস? ধুতুরা ফুল। খুব বিষাক্ত। এটা যদি কাউকে খাওয়াতে পারিস সে সঙ্গে সঙ্গে মারা যাবে।

আমি খুব আগ্রহ নিয়ে বললাম, তাহলে দাঁড়াও। নিয়ে যাই কয়েকটা।

রিয়েল মামা অবাক হয়ে বলল, কেন?

আমি বললাম, আমার শত্রু আছে না অনেক! কেউ যদি আমার সাথে বেয়াদবি করে একদম খাওয়ায়ে দেব। হাহাহাহ।

রিয়েল মামা আমার হাত ধরে কিছু দূর জোরে হেঁটে টেনে নিয়ে গেলেন, তুই একটা ডেন্জারাস মেয়ে বাবা।

কেন, আমি কী করলাম? আমার বিরক্তসূচক প্রশ্ন।

পৃথিবীর কোন মেয়ে শত্রুদের মেরে ফেলার প্ল্যান করে? কী সাংঘাতিক কথা! তোর এমন কী শত্রু?

আমি বললাম, বারে, এই যে আমার ক্লাসের রাজীব। বোম্বাই ফাইট খেলার সময় কাগজের ভেতর পেঁয়াজু ভরে ভরে আমার দিকে মারে! আমি ব্যথা পাই না? ওকে যদি আমি পেঁয়াজুর সাথে ধুতরা দিয়ে দেই, ও যদি মরে সাথে সাথে—তাহলে আমার ক্লাসের অন্য ছেলেদের একটা উচিত শিক্ষা হবে না?

রিয়েল মামা খুব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। আমরা তখন বাড়ির কাছাকাছি। পূজামণ্ডপের মাইকে কী কী যেন বলছে। একটু একটু শুনতে পাচ্ছি।

রিয়েল মামা বলল, তোর মত ঝগড়াটে মেয়ে আমি জীবনেও দেখি নাই একটাও। আর ওইটা কীরকম চোখ? মানুষের চোখ কী ওরকম হয় নাকি? কুকুর বিলাইয়ের চোখ ওরকম হয়।

আমি বললাম, মানুষের চোখ একশবার এরকম হয়। কত মানুষের চোখই তো এরকম। সব মানুষের চোখ কি কালো হয়?

রিয়েল মামা বলল, শয়তানদের চোখ এরকম হয়। ঘোলাটে। ব্রেইনের সব শয়তানি প্যাঁচ খেয়ে চোখ ঘোলা করে দেয়।

এমন সময় শুনলাম, মাইকে বলল, মেয়েটার চোখের রঙ বাদামি।

আমি চিৎকার করে বললাম, ওই যে মাইকে কী বলে শোন। একটা মেয়ের চোখের রঙ বাদামি। হাহ্।

রিয়েল মামা মাথা নেড়ে বলল, অসম্ভব। পৃথিবীর কোনো মেয়ের চোখ তোর মত না। তুই আর বিলাই আর কুত্তা এরা হইল এরকম চোখের।

আমি মাইকের মেয়েটার কথাটা আরো ভালভাবে শোনার জন্য দৌড়াতে থাকলাম মণ্ডপের দিকে। আমার পেছনে পেছনে রিয়েল মামাও দৌড়াচ্ছে। কাছাকাছি আসতেই স্পষ্ট শোনা গেল মাইকের ঘোষণা, “…বয়স দশ। পরনে লাল গেঞ্জি। নীল জিন্সের হাফপ্যান্ট। মেয়েটির চোখের রঙ বাদামী। বয়কাট চুল…।”

আমি তো খুবই উত্তেজিত হয়ে গেলাম। সবই একদম আমার সাথে মিল! আমি রিয়েল মামার দিকে তাকিয়ে একটা বিজয়ীর হাসি দিলাম।

ওদিকে মাইকে বলেই যাচ্ছে, “…নাম পারমিতা। বয়স দশ। পরনে লাল গেঞ্জি। নীল জিন্সের হাফপ্যান্ট। মেয়েটির চোখের রঙ বাদামি। বয়কাট চুল। ছেলেটির নাম রিয়েল। বয়স এগার। পরনে হাফহাতা সবুজ শার্ট। কালো প্যান্ট।…”

“…মিলি ও রিয়েল… তোমরা যেখানেই থাকো না কেন অতি সত্বর বাড়িতে আসো। তোমাদের বাবা মা তোমাদের জন্য দুশ্চিন্তা করছেন। তোমাদের মায়েরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।…”

“…একটি নিখোঁজ সংবাদ… একটি নিখোঁজ সংবাদ… একটি নিখোঁজ সংবাদ’।

এইটুকু শুনে তো আমাদের মাথায় বাজ পড়ল। দুইজনে পড়িমরি করে দৌড় দিলাম মণ্ডপের দিকে। মাইকিং করে আমাদেরকেই খোঁজা হচ্ছে এইটুকু বোঝার পর আমাদের হার্টবিট ঘোড়ার মত দৌড়াচ্ছে।

