page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

‘দ্য নাইট অফ’ — বছরের সেরা ড্রামা

মাঝে মাঝে মনে হয় টিভি সিরিজ কি সিনেমাকে রিপ্লেস করছে?

সরাসরি হয়ত বলা যাবে না যে টিভি সিরিজ সিনেমার জায়গা দখল করছে, কিন্তু গল্প দেখার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সিনেমার ওপর মানুষের যে নির্ভরতা ছিল সেটা টিভি সিরিজ বদলে দিয়েছে।

এখন আমেরিকা সহ সারা বিশ্বে অসংখ্য টিভি সিরিজ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এদের জনপ্রিয়তার দিকে তাকালেই এটা বোঝা যায়।

night-off-3

নাজকে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে।

এন্টারটেইনমেন্ট মাধ্যম ও আর্ট হিসাবে সামনের দিনগুলিতে টিভি সিরিজকে হয়ত সিনেমার চেয়েও শক্তিশালী বিবেচনা করা হবে। বাজার ও দর্শকের চাহিদার কারণেই এটা হবে।

লিখিত মাধ্যমগুলির মধ্যে উপন্যাস যে কারণে জনপ্রিয়, টিভি সিরিজের জনপ্রিয়তার কারণও সেটা। উপন্যাস জনপ্রিয় কারণ এর ব্যাপ্তি ও ডিটেইলিং। বেশ বড় পরিসরে, যথেষ্ট বিবরণ দিয়ে একটা কাহিনি বলা হয় উপন্যাসে।

টিভি সিরিজেও তাই, মাত্র একটা ক্রাইসিস বা সমস্যাকেই ফোকাসে থাকে না, আশেপাশের অনেক কিছু আসার সুযোগ পায়। কাহিনির সময় বেশি হওয়ার কারণে দর্শক বেশি ইনভলবড হয়ে যায়। সিনেমার ক্ষেত্রে এই জিনিসগুলি ঘটার সুযোগ কম।

ইন্টারনেটের কারণে টিভি সিরিজের বাজারও এখন অনেক বড়। ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে গল্প দেখার ক্ষেত্রে মানুষের রুচি ও অভ্যাস বদলে দিয়েছে টিভি সিরিজ।

movie-review-logo

টিভি সিরিজে সিনেমার মত সিনেম্যাটিক মোমেন্ট বা লার্জার দ্যান লাইফ ব্যাপারগুলি তৈরি হয় না—টিভি সিরিজ নিয়ে এমন একটা অভাব বোধ আছে। সামনে সেটাও হয়ত আর থাকবে না। এই বছর ‘গেম অব থ্রোনস’-এর ছয় নাম্বার সিজনে ‘ব্যাটল অব বাস্টার্ডস’-কে বলা হচ্ছে এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা যুদ্ধের দৃশ্য। ‘ট্রু ডিটেকটিভ’, ‘দ্য ওয়াকিং ডেড’, ‘স্ট্রেন্জার থিংস’… অনেক অনেক টিভি সিরিজের অ্যাপ্রোচ সিনেমার মত।

আমি এখানে একটা টিভি সিরিজ নিয়ে কথা বলব। এইচবিও’র নতুন টিভি সিরিজ ‘’দ্য নাইট অফ’’। ‘’দ্য নাইট অফ’’ সম্ভবত ২০১৬ এর সবচেয়ে সেরা ড্রামা। একটা মাত্র সিজন পার হইছে এটার।

‘দ্য নাইট অফ’ কতটুকু ভাল বা কতটুকু খারাপ, শুধু তা না বলে এটা নিয়ে আমি অনেকটা ইনফর্মালভাবে কথা বলব। সুতরাং, যারা এই টিভি সিরিজ এখনো দেখেন নাই, কিন্তু দেখতে চান, এবং দেখার আগে এর গল্পটাকে একেবারে ‘এক্সট্রা ভার্জিন’ রাখতে চান, তাদের জন্য স্পয়লার হইতে পারে এই লেখা। আশা করি বড় ধরনের স্পয়লার হবে না।

