page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

“প্রতি বছরই আমার চেষ্টা থাকে গত বছর যে রকম লিখেছি, এ বছর সেরকম লিখবো না।”—মঈনুল আহসান সাবের

সাদ রহমান: এবার বইমেলায় যে বইগুলা আসছে, ওইগুলার নামগুলা জানতে চাই।

মঈনুল আহসান সাবের: বই আসবে চারটি। চারটির মধ্যে একটা হচ্ছে সংকলন। সংকলন মানে ওটার নাম রাখা হয়েছে শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ১। ওইটা হয়তো পর্যায়ক্রমে আরো, ২/৩ এভাবে বের হতে পারে। আর আপাতত এছাড়া দুটো বই বের হয়েছে, আরেকটি হয়তো হবে। যে দুটো বের হয়েছে, তার একটির নাম হচ্ছে, দূরের গল্প। আরেকটা হচ্ছে, এভাবে লেখা হতে পারে আরেকটি গল্প। যেটি আসবে, সেটার নাম, সব গল্প তার মতো শেষ হয় না। এর মধ্যে ‘সব গল্প তার মতো শেষ হয় না’ বা ‘এভাবে লেখা হতে পারে আরেকটি গল্প’, এদুটো হচ্ছে মূলত ইল্যুশনের উপর কাজ। ইল্যুশন হচ্ছে, দুজনই দেখা যায় যে দুজন লেখক, লিখতে লিখতে তাদের চরিত্রের সাথে কনভারসেশন করছেন। তারা ভাবছেন যে, তাদের চরিত্রগুলো বাস্তব জীবনে চলে এসেছে। কোনো না কোনো প্রেক্ষাপটে, কোনো না কোনো অবস্থার কারণে। কোনো না কোনো, এমন একটা সিচ্যুয়েশন তৈরি হয়েছে, সেখানে হয়তো কোনো সময় হয়তো উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা লেখকের সাথে তর্ক করছেন, যে এটা কি এরকম হতে পারে কিনা। বা কোনো সময় বলছেন যে ঠিক এই পরিণতি আমার পছন্দ না। বা বলছেন যে, এই সংলাপটা এরকম না হয়ে অন্যরকম হতে পারতো। এটা হচ্ছে, লেখক লিখতে লিখতে হয়তো তার মধ্যে একধরনের মায়া বা বিভ্রম, ইংরেজিতে আমরা যেটাকে ইল্যুশন বলি, সেই ইল্যুশনটা তৈরি হয়েছে। তো এই কনভারসেশন দুটো, এই দুটো উপন্যাস, আসলে লেখকের সাথে তার ক্যারেক্টারের কনভারসেশন। এর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়েছে। এবং অবশ্যই এটার একটা পরিণতি আছে। আর আরেকটি, যেটা দূরের গল্প, দূরের গল্পটা আসলে এরকম যে, একজন লেখক এবং তার প্রেমিকা, এরা দুজন মিলে ঠিক করে যে, তারা দুজন মিলে একটি উপন্যাস লিখবে। উপন্যাসটা লিখবে, ধরো যে, নায়িকা যে, সে যে খুব ভালো লিখতে পারে, বা কিছু না। এটা একটা চ্যালেন্জের মতো যে লেখক লিখতে পারছে না এখন তারা ঠিক করেছে, দুজন মিলে যদি লিখতে শুরু করে তাহলে হয়তো লেখক যে লিখতে পারছে না, তার যে রাইটার্স ব্লক তৈরি হয়েছে, এটা হয়তো দূর হবে। দুইজন লিখতে আরম্ভ করে। দুইজন লিখতে আরম্ভ করলে হয়তো এমন একটা ধারণা ছিলো, তাদের দুইজনের জীবনের কথা আসবে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে আসছে আসলে তাদের দুজনেরই জীবনের ভেতর আরো অন্যান্য যে ক্যারেক্টারগুলো আছে, তাদের জীবনের আরো অন্যান্য ঘটনা আছে, সেগুলো আসলে কোনো না কোনোভাবে চলে আসছে। হয়তো এমন একটি ক্যারেক্টার আসছে, যে ক্যারেক্টারটার প্রতি ওই নায়ক বা নায়িকা কোনো সময় হয়তো কল্পনা করতো যে, ওরকম হওয়া তার ইচ্ছা ছিল। বা তার জীবনে ওরকম কোনো একটা ক্যারেক্টার এসেছিল। তো এইভাবে এই গল্প, এটাও একটা যে, এভাবে লিখতে লিখতে দেখা যায় যে, একটা উপন্যাস শেষ হচ্ছে।boimela-logo-2016

