page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

পশ্চিমবাংলার ‘বাংলা’ বা ‘Bengal’ নামকরণ বাংলাদেশের জন্যে যে বিপদ নিয়ে আসছে!

“যদি জন্মান্তর থাকে তবে যেন বাংলা দেশে আমার জন্ম না হয়…।”

— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৩৪১

 

১.

পশ্চিমবাংলার নাম ‘বাংলা’ রাখায় আমাদের একটু সমস্যাই হইল।

বাংলা ভাষাভাষী জিনিসপত্রের উপর, Bengal সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মালিকানার উপর, সর্বোপরি বাংলার ভৌগলিক নির্দেশক (GI) পণ্যের উপর বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার, বিশেষত প্যাটেন্টগত অধিকার খর্ব করার জন্যেই এই নাম রাখা।

ইন্ডিয়া নিজেদের পণ্য হিসেবে বাংলাদেশের জামদানি, টাঙ্গাইলের শাড়ি ও ফজলি আমসহ ৬০টি জিআই পণ্যকে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার চেষ্টায় নিবিষ্ট ছিল। এখন নবনামকৃত বাংলা বা বেঙ্গল তাদের এই কাজরে পানির মত সহজ কইরা দিছে।

bratya-raisu-logo

এই নব্য Bengal এর কারণে আন্তর্জাতিক দরবারে বাংলাদেশ যদি তার নিজের Bengal পরিচিতি হারাইতে বাধ্য হয় তবে তাতে আমাদের অর্থ সংক্রান্ত বিপদ ঘটবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের।

উৎসগত ভাবে যেই সব জিনিস Bengal এর বা বাংলাদেশের তা বিশ্বময় করতে এখন আর ‘বাংলা’র (সাবেক পশ্চিমবাংলা) অর্থাৎ ইন্ডিয়ার কোনো বাধা থাকবে না। তারা Bengal এর অর্থাৎ বাংলাদেশের যে কোনো উৎসজাত জিনিসকে ইন্ডিয়ার নিজস্ব জিআই পণ্য হিসাবে প্যাটেন্ট করতে পারবে। তাদের মেধাস্বত্বের কারণে সেই জিনিস বা তার কাছাকাছি কোনো জিনিস আমরা আর উৎপাদন বা রপ্তানি করতে পারব না।

ধরেন নকশি কাঁথার কোনো একটা সূচিকর্মের স্টাইল বা প্যাটার্ন আমাদের বাংলাদেশেই লভ্য ছিল আগে অর্থাৎ বেঙ্গলের ছিল, ইন্ডিয়ার কোথাও তা ছিল না। সেই রকম কাঁথা বাইরে রপ্তানি করতে চাই আমরা। যেহেতু তা উৎসগত ভাবে আমাদের, ইন্ডিয়া এই রকম জিনিসের প্যাটার্ন করার রাইট পাওয়ার কথা না। কিন্তু এখন পাবে, যেহেতু Bengal বলতে এখন বাংলা তথা পশ্চিমবাংলা তথা ইন্ডিয়াকেই বোঝাবে।

ইন্ডিয়া এখন বেঙ্গল নামের কারণে সেই কাঁথার প্যাটেন্ট করতে পারবে। তার ফলে সেই ধরনের প্যাটার্নের কাঁথা আমরা বাণিজ্যিক ভাবে আর উৎপাদন করতে পারব না, বেচতেও পারব না। বেআইনি হবে তা।

দুঃখের বিষয়, এর মধ্যেই নকশি কাঁথা এবং জামদানি শাড়ির প্যাটেন্ট নিবন্ধিত করে ফেলেছে ইন্ডিয়া।

সামনে আরো নিবন্ধন হবে। এই রকম হাজার হাজার (আসলে লক্ষ লক্ষ) জিনিসের প্যাটেন্ট স্বত্ব আমরা হারাইয়া ফেলব অচিরেই।

 

২.


ভিডিও: বাংলার রসগোল্লার ভৌগলিক নির্দেশক (জিয়োগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) এর স্বীকৃতি পেতে  ইন্ডিয়ার রাজ্য ওড়িষা ও বাংলার লড়াই

ভিডিওতে দেখুন, মিষ্টি নিয়ে ওড়িষার সঙ্গে প্যাটেন্টের লড়াইয়ে গেছে বাংলা। বাংলা রাজ্যের দাবি,  ‘চৈতন্য চরিতামৃতে’ রসগোল্লার উল্লেখ আছে। তদুপরি ১৮৬৪ সালে চিৎপুরে মিষ্টির দোকান করেন বিখ্যাত ময়রা নবীন চন্দ্র দাস। ৪ বছরের চেষ্টায় ১৮৬৮ সালে বিশ্বের রপ্রথম রসগোল্লা তৈরি করেন তিনি।