দেখা যাক।

প্রথম পর্বের নাম ‘দ্য বিচ’। নিউ ইয়র্কের এক পাকিস্তানি ফ্যামিলির ছেলে নাসির খান। কলেজ স্টুডেন্ট। ডাকনাম নাজ। বাবা সেলিম খান ট্যাক্সি চালায়। ট্যাক্সির মালিক তার বাবা একা না, আরো দুইজনসহ ট্যাক্সির মালিক তিনজন।

মায়ের নাম সফর খান—হাউজওয়াইফ। ছোট এক ভাই আছে, নাম হাসান, হাই স্কুলে পড়ে। এ থেকে নাসির খানের পরিবারের আর্থিক অবস্থা বোঝা যাওয়ার কথা। নিউ ইয়র্ক শহরের বাস্তবতায় নিম্ন মধ্যবিত্ত। নাজ খুবই শান্ত ও ভদ্র ছেলে, বাই নেচার।

শুক্রবার রাতে বন্ধুদের পার্টিতে নাজের দাওয়াত আছে। রাতে বাসায় কাউকে না বলে, বাবার ট্যাক্সি নিয়ে পার্টিতে যাওয়ার জন্য বের হয়ে যায় নাজ। নাজ এতটাই ইনোসেন্ট টাইপের, যে জায়গায় যাবে তার রাস্তাও তেমন চিনে না। পুলিশকে জিজ্ঞাসা করে রাস্তা চিনার চেষ্টা করে। রাস্তায় প্যাসেন্জাররা হায়ার করতে চাইলে নাজ বলে সে অফ ডিউটিতে আছে।

ট্রাফিক সিগনালে নাজ অপেক্ষা করছে, তখন ট্যাক্সিতে একটা মেয়ে উঠে বসে। বোল্ড সুন্দরী—চেহারায়, এক্সপ্রেশনে, হাসিতে।

নাজ আর তারে ট্যাক্সি থেকে নামতে বলতে পারে না। নাজ মেয়েটাকে বলে সে পার্টি মিস করতেছে।

মেয়েটা নাম বলে, আন্দ্রেয়া কর্নিশ।

দেখে মনে হয় ডিপ্রেসড, কোনো ঝামেলায় আছে। নাজ জিজ্ঞাসা করে সে কোথায় যেতে চায়।

আন্দ্রেয়া উত্তর দেয় সে বিচে যাইতে চায়। নাজ আন্দ্রেয়াকে নদীতীরে নিয়ে যায়। দুইজন বসে থাকে। আন্দ্রেয়া ড্রাগ নেয়, নাজকেও অফার করে। নাজ বলে সে জীবনে কখনো ড্রাগ নেয় নাই। আন্দ্রেয়ার ইশারায় নাজ ড্রাগ নেয়।

night-off-1

আন্দ্রেয়ার বাড়িতে নাজ ও আন্দ্রেয়া।

সেখান থেকে তারা আন্দ্রেয়ার বাসায় যায়। আন্দ্রেয়া একা থাকে। আরো ড্রাগের পর সেক্স করে তারা। মাঝরাতে নাজ ঘুম ভেঙে দেখে সে কিচেনে। বাসায় ফিরতে হবে নাজকে। উপরে বেডরুমে গিয়ে নাজ দেখে বিছানায় আন্দ্রেয়া রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নাজ আতঙ্কিত হয়ে বের হয়ে আসে।

ট্রাফিক আইন ভাঙার কারণে নাজকে পুলিশ আটকায়। আবার, আন্দ্রেয়ার খুন হওয়ার ঘটনাও পুলিশ ততক্ষণে জেনে গেছে। ট্রাফিক আইন ভাঙার কারণে রেগুলার চেকিং এর জন্য নাজকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। ছেড়ে দেওয়ার আগে বডি তল্লাশির সময় নাজের পকেটে রক্তাক্ত ছুরি পাওয়া যায়।

আন্দ্রেয়া খুনের অভিযোগে আটক করা হয় নাসির খানকে।

night-off-2

খুনের সন্দেহভাজন আসামী হিসাবে ধরা পড়ার আগে পুলিশ স্টেশনে নার্ভাস নাসির খান বা নাজ।

ডিটেকটিভ ডেনিস বক্স আন্দ্রেয়া হত্যার ঘটনার দায়িত্ব নেয়।

ডিফেন্স অ্যাটর্নি জন স্টোন নাজের দায়িত্ব নেয়।

দ্বিতীয় পর্বের নাম ‘সাটল বিস্ট’। সাটল বিস্টের ভালো বাংলা কী হয়? এখানে লেখলাম—ঠাণ্ডা পশু।

