page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ

ছোটবেলায় আমার একটা প্রিয় বই ছিল। আলেক্সান্ডার বেলায়েভের ‘উভচর মানুষ’। ওই বইয়ে একটা আর্গুমেন্ট ছিল—প্রকৃতির আইন ভঙ্গ করা উচিৎ কিনা। গল্পে নায়ক ইকথিয়ান্ডরকে সার্জারি করে হাঙরের কানকো বসিয়ে উভচর বানানোর ‘অপরাধে’ প্রফেসর সালভাদরকে আলাদতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সালভাদর কি প্রকৃতির নিয়মকে অসম্পূর্ণ ভাবেন কিনা সেটা জানতে চাইলে, উনি নিজেকে ডিফেন্ড করার জন্য সার্জারি করে অ্যাপেন্ডিক্স কেটে বাদ দেওয়ার কথা বলেন। অ্যাপেন্ডিক্স বাদ দিলে ওটাকে কেন কারুর প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ মনে হয় না জানতে চান।

কোনো কিছু আসলে কী করে প্রাকৃতিক থাকে সেটার সংজ্ঞায়ন সবার আগে জরুরি। মোটামুটি প্রথাগত মানুষের কিছু স্টেরিওটাইপ ধারণা—প্রকৃতির ব্যাপারে হচ্ছে, গাছপালা বা এই সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো প্রাকৃতিক। যা হচ্ছে আশে-পাশে সেগুলো সবই প্রাকৃতিক না হলেও স্বাভাবিক। নতুন কিছুকেও স্বাভাবিক হিসেবে ধরা যাবে যদি নতুন দর্শন বা প্রযুক্তি তাদের চলমান বোধের ঊর্ধ্বে না যায়।

sreyan-logo

‘চলমান বোধ’ বললাম কেন সেটা আগে ব্যাখ্যা করি। আমরা সাধারণত কিছু পরিবর্তনের বিরোধিতা করি। যেমন,ভাষার ক্ষেত্রে এখন RJ ভাষা, ফারুকী জেনারেশনের ভাষার প্রচণ্ড বিরোধী আমরা। আসলে এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করে লাভ নাই। ভাষার ধর্মই পরিবর্তনশীলতা। চর্যাপদ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন আমরা চাইলেও পড়তে পারব না। আসলে বিরোধিতা ‘পরিবর্তন’-এর না করে ‘পরিবর্তনের গতি’র হওয়া উচিৎ।

ঠিক কোন গতিতে পরিবর্তনটা হলে সেটা আমাদের টিকে থাকার জন্য উপযুক্ত হবে সেটা গবেষণার বিষয় হতে পারে। ‘পরিবর্তন’কে অযথা দোষারোপ করা আদতেও যৌক্তিক চিন্তার ভিত্তিতে দাঁড়ানো না।

belayev-122‘উভচর মানব’ বইটাতে হুট করে মানুষকে উভচর বানায়ে ফেলার প্ল্যানকে গ্রহণ করার ব্যাপারে একবিংশ শতাব্দীর মানুষই প্রস্তুত না। আর ওই গল্পটা তো বিংশ শতাব্দীর! আইডিয়াটা সময়ের অনেক আগেই চলে আসছে—সমস্যাটা এখানেই।

মানুষ এখন অ্যাপেন্ডিক্সের অপারেশন থেকে শুরু করে প্রোস্থেটিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ লাগানোকে হয়তো অপ্রাকৃতিক বলে উড়িয়ে দেবে না। যদিও এগুলো সবই প্রচণ্ড পরিমাণে অপ্রাকৃতিক—তবে বাতিল না। কারণ এ ধরনের অপ্রাকৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে মানুষের সরাসরি স্বার্থ জড়িত। মানুষ দড়াম করে পয়জনড হতে ভালোবাসে না। স্লো পয়জনিংয়ে কিন্তু মানুষের আপত্তি নাই।

কারোর স্বজনের স্কিন ক্যান্সার হলে তার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু ওজন স্তর ধ্বসে আল্ট্রাভায়োলেট রে যে গোটা হিউম্যান রেসের স্কিন ক্যান্সারে ভোগার আশঙ্কা বাড়ায় দিচ্ছে সেটা নিজের গায়ের উপর এসে না পড়লে কেহ বুঝবে না, অনেক ক্ষেত্রে গায়ে পড়ার পরেও অনেকেই বুঝবে না।

মানুষের মেন্টাল ইমেজ তৈরির সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা যদি আমাদের দৈনিক সমস্যার লিস্ট তৈরি করি তাহলে এক থেকে দশে সেই সমস্যা বা চাহিদাগুলাই থাকবে যেটার সাথে আমাদের ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতা সরাসরি জড়িত। যেমন টাকা পয়সা, চাকরি, গাড়ি বাড়ি কেনা, পরীক্ষার রেজাল্ট, প্রেম-পিরিত করা, চলমান কোনো অসুস্থতা ইত্যাদি। শব্দদূষণ, জনসংখ্যা, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, এনভায়রনমেন্ট পলিউশান এগুলো আসবে না, বা না আসাটাই স্বাভাবিক।