সাদ: তিনটা উপন্যাসই, মানে লেখকের চিন্তা বা একটার ভিতরে রাইটার্স ব্লক, তিনটাই তো লেখক চরিত্রের ভিতর দিয়ে আগাচ্ছে। এটার বিশেষ কী কারণ?

সাবের: হ্যাঁ। তিনটাই লেখক চরিত্র। বিশেষ কারণ নেই। আমি যেটা করি, প্রতি বছরই আমার চেষ্টা থাকে গত বছর যে রকম লিখেছি, এ বছর সেরকম লিখবো না। তো এবছর তিনটা লেখা, তিনটাই যেভাবে হোক, কাকতালীয়ভাবে হোক, বা সদিচ্ছায়, ইচ্ছায় হোক লেখক চরিত্র চলে এসেছে। এটাকে আমি কাকতালীয় ব্যাপার হিসেবেই, কারণ এটা আমি ভেবেচিন্তে পর পর লিখি নি। এটা বিভিন্ন সময়ে লেখা, আমি হয়তো বই বের করার আগে কিছুটা পরিমার্জনা করেছি।Untitled-1

সাদ: দুইটা উপন্যাসের ভিতরে যেই ইল্যুশন, যে লেখক তার ক্যারেক্টারগুলা নিয়া যেই একটা বিভ্রম, এটা কি আপনের লেখার সময়, বা এরকম  ব্যাপারগুলা ঘটে? বা আরেকটা যে রাইটার্স ব্লক?

সাবের: রাইটার্স ব্লক সব লেখকেরই ক্ষেত্রে ঘটে। কোনো না কোনো সময় রাইটার্স ব্লক ঘটে। লিখতে পারে না, লেখা হয় না, চেষ্টা করেও হয় না। আর ইল্যুশন, যেটা বা মায়া বা নিজের লেখালেখির সাথে জড়িয়ে পড়া, ক্যারেক্টারদের সাথে জড়িয়ে পরা, এটা হয়তো এমন হতে পারে, কেউ কেউ হয়তো ব্যক্তিগত ভাবে হয়তো তার মাথায় থাকে যে, এই ক্যারেক্টার কে কী করবো, বা কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবো। মানে আমার মূল কাজটা যেটা করেছি ক্যারেক্টারকে আমি আরেকটা ক্যারেক্টার বানিয়েছি।

সাদ: এই চেষ্টাটা, এটার পিছনে আপনার ইচ্ছা কতটুকু? আর কতটুকু দরকারি মনে করেন?

সাবের: দুটোই ব্যাপার। একটা তো, যে, যেহেতু আমি নিজেকে সবসময় বদলাতে চাই লেখালেখির ক্ষেত্রে, আর দরকারি যেটা, যাই বলি না কেন লেখা তো নানারকম হতে পারে, তাই না? তো লেখা নানারকম হতে পারে এবং লেখকের দায়িত্ব যে লেখা কত রকম হতে পারে। লেখার ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ নেই। আমরা কোনো বৃত্ত তৈরি করে দেই নি যে, এই বৃত্তের বাইরে যেতে পারবে কি পারবে না। তো আমি মনে করলাম, হ্যাঁ, লেখা যে আরো নানারকম হতে পারে, নানাভাবে আসতে পারে, তার যতরকম চেষ্টা একজন লেখক করতে পারে সে দায়িত্ব আমার ওপরও বর্তায়। বা দায়িত্ব না বলি, ইচ্ছাটা বর্তায়। যে আমি পারি, আমি এভাবেও পারি। Untitled-2