মণ্ডপের গেইট দিয়ে দৌড়ে ঢুকতেই দেখি আমার মা বাবা দুজনে গম্ভীর মুখে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো। রিয়েল মামার বাবা সেখানে নাই। উনার মা দেবী দুর্গার প্রতিমার সামনে চোখের পানি আর নাকের পানি একাকার করে গড়াগড়ি কাঁদছেন। আর আমার মা ধূলায় গড়াগড়ি যাওয়া তো দূরে থাক, তার শাড়ির কোথাও এতটুকু ভাঁজও পড়ে নি।

মার লাল চোখ দেখেই বুঝে গেলাম আমার কপালে আজকে জন্মের পিটুনি আছে। সে আমার দিকে একবার আগায়েও আসল না। এদিকে রিয়েল মামার মা তো তাকে জড়ায়ে-টড়ায়ে ধরে সে কী কান্না। ছেলেকে মিনিটে তিরিশটা করে চুমু খাচ্ছে। রিয়েল মামারা দুই ভাই। মানে তার মায়ের দুই মাত্র ছেলে। সুতরাং ছেলের অনেক খাতির তার মায়ের কাছে। আর আমার মায়ের তখন তিন মেয়ে। আমার জন্য তার কোনোই মায়া-দয়া নাই। আমার দিদিমারা আমাকে জড়ায়ে ধরে আছে। আদর করছে। আর জিজ্ঞাসা করছে, কোথায় ছিলি তোরা? কোথায় গেছিলি?

দুর্গাপূজার ছুটিতে
দুর্গার সাজে

আর আমার মা দূর থেকে চোখ লাল লাল করে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকায়ে আছে। জড়ায়ে ধরা, কান্না করা অনেক দূরে থাক। আমি মনে মনে ভাবলাম, মাকেই খাওয়াতে হবে ধুতুরা ফুল। এরকম নিষ্ঠুর সে!

দিদিমাদের উত্তর দিলাম, মামার দোকানে।

ওরা বলল, দোকানে তিনবার লোক পাঠানো হইছে। তোর মামা দোকান ছেড়ে এখন রিয়েলের বাবাকে নিয়ে তোদের খুঁজতে বের হইছে। গ্রামে গ্রামে রিকশায় করে মাইকিং হচ্ছে।

দুজনকে প্রায় কোলে করে বাড়িতে আনা হইল। সারাদিন খাওয়া হয় নাই। সবার আগে আমাদেরকে খাওয়ানো হবে। আমার মা কিছুতেই এখন খাইতে দিবে না। উনি আগে আমাকে গোসল করাবেন। নিচের কলের পাড়ে যে বাথরুম আছে ওইটাতে স্নান করায়ে তারপর খেতে দিবেন। আমি এক মিনিটে বুঝে গেলাম উদ্দেশ্য কী।

নিচের কলপাড়ের বাথরুম মূল বাড়ি থেকে অনেকটা বাইরের দিকে। সেইখানে আমরা স্নান করি না। সেইখানে নিয়ে পানি ছেড়ে দরজা বন্ধ করে আমারে একটা আচ্ছাসে মাইর দেয়া হলো আমার মায়ের উদ্দেশ্য। সবার সামনে তো আমাকে মারতে পারবে না। দাদু দিদিমা আছে। এরা ধরে ফেলবে। মামা আছে। মামি আছে। কিছুতেই মনমত মাইর দিতে পারবে না। তার চেয়ে ওই কলপাড়ে নিয়ে যথেষ্ট প্রাইভেসির সাথে মাইর দিবে। কেউ দেখবেও না কিছু বলবেও না। আমি নানাননানান করে জানায়ে দিলাম আমি কিছুতেই ওইখানে ওই বাথরুমে স্নান করতে যাব না। যদি যেতেই হয় তাহলে একা যাব। মাকে স্নান করাতে হবে না।

এদিকে মাও একগুয়ে। স্নান না করলে সে আমাকে বাড়ির ভেতরেই ঢুকতে দিবে না। খাবারের ঘর তো অনেক দূর। আর আমাকে একা পাঠালে আমি অভিনয় করে মাথা ভিজায়ে চলে আসব। এই ভরসন্ধ্যায় আমি কিছুতেই গায়ে পানি ঢালবো না, তাই মা আমার সাথে যাবে।

আমার মায়ের প্রবল শুচিবায়ু। অন্যরা সেটা জানত। তাই কেউ কিছু সন্দেহ করল না। আমার প্রবল নিষেধ আর মাথা নাড়ানাড়িকে উপেক্ষা করেই কলপাড়ের বাথরুমে আমাকে নিয়ে গিয়ে দরজা লাগায়ে আচ্ছাসে পিটানো হলো। আধা ঘণ্টা পর আমাকে যখন সাইজ করে খাবারের ঘরে নিয়ে যাওয়া হল আমি তখনও ফোঁপাচ্ছি। দেখলাম রিয়েল মামা মহাসুখে পিঠা পায়েস খাচ্ছে।

মনে মনে দুইটা ধুতুরা ফুল বরাদ্দ দিলাম। একটা আমার মায়ের জন্য। আরেকটা ওই রিয়েল মামার জন্য। ভাবলাম দশমীর আগেই দুইটা ধুতুরা ফুল আমি জোগাড় করে ফেলব।

 

কভার . পারমিতা হিম। ছবি. সাইফুল জুয়েল, ২০১৬

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here