page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

দেলদুয়ার, চারান ও স্ট্রং ডায়রিয়া

ডাক্তারের মতে ‘স্ট্রং ডায়রিয়া’, পাড়ার লোকজনের মতে কলেরা, ওলাওঠা। এ রোগে তখন বাঁচতো না কেউ, তবে আমি—জানি না কত দিন অচেতন থেকে—কীভাবে একদিন এক শান্ত স্নিগ্ধ ভোরে জেগে উঠি মৃত্যুঘুম থেকে। দেখি জানালায় আলো, হাওয়া; মাথার কাছে উদ্বিগ্ন পিতামহী, অল্প-অল্প নাড়ছেন তাঁর নিজের হাতে বোনা নকশি কাপড়ের পাখা। আমার চোখ মেলা দেখে খুশিতে চক-চক করে ওঠে তাঁর দুই চোখ, ডাকেন, বউমা! আসো…!!!

না, চেঁচিয়ে ডাকেন নি তিনি। পারতেন না উঁচু স্বরে ডাকতে, কিছু বলতে। নম্র, নত ছিল তাঁর স্বর। ওই স্বরেই কী আনন্দ সুরময় হয়ে উঠেছিল তখন। মা কোথাও ছিলেন—ছুটে আসেন, ভাই-বোনেরা এসে ভিড় করে চারপাশে, পড়শিরা আসেন একে-একে।

আমার পিতামহী সম্পর্কে বহু বছর পরে এক শ্রদ্ধা-সম্ভ্রমপূর্ণ বক্তব্য শুনেছিলাম বাবার চেয়ে বয়সে বড় তাঁর এক চাচাতো ভাই আবদুল মজিদের কাছে। তাঁকে বলতাম বালা কাকা। তিনি ভাষাবিদ ও গবেষক ড. মুহম্মদ এনামুল হক (১৯০৬-১৯৮২)-এর বড় মেয়ের স্বামী, ছিলেন তেজগাঁও ইনটারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজের গণিতের শিক্ষক। ১৯৬৬ সালে তিনিই আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর সহকর্মী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে। এর কয়েক মাস পরেই সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করি তাঁর সম্পাদিত মাসিক ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার।

sazzad-kadir-logo

আমার পৈতৃক বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলায়। এ উপজেলার এলাসিন গ্রামে কবি তারাপদ রায় (১৯৩৬-২০০৭)-এর জন্ম। তাঁর পিতামহ ও মাতামহের নামে স্কুল ও হাসপাতাল এখনও চালু আছে ওখানে। এলাসিন থেকে অল্প দূরের বিন্যাফৈর গ্রামে জন্ম কবি নরেশ গুহ (১৯২৩-২০০৯)-এর। তবে দেলদুয়ার বিখ্যাত জমিদার করিমুন্নেসা (বেগম রোকেয়ার বড় বোন, ১৮৫৫-১৯২২), তাঁর দুই পুত্র স্যার আবদুল করিম গযনবী (১৮৭২-১৯৩৯) ও স্যার আবদুল হালিম গযনবী (১৮৭৯-১৯৫৬) এবং তাঁদের এস্টেটের ম্যানেজার প্রখ্যাত কথাশিল্পী মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২)-এর কারণে। দেলদুয়ারে বসেই মীর সাহেব ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচনা করেন ও উৎসর্গ করেন করিমুন্নেসাকে। তাঁর ‘গাজী মিঞার বস্তানী’র পাণ্ডুলিপি উদ্ধারে বিশেষ ভূমিকা ছিল আমার ওই বালা কাকার। গ্রন্থের ভূমিকায় সে স্বীকৃতি দিয়েছেন ড. আশরাফ সিদ্দিকী।

