page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

পর্নো-অপরাধ বন্ধ করুন

ভারতে শুনেছি পর্ন সাইট ব্লক হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা হচ্ছে। পর্নোগ্রাফি নিয়ে আগে কখনো তেমন কথা হত না। ট্যাবুর মত বিষয় ছিল। ব্লক হওয়ার সাথে সাথেই আলোচনা শুরু হয়েছে। তার মানে ধরে নেয়া যায় একটা বৃহৎ অংশের সরাসরি সংযোগ ছিল পর্নো সাইটের সাথে।

যাই হোক, আমি নিশ্চিত না পর্নো সাইট সত্যি সত্যি ব্লক হয়েছে কি না। তবে ধরে নিচ্ছি ব্লক হয়েছে। হয়ে থাকলেও একটা জরুরি প্রশ্ন থেকে যায়—কী ধরনের পর্ন সাইট ব্লক হয়েছে?

একটা পত্রিকায় দেখেছি শুধু বিদেশী বড় সাইটগুলিই ব্লক করা হয়েছে।

পর্ন সাইট বলতে আমরা যা বুঝি তা হল যেসব সাইটে বিভিন্ন ক্যাটাগরির পর্ন ভিডিও আপলোড করা হয়ে থাকে। এগুলিতে অভিনয় করেন প্রফেশনাল অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। তাদের অভিনয় হল বিভিন্ন প্রকারের যৌনকর্ম। এর জন্য তারা টাকা পান। যারা সাইট চালান তারাও টাকা পান ভিডিওর ভোক্তাদের কাছ থেকে। ভোক্তারা রীতিমত সাবস্ক্রিপশন করে দেখেন।

muradul-islam-logo

ফ্রিতেও পর্ন ভিডিও দেখার বিভিন্ন সাইট আছে। সেগুলিতে আংশিক বা পুরো ভিডিওর দেখা মিলে। পেইড সাইটের সাথে অবশ্যই ফ্রি-এর পার্থক্য আছে। ভারতীয় উপমহাদেশে এইসব ফ্রি সাইটের দর্শকবৃন্দই বেশি। কারণ ডলার খরচ করে দেখার মত ডলার বিধাতা দিতে কার্পণ্য করেছেন এ অঞ্চলে।

এছাড়াও আরো বিভিন্ন ধরনের পর্ন সাইট আছে। আমি এখানে পর্ন সাইটের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনায় বসি নাই বলে সে আলোচনায় যাচ্ছি না। পর্ন সাইটের প্রকারভেদে যে আলোকপাত করলাম তার এক বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। সে বিষয়ে একটু পরে যাচ্ছি। তার আগে পর্ন নিয়ে কিছু কথা বলা আবশ্যক মনে হচ্ছে।

পর্ন ভিডিওগুলির মধ্যে একধরনের ন্যারেটিভও বিদ্যমান থাকে। সে ন্যারেটিভে বাস্তবের সাথে পর্নের ব্যবধানটা বুঝিয়ে দেয়া হয়। বাস্তবের সাথে পর্নের মিল নেই বলে অনেকে সমালোচনা করে থাকেন। কিন্তু এই ন্যারেটিভে বাস্তবতার সাথে ব্যবধানটা পর্নের ডিরেক্টর এবং স্ক্রিপ্ট রাইটার (যদি থেকে থাকেন আর কি) ইচ্ছাকৃতভাবে করে থাকেন।

আপনি সবই দেখতে পারবেন পর্ন ভিডিওগুলিতে কিন্তু তার ন্যারেটিভটা গ্রহণ করতে পারবেন না। আপনার স্বাভাবিক বিচার ক্ষমতায় মনে হবে এমন কিছু হতে পারে না। এ অবাস্তব গল্প। একে এমনভাবে তৈরি করা হয় যে এটাকে হালকাভাবে নিতেই হবে।

porn-hub-ad

পর্ন হাব অ্যাড ক্যাম্পেইন ফাইনালিস্ট

যেমন, একজন হাউজওয়াইফ বাসায়। প্লাম্বার এল। কাজটাজ শেষ করল। এইসময়ে ভদ্রমহিলা তাকে উত্তেজিত করে ফেললেন। শেষপর্যায়ে তিনি তাকে বললেন, আই হ্যাভ এনাদার হোল টু বি ফিক্সড। ক্যান ইউ ডু ইট?

