page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

নার্সিসিস্ট শনাক্ত করার ১০ উপায়

সেলফি স্টিককে এখন বলা হয়ে থাকে ‘নার্সিসিজম দণ্ড’। এই অতি মডার্ন সেলফি স্টিক ছাড়াও নার্সিসিস্টের আরো অনেক মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে। নার্সিসিজম মূলত পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বা ব্যক্তিত্বের সংকট।

একজন নার্সিসিস্ট মনে করে সে অনেক আকর্ষণীয়, বুদ্ধিমান এবং অন্যদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে নিজের অর্জন ও সামর্থ্যকে খুবই বড় করে দেখে এবং তার ইগো অনেক বেশি থাকে। তবে প্রায়ই এই ইগোর ব্যাকআপ দেওয়ার সামর্থ্য তার থাকে না।

একজন নার্সিসিস্টের কাছে নিজের প্রয়োজন সবার আগে, কিন্তু অন্য কেউ তার প্রয়োজন প্রকাশ করলে নার্সিসিস্ট ব্যক্তি সেটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখে। সে হয়ত লোকজনের সামনে বা ক্যামেরার সামনে নিজেকে অনেক মহান হিসেবে উপস্থাপন করে, কিন্তু কেউ যদি সেটি লক্ষ্য না করে তবে সে আপসেট হয়, সে হতাশ হয়ে পড়ে।

নার্সিসিস্ট ব্যক্তি সবসময় সবার মনোযোগ পেতে চায়, অন্যদের তুলনায় তার প্রতি অনেক বেশি প্রাধান্য আশা করে। তার প্রতি মনোযোগ না দিলে সে অত্যাচারিত বোধ করে। তার অধঃস্তনদের ক্ষতি করা এবং ওয়েটারকে দোষ দেওয়া একজন নার্সিসিস্টের খুবই সাধারণ বৈশিষ্ট্য। সে সবসময় নিজের সুনামের আশায় থাকে এবং অন্যদের সফলতাকে অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখে।

kim-k-nar-8

কিম কারদাশিয়ান। বিখ্যাত নার্সিসিস্ট। ২০১৫ সালে সেলফি দিয়ে বই বের করেছেন, নাম ‘সেলফিশ’।

শতকরা কতজন নার্সিসিস্ট হয়ে থাকে? মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬.২ ভাগ নার্সিসিস্ট। কিন্তু অন্যদের তুলনায় তাদেরকেই বেশি চোখে পড়ে কারণ প্রায়ই তাদেরকে সেলিব্রিটি বা নেতা বা ক্ষমতাপূর্ণ কোনো পজিশনে দেখা যায়।

নার্সিসিস্টদের বেশিরভাগই পুরুষ, তবে নার্সিসিস্টদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ২৫-৫০ শতাংশ। নারীদের নার্সিসিজম শুধু সেলফির মধ্যেই আবদ্ধ ভাবলে ভুল করবেন। নার্সিসিস্ট নারীদের জীবনের সবকিছুর সাথেই তাদের এই নার্সিসিজম সম্পর্কিত, যেমন বাচ্চা লালন পালন করা থেকে ব্যায়ামের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি। এই নার্সিসিজম থেকেই তাদের ডিপ্রেশন ও অ্যাংজাইটি বা উদ্বিগ্নতা দেখা দেয়।

নার্সিসিস্ট কোনো ব্যক্তিকে দেখা পর্ন দেখার মত, আপনি যখন বুঝতে পারেন আপনি একজন নার্সিসিস্টকে দেখছেন, তখন এই বিষয়টি টের পান।