Atia-Maszid

আতিয়া মসজিদ

আমার পিতামহ শাহ মোহাম্মদ আবদুর রকিব প্রথম জীবনে শিক্ষক ছিলেন, পরে নিবেদিত হন ধর্মচর্চায়। ‘হজরত শাহ সুফি আবদুর রকিব পীর কেবলা সাহেব’ তথা ‘দেলদুয়ারের পীর’ সাহেব নামে পরিচিতি পেলেও তাঁর শেষ জীবন কেটেছে গাজীপুর জেলার ভবানীপুর, নরসিংদী জেলার শিবপুর, রায়পুর ও সদর এলাকায়। তাঁর পাঁচ ভাই ও এক বোনের বংশধরেরা এখন থাকেন দেলদুয়ার সদরের মৌলভি পাড়ায়। এ পাড়ার নাম আগে ছিল ঢুলি পাড়া। আমার পিতামহীর পিত্রালয় ইছাপুরে হলেও অল্পবয়সে পিতৃহীন হওয়ায় তিনি মায়ের কাছে বড় হয়েছেন নানার বাড়ি পাছ চারানে। তাঁর সূত্রে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা শামসুর রহমান খান শাহজাহান এমপি থেকে প্রখ্যাত কবি-কথাসাহিত্যিক সাইয়িদ আতিকুল্লাহ পর্যন্ত বহু মান্যজন আমার আত্মীয়।

বালা কাকা গণিতে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন ম্যাটরিকুলেশন পরীক্ষায়, স্নাতক হওয়ার পর পড়েন নি আর, শিক্ষকতা করেছেন সারা জীবন। শিক্ষা-দীক্ষায় জ্ঞান-গরিমায় দেলদুয়ার প্রসিদ্ধি অর্জন করুক—এমনই ছিল তাঁর আশা। খুব আশা থাকলে যা হয়—শেষে খুব হতাশ ছিলেন তিনি। এ হতাশা ছিল তাঁর নিজের আত্মীয়-স্বজন, গ্রামের লোকজন সম্পর্কে। আমাকে অবশ্য স্নেহ করতেন বিশেষ ভাবে। ষাট দশকের মধ্যভাগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে তাই প্রথমে উঠেছিলাম তাঁর পশ্চিম নাখালপাড়ার বাসায়।

Charan-Bil

চরণ বিল

লেখা ও পড়ায় দেলদুয়ারের আর কেউ যে আমার মতো নয়, আমি যে একা-একা কীভাবে আলাদা হয়ে গেলাম—এর কারণ খুঁজেছেন তিনি। বলেছেন, “চাচিআম্মার মাধ্যমে তোর রক্তধারায় তুই পেয়েছিস্ পাছ চারানের শিক্ষা-সংস্কৃতি, মেধা ও গুণ!” তাঁর ‘চাচিআম্মা’ মানে আমার পিতামহী।

পাছ চারান কালিহাতী উপজেলার একটি গ্রাম। বিশাল চারান বিলের পাশে বালুকাময় সে গ্রাম সেকালে বিখ্যাত ছিল সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের বাসস্থান হিসেবে। সেই ঊনিশ শতকেই সেখানে সকল প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী ছিলেন শিক্ষিত। বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে যশস্বী তিন ব্যক্তির জন্ম ওই গ্রামে—আবদুল হামিদ খান ইউসুফজয়ী (১৮৪৫-১৯১০), রেয়াজউদ্দিন আহমদ মাশহাদী (১৮৫৯-১৯১৮) ও নওশের আলী খান ইউসুফজয়ী (১৮৬৪-১৯২৪)।

আবদুল হামিদ খান ইউসুফজয়ী ছিলেন টাঙ্গাইলের করটিয়া থেকে প্রকাশিত ‘আহমদী’ পত্রিকার সম্পাদক, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৪৮-১৯২৫)-এর সহকর্মী। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার এস্টেটের এক অংশের ম্যানেজার ছিলেন তিনি, ওই সময় অপর অংশের ম্যানেজার ছিলেন মীর মশাররফ হোসেন। মীর মশাররফ হোসেনের আত্মজৈবনিক ‘গাজী মিয়াঁর বস্তানী’ (১৮৯৯) গ্রন্থে এক প্রধান চরিত্র হিসেবে স্থান পেয়েছেন আবদুল হামিদ খান ইউসুফজয়ী। তাঁর কাহিনীকাব্য ‘উদাসী’ (১৯০০), ‘কিরণপ্রভা’ ও ‘অরুণভাতি’।

