page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

‘দ্য জাঙ্গল বুক’—নতুন মোগলি, নতুন শেরে খান

দ্য জাঙ্গল বুক সিনেমা রিলিজড হইছে ২০১৬ এর ১৫ এপ্রিল। যখন জানলাম জাঙ্গল বুক নিয়ে নতুন থ্রিডি সিনেমা হচ্ছে তখনই ঠিক করে রাখছিলাম দেখব। রুডইয়ার্ড কিপলিং এর দ্য জাঙ্গল বুক বইটা পৃথিবীতে বাচ্চাদের জন্য লেখা সবচেয়ে জনপ্রিয় বইগুলির একটা। সম্ভবত দ্য জাঙ্গল বুক-ই সারা পৃথিবীতে বাচ্চাদের জন্য লেখা ফ্যান্টাসি ধরনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সবচেয়ে বেশিবার পড়া বই। হ্যারি পটার সিরিজের পর দ্য জাঙ্গল বুক হয়ত দ্বিতীয় অবস্থানে চলে গেছে।

১৮৯৪ সালে কিপলিং দ্য জাঙ্গল বুক লেখছিলেন। সিনেমা ও টিভি শুরু হওয়ার পরে প্রোডাকশন হাউজ ডিজনি এই বই থেকে এত ছবি, এনিমেশন, টিভি সিরিজ তৈরি করে আসছে যে প্রায় সব জেনারেশনের বাচ্চাদের কাছেই পরিচিত এবং তাদের পছন্দের। দ্য জাঙ্গল বুকের কাহিনীই এমন, বাচ্চাদের সাথে সাথে বড়রাও পছন্দ করে। এই গল্পের মোগলিকে সবাই চিনে!

jungle-876

দ্য জাঙ্গল বুক বই পড়ছি। অনেক আগে দ্য জাঙ্গল বুক-এর অ্যানিমেশন বা কার্টুন দেখতাম। সাহারা ওয়ান নামের একটা ইন্ডিয়ান টিভি চ্যানেলে প্রতিদিন সকাল আটটা অথবা সাড়ে আটটায় দেখাইত। এরপর একটা আমেরিকান টিভি সিরিজও দেখছিলাম। টিভি সিরিজটার কাহিনী কার্টুনের থেকে আলাদা ছিল এটা মনে আছে। এবারের দ্য জাঙ্গল বুকের ট্রেলার সুন্দর, ট্রেলার দেখে মনে হইছে ছবিও সুন্দর হবে।

এইবারের জাঙ্গল বুক দেখার জন্য ছবি মুক্তির প্রথম দিন যেয়ে টিকেট পাই নাই। এরপর আরেকদিন দেখার কথা ঠিক করলেও বৃষ্টির কারণে হয় নি। বাসায় দেখতে হইলে ভালো প্রিন্টের জন্য অনেক দেরি করতে হবে জানতাম। ছবি মুক্তির দেড় মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, তখন আমি ‘নাউ অর নেভার’ সাইকোলজি থেকে দ্য জাঙ্গল বুক দেখার ডিসিশন নিলাম।

বিকালের রাস্তায় অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি জ্যাম আর সিএনজি পাওয়া যায় না, এই কারণে আমার ‘নাউ অর নেভার’ মানসিকতা আরো দৃঢ় হইল। স্বাভাবিকভাবেই বেশি ভাড়া দিয়ে একটা সিএনজি পাওয়া গেল, এবং আরো স্বাভাবিক ভাবেই ছবি শুরু হওয়ার ১৬ মিনিট পরে আমি হলে ঢুকতে পারলাম।

movie-review-logo

ছবির শুরু হয় একটা বাচ্চা ছেলে খালি গায়ে জঙ্গলের মধ্যে খুব জোরে দৌড়াচ্ছে। কয়েকটা নেকড়ে পিছন থেকে দৌড়ায়ে এসে ছেলেটারে পার হয়ে যায়। ছেলেটা গাছে উঠে লাফ দিয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যাওয়ার সময় ডাল ভেঙে পড়ে যায়। একটা প্যান্থার অর্থাৎ কালো রঙের চিতা এসে ছেলেটাকে থাবা দিয়ে ধরে। এই কালো চিতার নাম বাঘিরা।