এরকম ডায়লগ একধরনের সেন্সরশিপ। বাস্তবতার সাথে এর ব্যবধান—এটা যে সত্যি না, অবাস্তব গল্প তা বুঝিয়ে দেয়া। স্লাভো জিজেক এই বাস্তব ন্যারেটিভ না পাওয়াটাকে বলেছেন ট্র্যাজেডি অফ পর্নোগ্রাফি।

রিয়ালিস্টিক ন্যারেটিভ কেন দিতে পারে না তারা? হয়ত এটা তাদের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ রতিক্রিয়া প্রদর্শনে বাধার সৃষ্টি করে। কারণ বিশ্বাসযোগ্য ন্যারেটিভ তৈরি, সেইরকম অভিনয় করা সহজ কথা না। উপরন্তু এতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু সে সময় পর্ন ভিডিওতে নেই। যত দ্রুত সম্ভব তারা ক্রিয়াতে চলে যেতে চায়। কারণ তাদের ভোক্তাদের উদ্দেশ্য থাকে সেটা দেখাই।

এই অবাস্তব ন্যারেটিভের একটা উপকারও আছে মনে হয়। যেমন দর্শকের মাথায় এটা চলে যায় এই জিনিস বাস্তব না। সে প্লাম্বার হয়ে হাউজওয়াইফের একা কুটিরে কাজ করতে গেলে দুয়েকবার ইতিউতি তাকালেও এই পর্নের মত অবস্থার তৈরি হবে তা কখনো ভাববে না। স্বাভাবিক বিচার ক্ষমতা থাকলে সে আশা করবে না আরেকটা হোল ফিক্সের অফার চলে আসবে।

ডব্লিউ ডব্লিই ই রেসলিং আগে দেখাত বিটিভিতে। সপ্তাহে একবার। সন্ধ্যার দিকে। তখন বার বার বলত প্লিজ ডোন্ট ট্রাই দিস এট হোম। পর্নে কিন্তু এই ম্যাসেজ অবাস্তব ন্যারেটিভের জন্য ভোক্তার মাথায় এমনিতেই চলে যায়। তারা বুঝে নেয় এটা ট্রাই করতে গেলে পাবলিক ডলা নিশ্চিত। সুতরাং, ট্রাই করার দুঃসাহস দেখায় না।

২.
নৈতিক কারণে পর্ন সাইট যদি ব্লক করে কোনো গভর্নমেন্ট তাহলে সেটা হবে খুব দুর্বল কারণ। যেহেতু নৈতিকতা কোনো সহজ বিষয় না। খুব জটিল বিষয়। এক নৈতিকতায় যা খারাপ অন্যদিক থেকে তা ভালো হয়ে যেতে পারে। নৈতিকতা খুব আপেক্ষিক ব্যাপার।

পর্ন সাইটে নারীদের খারাপভাবে উপস্থাপন করা হয় এরকম যুক্তি দিয়ে কেউ এর বিরোধীতা করতে পারেন। তবে এই বিরোধীতা মূল ধারার মিডিয়া এবং ফিল্মের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। যেমন, বলা যায় ফিল্মের আইটেম সং। সুতরাং, এই যুক্তিতে বিরোধীতা খুব শক্তিশালী হবে বলা যায় না। পর্ন সাইটের অনেক ক্যাটাগরিতে পুরুষকেও বাজেভাবে উপস্থাপিত হতে দেখা যায়।