আপনি একজন নার্সিসিস্টকে নিচের ১০টি উপায়ের মাধ্যমে বুঝতে পারবেন।

১. তারা নাম উল্লেখ করে

নার্সিসিস্টরা অন্য ব্যক্তির দোষ দেওয়া বা নিন্দা করা ছাড়া অন্যদের প্রসঙ্গে আলোচনা প্রায় করেই না। অথবা নেইম ড্রপিং করে, অর্থাৎ, তার থেকে উর্ধ্বতন বা ক্ষমতাপূর্ণ কারো নাম উল্লেখ করে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চায়। তারা ক্ষমতা বা সৌন্দর্য বা খ্যাতির সাথে নিজেদের যুক্ত করতে চায়। এবং তারা এটা করে শুধুমাত্র ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেই না, বিভিন্ন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান, ব্র্যান্ড, এক্সক্লুসিভ ইভেন্ট ইত্যাদি তারা প্রায়ই উল্লেখ করে থাকে।

২. তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাটায় বা সেলফি এডিট করে

২০১৪ সালে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী ১০০০ লোকের ওপর একটি গবেষণা করে দেখা গেছে, যাদের মধ্যে নার্সিসিজম বেশি তারা তিনটি জিনিস করে। তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাটায়, নিজেদের সেলফি বেশি পোস্ট করে, ক্রপিং বা ফিল্টার ব্যবহার করে সেলফি বেশি এডিট করে।

নার্সিসিস্টদের চেনার ব্যাপারে এই জিনিসটি হয়ত নতুন না, তবে এই গবেষণার মাধ্যমে ব্যাপারটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

৩. তারা নিজেদের ফুলিয়া-ফাপিয়ে বড় করে ও অন্যদেরকে নিচু মনে করে

নার্সিসিস্টরা যদি মনে করে তাদের ট্যালেন্ট, দক্ষতা ও অসাধারণত্ব কেউ ভালোভাবে বুঝতে পারে নি বা স্বীকৃতি দেয় নি, তাহলে তারা রেগে যায়, খারাপ আচরণ করে। ফলে, এ রকম তিক্ত আচরণ করা নার্সিসিস্টের সংখ্যা অনেক। তারা মনে করে তারা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের অসাধারণত্ব প্রদর্শন করে আসছে, কিন্তু তারা কেন সবার মনোযোগ পাচ্ছে না বা লিস্টের প্রথমে থাকছে না।

৪. তারা অন্যদের আদর্শে পরিণত হতে চায়, কিন্তু আপনি তাদের পছন্দ করলে তারা পাত্তা দেয় না

আপনি যদি নার্সিসিস্টকে বলেন আপনি অনেক অসাধারণ তখন সে আপনাকে পাত্তা দিবে না। কিন্তু তাকে যদি বলেন যে সে খুবই বোরিং এবং গতানুগতিক তাহলে সে প্রচণ্ড রেগে যাবে। সে সমালোচনা নিতে পারে না এবং পরাজয় মানতেই পারে না। এতে তারা মারাত্মক শূন্য, অপমানিত বোধ করে ও রেগে যায়।

৫. তাদের সবসময় সেরাটা প্রয়োজন

তারা সবসময় সবকিছুর সেরাটা নিতে চায় ও সেরাটা পেতে চায়। যেমন সেরা ডাক্তার, সেরা ল-ইয়ার, সেরা হেয়ারস্টাইলিস্ট, সেরা ট্রেইনার ইত্যাদির সুবিধা পেতে চায়। সবচেয়ে নামি কোম্পানিতে কাজ করতে চায়, সবচেয়ে দামি গাড়ি চালাতে চায়, দামি রেস্টুরেন্ট বা বারে যেতে চায়।

৬. সবার প্রথমে… তারা মনোমুগ্ধকর ও আকর্ষণীয়

নার্সিসিস্টরা জানে কীভাবে এই জিনিসটা নিজেদের মধ্যে আনতে হয়। প্রায়ই দেখা যায় একজন নার্সিসিস্ট খুবই মোহনীয়, দেখতে আকর্ষণীয় এবং তারা  আত্মবিশ্বাস দ্বারা লোকজনের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম। হ্যাঁ, ঠিক ততক্ষণই সে আকর্ষণীয় যতক্ষণ আপনি তাকে পুরোপুরি না জানতে পারছেন। যখন জানতে পারবেন, তখন তো…