বাঘিরা ছেলেটাকে বলে, তোমার মত এত অপদার্থ নেকড়ে আমি জীবনে দেখি নাই। জন্ম থেকে তুমি নেকড়ে না হও, অন্তত নেকড়ের মত হওয়ার চেষ্টা তো করতে পারো।

ছেলেটা হাসতে হাসতে বলে, ডাল না ভাঙলে আমি পারতাম, তুমি ধরতে পারতা না। দুজন হাঁটতে থাকে।

jungle-31

বাঘিরা তখন বর্ণনা করতে থাকে, অনেকদিন আগে সে এই মানুষের বাচ্চাটাকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাইছিল। সে এই বাচ্চাটাকে নিয়ে আইসা একটা নেকড়ে পরিবারের কাছে দেয়। সেই দলের প্রধান নেকড়ের নাম আকিলা। মা নেকড়ের নাম রাকশা। রাকশার নেকড়ের বাচ্চাগুলির সাথে এই মানুষের বাচ্চাটাও বড় হয়।

প্রচণ্ড গরম আর সূর্যের তাপ। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যে নদী গেছে সেটার পানি প্রায় শুকিয়ে গেছে। জঙ্গলের পশুপাখিরা খুব কষ্টে আছে। নদীর একটা জায়গায় যে সামান্য পানি আছে সেই জায়গায় জঙ্গলের সব জন্তুরা পানি খেতে আসছে। নেকড়ের দলের সাথে সেই মানুষের বাচ্চাটিও আসছে। রাকশা তাকে সাবধান করে দেয়—জঙ্গলের অনেকেই মানুষের বাচ্চাকে আগে কখনো দেখে নাই, ভদ্রভাবে থাকবা।

সবাই যখন যার যার মত পানি খাচ্ছে তখন বাঘের গর্জন শোনা যায়। আকিলা সেই মানুষের বাচ্চাটাকে ডাক দেয়, সে কাছে আইসা নিজেকে আড়াল করে।

সব জন্তুই তটস্থ হয়ে যায়। একটা বাঘ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার আসে। তার মুখে আগুনে পোড়ার দাগ। এর নাম শেরে খান। সেও পানি খাইতে আসছে। সে পানি খাওয়ার পর গম্ভীর ভঙ্গিতে পায়চারি করতে করতে বলে, আমি অদ্ভুত কিছু একটার গন্ধ পাচ্ছি। মানুষের বাচ্চার গন্ধ এ রকম। আমি কয়েকদিন জঙ্গলে ছিলাম না আর সবাই জঙ্গলের নিয়ম ভুলে গেছে!

আকিলা বলে, মোগলি আমাদের অংশ, আমাদের সন্তান। তখন শেরে খান খুব সার্কাস্টিক টোনে বলে, মোগলি! নামও রাখা হয়ে গেছে!

এই পাঁচ ছয় বছরের মানুষের বাচ্চা মোগলিই দ্য জাঙ্গল বুকের নায়ক। সে এই জঙ্গলে নেকড়েদের কাছে বড় হইছে। সে কখনো কোনো মানুষ দেখে নাই, এই জঙ্গলের বাইরেও কোনোদিন যায় নাই।

শেরে খান জঙ্গলের নিয়মের ব্যাপারে খুবই কনজার্ভেটিভ। সে আকিলাকে বলে, আমার চেহারা দেখেও তোমাদের মনে পড়ে না মানুষ কী করতে পারে? মানুষের বাচ্চা বড় হয়ে মানুষই হবে। শেরে খান নেকড়েদের জানায় দেয় মোগলিকে তার হাতে তুলে না দিলে সে নেকড়েদেরকে আক্রমণ করবে।

jungle-32

“শেরে খান জঙ্গলের নিয়মের ব্যাপারে খুবই কনজার্ভেটিভ। “

এক সময় জঙ্গলে প্রচণ্ড বৃষ্টি নামে। নেকড়েরা চিন্তা করতে থাকে মোগলিকে নিয়ে কী করবে। কোনো কোনো নেকড়ে চায় মোগলি জঙ্গলের বাইরে মানুষের গ্রামে, মানুষের কাছে চলে যাক। রাকশার কাছে মোগলি তার একজন সন্তান, সে চায় না মোগলি এখান থেকে অন্য কোথাও যাক। আকিলা বুঝতে পারে না কী করবে। মোগলি নিজেই এসে বলে সে জঙ্গলের বাইরে চলে যাবে, সে চায় না তার জন্য কারো বিপদ হোক।