যদি রাজ্যের দাবি অনুসারে কৃষ্ণদাস কবিরাজের (১৪৭৮-১৫৩৩) বই ‘চৈতন্য চরিতামৃতে’ রসগোল্লার উল্লেখ থাকে তবে কী ভাবে নবীন চন্দ্র দাস বিশ্বের প্রথম রসগোল্লা তৈরি করেন তা নিয়ে অবশ্য দুশ্চিন্তা নাই বাংলার। তাদের নিজেদের দাবির প্রেক্ষিতে নানান নথি পেশ করেছে বাংলা। রসগোল্লাই শুধু না, গোবিন্দভোগ নিয়েও প্যাটেন্টের দাবি আছে বাংলার।

প্রাথমিক ভাবে বাংলা রাজ্যের দাবিতে সন্তুষ্ট জিআই। তারা বলছেন রসগোল্লার যে হোয়াইটনেস বাংলার বাইরে কোথাও সেটা নাকি আনতে পারে না। তবে এ বাংলা তদানীন্তন পশ্চিমবাংলা। পশ্চিমবাংলা আদিতে বেঙ্গলের অংশ ছিল। এখন তারাই বেঙ্গল, আমরা নই—এইটাই সমস্যা।

সম্ভবত চেন্নাইয়ের জিআই কর্তারা রসগোল্লার উপর জিআই দাবি মাইনা নিচ্ছে নতুন ‘বেঙ্গল’ এর। এখন ওড়িষা শুধু নয়, বাংলাদেশও মে বি রসগোল্লার উপর কর্তৃত্ব হারাবে। সাদা যেই রসগোল্লা আমরা দেখি তার রপ্তানি অধিকারও হারাতে পারে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞরা ভাল বলতে পারবেন। বিশেষজ্ঞরা যাতে কথা বলা শুরু করেন, রাষ্ট্র যাতে কাজ করা শুরু করে তার জন্যেই আমার এই লেখা।

নইলে বাংলা রসগোল্লার প্যাটেন্ট পাওয়ার পর আমাদের হাতে থাকবে গোল্লা!

 

৩.

এই আশঙ্কার প্রায় সমান খারাপ হচ্ছে এই যে, পশ্চিমবাংলার ‘বাংলা’ নামকরণের কারণে বাংলাদেশের ইনডিয়ায় হেলান দেওয়া বাংলাপ্রেমিক সংস্কৃতি ব্যবসায়ীরা এখন নিজেদের আইডেন্টিটি তৈরিতে বিশেষ মনোযোগী হয়ে পড়বেন।

ফলস্বরূপ, এক নতুন ‘বাংলা’ জাতীয়তাবাদের ঠেলা সামলাইতে হবে আমাদের, এই বাংলাদেশে।

‘বাংলাই বাংলাদেশ, বাংলাদেশই বাংলা’—এই রকম একটা পরাবাস্তব জাতীয়তাবাদের হাহাকার দেখা দিতে পারে আমাদের জাতীয় জীবনে।

আমাদের এখন জাতীয় ভাবে পজেটিভলি বুঝতে হবে ‘বাংলা’ জাতীয়তাবাদের বাইরে কোন আইডেন্টিটি আমরা ধারণ করব, এবং তা কেন করব, নাকি ইনডিয়ার নতুন ‘বাংলা’ পরিচয়ের মধ্যে লীন হব আমরা? সে আশঙ্কা আছে।

আমাদের ভয়ানক ক্ষতি হয়ে যাবে যদি রাষ্ট্রীয় ভাবে খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক মণ্ডলীর কাছে আমরা আমাদের Bengal জনিত দাবিগুলি উপস্থিত করতে না পারি। রাষ্ট্রীয় ভাবে Bengal এর দাবি আমাদের বেশি হওয়ার কথা, কিন্তু যেহেতু আমাদের দেশের নামের সঙ্গে বেঙ্গল যুক্ত নাই তা একটু কঠিনও আবার।

ইনডিয়া ‘বাংলা’ নিয়া যত তার সীমান্তবর্তী প্রদেশ রাঙ্গাইতে থাকুক, আমরা আমাদের Bengal কোনোভাবেই ছাড়ব না। Bengal যেহেতু আমাদেরও।

জয় বাংলা!

About Author

ব্রাত্য রাইসু
ব্রাত্য রাইসু

কবি, বুদ্ধিজীবী, চিত্রশিল্পী, সাক্ষাৎকারগ্রহীতা ও বিদূষক।