নাজ দাবি করতে থাকে সে নির্দোষ। ডিফেন্স অ্যাটর্নি স্টোন নাজকে চুপ থাকতে বলে দেয়।

ডিটেক্টিভ বক্স নাজকে কৌশলে স্বীকার করাতে চায় যে সে আন্দ্রেয়াকে খুন করেছে।

এই ডিটেকটিভ বক্স সম্পর্কেই স্টোন নাজকে বলে সাটল বিস্ট।

প্রথম দুই পর্বে ডিটেক্টিভ বক্সের কথা বলা, আচরণ দেখে মনে হয় এই টিভি সিরিজে সে-ই প্রোটাগনিস্ট হতে যাচ্ছে। অসাধারণ একটা ইনভেস্টিগেশন দেখা যাবে।

কিন্তু সেটা ঘটে না।

ডিফেন্স অ্যাটর্নি জন স্টোন-ই বরং ডিটেকটিভ বক্সের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পায়ে একজিমা, বড় কোনো কেস হ্যান্ডেল করার অভিজ্ঞতা না থাকা, সাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণে জন স্টোনকে লো প্রোফাইল মনে হয়।

নাজের পরিবার নাজকে দেখতে আসে।

আন্দ্রেয়ার লাশ শনাক্ত করতে আসে তার সৎ বাবা। আন্দ্রেয়ার মা মারা গেছে আগেই।

তৃতীয় পর্বের নাম, এ ডার্ক ক্রেট। একটি অন্ধকার বাক্স।

অনেক দরদাম করে জন স্টোন নাজের পরিবারকে ৫০ হাজার ডলার লিগ্যাল ফিসের বিনিময়ে সার্ভিস অফার করে। নাজের পরিবারের লিগ্যাল ফিস বহন করার সামর্থ্য নাই।

মিডিয়া অ্যাটেনশনের কারণে হাই প্রোফাইল অ্যাটর্নি অ্যালিসন ক্রো নাজের পরিবারকে কোনো ফিস ছাড়াই লিগ্যাল সার্ভিস অফার করে।

সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হওয়ার পরে নাজের বাবা মা তার সাথে দেখা করতে যায়।

সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হওয়ার পরে নাজের বাবা মা তার সাথে দেখা করতে যায়।

নাজকে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

পুলিশ ট্যাক্সি আটকে রাখায় নাজের বাবা এবং ট্যাক্সির বাকি দুইজন মালিক কাজে যেতে পারে না।

চতুর্থ পর্বের নাম ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ বা যুদ্ধের কৌশল।
নাজকে প্রস্তাব দেওয়া হয় সে যদি অপরাধ স্বীকার করে আবেদন করে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় না যায় তাহলে তাকে মাত্র পনের বছরের জেল দেওয়া হবে। আর বিচার প্রক্রিয়ায় গেলে, অপরাধ প্রমাণ হলে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।

night-off-7

নাজকে আটক করার পর পুলিশ স্টেশনে তার সাথে কথা বলছে ডিফেন্স অ্যাটর্নি জন স্টোন।

নাজ অপরাধ স্বীকার করে না। কেস বিচার প্রক্রিয়ায় চলে যায়। নাজের অ্যাটর্নি অ্যালিসন ক্রো নাজের কেস ড্রপ করে দেয়।

অ্যালিসন ক্রো-এর সহকারী, ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত চান্দ্রা নাজের হয়ে কেস লড়তে থাকে। তাকে সাহায্য করে জন স্টোন।

জেলে একজন কৃষ্ণাঙ্গ বন্দি নাজকে বলে তার কাছে আশ্রয় চাইতে। তার নাম ফ্রেডি। অনেক ক্ষমতা তার। সে জানায় নাজকে সে স্নেহ করে।

ফ্রেডি চরিত্রে অভিনয় করেছেন কেনেথ উইলিয়ামস। কেনেথ উইলিয়ামস অসাধারণ অভিনেতা।

জেলখানায় ফ্রেডির রুমে নাজ ও ফ্রেডি।

জেলখানায় ফ্রেডির রুমে নাজ ও ফ্রেডি।

নাজকে ফ্রেডির সাহায্য অফার করার ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। ফ্রেডি নাজকে বলে, জেলের লাইব্রেরিতে দুইটা বই সবচেয়ে বেশি পড়া হয়, একটা হইল ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’, আরেকটা সিডনি শেলডনের ‘দ্য আদার সাইট অব মিডনাইট’।

আস্তে আস্তে বদলে যায় নাজ।

পাঁচ নাম্বার পর্বের নাম ‘দ্য সিজন অব দ্য উইচ’।

নাজকে অপরাধী ধরেই ডিটেকটিভ বক্সের তদন্ত আগায়। প্রসিকিউটর হেলেনা উইজের সাথে বক্স শেয়ার করে তদন্ত রিপোর্ট।

এখানে প্রসিকিউটর হেলেনা উইজ নাজ বা নাসির খানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আর্গুমেন্ট হাজির করে।

অন্যদিকে নাজের আইনজীবি চান্দ্রা ও জন স্টোনও নাজের পক্ষে ভাল ফাইট দিতে থাকে। নাজের প্রসিকিউশন জমে ওঠে।

এদের মধ্যে কে উইচ বা ডাইনি? হেলেনা উইজ নাকি চান্দ্রা?

হেলেনা উইজ হয়ত একজন নিরপরাধীকে দোষী প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। অথবা চান্দ্রা হয়ত একটা মেয়ের খুনীকে বের করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

জন স্টোন নিজে থেকেই আরো ভালভাবে তদন্ত করতে থাকে। জন স্টোনের ক্যারেক্টার ইন্টারেস্টিং হওয়ার অন্যতম কারণ, তার প্রসিকিউটর হয়ে ডিটেকটিভের কাজ করা।

প্রসিকিউটর চান্দ্রা ও জন স্টোনের সাথে আদালতে নাজ।

প্রসিকিউটর চান্দ্রা ও জন স্টোনের সাথে আদালতে নাজ।

স্টোনের তদন্তে আন্দ্রেয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে। আন্দ্রেয়ার সৎ বাবার বয়স আন্দ্রেয়ার মায়ের চেয়ে অনেক কম। এই লোক সন্দেহজনক। বয়স্ক ও ধনী মহিলাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে।

আরেকজনকে পাওয়া যায়। এক তরুণ ফিন্যান্সিয়াল কনসালট্যান্ট।

স্কট আরো বের করে আন্দ্রেয়ার বাড়িতে ঢোকার সময় মুসলমান হওয়ার কারণে নাজকে টিজ করে দুই কৃষ্ণাঙ্গ।

ষষ্ঠ পর্বের নাম ‘স্যামসন ও ডেলিলাহ’। স্যামসন ও ডেলিলাহ বাইবেলের দুই চরিত্র।

এই পর্বের নাম ‘স্যামসন ও ডেলিলাহ’ কারণ, আরেকজন সন্দেহভাজন পাওয়া যায়। সেই ব্যক্তি ইঙ্গিত করে বাইবেলের স্যামসন ও ডেলিলাহ’র ঘটনার দিকে।

নাজ সম্পর্কে অপ্রত্যাশিত অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

সাত নাম্বার পর্বের নাম ‘অর্ডিনারি ডেথ’।

এই পর্বে আদালতে প্রসিকিউশনে দারুণ নাটকীয়তা তৈরি হয়। ডিটেকটিভ বক্স এই পর্বে এসে আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাদি ও বিবাদি দুই পক্ষের প্যাথলজিস্টের জবানবন্দি ভাল উত্তেজনা তৈরি করে।

প্রথম সিজনের আট নাম্বার ও শেষ পর্ব ‘দ্য কল অব দ্য ওয়াইল্ড’।

আদালতে ডিটেকটিভ বক্স। কিছুক্ষণ পর উঠে চলে যাবে।

আদালতে ডিটেকটিভ বক্স। কিছুক্ষণ পর উঠে চলে যাবে।

এই পর্ব বেশ বড়। এই পর্ব নিয়ে বেশি কিছু বলতে গেলেই সিরিয়াস স্পয়লার হইয়া যাবে। কয়েকটা পয়েন্ট বলি।

