হাইপারটেনশন আর প্রিডায়াবেটিস, একটা আরেকটাকে বাড়তে সাহায্য করে।

কারো রক্তে সুগারের মাত্রা দীর্ঘকাল ধরে বাড়তে থাকলে তিনি প্রিডায়াবেটিক অবস্থায় আছেন বলে ধরা হয়। যদিও রোগ হিসেবে প্রচলিত ডায়াবেটিসের তুলনায় প্রিডায়াবেটিক অবস্থায় রক্তে সুগারের মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে।

এই অবস্থায় পৌঁছানো মানে ধীরে ধীরে টাইপ-টু ডায়াবেটিসের দিকে এগিয়ে যাওয়া। স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ক্ষতির আশঙ্কা ছাড়াও টাইপ-টু ডায়াবেটিস আপনার আয়ু ১০ বছর পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে!

তবে, প্রিডায়াবেটিস অবস্থা থেকে কেউ চাইলেই ফিরে আসতে পারে। যত দ্রুত সমস্যাটা ধরতে পারবেন, তত বেশি নির্দিষ্ট কিছু রিস্ক ফ্যাক্টরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সময় পারবেন। প্রিডায়াবেটিস অবস্থার পেছনে দায়ী অন্যতম কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর হলো শরীরের বাড়তি মেদ, অলস জীবনযাপন অথবা চিনি যুক্ত খাবার বেশি খাওয়া।

শরীরের জিনগত কিছু ব্যাপারও ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে। তবে পরিমিত খাদ্যাভ্যাস আর নিয়মিত ব্যায়াম আপনাকে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থেকে অনেকটাই দূরে রাখবে।

চেক-আপ করার সময় ডাক্তার হয়ত আপনার রক্তের গ্লুকোজ নিয়মিতই মাপছেন। কিন্তু, আপনি নিজে কীভাবে নিশ্চিত হবেন আপনি প্রিডায়াবেটিক অবস্থায় আছেন কিনা?

প্রিডায়াবেটিসের কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণও আছে, যা দেখতে পাওয়া মানে আপনি বিপদে আছেন। আবার এই লেখায় আলোচিত বাত কিংবা চর্মরোগের মতো লক্ষণগুলো দেখা নাও দিতে পারে, যদিও সেগুলো ডায়াবেটিসেরই পূর্বলক্ষণ। নিচে প্রিডায়াবেটিসের উল্লেখযোগ্য ৭টি লক্ষণ।

১. উচ্চ রক্তচাপ

উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের প্রিডায়াবেটিস থাকার আশঙ্কা থাকে। হাইপারটেনশনের ফলে হৃৎপিণ্ড দ্রুত চলাচল করে আর শরীরে প্রচুর রক্ত প্রবাহিত হয়। তাতে করে রক্ত থেকে অতিরিক্ত সুগার বের করে দেয়া শরীরের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

হাইপারটেনশন আর প্রিডায়াবেটিস, একটা আরেকটাকে বাড়তে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই দুই লক্ষণ কারো মধ্যে থাকলে তার হার্টফেইল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।

দুঃখজনক যে, উচ্চ রক্তচাপ আর প্রিডায়াবেটিসের স্পষ্ট কোনো প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা যায় না। অর্থাৎ, আপনার যদি হাইপারটেনশন থেকে থাকে, তাহলে প্রিডায়াবেটিসের ব্যাপারেও আপনাকে এখনই সতর্ক হতে হবে।

২. ঝাপসা দৃষ্টি

প্রিডায়াবেটিস অথবা ডায়াবেটিস, যেকোনোটার ফলেই আপনার দৃষ্টি সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে। রক্তে সুগারের মাত্রা আকস্মিকভাবে কমে গেলে গ্রন্থিগুলিতে সঞ্চিত ফ্লুইড বের হয়ে চোখের লেন্সে চলে আসতে পারে।

মূলত অতিরিক্ত সুগার বের করে দেয়ার জন্যে শরীর যখন কোষ থেকে পানি শুষে নেয়া শুরু করে, তখনই এমনটা হয়। ফলে চোখ প্রসারিত হয়ে আকারে বদলে যায় আর ফোকাস নির্ধারণে সমস্যার সৃষ্টি হয়।

