page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

নৈসর্গিকের ‘নৈসর্গী’ হয়ে ওঠা

নৈসর্গীর যখন আড়াই মাস বয়স তখন আমার বাসায় পাঁচটা মুরগীর বাচ্চা আনা হয়। ওইদিন আমি বটি নিয়ে বাচ্চাগুলারে কাটতে বসছি। চামড়াগুলো ছিলানোই ছিল, শুধু পুরা মুরগীটারে ছোট ছোট টুকরা করা লাগবো।

যারা আগে মুরগীর বাচ্চা কাটছেন তারা তো জানেন কেমনে এটা করতে হয়। প্রথমে বাম হাতের তালুতে মুরগীর বাচ্চাটারে রাইখ্যা ডান হাত দিয়া মুরগীর বাম থান আর কোমরের জয়েন্ট-এর হাড্ডিকে মড়াৎ করে আলগা করতে হয়। তারপর ঐ জায়গা বরাবর বটি চালাইতে হয়।

আমিও তেমন কইরাই বাম হাতের তালুতে মুরগীর পিঠের সাইডটা ধরলাম। এখন ডান হাত দিয়ে মুরগীর কোমরের হাড়টাকে ডিসপ্লেস করা লাগবে। ঠিক সেইসময়, হঠাৎ করে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা একটা ইলেকট্রিক শকের মতো কিছু একটা চইলা গেল।

farjina-malek-snigdha-logo

গত আড়াই মাস যাবত আমি আমার বাচ্চারে এমনে কইরা ধইরাই গোসল করাই। আমার বাচ্চাও একই ভাবে বুক চিতায়া শুইয়া থাকে। পা দুইটাও একই রকরম; বামেরটা সোজা ‘দ’ আর ডানের টা উলটা ‘দ’। আমি মুরগী কাটতে পারি না; আমার কেমন জানি ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগে।

সেদিন আমার মনে হইছিল আমি বোধহয় আর কোনোদিন মুরগী খাইতে পারব না। যদিও মুরগী খাওয়া নিয়া আমার পরে কোনো সমস্যা হয় নাই, কিন্তু একটা বিষয় মাথার মধ্যে গাঁইথা গেছিল। মানুষ আসলে আর দশটা পশুপাখির মতই কিছু একটা। আগে এইটা নিয়ে যতই পড়াশুনা করি না কেন, এমন কইরা এই সত্যটা কেউ মাথায় গিথায়া দিতে পারে নাই। আমার কাছে মনে হয় আমরা আসলে বাচ্চা বিকাশের নামে যেইটা করি তা হইল বাচ্চারে প্রকৃতি থেকে দূরে নেয়ার চেষ্টা। বাচ্চারে মাটিতে থাকতে দেয়া যাবে না, গাছে উঠতে দেয়া যাবে না, হাঁটতে দেয়া যাবে না, যেমন ইচ্ছা তেমন শরীর নড়াইতে পারবে না—ইত্যাদি ইত্যাদি।

farjina-m-1a

নৈসর্গী: আকাশে কী যেন খোঁজে আমার মেয়ে”—লেখক

এই তো সেদিনও মেয়েটা হাত পা দুই দিকে ছড়ায়ে বিছানা থেকে ফ্লোরে আর ফ্লোর থেকে বিছানায় ঘষাঘষি আর গড়াগড়ি করতে ছিল। আমার সভ্য হবার অভিজ্ঞতায় সেই স্টাইল খুবই বেমানান। মেয়েকে বললাম, “পা চাপাইয়া রাখো, এমন করো কেন?”

নৈসর্গী জানতে চায়, “কেন? এমন করলে কী হয়?”