আকিলা রাকশাকে বলে জঙ্গলের বাইরে যাওয়াই মোগলির জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

এই সময় বাঘিরা এসে বলে সে মোগলিকে জঙ্গলের বাইরে পৌঁছায় দিবে। মোগলি বাঘিরার সাথে যাত্রা শুরু করে।

হাঁটতে হাঁটতে মোগলি বাঘিরাকে বলতে থাকে, তুমিই তো আমাকে বলতা মানুষদের গ্রামের কাছে যেন না যাই, এখন আবার তুমিই বলতেছো মানুষদের গ্রামে যাইতে।

jungle-36

“এই জঙ্গল, জঙ্গলের নদী সবকিছু হাতিরা গড়ে তুলছে। তাদেরকে সম্মান না দিলে তারা অসন্তুষ্ট হয়।”

বাঘিরা বলে, আমার মনে আছে কী কী বলতাম। হঠাৎ সামনে দিয়ে একপাল হাতি যাইতে দেখে মোগলি খুশিতে চিৎকার দেয়, হাতি!

বাঘিরা মাথা নত করতে করতে মোগলিকেও বলে হাতিদের দেখলে মাথা নত করতে। এই জঙ্গল, জঙ্গলের নদী সবকিছু হাতিরা গড়ে তুলছে। তাদেরকে সম্মান না দিলে তারা অসন্তুষ্ট হয়।

তারা দুজন এক খোলা জায়গায় এসে পৌঁছায়, অনেক বুনো মহিষ চরতেছে সেখানে। হঠাৎ মহিষেরা দৌড়াতে শুরু করে, বাঘিরা টের পায় শেরে খান আসছে। মোগলিকে পালাতে বলে সে যায় শেরে খানের সাথে মারামারি করতে। শেরে খানের সাথে বাঘিরা পারে না। বাঘিরাকে ফেলে শেরে খান মোগলিকে তাড়া করতে থাকে, মোগলিও যত জোরে পারে দৌড়াতে থাকে। দৌড়াতে দৌড়াতে মোগলি এক সময় পাহাড়ের খাদের কিনারে চলে আসে, পিছনে শেরে খান। মোগলি নিচে লাফ দেয়। শেরে খান খাদের কিনারে এসে দাঁড়ায়। পাহাড়ের নিচে, মোগলি যেখানে পড়ে গেছে, সেই পথ দিয়ে এক পাল বুনো মহিষ প্রচণ্ড জোরে দৌড়ে যাচ্ছে। যে কোনো সময় মোগলি তাদের পায়ের নিচে পড়তে পারে, তাছাড়া যে কোনো সময় শেরে খানও নেমে আসতে পারে। কোনো উপায় না দেখে মোগলি লাফ দিয়ে একটা মহিষের শিং ধরে ঝুলে পড়ে। মহিষের শিং ধরে ঝুলে থেকে মোগলি যখন চলে যাচ্ছে, শেরে খানের সাথে তার চোখাচোখি হয়।

এই ঘটনার সময় যেখানে ছবি দেখছিলাম সেখানের পরিবেশ নিয়ে একটু বলি। যেহেতু রিলিজের অনেক পরে গেছি ছবি দেখতে, আমি ধরেই নিছিলাম ভিড় একদম কম থাকবে। ভিড় বেশি না থাকলেও মোটামুটি ছিল। কিন্তু যারা ছিল তাদের অধিকাংশই বাচ্চা, পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চা। ছবির শুরু থেকেই তাদের কথা, আওয়াজ, চিৎকার, উপর থেকে নিচে, নিচ থেকে উপরে যাওয়া সবকিছু মারাত্মক ডিস্টার্বিং মনে হচ্ছিল।