নওশের আলী খান ইউসুফজয়ী চিন্তাবিদ-সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ-গবেষণাগ্রন্থ ‘বঙ্গীয় মুসলমান’ (১৮৯১), কবিতা-সঙ্কলন ‘শৈশব-কুসুম’ (১৮৯৫)। রেয়াজউদ্দিন আহমদ ছিলেন ভাষাবিদ-সাহিত্যিক। কলকাতা আলিয়া মাদরাসার বাংলা ও সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপক ছিলেন, পরে হন দেলদুয়ার এস্টেটের ম্যানেজার। এ ছাড়া জড়িত ছিলেন সুধাকর দলের মুখপত্র ‘সুধাকর’-এর সঙ্গে। খ্রিস্টান মিশনারিদের বিভিন্ন তৎপরতার বিরোধী ছিলেন, বিশেষ করে লোকজনকে দলে-দলে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, কলমও ধরেছিলেন জোরেশোরে। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ—কৌমুদী, সুরিয়া বিজয়, সমাজ ও সংস্কারক, অগ্নিকুক্কুট। দুর্দান্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ ধর্মীয় বিতর্কগ্রন্থ ‘অগ্নিকুক্কুট’ খ্রিস্টান পাদরি-মিশনারিদের প্ররোচনায় বৃটিশ ভারত সরকার বেআইনি ঘোষণা করেছিল, দোকান ও ছাপাখানা-বাঁধাইখানা খুঁজে-খুঁজে বইয়ের কপি সংগ্রহ করে পুড়িয়ে দিয়েছিল বিভিন্ন প্রকাশ্য স্থানে।

দেলদুয়ারের গৌরব-গরিমা বিশ শতকের প্রথম দিকেও যথেষ্ট উজ্জ্বল ছিল মনে হয়। ‘বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস’ (নতুন সংস্করণ, ১৩১৭ বঙ্গাব্দ) গ্রন্থে দুর্গাচন্দ্র সান্যাল (১২৫৪ বঙ্গাব্দ – ?) আটিয়া পরগণার ইতিবৃত্তে লিখেছেন, “বর্ত্তমান জেলা মৈমনসিংহ মহকুমা টাঙ্গাইলের অন্তর্গত পরগণা আটিয়া একজন মুসলমান ফকীরের জাগীর ছিল। সেই পরগণার মধ্যে বাথুলির বিশ্বাসগণ সম্ভ্রান্ত তালুকদার ছিলেন। এই বিশ্বাসদের বাটীতে ‘কচুয়া’ নামে একটি দরিদ্র মুসলমান বালক গোরুর রাখালী করিত। রৌহার ভুবনেশ্বর ভট্টাচার্য্য এই বিশ্বাসদিগের মিত্র এবং জ্যোতির্বিদ পণ্ডিত ছিলেন। তিনি কচুয়াকে দেখিয়া তাহার সুলক্ষণ দৃষ্টে বলিলেন যে, ‘এই বালক রাজা হইবে। যদি বিশ্বাসেরা এখন ইহার উপকার করেন, তবে কচুয়া ও তদ্বংশীয় জমিদার দ্বারা বিশ্বাসদের বহু প্রত্যুপকার হইবে।” বিশ্বাসেরা এই কথা বিশ্বাস করিয়া কচুয়াকে পারসী পড়িতে দিল এবং নিজব্যয়ে তাহাকে এবং তাহার জননীকে পালন করিতে লাগিল। কচুয়া পারসী শিখিলে তাহার নাম ‘কচে আলি’ হইল। কচে আলি আটিয়ার ফকীরের চাকরী পাইল। ফকীরের অন্তিম সময়ে সে এবং তাহার মাতা ফকীরের যথাসাধ্য সেবা শুশ্রুষা করায় ফকীর তাঁহার সমস্ত সম্পত্তি কচে আলি ও তাহার মাতাকে দিয়াছিলেন। কিন্তু বাদশাহী সচিব কচে আলিকে নিষ্কর জাগীর ভোগ করিতে না দিয়ে পরগণার উপর মালগুজারী ধার্য্য করিলেন। তদবধি কচে আলি জমিদার হইয়া খাঁ উপাধি ধারণ করিলেন এবং বাথুলির বিশ্বাসদিগকে প্রধান কার্য্যকারক নিযুক্ত করিলেন। মোগল সম্রাটদের অধীনে কচে আলি খাঁর সন্তানেরা ফৌজদার ও মন্সবদার ছিলেন এবং আটিয়া পরগণার সীমা প্রচুর বৃদ্ধি করিয়াছিলেন। মুর্শিদকুলী খাঁর কঠোর মালগুজারী বন্দোবস্তে বাঙ্গালা ও বেহারের প্রায় সমস্ত মুসলমান জমিদারেরই জমিদারী নীলাম হইয়া গিয়াছিল; কিন্তু বাথুলির বিশ্বাসদের প্রযত্নে আটিয়ার জমিদারের সম্পত্তি রক্ষা পাইয়াছিল। দেলদুয়ারের মিঞারা সম্ভ্রান্ত সৈয়দ। তাঁহারা আটিয়ার খাঁদিগের দৌহিত্র সূত্রে এই বৃহৎ পরগণার কিয়দংশ পাইয়া জমিদার হইয়াছেন। ইংরেজ রাজত্বে আটিয়া পরগণার কতকাংশ ঢাকার নবাবদিগের অধিকারভুক্ত হইয়াছে। আর অল্প কিছু অংশ ধনবান্ হিন্দুরা খরিদ করিয়াছেন। পক্ষান্তরে আটিয়ার খাঁ সাহেবেরা অনেক অতিরিক্ত জমিদারী তালুক ইত্যাদি ক্রয় করিয়া সে ক্ষতিপূরণ করিয়াছেন। হিন্দুদের সহ এই বংশীয়দের যতদূর সদ্ভাব আছে এবং ছিল, অন্য কোন মুসলমান বড় মানুষের সহ হিন্দুদের ততদূর হয় নাই। আর দেলদুয়ারের মিঞাদের তুল্য সম্ভ্রান্ত মুসলমান বাঙ্গালা, বেহারা, উড়িষ্যার আর কোথাও দেখা যায় না। করটিয়ার মিঞারাই কচে আলি খাঁর পুত্রের বংশধর।”

মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭ - ১৯১২)

মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭ – ১৯১২)

উনিশ শতকের শেষ দিকে, ১৮৯৪-৯৫ সালে টাঙ্গাইলে ওকালতি পেশায় নিয়োজিত থাকাকালে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ শতকের শুরুতে দুর্গাচন্দ্র সান্যাল যখন ওই গ্রন্থ রচনা করেন বর্ধিষ্ণু দেলদুয়ারের ক্ষয়িষ্ণুতা শুরু হয়েছিল ওই সময় থেকেই। বাল্যকালে যে দেলদুয়ারকে আমি দেখেছি তা সমকালীন যাবতীয় উন্নয়ন থেকে ছিল যোজন দূরে। আমার কখনওই মনে হয় নি যে এখানে মীর মশাররফ হোসেন বাস করেছেন কিংবা এখানকার দুই জমিদার-ভ্রাতা ছিলেন বৃটিশ বঙ্গ সরকারের শীর্ষ ক্ষমতাবলয়ে অধিষ্ঠিত। সত্যি বলতে কী যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেলদুয়ার উপজেলা এখনও সবচেয়ে বেশি অনগ্রসর টাঙ্গাইল জেলার অন্যান্য উপজেলার তুলনায়।

এখন যে হাই স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কিছু পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ ইত্যাদি দেখা যায় তার কারণ জমিদারদের মেয়ের দিক থেকে এক জামাতা লে. করনেল এম. আতিকুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগ। আশির দশকের প্রথম দিকে তিনি সেনাপ্রধান থাকাকালে অবহেলিত ইউনিয়ন দেলদুয়ার প্রথমে থানা, তারপর মানউন্নীত থানা, শেষে উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে রাতারাতি। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা। আমাদের জমিজমা সম্পত্তির বেশির ভাগ অধিগৃহীত হয় বিভিন্ন সরকারি ভবন নির্মাণের স্থান হিসেবে।

Dilduar-Zamidarbari

দেলদুয়ার জমিদারবাড়ি

দেলদুয়ারে প্রথম উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে যিনি যান তিনি ছিলেন আমার হলমেট। ইংরেজি বিভাগের ছাত্র, মোহসিন হলে থাকতে আমাকে চিনতেন ভালভাবেই। দেলদুয়ার গিয়ে যখন শুনলেন আমি ওই গ্রামের সন্তান, তিনি বিশ্বাসই করলেন না। বললেন, এমন একটি গ্রামে সাযযাদ কাদিরের মতো একজনের জন্ম হতেই পারে না। তাঁকে চিনি ভালভাবে। মোহসিন হলে আমরা থেকেছি একই সময়ে। তখন তিনি সিনিয়র ছিলেন, আমি নবাগত।

পরে তিনি শর্ত দেন গ্রামের তরুণদের, তাঁকে যদি কোনও উপলক্ষে এখানে সশরীরে হাজির করতে পারো তবেই কেবল বিশ্বাস করতে পারি।

