page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

পাগারু ঠসা

জামালপুর আমার দাদাবাড়ি। ১৯৯৬ সালে ইলেকশানের সময় একবার গেছিলাম বাপ মা’র সাথে। সেই প্রথম যাওয়া, এবং গত ২০ বছরের মধ্যে সেই শেষ। আমার দাদাবাড়িতে কেউ থাকেন না। বাড়ি-টারিও আর নাই। আমার চাচারা (এবং বর্তমানে আমার চাচাতো ভাইরা) রাজনীতির সাথে আছেন, তারা নিজেদের সময়মত সময়ে গ্রামে যান, গ্রামের মানুষদের সাথে রাজনৈতিক আহা-উহু করেন, এরপর উনারাও শহরে নিজ নিজ বাড়িতে ফেরত আসেন।

আমার বাপ-মা যখন বিয়া করেন, তখন বাংলাদেশে ১৮টা জেলা ছিল। তারা হানিমুন করছিলেন প্রত্যেকটা জেলায় ঘুইরা বাংলাদেশের সব দর্শনীয় জায়গা দেইখা। এইবার আমার বাংলাদেশ সফরের অ্যাজেন্ডা ছিল বর্তমান ৬৪ জেলার সব অদর্শনীয় জায়গা ঘুইরা ফেলানো। সেই বাবদ আমার জামালপুর যাওয়া।

01. logo nadia png

জামালপুর অত্যন্ত শ্রীহীন একটা জেলা। তার পাহাড় নাই, জঙ্গল নাই, পানি আছে নামকাওয়াস্তে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও টিঙ্গটিঙ্গা দশ-আনিতে। চারদিকে ঝগড়ার চর, খেওয়ার চর, চিনার চর, মালির চর, খেতার চর, ঝালড় চর, মেষের চর, গোয়ালের চর—এইসব মারাত্মক নামওয়ালা বালিওয়ালা ধূসর চরাঞ্চল।

কিন্তু জামালপুরের সবচাইতে মজার জিনিস দেখলাম তার মানুষ। এবং তার ভাষা।

আমি গেলাম গুদারাঘাটে একজনের বাসায়। জমি নিয়া গোলমাল। এক জমি চারজনের কাছে বিক্রি হইছে। শুধু চার জনের কাছেই জমির মালিক জমি বিক্রি করেন নাই, বিক্রি করার পরে উনি এখনো চার ক্রেতার জমিতে ভুট্টা ও গম চাষ কইরা খাইতেছেন।

আমার মহান পিতৃদেব গেছেন গ্রামের মাতবর স্টাইলে সেই ঝামেলা মিটাইতে। আমি আসাতে বাড়ির মহিলারা বাসার ছোট ছোট ছেলেদের দোকানে পাঠাইলেন চা পাতা আনতে। এরপর উনারা বাড়ির উঠানের মাটিতে পুইতা রাখা আদা বাইর কইরা অত্যন্ত চিনিবহুল আদা চা বানাইলেন আমার এবং বাড়ির মুরগীর জন্য।

আমি চা পিরিচে ঢাইলা সুরুৎ সুরুৎ শব্দ কইরা চা খাইলাম। বাড়ির ভিতরে জমির মালিক একটা মাচার উপর উইঠা বইসা বিড়ি টানতেছেন এবং একটা লাল মুরগীরে রুটি খাওয়াইতেছেন। উনার নাম পাগারু। লোকজন ডাকেন পাগারু ঠসা। ‘ঠসা’, কারণ উনি কানে শোনেন না।

পাগারু ঠসা

উনার নাম পাগারু। লোকজন ডাকেন পাগারু ঠসা। ‘ঠসা’, কারণ উনি কানে শোনেন না।

আমার অবশ্য ধারণা উনি ভালোই কানে শোনেন। মাঝেমধ্যে ভান করেন না শোনার। উনি মুদ্রাদোষ আকারে একটু পরপর ‘ইডি’ ‘ইডি’ বলেন।

—মাচায় উইঠা কী করেন?

—ইডি ইডি—তুমি কেডা, গেল্লি? তুমারে কোন্ঠো দেকচি?

—আমার বাবার নাম নজরুল ইসলাম। আমাকে আপনি আগে দেখেন নাই।

— নরজুল? তুমার বাপেরে শেন ছুডো দেখচি!

—জ্বি। আপনি মাচায় কী করেন?

—আগে গম চুরি কত্তাম—ইডি ইডি—‘কাবিখা’র আমলে। ষুলো টন গম চুরি কচ্ছিলাম। বিশাল রিকস। টুক্কের চরর থন লুক নিয়া আইছিল্‌ আমারো মাইত্তে। তহনি কানের উপর চর মাইছিল্‌ ইডি ইডি ইউ-পি চেয়ারম্যানো।

—কাবিখা কী?