যদি পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও কেউ চিন্তা করে সেটা করবে খুব জোর পরের তিন জেনারেশন। সুতরাং সালভাদরের পাগলামোর যে আদৌ একটা প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে সেটার কোনো মানসিক প্রতিচ্ছবি সাধারণ মানুষের মাঝে সহজে তৈরি হওয়ার কথা না। লিডার গোছের মানুষের অবশ্য এ রকমটা ভাবার কথা—যেটা আসলে অন্ততঃ বাংলাদেশের সুবিধাবাদী সরকারদের মাথায় আসবে না।

আগেই বলেছি আমরা বিষ খেতে চাই না কিন্তু স্লো পয়জনিংয়ে সমস্যা নাই। মানুষের এই মানসিক গড়নটা লং টার্ম সারভাইভালের জন্য ক্ষতিকারক। লংটার্ম সারভাইভাল মানে কিন্তু মানুষের বয়েস দেড়শ বছর বাঁচা না। মানুষের গড়ায়ু হয়ত দেড়শ হতে খুব বেশি দিন লাগবে না। কিন্তু মানব সভ্যতাকে লক্ষ লক্ষ বা কোটি কোটি বছর টিকিয়ে রাখার যোগ্যতা মানুষের আছে কিনা সেটাই হচ্ছে আমার প্রশ্ন!

কিছু মানুষ আছে উন্মাদের মত “ভাব মারার জন্য আইফোন কেনা” নিয়ে চিন্তা না করে মানুষের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি আর সম্পদের পরিমাণের হিসাব কষতে থাকে। হয়তো বা তাদের কাছে সমুদ্রকে সুবিশাল শক্তির ভাণ্ডার মনে হয়। হয়ত তারা ভাবতেই পারে মানুষকে পানিতে থাকার মত করে বদলে নিলে স্থান, সম্পদ আর শক্তির সমস্যা মিটে যাবে।

এদের চিন্তা হয়ত হুট করে আমাদের মেন্টাল ইমেজে ধরা পড়বে না, না পড়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে এদের ভাবনাগুলো অযৌক্তিক বা অকল্যাণকর—এ রকম উপসংহারে আসার আগে বেশ কয়েকবার ভালোমত ভেবে নেওয়াটা কি উচিৎ না? কেননা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এ ধরনের নেতিবাচক কল্পনা প্রায়শই ব্যক্তিগত রেষারেষি, প্রতিহিংসা থেকে শুরু করে খুয়াখুনি পর্যন্ত চলে যায়।

হতে পারে কোনো একটা সময় কোনো এক প্রজন্ম আসলেই পানিতে থাকছে। তারা হয়ত হাসাহাসিও করছে এই ভেবে—কোন এককালে মানুষ ‘প্রাকৃতিকতা’ বা ‘স্বাভাবিকতা’র দোহাই দিয়ে এ ধরনের পরিবর্তনকে নিরুৎসাহিত করত।

ছোটবেলায় আমরা মোটামুটি সবাই একটা কথা পড়েছি—বাতাসের সমুদ্রে থেকে আমরা ভুলে যাই যে আমরা বাতাসের মধ্যে ডুবে আছি। গতিশীলতার কিংবা পরিবর্তনের সমুদ্রে ডুবে থেকে আমরা আসলেই ভুলে যাই পরিবর্তনটাই প্রাকৃতিক, গতিশীলতাই প্রাকৃতিক। টিকে থাকার একটাই শর্ত—পরিবর্তিত হওয়া। কিংবা বলা চলে—পরিবর্তনের মাঝে টিকে থাকার এই গল্পটাই প্রায় চোদ্দ বিলিয়ন বছর ধরে প্রকৃতি লিখছে। মাঝখান দিয়ে তোমার আমার স্থবিরতার বন্দনাকে প্রকৃতি সযতনে মুছে দিচ্ছে।

এই যে চিকিৎসা শাস্ত্র সংযোজন বিযোজন—ভ্যাক্সিন, এন্টিবায়োটিক; এই যে কাঁচা না খেয়ে নানান মশলা পাতির বিন্যাস সমাবেশ করে কাঁচা খাবারকে নানান স্বাদ দেওয়া কোনটাকে নির্ভেজাল প্রাকৃতিক বলা যায়?

আমাদের পরিচিত seven sins-গুলো হচ্ছে মানুষের আদি আর অকৃত্রিম কন্সটিটিউশান—envy, lust, wrath, greed, gluttony, sloth, ego। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে একটা বিনয়ী ভদ্র পরোপকারী মানুষ হওয়ার ঘটনাও কিন্তু কৃত্রিম।

এই প্রবৃত্তিগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য সমাজ ব্যবস্থাতেও অনেক পরিবর্তন আসছে। প্রাকৃতিক বা বলা চলে নির্ভেজাল প্রবৃত্তি কামকে ইন্সটিটিউশনালাইজ করেছে।

About Author

সায়মা জেবীন শ্রেয়ান
সায়মা জেবীন শ্রেয়ান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স করছেন।