যখন মোগলি লাফ দিয়ে মহিষের শিং ধরে ঝুলে পড়ে, ঠিক তার আগে এক ছেলে বাচ্চা চিৎকার করে বলতেছিল, এখন লাফ দিয়ে একটা গণ্ডারের শিং ধরবে। ট্রেলারের কারণে এইটা হয়ত অনেকেরই আগে থেকে জানা। আবার, বাঘিরা যখন দুই পাহাড়ের মাঝখানের ফাঁকা জায়গা লাফ দিয়ে পার হচ্ছিল, তখন আরেকজন হাসতে হাসতে জোরে বলতেছিল, আমিও পারব লাফ দিতে। এই রকম কয়েক বার হইছে, আর বেশিরভাগ সময়ই নিজেরা নিজেরাই কথা বলতেছিল। আমি বিরক্ত হয়ে ভাবতেছিলাম এদের কেন যে ছবি দেখাইতে নিয়া আসছে, নিজেরা তো কাহিনীতে ঢুকতে পারবেই না… অন্যদেরও দেখতে দিবে না। ইন্টারভ্যালের সময় আলো জ্বলে উঠলে আমি আশে পাশে তাকায়া দেখি আমি অন্ধকারে যা অনুমান করছিলাম তার তিনগুণ বাচ্চা, সব চার-পাঁচ বছরের। সবাই কিচির-মিচির করতেছে। আমি চিন্তা করতেছিলাম, আমি শেষের দিকে আজকে দেখতে আসলাম, আর ঠিক আজকেই এই বাচ্চারা আসছে!

jungle-33অল্প যে কয়জন টিনেজ ছিল, বলা যায় তারা আমার মতই আইডিয়াল অডিয়েন্স। বড়দেরও ডিস্টার্বিং মনে হচ্ছিল। কেউ কথা বলতেছিল। আমার নিচের সারির কেউ কেউ ফোনে ব্রাউজ করতেছিল, বা নিজেদের ছবি তুলতেছিল; আর ফোনের আলো আইসা পড়তেছিল আমার চশমার কাচে।

মোগলি শেরে খানের হাত থেকে পালায়ে বাঁচার পর শেরে খান চলে যায় নেকড়েদের কাছে। খুব শান্ত ও ধীরস্থিরভাবে আকিলাকে বলে, তুমি জানো আমি এখানে কেন আসছি।

আকিলা শেরে খানকে বলে মোগলি জঙ্গল ছেড়ে চলে গেছে।

শেরে খান আনপ্রেডিক্টেবল ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়ে আকিলাকে পাহাড় থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলে। আকিলা মারা যায়।

অন্যদিকে মোগলি একা একা জঙ্গলের অন্য সাইডে চলে আসে। সেখানে কা নামের এক বিরাট অজগরের সাথে দেখা হয়। মোগলি শুরুতে তাকে দেখে না, আড়াল থেকে কথা বলা শুরু করে কা। মোগলিকে জিজ্ঞেস করে একা একা এখানে সে কী করছে? খুব মিষ্টি গলায় কা মোগলিকে বলতে থাকে তার কোনো ভয় নেই, কা তাকে রক্ষা করবে, দেখেশুনে রাখবে। আস্তে আস্তে আড়াল থেকে মাথা বের করে আনে কা নামের এই অজগর।

jungle-3

“অজগরের জ্বলজ্বলে চোখে মোগলি দেখতে পায় তার অতীতের কাহিনী।”

মোগলি জন্মের পর কীভাবে এই জঙ্গলে আসল সেই কথা মোগলিকে বলতে শুরু করে। কা মোগলিকে তার চোখের দিকে তাকাতে বলে। কা বলতে থাকে মানুষ সবসময় জঙ্গলের বাইরেই থাকে, কিন্তু কখনো কখনো মানুষ জঙ্গলে আসে। কখনো কখনো তারা জঙ্গলে এসে জঙ্গলের ক্ষতি করে, তারা সাথে করে একটা জিনিস নিয়ে আসে, সেইটা জঙ্গলকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। সেটার নাম রেড ফ্লাওয়ার। আগুনকে জঙ্গলের জন্তুরা রেড ফ্লাওয়ার নামে ডাকে।

অজগরের জ্বলজ্বলে চোখে মোগলি দেখতে পায় তার অতীতের কাহিনী। এক লোক তার ছোট বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে জঙ্গলের প্রান্তের দিকের একটা গুহায় ছিল। শেরে খান সেই গুহায় যেয়ে আক্রমণ করে, সেই শিশুর বাবাকে মেরে ফেলে। সেই লোকটি মারা যাওয়ার আগে আত্মরক্ষার জন্য তার হাতের মশাল দিয়ে শেরে খানের মুখ পুড়িয়ে দেয়। শেরে খান আহত হয়ে সেখান থেকে চলে আসে। বাচ্চাটি সেখানেই থেকে যায়। সেই বাচ্চাটিই মোগলি। বাঘিরা তাকে পেয়েছিল।

