page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

দেরাজ / ড্রয়ার

আমার দেরাজে খুব নিয়মিতভাবে গন্ধমূষিক বা গন্ধমূষিকেরা হাগু করে আসছিল। কথা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অফিস-টেবিল নিয়ে।

গন্ধমূষিকদের চলতি ভাষায় ছুঁচো বলে। কাজটা তারা রাতের বেলায় করে আসছিল বলে ধরে নেয়া যায়। একটা করছে নাকি একাধিক সেটা তাদের কৃতকর্ম থেকে সিদ্ধান্তে আসা মুস্কিল। আর এটাও সত্য যে আমি বিষ্ঠারত ছুঁচো-সংখ্যা নিয়ে অতটা গবেষণামুখী ছিলাম না, যতটা ছিলাম বিষ্ঠাত্যাগের এই দুর্দান্ত স্থান আবিষ্কার হেতু আর উপায় নিয়ে।

উপায়ের বিষয়টা অতি গুরুতর। একটা মাঝারি মাপেরও গন্ধমূষিক ঢুকবার জন্য ন্যূনতম ছিদ্র কোথায় যে আছে সেটা কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকল না। কদিন দুশ্চিন্তা করার পরে মনে পড়ল এদের মাপে বিশাল শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। পশমের মধ্যকার মাংসল প্রাণিটি বিশেষ বড় আকারের হয় না। ফলে আমার মনুষ্যচক্ষে যা গুরুতর ছিদ্র নয় তা এই প্রাণির অনুপ্রবেশ ও বিষ্ঠাত্যাগের জন্য যথেষ্ট অনুকূল। এই প্রাণিটির নিজ গন্ধের তুলনায় এর বিষ্ঠার গন্ধ এমনকিছু গুরুতর নয়। গন্ধবিচারে বরং প্রাণিটি অপেক্ষা তার বিষ্ঠাকেই আপনার অধিকতর সহনীয় মনে হবে। তারপরও দেরাজে নিত্য নতুন বিষ্ঠা আপনি দর্শন করতে চান না, দাপ্তরিক কাজকর্মের জন্যও সেটা বিশেষ আরামদায়ক নয়।

manosh chy logo

কাঠমিস্ত্রি যিনি এলেন তাঁকে এই সমস্যাটি বোঝাতে বিশেষ বেগ পেতে হয় নি। তিনি ছুঁচো-কর্ম বিষয়ে অবগত ও প্রস্তুত ধরনের পেশাজীবী। আরও অভিজাত কাঠের কারিগর হলে তাঁকে এই অভূতপূর্ব সমস্যা বোঝাতে বহুত ঝামেলা হতো। এমনকি তাঁর হাস্যরসের মধ্যেও পড়তে হতো আমাকে, বা ছুঁচোকুলকে, বা হয়তো দুই জাতিকেই। ইনি, তুলনায়, যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে এই সমস্যাটি শুনলেন। তাঁকে এমনকি সমবেদনাতুরও মনে হলো। তিনি সারাইকাজ করতে সম্মত হলেনও অত্যন্ত দ্রুত। বস্তুত, এধরনের সারাইকাজ না থাকলেই বরং তাঁর সমস্যা। তারপরও তিনি একটা হালফ্যাশনের টেবিল কেন কিনে নিচ্ছি না এই প্রশ্ন না-করে পারেন নি।

তিনি এসেছেন অফিসের পিওনদের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে। আর পিওনগণ আমাকে চিত্রিত করার সময় বিভাগের সভাপতির অবয়ব জোরেশোরেই বানিয়ে থাকার কথা। হাজার হলেও তাঁরা বলছেন তাঁদের অফিসের বড়কর্তাকে নিয়ে। ফলে মিস্ত্রির প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক পরিস্থিতি বিষয়ে এরপর একটা ক্রিটিক্যাল আলাপ তাঁর সঙ্গে পাড়তে বসা বরং খুব কঠিন হলো। পরে তিনি খানিকটা সমবেদনায়, আর খানিকটা করুণায় আমার দেরাজ সারাতে শুরু করেন।

ছুঁচো এবং আমাদের অফিসের আর্থিক সামর্থ্য দুটোই ভারি অসুবিধাজনক পটভূমি তৈরি করেছিল। কিন্তু তা যদি নাও হতো, দেরাজ সারাই করার সময়ে আমার যা মাথায় কাজ করছিল তা কিছুতেই মিস্ত্রিকে বলা সহজ ছিল না।

ইতস্তত করেও শেষমেশ তাঁকে আর আব্দার করা হয় নি। আমার মাথায় ছিল নানান মাপের খুপরি থাকবে একেকটা দেরাজে। এই দেরাজগুলো সনাতনী। মানে হালফ্যাশনের চাকালাগানো দেরাজ নয়। কাঠের ফোঁকড়ে মানানসই মাপের কাঠের একটা খোলামুখ বাক্স আসা-যাওয়া করা। ব্যস। তা হোক! তাতেও নানান খুপড়ি বা কুঠুরি থাকবে এই হলো আমার বাসনা। অনেকটা বারোভাজা বিক্রেতাদের যেমনটা থাকে। কাঁচামরিচ, পিঁয়াজকুচি, চানাচুর, চিড়াভাজা ইত্যাদি সবকিছু যেমন বিক্রেতার সেই বাক্সে ভিন্ন ভিন্ন খুপড়িতে থাকে সেরকম দেরাজ আমার পছন্দ। আমার থাকবে আলপিন, স্ট্যাপলার, স্টিকার, পরীক্ষার কাগজ আরো নানান কিছু। দেরাজের এই বর্গবিভাজিত কুঠুরি আমার অতীব প্রিয়। কিন্তু সারাজীবন তা কল্পনাতেই থেকে গেল।

নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করতে বসলে দেখা যায়, দেরাজের পূর্বসূরি, অন্তত আমার জীবনে, একটা রেক্সিনলাগানো কাঠবোর্ডের বাক্স। হিসেবানুযায়ী এটা একটা ছোট স্যুটকেসরূপী স্কুলে বই নেবার সামগ্রী। তুলনামূলকভাবে দামি জিনিসের বিপরীতে আমার ছোটবোনের স্কুলসামগ্রী হিসেবে এই আপাতসাশ্রয়ী বস্তুটি কেনা হয়। সে তাতেও আঠারো আনা খুশি ছিল। স্যুটকেসটির বকল্স বা হাতল কিছু একটা বিপর্যয়ের পর থেকে ছোটবোন এটা, বাধ্য হয়ে, পরিত্যাগ করে। আর তখন থেকেই সেটি আমার আর্কাইভ।

ভাঙা-ফেলনা সুইচ, ফিউজ বাল্ব, টর্চের পুরাতন ব্যাটারি, তামার তার, কয়েকটা স্ত্রু, পড়ে পাওয়া অচল ক্যাসিও ঘড়ি ইত্যাদি। এত বছর পর এই মহাফেজখানার চারিত্র্য নির্ধারণ করতে বসলে যে মৌলিক নীতিমালা বা বর্গ নিশ্চিত করা যেতে পারে তা হলো ইইই: ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইন্জিনিয়ারিং। এরকম একটা সর্বাত্মক বর্গ হওয়া সত্ত্বেও সেটার মধ্যেই একাধিক উপবর্গ তখন আমি অনুভব করতাম। আর সেই কার্ডবোর্ডের স্যুটকেসটি পরম প্রিয় যেমন ছিল, তেমনি খানিক অপ্রতুলও ছিল। আজকের দেরাজের সে সাক্ষাৎ পূর্বসূরি। তখন সম্ভবত ভাবতাম যে বড় হয়ে নিজের দেরাজগুলো পছন্দমাফিক বানিয়ে নেয়া যাবে।

জনঅরণ্য ছায়াছবির উৎপল দত্তকে মনে আছে? তাঁর চরিত্রটির নাম মনে ছিল না, এখন নেটে খুঁজে দেখলাম ‘বিশু’দা’। তাঁর সঙ্গে নিজের পেশা-ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে এসেছিলেন জীবনযাপন ও অনটন নিয়ে বিহ্বল প্রদীপ মুখার্জ্জি। তিনি ছবিটির প্রটাগনিস্ট, তাঁর চরিত্রটির নাম সোমনাথ। স্ট্রিটস্মার্ট বিশুদা তাঁকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে তাঁর অফিসে দেখা করতে বলেছিলেন। সোমনাথ কীভাবে জীবন চালাতে পারে সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা-পরামর্শ দেবার সময় বিশু’দা নানাবিধ কোম্পানির প্যাড আর নেইম-কার্ড বানানোর পরামর্শ দিলেন। অফিসে একেকটি টেবিল একেকটি কম্পানি, একেকটি অফিস, এমনকি একাধিক কম্পানি। সামনের টেবিলের একজনকে দেখিয়ে বিশু’দা জানালেন তাঁর ১১টা কম্পানি; একটা আসল বাকিগুলো স্রেফ কাগুজে।

bishuda

‘যোগমায়া এন্টারপ্রাইজেস’—”এই যতগুলি লেটার বক্স দেখছো তার প্রত্যেকটি হলো একটি করে আপিস। আর এই হচ্ছে আমার অফিস। আমার গিন্নীর নামে নাম।”—সত্যজিৎ রায়ের ‘জনঅরণ্য‘ (১৯৭৬) ছবিতে সোমনাথকে বলছেন বিশুদা (উৎপল দত্ত)

বিল্ডিংয়ে উঠবার সময় সেসব কাগুজে আর অকাগুজে অফিসের আলাদা আলাদা কাঠের ডাকবাক্স। বিশু’দা সোমনাথকে দালালির মুখ্য কারিগরি বোঝাতে শুরু করছিলেন। মধ্য ৭০-এর ছায়াছবি, চিত্রিত করছিল আরো ক’বছর আগের কোলকাতা। ওই প্যাড আর নেইম-কার্ডগুলো দুর্দান্ত এক সামাজিক সম্পর্কের দলিল ছিল। আমার তখনও দেখতে গিয়ে মনে হয়েছে সোমনাথ বা বিশু’দার কুঠুরিওয়ালা স্যুটকেস থাকলে ভাল হতো। কম্পানির চরিত্র অনুযায়ী আলাদা আলাদা কুঠুরিতে নেইম-কার্ডগুলো আর প্যাড থাকতে পারত।

জীবনে এখন পছন্দমাফিক দেরাজ বানানো সহজ। হুকুম পেলে কাঠের কারিগর আপনাকে বানিয়ে দেবার জন্য বসেই রয়েছেন। কেবল মাথায় যেমন সাজানো-গোছানো রয়েছে সেরকম সাজিয়ে আপনার ফরমায়েশটা বলতে পারতে হবে। এমন সুলভ বন্দোবস্ত থাকার পরও সাজানো-গোছানো কুঠুরিওয়ালা দেরাজ আমার আর বানানো হয়ে ওঠে নি। কর্মক্ষেত্রে তো নয়ই, বাসাতেও নয়।

manosh-312

নিজের অফিস ঘরে লেখক। ছবি. রাকা তাবাসসুম, ২০১৪

এরকম সাজানো গোছানো দেরাজের বা কুঠুরির কাছাকাছি অর্জন বলা চলে পোশাকের আলমারিতে ঘটে থাকে। তৈরি-আসবাবের দোকানে এমনভাবে কুঠুরি সাজানো থাকে যাতে আলাদা আলাদা কুঠুরি থাকে। ঝোলানো জামা, লন্ড্রি থেকে আসা জামাকাপড়, ধুতে-দিতে-হবে এমন কাপড়ের দেরাজ, পাসপোর্ট বা চাবি রাখবার ছোট দেরাজ। আপনার কল্পনার কাছাকাছি কুঠুরিবিন্যাস। বর্গবিভাজন। আলমারির আরও গুরুত্ব হলো এর কুঠুরিগুলোতে আপনার চোখ পড়ে, হাত পড়ে। দেরিতে হলেও। কাগজপত্রের বা দাপ্তরিক জিনিসপত্রের কুঠুরির ম্যাজিক হলো তাতে হাত নাও পড়তে পারে। যত নিশ্চিত বিন্যাস ততই হাত না-পড়ার সম্ভাবনা। অসংমিশ্রিত মহাফেজখানা!

গন্ধমূষিকের প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। প্রায় দুই বছর তাও। নব নব বিষ্ঠা-সম্ভাবনায় বা বিষ্ঠাতঙ্কে দেরাজ তিনটা টানাটানি করে খুলতাম। প্রতিদিন না হলেও, দু’দিন পরপরই। গন্ধমূষিকের অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ হবার পর সেসব দেরাজ আর মাসের পর মাস খোলা হয় না। সেগুলোতে জরুরি জিনিস আছে–এই নিশ্চিত জ্ঞানসমেত আমি দেরাজহীন থাকি। আগামীতে কখনো দরকার পড়বে আর খোলা হবে কিংবা পর্যালোচনা হবে এর নথিপত্র এই আস্থাতেই কুঠুরিতে থাকে কুঠুরির দস্তাবেজ।

আদাবর, ৫ এপ্রিল ২০১৬

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।