আমার পাশে নায়িকা পপির ছবি বুকপকেটে নিয়া দাঁড়ানো একজন বাচ্চা ছেলে উত্তর দিলেন, “কাজের বিমিময় (বিনিময়ে) খাইদ্য।”

pagaru-3

নায়িকা পপির ছবি হাতে বাচ্চারা।

আমি আবার তাকাইলাম পাগারু ঠসার দিকে। উনি বইলাই যাইতেছেন।

—মারি কাডি খাওয়ার সুযোগ কই?—ইডি ইডি—অরা দলেক দিবেরই চায় না! তুমার বাপে বলে ম্যালা বড় হইছে। তুমার চাচারায় মিনিষ্টর। তা আমাগোরে দিবার কোডাই? মুহো মইদ্দে বাত নাই। তো গোটা তিনি গাইগরু আছিল্‌।

—সেই গরু কই?

—এইডা আমার চরাই (মুরগীকে দেখাইয়া), অক উডি খাওয়াই।

—রুটি ক্যানো?

—উডিতে সাইস্ত্য ভালো হয় বেন, আমার মেয়ে জামাই বাজারত দাম পাইল হনি—তা—ইডি ইডি—টেয়া কেমাই করি খা তোরা—আঙ্গো তো লুকাল গম্মেন্ট নাই, বুচ্ছো না, গেল্লি?

—লোকাল গভর্নমেন্ট দিয়ে আপনি কী করবেন?

—ওডি কওয়া পাবো না। তা এর নাম হইলো কালাবাপ। এ সারাদিন আমার বুগলে এবে বয়া থাকবো। জেল্লা জেল্লা আমি যামু, অন্তি যাবোয় অয়।

—ভালোই তো। কিছুক্ষণ আগেই কি ওকে দেখছি বাঁশগাছের উপর বইসা থাকতে?

—তা আমি কি আর তুঙ্গোর মন্তি সাবের মত হওয়া পামু? আল্লারই কী কাম! ওই পেসিডিয়াম সদস্য আছিল্‌ না, ফারুক এস-পির বড় শালা, অয় আমাক ক’লো—কয় লাখ টেয়া নাগবো, নিক! তহনি শেন ইউ-পি চেয়ারম্যানো দুই ঠ্যাং দিছে এস-পির ঘাড়ো তুলি।

—কী করছে? কে কার ঘাড়ে ঠ্যাং উঠায় দিছে?

—তা অপুক অরা আর নমিনেশান দিলো না—ইডি ইডি—কী শিশটেম! ফারুকে আমাক ক’লো, তগর দিয়া কুনডক হবার নয়। জব্বারে কিছু করা পায় না।

—জব্বারটা কে?

পপিওয়ালা বাচ্চা ছেলে উত্তর দিলেন, “ওই পেসিডিয়াম সদস্য!”

—তা শেখ নামডা কাইটা আইসা কথা কউক—ইডি ইডি—আঙ্গর লগে।

—শেখ আবার কে এইখানে?

এইবার উনি বাচ্চা ছেলের দিকে ঘুইরা রাগ রাগ গলায় চিল্লায়ে উঠলেন, “ঐ তোরো কালাবাপের নিগা চা জুড়াইতে কইচি না? গরম দিলে বেন আবার কী করে?”

আমি আর ঠসা সাহেবের সাথে কথা বাড়াইলাম না। পপিওয়ালা পাংখা দিয়া এক কাপ আদা চা ঠাণ্ডা কইরা ‘কালাবাপ’রে দিলেন। আমি মনে মনে আমার পিতৃদেব ও জমির চার মালিকরে শুভকামনা জানাইলাম।

About Author

নাদিয়া ইসলাম
নাদিয়া ইসলাম

ফ্যাশন ডিজাইনার। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক সাইন্স থেকে পাশ করে এখন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। ২০০৭ থেকে ইংল্যান্ডে আছেন। এর আগে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। জন্ম লিবিয়ার সির্তে। মিছুরাতায় থাকতেন। ১১ বছর বয়সে লিবিয়া ত্যাগ করেন।

Comments

  1. faraby ananta says:

    জামালপুর আমারো দাদাবাড়ি। এখানকার ভাষা নিয়ে এত দারুন লেখা আর পড়ি নাই। লেখকের ক্যামেরার কাজ নাকি লেখনী, কোনটা বেশি ভালো বুঝতে পারছি না। 🙂