এই গল্প বলতে বলতে কা হিপনোটাইজ করে মোগলিকে পেঁচিয়ে ধরে। মোগলিকে তখন একটা ভালুক এসে বাঁচায়। ভালুকের নাম বাল্লু।

jungle c36

বাল্লু মোগলিকে বলে সে যেহেতু তাকে উদ্ধার করেছে মোগলিকে তার ঋণ শোধ করতে হবে। পাহাড়ের উপরের মৌচাক থেকে মোগলিকে মধু নামিয়ে দিতে হবে। মোগলির সাথে বাল্লুর বন্ধুত্ব হয়। মোগলি তাকে জানায় শেরে খান তার পিছে পড়েছে এবং সে মানুষের গ্রামে ফিরে যাবে, সে বাঘিরার জন্য অপেক্ষা করছে।

বাল্লু তাকে জঙ্গলের শেষ প্রান্তে মানুষের গ্রামের কাছে নিয়ে যায়। রাতের বেলা দূর থেকে মোগলি দেখে মানুষের গ্রামে আগুনের কুণ্ডলি জ্বলছে। মোগলিরও সেখানে যাইতে মন চায় না, বাল্লুও তাকে বলে এখানে তার সাথে থাকতে। বাল্লু বলে যদি মোগলির ভালো না লাগে তাহলে বাল্লু নিজে যেয়ে মোগলিকে ওখানে দিয়া আসবে।

অন্যদিকে শেরে খান রাকশার অন্য বাচ্চাদেরকে পাহাড়ের ওপর বসে বসে কোকিলের গল্প শোনায়। কোকিল অন্য পাখির বাসায় ডিম পাড়ে। সেই পাখি কোকিলের বাচ্চাকে নিজের বাচ্চা মনে করে বেশি বেশি খাবার দেয়, যত্ন নেয় অথচ সেই পাখির নিজের বাচ্চারা খাবারের কষ্টে মারা যায়। রাকশা আইসা তার বাচ্চাদের নিয়ে যায় শেরে খানের কাছে থেকে।

বাল্লুর সাথে মোগলির আনন্দে সময় কাটতে থাকে। বাঘিরা ফিরে আসে। বাঘিরা বাল্লুকে বোঝায় জঙ্গলে থাকা মোগলির জন্য বিপদজনক, বাল্লু যাতে তাকে আর উৎসাহ না দেয় এখানে থাকার জন্য। বাঘিরা মোগলিকে জোর করতে থাকে জঙ্গল ছেড়ে যাওয়ার জন্য।

হাতিদের গর্জন শুনে মোগলি যেয়ে দেখে একটা বাচ্চা হাতি গর্তে পড়ে গেছে, সে উঠতে পারতেছে না, হাতিরা গর্তের উপরে অসহায়ভাবে দাঁড়ায় আছে। মোগলির বুদ্ধি এবং সাহায্যের কারণে বাচ্চা হাতিটা গর্ত থেকে উঠে আসতে পারে।

বাল্লুর মন নরম, মোগলির প্রতি তার মায়া জন্মাইছে। তবু সে মোগলিকে মিথ্যা কথা বলে। বলে, আমি চাই না তুমি এখানে থাকো, আমি তো কখনোই তোমাকে বন্ধু ভাবি নাই। আমি তোমার একটা উপকার করছি, তুমি আমার একটা উপকার করছ। ব্যস, দ্যাটস ইট।

junglebook-9

“এক বানর মোগলিকে ছুঁড়ে মারে, আরেক বানর ক্যাচ ধরে আবার ছুঁড়ে মারে, আবার আরেক বানর ক্যাচ ধরে…”

মোগলি মন খারাপ করে গাছের উপর বসে থাকে। তখন বানরেরা মোগলিকে তুলে নিয়ে যায়। এক বানর মোগলিকে ছুঁড়ে মারে, আরেক বানর ক্যাচ ধরে আবার ছুঁড়ে মারে, আবার আরেক বানর ক্যাচ ধরে… এভাবে অনেক বানর হাত বদল করে  মোগলিকে তারা নিয়ে যায় মাংকি টেম্পলে।