p bed 3

পর্নো মুভির একটি সেট

পর্নের বিষয়টা বুঝতে হলে মানুষের সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে ভাবতে হবে। তা নিয়ে ভাবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোক আছেন নিশ্চয়ই। আশা করা যায় তারা ভাববেন এবং সে অনুসারে ব্যবস্থা নেবেন। আমি জিজেকের একটা ভিডিওতে দেখেছিলাম তিনি বলছেন, পুরুষেরা যখন নারীর সাথে ক্রিয়াদি করে তখন তাদের ফ্যান্টাসির দ্বারাই তারা আনন্দ পায়। বাস্তব ক্রিয়ার চাইতে ফ্যান্টাসিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। জিজেক ফ্রয়েড কিংবা লাকানিয়ান কোনো ফিলোসফিক দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটা বলেছেন ধারণা করি। এটা যে সত্যি তা আমি বলছি না, বলছি মানুষের সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিটার ক্রিয়া জানা জরুরি পর্নোগ্রাফির মত বিষয় হ্যান্ডেল করতে।

যাই হোক, যে প্রশ্নটা প্রথমে করেছিলাম, কী ধরনের পর্ন সাইট ব্লক হয়েছে তা জানা দরকার। সেখানে চলে যাচ্ছি।

ধরে নিচ্ছি এই উপমহাদেশে যদি পর্ন সাইট ব্লক করা হয় তাহলে ইয়াং জেনারেশনকে কুপথে নেয়ার অভিযোগটাই হবে প্রধান অভিযোগ। সুতরাং আমাদের জানতে হবে কোন ধরনের পর্ন সাইট এখানকার ইয়াং জেনারেশন বেশি ব্যবহার করেন। ফ্রী সাইটগুলি অবশ্যই। সুতরাং, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিজের উদ্দেশ্য ঠিকমত চরিতার্থ করতে হলে ফ্রি সাইটগুলির উপর নজর দিতে হবে। বড় সাইটগুলি ব্লক করে বসে থাকলে চলবে না।

বিভিন্ন ফোরাম আছে, ফাইল শেয়ারিং সাইট আছে যেগুলিতে ব্যবহারকারীরা ভিডিও আপলোড করতে পারেন। এগুলি ব্যবহার করা যায় ফ্রিতে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় গার্লফ্রেন্ডের ভিডিও করেছিল বয়ফ্রেন্ড, তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর বয়ফ্রেন্ড তা এসব সাইটে তুলে দিচ্ছে। আরো বিভিন্ন রকমভাবে ভিডিও করে তুলে দেয়া হচ্ছে।

মূল যে পর্ন ইন্ডাস্ট্রি সেগুলিতে অভিনেতা-ডিরেক্টর নিজের ইচ্ছায় ভিডিওগুলি দেন। তাদের বিজনেস এটাই। কিন্তু ‘দেশী ভিডিও’ নামে যেসব পর্ন ভিডিওর দেখা মিলে তাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই এর কুশীলবদের অমতে তাদের ভিডিও ছাড়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা হয়ত জানতেও পারেন না। এটা একটা বড় মাপের অপরাধ।

যে কোনোভাবেই হোক এই ধরনের ভিডিও যাতে কেউ প্রকাশ করতে না পারে তার ব্যবস্থা করা উচিত। দরকার হলে দেয়া উচিত কঠিন শাস্তি। এটি বড় ধরনের সাইবার ক্রাইম।

আমেরিকায় কিছুদিন আগে আলোচিত হয়েছিল ‘রিভেন্জ পর্ন’ শব্দদ্বয়। সিএনএনের সাংবাদিক লরি সিগেল এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন। রিভেন্জ পর্নের ভোক্তভোগীদের সাথে আলাপ, এ নিয়ে বিভিন্ন জনের ইন্টারভিউ ইত্যাদি নিয়ে তার করা রিপোর্টগুলি তাদের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে। শেষ পর্যন্ত গুগল তাদের সার্চ লিস্ট থেকে রিভেন্জ পর্নের ভিডিওগুলি রিমুভ করার উদ্যোগ নেয়।