এরপর বিজয় দিবসের স্মরণিকা প্রকাশ উপলক্ষে আমাকে দেলদুয়ারে নিয়ে গিয়ে তাদের প্রমাণ করতে হয় আমি দেলদুয়ারের সন্তান।

ছোটবেলা থেকেই ১০১ রকম অসুখে ভুগে ওষুধ-ইনজেকশন-জ্বালা-যন্ত্রণা-রোগশয্যায় অভ্যস্ত থাকলেও ১৯৫৯ সালে স্ট্রং ডায়রিয়ায় ভুগতে-ভুগতে আমার বেঁচে ওঠাটা সত্যিই ছিল বিস্ময়কর। বিছানায় লেপটে থাকতে-থাকতে শুকিয়ে হয়ে যাই রোগা টিঙটঙে, লিকলিকে। ‘তালপাতার সেপাই’, ‘প্যাঁকাটি’—এ সব নামকরণ আমার সেই থেকে। ‘পাটখড়ি’কে যে ‘প্যাঁকাটি’ বলে অনেকে তা জানলাম ওই সময়।

কলেরার নামে সেকালে জনমনে ছিল ভয়ঙ্কর আতঙ্ক। লোকজন আক্রান্তদের বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষতো না কোনও না কোনও ভাবে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কায়। ফলে আমরা এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম সমাজ থেকে। এর মধ্যেই আমাকে দেখতে আসেন স্কুলের বিদায়ী প্রধান শিক্ষক দানেশ স্যার ও নবাগত প্রধান শিক্ষক নিজামউদ্দিন স্যার। দানেশ স্যার আমার পিতামহের ছাত্র, তাঁর বড় ছেলে মাহফুজ সিদ্দিকী খ্যাতনামা সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। আমাদের বিন্দুবাসিনী স্কুল ছেড়ে তিনি যোগ দেন শিবনাথ স্কুলে। অন্যদিকে ভুঞাপুর স্কুল ছেড়ে আসেন নিজামউদ্দিন স্যার। তিনি সম্পর্কে আত্মীয় আমাদের। তাঁর বড় ছেলে আমার ফুফা (বাবার চাচাতো বোনের স্বামী), ছোট ছেলে সহপাঠী। মনে আছে কাগজের বড় ঠোঙায় তাঁরা আমার জন্য এনেছিলেন কমলা, আঙুর, আপেল ও নাশপাতি।

সাগু-বারলি-শটি-জাউ ইত্যাদির পাশাপাশি ভাল-মন্দ খেয়ে-খেয়ে গায়েগতরে কিছু বল যেন পাই ক্রমে। ধীরে-ধীরে চেষ্টা করি উঠে বসতে। একদিন উঠেও বসি। তারপর কাঁপতে-কাঁপতে দাঁড়াই কোনও মতে, চেষ্টা করি হাঁটতে। কিন্তু শরীরে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে-ফিরতে দেরি হয় আরও ১০-১২ দিন। আমি প্রচণ্ড অধীর হয়ে উঠেছিলাম ভেতরে-ভেতরে। স্কুল, খেলার মাঠ, বন্ধু সাথি, সহপাঠী আর আউট বইয়ের জন্য। স্যারেরা অবশ্য সঙ্গে করে এনেছিলেন আমার পুরস্কার পাওয়া কিছু আউট বই।

আমি অসুস্থ থাকাকালে আয়োজন করা হয়েছিল চার বছর ধরে বন্ধ থাকা ‘বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে’র। ক্লাশ ফাইভে সেকেন্ড বয়, সিক্স সেভেন এইটে ফার্স্ট বয়ের পুরস্কার ছাড়াও পেয়েছিলাম চার বছর ধরে ক্লাশে সবচেয়ে বেশি উপস্থিতির পুরস্কার। একটি-দু’টি করে বই লাল ফিতায় বাঁধা, সঙ্গে টাইপ করা কার্ড, ভেতরে কোনও স্যারের হাতে লেখা বিবরণ—মনে আছে এখনও সব। রোগশয্যায় শুয়ে-শুয়ে কত বার পড়েছি আতোয়ার রহমানের ‘সাঁঝের বেলার রূপকথা’, বন্দে আলী মিয়ার ‘গুপ্তধন’ ও ‘শিয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা’, মবিনউদ্দীন আহমদের ‘গহন বনে রত্নাগার’ ও ‘কুদরৎ খাঁর ভিটে’ এবং আরও কী-কী বই।