পাহাড়ের উপরে পুরাতন একটা ভগ্ন বাড়ি। নিচ থেকে বাঘিরা আর বাল্লু মাংকি টেম্পলের দিকে দৌড়ে, পাহাড় বেয়ে আসতে থাকে। মাংকি টেম্পলের ভিতরে মোগলিকে নিয়ে যায় বানরেরা। টেম্পলের ভিতরে অনেক ফল, ভাঙা ধাতব জিনিসপত্র ছড়ানো ছিটানো। বানরদের রাজা, বিরাটাকারের আরেক বানর কিং লুই বের হয়ে আসে। মোগলিকে তার সামনে রাখে বানরেরা। কিং লুই মোগলিকে বলে সে মোগলির সব জানে, শেরে খান তাকে খুঁজতেছে। মোগলি জিজ্ঞেস করে সে কীভাবে জানে, কিং লুই বলে, জঙ্গলের সব খবর তার কাছে পৌঁছায়। কিং লুই বলে, বয়, আই গট ইয়ারস, মাই ইয়ারস গট ইয়ারস।

ততক্ষণে বাল্লু আর বাঘিরা এসে পৌঁছায়। বানরেরা ঘিরে ধরে বাল্লু আর বাঘিরাকে। কিং লুই মোগলিকে বলে তার কাছে সব আছে, অনেক সম্পত্তি তার। কিন্তু একটা জিনিস নাই, সেটা রেড ফ্লাওয়ার। মোগলিকে রেড ফ্লাওয়ার আইনা দিতে হবে। রেড ফ্লাওয়ার আইনা দিলে কিং লুই মোগলিকে সাহায্য করবে। মোগলি তার প্রস্তাবে রাজি না হয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। কিং লুই মোগলিকে ধাওয়া করে, মোগলি ভাঙা টেম্পলের পিলারগুলির আড়ালে আশ্রয় নিতে থাকে। বিশালাকারের কিং লুই মোগলিকে খুঁজতে থাকে, মোগলিকে উদ্দেশ্য করে বলে বাঘিরা আর বাল্লু তাকে শেরে খানের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না, আকিলাকে শেরে খান অলরেডি মেরে ফেলছে। মোগলিকে ধরার জন্য কিং লুই তাড়া করতে থাকে, পুরাতন মাংকি টেম্পল ভেঙে পড়ে কিং লুই’র উপরে। মোগলি লাফ দিয়ে বের হয়ে আসে।

মোগলি কাঁদতে কাঁদতে বাঘিরাকে জিজ্ঞেস করে আকিলার কথা। মোগলি ঠিক করে সে আকিলাকে হত্যা করার প্রতিশোধ নিবে। দৌড়ে জঙ্গলের শেষ প্রান্তে যেয়ে মানুষের গ্রাম থেকে মশালে করে আগুন নিয়ে আসে। জঙ্গলে মশাল দেখে সব জন্তুরা তটস্থ হয়ে ওঠে, তারা ধারণা করে কোনো মানুষ প্রবেশ করেছে জঙ্গলে। সব পশুপাখি নিজেদের বাচ্চা সহ নদীর ধারে এসে আশ্রয় নেয়। সব পশুপাখির সামনে এসে মোগলি চিৎকার করে বলতে থাকে, শেরে খান, আমি তোমাকে ভয় পাই না, আর কারোও তোমাকে ভয় পাওয়ার দরকার নাই।


দ্য জাঙ্গল বুক এর অফিসিয়াল ট্রেইলার, ইউটিউব লিংক

কিন্তু মোগলি খেয়াল করে নি তার দৌড়ে আসার সময় তার মশাল থেকে একটু আগুন পড়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে জঙ্গলে আগুন লেগে যায়। শেরে খান এসে পিছনে তাকাতে বলে। সেই দিকে দেখিয়ে শেরে খান বলে, মানুষের বাচ্চা শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়ে গেছে। মোগলিকে বলে সবাইকে তোমার আসল রূপ দেখায় দাও। জঙ্গলে আগুন লাগার জন্য মোগলি কিছুটা অপরাধবোধে ভূগতে থাকে। সে হাতের মশাল ছুঁড়ে ফেলে নদীতে। মোগলি বলে, আমি এখান থেকে কোথাও যাব না, এই জঙ্গলই আমার ঘরবাড়ি।