আমাদের বাংলাদেশে কয়েকবছর আগে একজন টিভি অভিনেত্রীর কিছু ভিডিও তার প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ড ছেড়ে দেয় প্রতিশোধ হিসেবে। ভিডিওগুলি একসময় ছড়িয়ে যায় সারাদেশে। আমাদের দেশের সরকার এ নিয়ে সেই বয়ফ্রেন্ড ব্যক্তিটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় নি কিংবা কোনো সাংবাদিক এর ভয়াবহতা নিয়ে সিরিয়াস কোনো কাজ করেন নি দৈনিক পত্রিকায়। অথচ আমাদের দেশের জ্ঞানীগুণী সাংবাদিক ও লেখকদের উচিত ছিল এ জাতীয় অপরাধের বিরুদ্ধে যথাযোগ্য প্রতিবাদ গড়ে তুলে অপরাধীকে বিচারের সম্মুখীন করা। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের দেশের একটা বড় অংশ ভিডিওগুলিতে সেই অভিনেত্রীরই দোষ খুঁজে পেয়েছিলেন।

আমি এটাকে বলব নৈতিকতার সমস্যা। তারা তাদের নৈতিকতা দ্বারা বিষয়টা বিচার করতে গেছেন এবং একজন মেয়ের এরকম বিবাহ বহির্ভূত যৌনকর্মকে মেনে নিতে পারেন নি। ফলে মেয়েটাকে তাদের দোষী মনে হয়েছে। ছেলেটাকে দোষী মনে হয় নি কারণ তাদের মাইন্ডসেট ভয়াবহ পুরুষতান্ত্রিক এক সমাজের।

এ ধরনের ক্ষেত্রে অবস্থা বোঝার উপায় হল ভোক্তভোগীর জায়গায় নিজেকে রেখে বিষয়টা কল্পনা করা। তাহলেই প্রকৃত অবস্থা বোঝা যেতে পারে।

এই ধরনের যেসব পর্ন ভিডিও, দেশী ভিডিও আছে এগুলি বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

একটা ভিডিও দেখেছিলাম অনেক আগে। একজন নারী সম্ভবত মডেল হতে গিয়েছেন। একজন তার উপর সুবিধা নিচ্ছে। সে মোবাইল দিয়ে ভিডিও করছে। সেই মডেল অশ্রুসিক্ত নয়নে বাঁধা দিচ্ছেন, বার বার মানা করছেন। কিন্তু লোকটা বলছে যে সে রিমুভ করে ফেলবে ইত্যাদি।

জীবনে অনেক নির্মম ভিডিও দেখেছি। কিন্তু এই ভিডিও দেখে যে আকস্মিক কষ্ট অনুভব করতে পেরেছিলাম তা কখনো অনুভূত হয় নি। আমার আজকের এই লেখাটিও সম্ভবত সেই কষ্ট থেকে জন্ম নিয়েছে।

সবার প্রতি অনুরোধ থাকবে, এ ধরনের ভিডিওর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার। কোনো ভিক্টিম পাওয়া গেলে তার আইনগত সাহায্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এবং যে অপরাধী এর সাথে জড়িত তাকে শাস্তির সম্মুখীন করতে হবে।

আমাদের দেশে ইন্টারনেটের বিস্তার এখনো খুব বেশি হয় নি। আস্তে আস্তে বাড়ছে। এই অবস্থাতেই সচেতন হওয়া জরুরি। এ নিয়ে নির্দিষ্ট আইন ও শাস্তির বিধান থাকাও জরুরি।

About Author

মুরাদুল ইসলাম
মুরাদুল ইসলাম

জন্ম. জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট। প্রকাশিত বই 'মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালী', 'গ্যাডফ্লাই', 'কাফকা ক্লাব', 'রাধারমন এবং কিছু বিভ্রান্তি' ইত্যাদি। ওয়েবসাইট: muradulislam.me