ফাঁকা একটা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আকস্মিক কোনো পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। ধরেই নিলেন কেউ আপনাকে ফলো করছে। এর কারণ, জায়গাটা নীরব হলেও আপনি সাধারণত নিজের পায়ের শব্দ আলাদা করে কখনো শুনতে পান না। তাই পায়ের শব্দ শুনলেই আপনার মনে হয় অন্য কেউ হেঁটে আসছে।

আমাদের ব্যক্তিগত শব্দগুলি মস্তিষ্ক সচরাচর আলাদা করে রেজিস্টার করে না। বিজ্ঞানীরা বরাবরই এই বিষয়টা জানতেন। কিন্তু মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে এই কাজটা করে থাকে তা সঠিকভাবে এখন পর্যন্ত অজানা ছিল। সম্প্রতি ‘নেচার’ পত্রিকার একটা গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়, যেখানে বিজ্ঞানীরা পায়ের শব্দের ওপর ভিত্তি করে মস্তিষ্কের শব্দ “ফিল্টার” করার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করেন।

ব্রেইনের প্রতিটা আলাদা আলাদা স্নায়ুকোষ অর্থাৎ নিউরনগুলি এই উদ্দেশ্যে কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে তা জানার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করে একটা “অগমেন্টেড রিয়্যালিটি” নির্মাণ করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে ইঁদুরদের ওপর পরীক্ষা চালানো হয় এবং হাঁটার সময় ইঁদুররা কীরকম শব্দ শুনতে পাবে সেটা তারা পরীক্ষামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

দেখা যায়, ইঁদুরগুলি নিজেদের হাঁটার শব্দে অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর তাদের মস্তিষ্কের অডিটরি কর্টেক্সের সব নিউরন সে শব্দে প্রতিক্রিয়া জানানো বন্ধ করে দেয়। আর অডিটরি কর্টেক্সই হলো আমাদের মস্তিষ্কের অন্যতম প্রধান শ্রবণ কেন্দ্র।

কোনো ইঁদুর যখন তার পায়ের শব্দ শুনে, তখন অডিটরি কর্টেক্সের ‘ইনহিবিটরি নিউরন’গুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিজের পায়ের শব্দে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া ইঁদুরের ধারণা অনুযায়ী এসব নিউরনের একটা গ্রুপ সেই শব্দের একটা ফটো-নেগেটিভ তৈরি করে রাখে। ফলে হাঁটার সময় আসলেই যখন ইঁদুরটি সেই শব্দ শুনতে পায়, ফটো-নেগেটিভ শব্দটিকে তখন বাতিল করে দেয়।

অন্যদিকে, কোনো অপ্রত্যাশিত শব্দ শুনতে পেলে অডিটরি কর্টেক্সের নিউরনে খুবই জোরালো প্রতিক্রিয়া হয়। শারীরবৃত্তিক এ প্রবণতা কেবল পায়ের শব্দেই সীমাবদ্ধ না। আমরা যখন কীবোর্ডে টাইপ করি, কীস্ট্রোকের শব্দ আমাদের কানে এলেও আমরা বিরক্ত হই না। কিন্তু পাশে বসে থাকা অন্য কারো টাইপ করার শব্দ সহজেই আমাদের বিরক্তি উদ্রেক করে।

যেসকল প্রাণি নিয়মিত শিকারের হাত থেকে নিজদের রক্ষা করে চলে, যেমন ইঁদুর, তাদের জন্য এই প্রক্রিয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজেস্ব স্বতঃস্ফূর্ত শব্দ থেকে পারিপার্শ্বিক শব্দ আলাদা করার তাৎক্ষণিক ক্ষমতা তাদেরকে সমূহ বিপদের হাত থেকে বাঁচায়।

তাছাড়া আমরা যখন কথা বলি, গান গাই কিংবা কোনো যন্ত্রে সুর তুলি– তখনও এটা কাজে আসে। যেমন, গিটার বাজাতে বসলে আমাদের একটা পূর্বধারণা থাকে– ঠিক কোন ধরনের সুর তুলব আমরা। কিন্তু প্র্যাক্টিস করার সময় অনেক ভুল হয় আমাদের। ব্রেইনের সেই মেকানিজম একটা ভুল নোট শুনলেই সাথে সাথে আমাদেরকে তা জানান দিয়ে দেয়। ফলে আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাই।

বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে বোঝার চেষ্টা করবেন কীভাবে এসকল “এরর সিগনাল” আমাদের ভাষা শিক্ষা ও সঙ্গীতচর্চায় ভূমিকা রাখে। তাছাড়া এ গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে গবেষকরা স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে আরো অনেক কিছু জানতে পারবেন বলে আশা করছেন। কারণ স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীরা প্রায়ই স্পষ্টভাবে কিছু কাল্পনিক শব্দ শুনতে পান। হতে পারে, ব্রেইনের যেসকল সার্কিট শব্দ উপেক্ষা ও শনাক্ত করে থাকে, সেগুলি এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

সূত্র. হাও স্টাফ ওয়ার্কস/সায়েন্স