শেরে খান মোগলিকে আক্রমণ করবে এমন সময় বাল্লু বাঁধা দেয়। বাল্লুর সাথে লড়াইয়ের সময় নেকড়ের দল শেরে খানকে আক্রমণ করতে ছোটে। মোগলিও তাদের সাথে ছুটতে গেলে বাঘিরা এসে তাকে আটকায়, বলে, তুমি নেকড়ের সাথে আক্রমণ করতে পারবা না, কারণ তুমি নেকড়ে না, তুমি মানুষের বাচ্চা, মানুষের মত লড়াই করো। জঙ্গলের যে অংশে আগুন লাগছে, মোগলি সেইদিকে দৌড় দেয়।

বাল্লু আর নেকড়ের দলকে পরাজিত করে শেরে খানও মোগলির পিছনে দৌড়ে যায়। মোগলির পিছনে পিছনে সেও গাছে ওঠে। মোগলি এক গাছ থেকে লাফিয়ে আরেক গাছে যেয়ে ফাঁদ তৈরি করে। শেরে খানও মোগলিকে তাড়া করে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যেতে থাকে। এক সময় শেরে খানকে মোগলি বোকা বানায়। শেরে খান আগুনের মধ্যে পড়ে যায়।

এরপর মোগলির নির্দেশে হাতিরা নদীর মুখে বাঁধ দেয়, নদীর পানি সারা জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ে, আগুন নিভে যায়।

মোগলি বাল্লু আর বাঘিরার সাথে রাকশার কাছে ফিরে যায়। এই দৃশ্যটুকু সুন্দর। রাকশার সব সন্তানদের মধ্যে একটা নেকড়ে মোগলি যাওয়ার পর থেকেই খুব মন খারাপ করে থাকত, খেলত না, চুপ করে বসে থাকত। অন্য নেকড়ে বাচ্চারা যখন খেলতেছে, সে চুপ করে বসে আছে, হঠাৎ মোগলিকে আসতে দেখে সে খুব আনন্দিত হয়ে বলে ওঠে, মোগলি ইজ ব্যাক!

মোগলি চরিত্রে অভিনয় করছে ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান এক বালক, নীল শেঠি। সে অসাধারণ। মোগলি চরিত্রে এর চেয়ে ভালো আর হয় না। সে পারফেক্ট। একটা আট-নয় বছরের বাচ্চা যেরকম স্বতঃস্ফূর্ত, জেদি, আশেপাশের প্রতি কিছুটা অমনোযোগী আবার একইসাথে ভালনারেবল—সবই আছে নীলের মধ্যে। হাতিদের দেখে চিৎকার করে ওঠা, আকিলার মারা যাওয়ার খবর শুনে কাঁদতে কাঁদতে বাঘিরাকে বকতে থাকা, আগুনের মশাল নিয়ে এসে শেরে খানকে ডাক দেওয়া, লাফ দিয়ে মহিষের শিং ধরার পর শেরে খানের সাথে তার চোখাচোখি—সব কিছুতে তার এক্সপ্রেশন খুবই দারুণ।

niell-shethi

“মোগলি চরিত্রে অভিনয় করছে ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান এক বালক, নীল শেঠি। সে অসাধারণ। “

ছবিতে দেখানো পশুপাখিগুলি কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজ। এই কাজ অনেক ভালো মনে হইছে, একবারও অ্যানিমেশন মনে হয় নাই।

শেরে খানের ব্যক্তিত্ব স্পষ্ট, বাল্লু অনেক হিউমারাস, বাঘিরা অনেক বিচক্ষণ। সবাই পারফেক্ট।

আর জঙ্গলও কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজ, জঙ্গলের ইমেজও পশুপাখির মত নিখুঁত। না জানা থাকলে বেশিরভাগই মনে করবে আসল জঙ্গল।

তবে জঙ্গলের স্পেস অনেক ছোট মনে হইছে। আরো বেশি স্পেস ব্যবহার করে বা পাহাড় কম দেখায়ে ল্যান্ডস্কেপ বেশি দেখাইয়া বা অন্য কোনোভাবে হয়ত জঙ্গল অনেক বড় দেখানো যাইত।

ছবিতে পশুদের জন্য ভয়েস দিছেন হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতারা। শেরে খানের ভয়েস দিছেন ইদ্রিস এলবা, বাঘিরার ভয়েস বেন কিংসলে, অজগর কা এর ভয়েস স্কারলেট জোহানসন, বাল্লুর ভয়েস দিছেন বিল মুরে, কিং লুই’র ভয়েস দিছেন ক্রিস্টোফার ওয়াকেন। সবার কণ্ঠই ঠিক আছে। তবে ইদ্রিস এলবার ভয়েসে শেরে খান কথা বলবে, এই কম্বিনেশন নিয়ে যে রকম ভাবছিলাম, কেন যেন অতটা হয় নাই। তবে ঠিক আছে।

দ্য জাঙ্গল বুক পরিচালনা করছেন জন ফ্যাভরিয়ো। জন ফ্যাভরিয়ো এর আগে আয়রন ম্যানআয়রন ম্যান ২ ছবি সহ কয়েকটি পরিচালনা করেছেন। তাছাড়া অ্যাভেন্জার্স, আয়রন ম্যান, আয়রন ম্যান ২দ্য কাউবয় অ্যান্ড এলিয়েন সহ আরো অনেক ছবি প্রযোজনা করেছেন।

favreau

পরিচালনা জন ফ্যাভরিয়ো (জন্ম. ১৯৬৬)

রুডইয়ার্ড কিপলিং এর গল্প থেকে ছবির স্ক্রিপ্ট লিখছেন স্ট্রিট ফাইটার ছবির চিত্রনাট্যকার জাস্টিন মার্কস।

দ্য জাঙ্গল বুক ছবি একটু ছোট মনে হয়। ছবিটা ১ ঘণ্টা ৪৩ মিনিটের। টাইটেল বাদ দিলে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। সময় হয়ত সমস্যা না। কম সময়ের মধ্যে ছবিতে আরো বেশি ঘটনা ঘটলে বা আরো বেশি ইভেন্ট থাকলে কম সময়ের গল্প বড় মনে হইত।

এটা হয়ত বলার দরকারও নাই যে দ্য জাঙ্গল বুক ডিজনি প্রোডাকশন হাউজের ছবি।

যে বাচ্চাদের আওয়াজ, চেঁচামেচি ছবির শুরুর দিকে ডিস্টার্ব করছে, ছবির অ্যাডভেঞ্চারাস পার্ট শুরু হওয়ার পরে তারা সামান্য শব্দও করে নাই। বাল্লুর সাথে দেখা হওয়ার পরে থেকে তারা চুপ হয়ে গেছে। আর মোগলি যখন হাতির বাচ্চা উদ্ধার করতেছে, সেইখান থেকে ছবির শেষ পর্যন্ত তারা অবিশ্বাস্য রকমের চুপচাপ ছিল। ফ্যান্টাসি আর অ্যাডভেঞ্চারের পাওয়ারই হয়ত এরকম। বড়রা হয়ত এই গল্পটাকে পিওর ফ্যান্টাসি হিসাবে দেখে, যে ফ্যান্টাসি কখনো বাস্তবে ঘটে না, যে কোনো গল্প বা ফ্যান্টাসির ভিতরের মিথ্যাটুকু অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করতে করতে বড়রা দেখে। কিন্তু বাচ্চাদের সাইকোলজিতে হয়ত এইটার মিথ্যাটুকু ধরাই পড়ে না, তাদের দেখার ভঙ্গিতে থাকে—আমি যেইটা দেখতেছি তা ঘটতেছে। কোনো কিছু বিশ্বাস করলেই বাচ্চারা তাতে মনোযোগ দেয়, বিশ্বাস না করলে মনোযোগ দেয় না।

junglebook-11

কয়েকদিন আগে দেখলাম জাপানে গভীর বনের মধ্যে এক বাচ্চা হারায় গেছে, আবার কয়েকদিন পরে দেখলাম তাকে পাওয়াও গেছে। জাস্ট দেখছি, নিউজ ফলো করি নাই। দ্য জাঙ্গল বুক দেখার পরে এই নিউজের কথা মনে পড়ছে।

মাংকি টেম্পলে বানরদের দৃশ্যের সময় অনেকেরই হাসি বা কথার আওয়াজ পাওয়া গেছে, কিন্তু বাচ্চাদের থেকে কোনো শব্দ আসে নাই। বাচ্চাদের সেন্স অব হিউমারও হয়ত বড়দের চাইতে ভালো।

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।