সাদ: ওই সংকলনটা নিয়ে একটু বলবেন।

সাবের: এই সংকলনের গল্প, লেখা আছে, উপন্যাস আছে। আসলে যেটা সমস্যা, আমরা তো আসলে উপন্যাস বলি, মূলত আসলে নভেলা বলা উচিত। পরিসরের দিক দিয়ে। একটি দুটি হয়তো একশো পৃষ্ঠার মধ্যে, সোয়াশো পৃষ্ঠার মধ্যে উপন্যাস হয়ে যায়, কারেক্টার পায়, তো অধিকাংশই পায় না। তো আটটি লেখার সংকলন। এই লেখাগুলো আমার প্রিয়। প্রিয় মানে, যেহেতু প্রথম খণ্ড এটি, ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’ নাম দেওয়া হয়েছে। যদি তিন খণ্ড হয়, তাহলে তো আমার অন্তত, প্রথম খণ্ডে অন্তত আমার খুব প্রিয় লেখাগুলো যাওয়া উচিত। এর মানে এই না যে এর বাইরে আমার আর কোনো প্রিয় লেখা নেই।

সাদ: এই যে সংকলন করা, একত্রিত করার যে একটা রীতি, অনেকদিন আগে থেকেই তো চলে আসছে, এই ব্যাপারটাকে মানে কী মনে করেন? ভালো মনে করেন?

সাবের: মানে, আমি যদি খুব মানে চাঁছাছেলা ভাবে বলি, তাহলে যেটা হচ্ছে যে, এমনও তো হচ্ছে যে, আমরা ঠিক ওভাবে নাম জানি না, কোনো লেখকের, মানে অনেক লেখকরই, কবিতার বই বেরিয়েছে বিশটা, গল্পের বই বেরিয়েছে, উপন্যাস বেরিয়েছে, কিন্তু পাঠক নাম জানে না। এখন একজন লিখবেন, পাঠক তার নাম জানবে না এটাও তো একধরনের ব্যর্থতা। হয় পাঠককে জানতে হবে, ভালো পাঠককে জানতে হবে, না হয় খারাপ পাঠককে জানতে হবে। খারাপ-ভালো পাঠকের বিচারক আমি না। কিন্তু এরকম একটা ব্যাপার তো সমাজে আছে, এটাও আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আমি কাউকে হয়তো বিদগ্ধ পাঠক মনে করছি, আমি হয়তো কাউকে ততটা বিদগ্ধ মনে করছি না। সব পাঠকই পাঠক।

dhতো এখন কোনো পাঠকই যদি তার নাম না জানে, তার বিশটা বই বেরিয়ে গেছে, তারপর তার একটা সংকলনও বের হলো, তার শ্রেষ্ঠ কবিতা, বা তার নির্বাচিত কবিতা, বা তার শ্রেষ্ঠ গল্প, এই ব্যাপারগুলো অবশ্যই হাস্যকর। কিন্তু এর পাশাপাশি আবার যেটা হয়, যে অনেক বড় লেখক, অনেক ভালো লেখক, এদেরও কিন্তু, যাদের আমরা বড় বা ভালো মনে করি, করছি, সামগ্রিকভাবে, তাদের তো অনেক বই আউট অব প্রিন্ট। পাওয়া যায় না। বা খুঁজে পাঠক পাচ্ছে না। আগ্রহ আছে আর কি। তো এই সংকলনগুলো করলে বা সমগ্র করলে হয়তো তখন দেখা যায় যে, এই লেখাগুলো একজন পাঠকের পক্ষে খুব সহজে, যার আগ্রহ আছে তার আর কি, সে খুব সহজে এগুলো জোগার করতে পারছে আর কি।

বাংলা একাডেমি বইমেলা, ১০/২/২০১৬

ইউটিউব ভিডিও

About Author

সাদ রহমান
সাদ রহমান

জন্ম. ঢাকা, ১৯৯৬। কবিতার বই: 'কাক তুমি কৃষ্ণ গো' (২০১৬)।