আমি তখন উল্টাপাল্টা কী সব উত্তর দেই! আমি নিজেও জানি না কেন আমার শরীররে ভদ্র সভ্য বানাইতে গিয়া এমন আড়ষ্ট বানাইছি। আমার হাত-পাগুলারে আমি চাইলেও সব ভাবে ঘুরাইতে- নড়াইতে পারি না; আধা ঘণ্টা হাঁটলে দুই ঘণ্টা শুইয়া/ বইসা থাকার ধান্দা করি। এই আড়ষ্টতার নামই কি শরীরের সৌন্দর্য? হইতে পারে।

ওর বয়স যখন তিন / সাড়ে তিন তখন আমরা চন্দ্রিমা উদ্যানে প্রত্যেকদিন সকালে হাঁটতে যাইতাম। হাঁটা ছিল তার বিনোদন; একটু হাঁইটাই সে আর উদ্যানের কাকগুলা একসাথে নাস্তা খাইত। নৈসর্গী রুটি ছিটায় আর কাক উড়াল দিয়া বাতাস থিকা ধইরা খায়। এইটাই তার খেলা। মাঝে মাঝে কাক ধরতে পারে না, মাটি থিকা কুড়ায়া খায় তখন।

একসময় আমার মেয়ে জিগায়, “কাকের পেট খারাপ হবে না মা? এই যে মাটির থেকে খায়?”

আমি ভাবা শুরু করলাম উল্টা দিক থিকা। আমাদের কেন এত অসুখ হয়? অন্য কোনো প্রাণীর তো এত সমস্যা নাই। এমন কি আমরা যেগুলারে বাসায় পালি ওদের জন্যই ভেটেনারি ডাক্তার আছে। একই জাতের যেগুলা এখনও প্রাকৃতিক বলয়ে আছে, তাঁদের সমস্যা কত কম! যাই হোক মেয়েরে আমি কোনো উত্তর দেই না, খালি হাসি। মেয়েও হাসে। আমাদের মধ্যে অলিখিত চুক্তি হয়। সে আমারে যা খুশি প্রশ্ন করার স্বাধীনতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয় আর আমিও সব প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়াইতে থাকি।

farjina-m-1c

নৈসর্গী ও লেখক। ছবি. মুজীবুল আনাম লাবীব

কিন্তু আমি এইদিকে যতই নির্লিপ্ত থাকি না ক্যান আমাদের আশপাশ ওরে ঠিকই প্রকৃতি থিকা বাইর কইরা সভ্য, ভব্য আর স্ট্রাকচার্ড বানাইতে থাকে। নৈসর্গী তখন মাত্র স্কুলে ভর্তি হইছে; দুই তিন মাস হইল স্কুলে যায়। একদিন স্কুল ব্যাগ খুইলা দেখি ওর টিচার একটা পেঁপে প্রিন্ট কইরা ওদের রঙ করতে দিছিল। আর বইলাও দিছিলো যে হলুদ নাইলে সবুজ রঙ করা লাগব। আর সব বাচ্চার মত নৈসর্গীও রঙ করছে। পাশে টিচারের কমেন্ট—‘আরও ভাল করে রং করতে হবে।’ ঘটনা হইল, মেয়ের রঙ পেঁপের প্রিন্ট করা বাউন্ডারির বাইরে ছড়াইয়া গেছিল।

আমি জিগাইলাম, “কী সমস্যা? রঙ ছড়াইছে ক্যান?”

সে আমারে বলে, “মা পেঁপেটা তো পাকা ছিল, তাই আশেপাশে ছড়াইয়া গেছে।”

আমি ওরে জড়াইয়া ধইরা কইলাম, “সাবাস আম্মা, এই জীবনীশক্তিটাই দরকার। আর কোনো কিছুর উপরেই ভরসা করিস না, এমনকি তোর মায়ের উপরেও না।”

About Author

ফারজিনা মালেক স্নিগ্ধা
ফারজিনা মালেক স্নিগ্ধা

জন্ম ময়মনসিংহে ১০ জানুয়ারি ১৯৮৩ সালে। আঠার বছর ধরে সেখানেই থাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেন ২০০৭-০৮ সালে। এরপর হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি থেকে চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানে মাস্টার্স। দেশে ফিরে ৬ বছর কাজ করেন বিভিন্ন এনজিওতে। বর্তমানে বাস করছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে। কাজ করছেন সেনটাকেয়ার কমিউনিটি সার্ভিস ব্রিসবেন নামের একটি এনজিও তে।