সাযযাদ কাদির, বঙ্গবন্ধু সেতুর কাছে, জুন ১৯৯৮

সাযযাদ কাদির, বঙ্গবন্ধু সেতুর কাছে, জুন ১৯৯৮

তবে বিন্দুবাসিনী স্কুল থেকে পুরস্কার পাওয়া সেই শেষ নয়। ২০০৫ সালে স্কুলের ১২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আমাকে দেয়া হয় ১২৫ বছরের ছাত্রদের মধ্যে সেরা সাংবাদিকের পুরস্কার। প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক বদিউজ্জামান (জাদু ভাই) অথবা বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সাংবাদিক মাহফুজ সিদ্দিকী এ পুরস্কারটি পেলে আমি অবশ্য খুশি হতাম সবচেয়ে বেশি।

তারপর এক বিকালে ফেলে আসা জীবনে ফিরে যাওয়ার অধীরতায় বেরিয়ে পড়ি রোগশয্যা ছেড়ে স্কুলের কাছে পুলিশ প্যারেড গ্রাউন্ড—আমাদের খেলার মাঠের দিকে। তখনও স্কুল-অফিস ছুটি হয় নি, বউ-ঝিরা দ্বিপ্রাহরিক অবসরে, পাড়া ফাঁকা, রাসতা জনশূন্য। হাঁটতে-হাঁটতে চলে যাই রেজেস্ট্রি পাড়ার কাছাকাছি। হঠাৎ আমাকে দেখে ‘ভূত’ ‘ভূত’ বলে দৌড়ে পালায় দুই বামন যমজ ভাই রবি ও কৃষ্ণ। (ওদের একজন শহিদ হয়েছে একাত্তরে।)

বুঝতে পারি আমার মৃত্যুসংবাদ পাড়ায় চাউর হয়েছে ভালভাবেই। হতাশ হয়ে, বিষণ্ন মনে, ফিরে আসি বাড়িতে।

About Author

সাযযাদ কাদির
সাযযাদ কাদির

কবি ও বহুমাত্রিক লেখক। জন্ম: ১৯৪৭, টাঙ্গাইল। পেশা: সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা। সাবেক সহকারী সম্পাদক, বিচিত্রা; দৈনিক সংবাদ। ভাষা-বিশেষজ্ঞ, রেডিও পেইচিং, গণচীন। পরিচালক, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট। বই— কবিতা: যথেচ্ছ ধ্রুপদ; রৌদ্রে প্রতিধ্বনি; দূরতমার কাছে; দরজার কাছে নদী; এই যে আমি; জানে না কেউ; বিশ্ববিহীন বিজনে; মণিমালা সিরিজ; বৃষ্টিবিলীন; কবিতাসংগ্রহ। গল্প: চন্দনে মৃগপদচিহ্ন; অপর বেলায়; রসরগড়; গল্পসংগ্রহ। উপন্যাস: অন্তর্জাল; খেই; অনেক বছর পরে; জলপাহাড়: চার চমৎকার; আঁচ। প্রবন্ধ-গবেষণা: ভাষাতত্ত্ব পরিচয়; হারেমের কাহিনী: জীবন ও যৌনতা; রবীন্দ্রনাথ: মানুষটি; রবীন্দ্রনাথ: শান্তিনিকেতন; বাংলা আমার; সহচিন্তন; বিচলিত বিবেচনা; চুপ! গণতন্ত্র চলছে...; ম্যাঙ্গো পিপল উবাচ; সহস্রক; রমণীমন; রাজরূপসী; নারীঘটিত; সাহিত্যে ও জীবনে রবীন্দ্র-নজরুল। শিশুতোষ: মনপবন; রঙবাহার;এফফেনতি; উপকথন; উপকথন আরও; উপকথন আবারও; উপকথন ফের; উপকথন তেপান্তর; উপকথন চিরদিনের; ইউএফও: গ্রহান্তরের আগন্তুক; সাগরপার; মহাবীর হারকিউলিস; জানা-অজানা বাংলা; তেনালি রামন। ভাষান্তর: লাভ স্টোরি; রসচৈনিক। স্মৃতিকথা: নানা রঙের দিন। সম্পাদনা: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা; দুষ্প্রাপ্য প্রবন্ধ; এই সময়ের কবিতা; এই সময়ের কবিতা ২০১৪; এই সময়ের কবিতা ২০১৫; শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেমের কবিতা।