৭. তারা অনেকগুলি সম্পর্ক তৈরি করে

নার্সিসিস্ট যখন সম্পর্ক শুরু করে তখন সম্পর্কের অন্য পার্টনারের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি খুবই উঁচু ও আদর্শায়িত থাকে। কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে তার ধারণা ভুল। এটি মূলত তিনটি কারণে ঘটে। ১) সে যখন ব্যক্তির ইমেজের ভিতরের আসল ব্যক্তিটিকে বুঝতে পারে তখন সে হতাশ হয়। ২) খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ৩) যে আছে তার চেয়ে ভালো কাউকে দেখা যায়।

এর ফলে নার্সিসিস্ট ব্যক্তির সাথে আমাদের সম্পর্ক…

৮. তারা সবসময়ই পরবর্তী জিনিস খোঁজে

২০০২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে কমিটমেন্টের সাথে নার্সিসিজমের সম্পর্ক নেতিবাচক। নার্সিসিস্ট ব্যক্তি সবসময়ই মনে করে সে আরো ভালো করতে পারবে বা আরো ভালো জিনিস খুঁজে পাবে, ফলে সে কোনো কিছুতে স্থায়ী থাকতে পারে না। গবেষকরা এই উপসর্গের নাম দিয়েছেন ‘অল্টারনেটিভনেস’।

৯. তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র আত্ম-ঘৃণা বা নিজেকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার বোধ নেই

২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার একটি দল একটি গবেষণা করেছিল নার্সিসিস্টদের নিয়ে। গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘নার্সিসিস্ট কি নিজের আত্মগভীরে নিজেকে ঘৃণা করে’। এই গবেষণার কৌশল এমন ছিল যে নার্সিসিস্ট নিজেকে কীভাবে দেখে তা বের হয়ে আসে। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে নার্সিসিস্টদের সেলফ-স্টিম কম বা তাদের নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকে তারা এমন করে, কিন্তু এই গবেষণায় এর বিপরীত ব্যাপারটি প্রকাশিত হয়। দেখা যায়, নার্সিসিস্ট নিজেকেই মনে করে সে নিজেই সব।

১০.  তারা এটা পুরোপুরি স্বীকার করে

২০১৪ সালে একটি গবেষণায় দেখা যায়, একটি সাধারণ প্রশ্ন করে নার্সিসিস্ট শনাক্ত করা যায়।

প্রশ্নটি হল, আপনি এই বাক্যটির সাথে কতটুকু একমত: ‘আমি একজন নার্সিসিস্ট।” ( মনে রাখবেন, ‘নার্সিসিস্ট’ এর মানে আত্ম-অহংকারী, আত্ম-কেন্দ্রিক ও নিষ্ফল)

এই গবেষণাটি খুবই কঠোর ভাবে করা হয়েছিল। গবেষকরা ১১টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি টেস্ট করেন। দেখা গেছে তাদের উত্তর একদম নিখুঁত ছিল। নার্সিসিস্টদের সহানুভূতি বা কমিটমেন্ট না থাকলেও, দেখা গেছে যে তাদের নিখুঁত অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে।

কারাভাজ্জিওর আঁকা নার্সিসাস

কারাভাজ্জিওর আঁকা নার্সিসাস

আসল নার্সিসাসের কথা বলা যাক। খুঁত নেই, একেবারে পারফেক্ট এমন একজন আদর্শ রোমান্টিক পার্টনার খুঁজছিলেন নার্সিসাস। অনেক খোঁজার পরে তিনি একজনকে পান, সেটা ছিল জলাশয়ের পানিতে তার নিজেরই প্রতিবিম্ব। আমরা জানি যে এর পরিণতি ভালো ছিল না, তিনি সেই জলাশয়ে ডুবে মারা যান। সে সময় গ্রিসে যদি সেলফি স্টিক থাকত তাহলে হয়ত তার এই পরিণতি ঘটত না।

 

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক