page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

নানা রঙের সন্ত্রাসের অতীত বর্তমান

অই যে ১৮৪৭ জন্ম নেয়া রাশিয়ার মানুষটা, যিনি নিজের মর্জিমতে এক প্রকারের নিহিলিজম চর্চা করতে ‘বিপ্লবী’ সাজছিলেন, আর ‘প্রতিপক্ষকে খতম করাই সমাধান’ এবং ‘প্রতিষ্ঠিত সব মূল্যবোধ ধ্বংস করো’ এমন চরম পর্যায়ের চিন্তা করতে করতে সন্ত্রাসবাদকেই ফেরি করতে লেখছিলেন বই ‘ক্যাটাকিজম অব এ রিভলুশনারি’—অই লোকটার নাম সের্গেই নেচায়েভ।

দস্তইয়েফস্কির নিহিলিজম বিরোধী উপন্যাস ‘ডেমনস’ এর ভারখোবেনস্কি চরিত্রটি আসলে বাস্তব জীবনে থাকা অই নেচায়েভ। ক্যাটাকিজমের মূল মর্ম “the ends justify the means”—খতম করার মধ্য দিয়ে ফল পাওয়া—এই ইজমের ধারক মনেপ্রাণে চায় সকল প্রকার মূল্যবোধের ধ্বংস সাধন।

nechayev-2

সের্গেই নেচায়েভ (১৮৪৭ – ১৮৮২)

নেচায়েভ নিজেকে সন্ত্রাসী পরিচয় দিতেন। তার বইয়ে লেখেন, “একজন বিপ্নবী হলেন তিনি, যার বিপদজনক তকদির নির্ধারিত। তার ব্যক্তিগত আবেগ, স্বার্থ, সম্পর্ক-মায়া, সম্পদের লোভ নাই, এমনকি তার নামের খ্যাতির আকাঙ্খাও নাই। তার গভীর আসক্তি, তার চিন্তা কেবল এক উদ্দেশ্যে—বিপ্লব। শুধু কথায় না, কাজে-কর্মে, মনেপ্রাণে সমগ্র সভ্য দুনিয়ার সামাজিক নিয়ম কানুন, ভদ্রতা, নৈতিকতা, প্রচলিত রীতিনীতির  সাথে সম্পর্ক রাখে না। সে ওসবের নিষ্ঠুর দুশমন এবং এসবের মাঝে থাকে কেবল ধ্বংস করবার উদ্দেশ্য নিয়ে।”

নেচায়েভের মতে, ‘বিপ্লবী’র কাজ হল, মানুষকে উত্যক্ত করে, সমাজের মানুষের জীবনে দুঃখ দুর্দশা এনে মানুষকে বিদ্রোহী বানিয়ে তোলা। ইতালির ‘রেড ব্রিগেড’ গঠিত হয়েছিল এই নেচায়েভের মতাদর্শের অনুসরণে।

sarwar-chy-2-logo

 

ইতিহাসে দেখা যায়, বিপথগামী বা বিভ্রান্ত কমিউনিস্টরা নেচায়েভের ক্যাটাকিজম চর্চা করে লক্ষ্যে পৌঁছতে চেয়েছে। কিন্তু কার্ল মার্কস কঠোর সমালোচনা করেছেন সের্গেই নেচায়েভের ধ্বংসসাধক চিন্তার। মার্কস বলতেন ওটা ‘বারাকস কমিউনিজম’। এই বারাক মিলিটারির বারাক না। প্রথম দিকের রুশ সাম্রাজ্যে শিল্পশ্রমিক আস্তানা (প্রিমিটিভ ডরমিটরি) ধরনের কিছু বোঝাতে ‘বারাক’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন মার্কস। ক্যাটাকিজমকে মার্কস ও এংগেলস সাম্প্রদায়িক চিন্তাও মনে করতেন। তারা আসল কমিউনিস্টদেরকে, তাদের ভাষায় ‘ভণ্ড নেচায়েভ’ এর চিন্তা থেকে দূরে থাকতে বলতেন।

২.
তারও আগে, সন্ত্রাসের জন্মের খোঁজ নেয়া যাক একটু। ল্যাটিন terrere থেকে ফরাসি ভাষার শব্দ terrorisme মানে ডর লাগানি।  প্রথম দিকে সন্ত্রাস মানে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ ছিল। ফরাসি বিপ্লবের শুরুর দিকে reign of terror—ত্রাসের রাজত্ব—এর একটা সময় ছিল। আস্তে আস্তে এসে গেল ‘পলিটিক্যাল টেররিজম’। ক্ষমতা নেয়ার জন্যে ও ক্ষমতায় থাকার মতলবে ডর লাগানি এবং এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের দিকে সহিংস হয়ে জান মালের ক্ষতি করা।

demons-dost1

নেচায়েভকে নিয়ে দস্তইয়েফস্কির নিহিলিজম বিরোধী উপন্যাস ‘ডেমনস’। প্রথম প্রকাশিত হয় ‘দি রাশিয়ান মেসেনজার’ জার্নালে, ১৮৭১-৭২ সালে।

এই যে ডর লাগানি, এটা মানুষের স্বভাবে নানা রঙ্গের দেখা যায়। শিশুরা ডর লাগানি খেলা খেলে। বড়রা মশকারি করে ডর লাগায়, বিপদজনক কৌতুক প্রোগ্রাম বানায়, হরর ফিল্ম বানায়, নাটক বানায়, মানে শিল্পেও ত্রাসের স্থান আছে। মানুষ শিল্পে সফ্‌ট ভয়কে উপভোগ করে।

কিন্তু রাজনীতির উদ্দেশ্য ‘সফল’ করতে ত্রাস-সন্ত্রাস কেবল ডর লাগানিতে সীমিত থাকে না। মানুষের অস্তিত্বের সংকট আনে। ধ্বংস করে। আধুনিক সভ্যতার এই পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় জুরিসডিকশন হল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সন্ত্রাস করা অপরাধ। ‘আল কায়দা’ ‘আইএসআইএস’ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী চিহ্নিত।

৩.
আইএসআইএসকে কেউ বলেন সালাফি জিহাদী, কেউ বলেন এরা ওয়াহাবিদেরই একটা অংশ। গ্লোবাল রিসার্চ—সেন্টার ফর গ্লোবাল রিসার্চ এর প্রতিবেদনে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ স্কলার Garikai Chengu তার প্রতিবেদনে লেখেন, আল কায়দা ও আইএসআইএস  আমেরিকা তৈরি করেছে তার স্বার্থে। স্বার্থ হল, ‘to divide and conquer the oil-rich Middle East and to counter Iran’s growing influence in the region.’  (তাদের মধ্যে বিভক্তি এনে তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য কব্জায় নেয়া আর এ অঞ্চলে ইরানের ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা প্রভাব মোকাবেলা করা)।

তাদের মতে ‘মিলিট্যান্ট পলিটিক্যাল ইসলাম’কে আমেরিকা ব্যবহার করে আসছে শীতল যুদ্ধের যুগ থেকে। রোনাল্ড রিগানের সময়ের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি ডিরেক্টর বলছিলেন, ”যে কোনো উপায়ে আমেরিকা একটা লম্বা সময় জুড়ে সন্ত্রাসবাদ ব্যবহার করছে। সিনেটে ১৯৭৮-৭৯ তে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আইন পাশ করতে চাইছিল। প্রত্যেক সংস্করণের বেলায় আইনজ্ঞরা বলছেন, আমেরিকাই আইন লঙ্ঘন করবে।”

উল্লেখ্য, আইএসআইএস দুনিয়ার মানুষের নজর কড়লো আমেরিকার সাংবাদিকদেরই কল্লা কেটে ফেলে।

মডারেট আরব মুসলমানেরা আইএসআইএসকে ইসলামি মনে করেন না। আলাপকালে তারা বলেন, “ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম কারও উপর জবরদস্তি এলাও করে না।”

About Author

সারওয়ার চৌধুরী
সারওয়ার চৌধুরী

কবি, কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক। প্রাক্তন সিলেট প্রেসক্লাব সদস্য। সহকারী সম্পাদক দৈনিক জালালাবাদ ১৯৯৩-৯৭। জাপানি কথাশিল্পী হারুকি মুরাকামির গল্পের অনুবাদ বই ও তুর্কি কথাশিল্পী এলিফ সাফাকের উপন্যাস' ফোরটি রুলস অব লাভ' অনুবাদ করেছেন। উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ ও অনুবাদসহ মোট ছয়টি বই তার প্রকাশিত। ইউএই প্রবাসী ১৮ বছর ধরে। তিনি ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, আরবি ভাষাও জানেন।