চান্দ্রার কারণে পুরা বিচারকার্যটার মিসট্রায়ালের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

ডিটেকটিভ বক্স ঘটনা নতুনভাবে দেখে।

বাদী পক্ষের প্রসিকিউটর হেলেনা উইজ ও নাজের অ্যাটর্নি জন স্টোন দুইজনই জুরিদের প্রভাবিত করার মত ইমোশনাল বক্তব্য দেয়।

এই কেসের একটা রেজাল্ট আসে।

উপরে যা বলা হইল তা পুরা সিরিজটার একটা সিম্পল আউটলাইন। এইটা ‘দ্য নাইট অফ’-এর কাহিনি না। ‘দ্য নাইট অফ’-এর কাহিনি আরো এলাবরেট।

এই সিরিজের লেখক ও ক্রিয়েটর দুইজন। স্টিভেন জালিয়ান ও রিচার্ড প্রাইস নামের দুই ভদ্রলোক। রিচার্ড প্রাইস অনেক বিখ্যাত সিনেমা ও টিভি সিরিজের কাহিনি লিখছেন।

তবে স্টিভেন জালিয়ান আরো হাইপ্রোফাইল। স্পিলবার্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবি যেইটা মনে করা হয়, সেই ‘শিন্ডলার’স লিস্ট’ ও মার্টিন স্করসেসির ‘দ্য গ্যাংস অব নিউ ইয়র্কে’র চিত্রনাট্য লেখছেন তিনি। মোজেস বা মুসা (আঃ) রে নিয়া রিডলি স্কটের ছবি ‘এক্সোডাস’, বিখ্যাত ছবি ‘আমেরিকান গ্যাংস্টারে’র গল্প তার লেখা।

zalian3

স্টিভেন জালিয়ান (জন্ম. ১৯৫৩) ও রিচার্ড প্রাইস (জন্ম. ১৯৪৯)

এই টিভি সিরিজটা ২০০৮-০৯ সালের বিবিসির টিভি সিরিজ ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস’ অবলম্বনে বানানো হইছে।

‘দ্য নাইট অফ’-এর কাহিনির একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার মূল চরিত্র, যাকে খুনী হিসেবে সন্দেহ করা হইতেছে সে মুসলিম। যদিও এইখানে নাজ বা নাসির খানের জন্ম নিউ ইয়র্কে, সে কখনো আমেরিকার বাইরে যায়-ই নাই, তবে মুসলিম হওয়ার কারণে আমেরিকার বাস্তবতায় সে অন্য অপরাধী বা সন্দেহভাজনের থেকে আলাদা। এইটা এই সিরিজটাতে দেখাক বা না দেখাক, দর্শকের কাছেও সে আলাদা।

মুসলিম হওয়ার কারণে প্রসিকিউশন সিস্টেম তার সাথে কী আচরণ করে এইটার প্রতি স্বাভাবিকভাবেই মনোযোগ ছিল। এই সিরিজে দেখানো হইছে অন্যান্য সন্দেহভাজনদের সাথে যে আচরণ করা হয়, নাসির খানকে সেই একই ধরনের আচরণ দেওয়া হয়েছে।

আমেরিকার এয়ারপোর্টে মুসলিম যাত্রীদের হয়রানি ও বিভিন্ন জায়গায় মুসলিম বন্দিদের নির্যাতনের যেসব ঘটনা ঘটে তার উল্টোটা দেখানো হইছে এখানে। হয়রানি ও নির্যাতনের এইসব ব্যাপারগুলি মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ায় আমেরিকার যে ইমেজ দাঁড়া হইছে সেটা  নিউট্রালাইজড করার জন্য-ই এরকম দেখানো হয়ে থাকতে পারে।

নাইন ইলেভেনের পরে আমেরিকার বাস্তবতায় যে কোনো মুসলিম অপরাধী বা সন্দেহভাজনই ‘টেররিস্ট’ হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে থাকে। এই সিরিজে দেখানো হয়েছে মুসলিম মাত্রই ‘টেররিস্ট’ হওয়ার সম্ভাবনাকে তারা অতটা সিরিয়াসভাবে দেখে না। এখানে অন্যান্য সন্দেহভাজনদের ক্ষেত্রে যা করা হয়, নাজের ক্ষেত্রেও তাই—তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও খুনের সন্দেহ করা হয়। জেলেও তার পরিচয় দাঁড়া হয় মার্ডারার ও রেপিস্ট আসামী হিসেবে।

ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে আমেরিকান কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট পজেটিভ, এটা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন, দেখানো হয় ডিটেকটিভ বক্স কাউন্টার টেররিজম বিভাগে না থেকেও ইসলামের ইমাম আলী (রাঃ) সম্পর্কে জানে। আবার বাদী পক্ষের প্রসিকিউটর হেলেনা উইজ যখন নাজের বিরুদ্ধে আর্গুমেন্ট দাঁড়া করায়, তখন খুব ইমোশনালভাবে বলে, প্রফেট মোহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, তোমার পায়ে যত শক্তি আছে তা নিয়ে বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করার জন্য ছুটে যাও।

এইসব দিক থেকে দেখলে, আমেরিকান কর্তৃপক্ষ মুসলিমদের যেভাবে দেখে, যেভাবে হেনস্থা করে সেটার বিপরীতটা দেখানো হয়েছে এই সিরিজে।

ড্রামা ও টিভি সিরিজ হিসেবে ‘দ্য নাইট অফ’ অসাধারণ। এই টিভি সিরিজে গল্প বলার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া নাই। কোনো আর্টিফিশিয়াল বা লেইম ধরনের থ্রিল তৈরির চেষ্টা নাই। নাজের ফ্যামিলির সমস্যা, অ্যাটর্নি জন স্টোনের জীবন, ডিটেকটিভ বক্সের প্রফেশনাল জীবনের বাইরের অবস্থা, জেলের ভিতর নাজের জীবন ও তার পরিবর্তন ইত্যাদি খুব সহজভাবে কাহিনির অংশ হয়ে যাওয়ায় এই টিভি সিরিজটা অন্য যে কোনো টিভি সিরিজের থেকে আগানো।

‘দ্য নাইট অফ’ মাস্টার স্টোরিটেলারের কাজ।

গল্পের কনটেক্সট খুব সুন্দরভাবে তৈরি করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষ করে উপমহাদেশের একটি পরিবার যেমন, নাসির খানের পরিবারও তাই। ‘দ্য নাইট অফ’-এর নাসির খান কোনো ভাবেই আমেরিকান ফ্যামিলির সন্তান না। আবার নাসির খানও কোনোভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশে বড় হওয়া কোনো তরুণ না। সিরিজের ক্রিয়েটর রিচার্ড প্রাইস ও স্টিভেন জালিয়ানের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।

নাজের বাবা সেলিম খান ও মা সফর খান।

নাজের বাবা সেলিম খান ও মা সফর খান।

নাসির খান বা নাজ চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন সেই রিজ আহমেদকে  দেখে অস্পষ্টভাবে মনে হচ্ছিল কোথায় জানি দেখছি। পরে বের করলাম ২০১৪ সালের ‘নাইটক্রলার’ সিনেমায়। ২০১৬ এর জেসন বর্ন ছবিতেও অভিনয় করেছেন। রিজ আহমেদ ভাল অভিনেতা। ‘দ্য নাইট অফ’-এ সবার অভিনয়ই ভাল।

‘দ্য নাইট অফ’ অসাধারণ সিরিজ। তবে এই সিরিজে কিছু একটা মিসিং আছে যার কারণে, আপনি এটাকে আপনার দেখা সবচেয়ে সেরা টিভি সিরিজ বলবেন না। সেটা হল এই সিরিজের কাহিনির পরিণতি সম্পর্কে আপনার যে এক্সপ্রেক্টেশন তৈরি হয়, ‘দ্য নাইট অফ’ সেটা পূরণ করে না।

‘দ্য নাইট অফ’-এ গল্প বলার ধরন ও ড্রামা তৈরি হওয়ার বাইরে অন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে। মাইনরিটি, এশিয়ান, গরীব ও মুসলিমদের সাথে আমেরিকান কর্তৃপক্ষ ও জুডিশিয়াল সিস্টেম বৈষম্য করে না—এই বক্তব্য প্রচার করার একটা কালচারাল অ্যাটেম্পট এই টিভি সিরিজ।

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।