চোখে ঝাপসা দেখার পেছনে সম্ভাব্য অনেক কারণই রয়েছে। তবে এই তালিকার অন্যান্য লক্ষণের সঙ্গে যদি ঝাপসা দৃষ্টিও আপনার সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে হতে পারে আপনি প্রিডায়াবেটিক অবস্থায় আছেন।

৩. চর্মরোগ

মাঝে মধ্যে শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার লক্ষণ শরীরের বাইরেও প্রকাশ পায়। যেমন, রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে চামড়ায় খসখসে উজ্জ্বল অথবা গাঢ় মসৃণ ধরনের প্রলেপ দেখা যায়। যা মূলত প্রিডায়াবেটিসের লক্ষণ।

প্রিডায়াবেটিস স্বাভাবিক রক্ত চলাচলেও প্রভাব রাখে, যার ফলে শরীরের প্রান্তগুলিতে চুলকানি দেখা দিতে পারে। এ ধরনের চুলকানি বিশেষত পায়ে দেখা যায়। অর্থাৎ আপনার চর্ম সংক্রান্ত সমস্যাগুলি যদি প্রিডায়াবেটিসের লক্ষণের সাথে মিলে যায়, তাহলে এ বিষয়ে দ্রুত নজর দিন।

৪. সন্ধিস্থানের বাত

গেঁটেবাত একধরনের আরথ্রাইটিস কিংবা বাতের লক্ষণ। হাড়ের বিভিন্ন সন্ধিস্থানের টিস্যুতে ইউরিক এসিডের ক্রিস্টাল জমা হওয়ায় এমন ব্যথা হতে পারে। এই ধরনের বাত প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক আর প্রিডায়াবেটিসের অন্যতম লক্ষণ।

রাজা অষ্টম হেনরি ছিলেন এই ধরনের বাতে আক্রান্ত বিখ্যাত ব্যক্তিদের একজন। এই রোগকে ‘রাজাদের রোগ’ও বলা হত। সাধারণত অতিভোজন কিংবা বিলাসী খাবার-দাবার বেশি খাওয়ার ফলে গেঁটেবাত হয়। তাই মেদবহুল শরীরেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। এমনকি প্রিডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে অন্যতম একটা রিস্ক ফ্যাক্টর হলো শরীরের এই অতিরিক্ত মেদ।

৫. অকারণে ক্ষুধা লাগা

সুগার অথবা গ্লুকোজ হলো আমাদের শরীর চালানোর অন্যতম জ্বালানী। কিন্তু এই জ্বালানিই যখন অধিক হারে গ্রহণ করেন, তখন অগ্ন্যাশয় থেকে বের হওয়া ইনসুলিন এই অতিরিক্ত গ্লুকোজকে প্রসেস করতে পারে না।

এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ বা সুগার তখন রক্তে মিশে যায়, যা শরীরের শক্তি উৎপাদনে আর কাজে লাগে না। তার জন্যেই ঘন ঘন ক্ষুধা লাগতে পারে, কারণ আপনার শরীর যা চাচ্ছে, তা পাচ্ছে না।

প্রিডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুগার প্রস্রাবের সাথে বের করে দেয়ার জন্য ক্ষুধা লাগলে পানি খাওয়া ভালো। এর হাত থেকে বাঁচার আরেকটা উপায় হলো নিয়মিত ব্যায়াম করা।

৬. প্রচণ্ড ক্লান্তি

রক্তে অতিরিক্ত সুগার যেভাবে আমাদের ক্ষুধা বাড়ায়, তা একইভাবে আমাদের ক্লান্তিও বাড়ায়। পরিমিত খাদ্য গ্রহণের পরও যখন আপনার শরীর তার জ্বালানী পাচ্ছে না, আপনি তখন এমনিতেই ক্লান্ত হবেন।
এই লক্ষণটা প্রিডায়াবেটিসের অন্যান্য রিস্ক ফ্যাক্টরগুলির বৃদ্ধিতেও অবদান রাখে। কারণ ক্লান্তি আর অবসাদ আপনাকে বেশি সময় ধরে বিশ্রাম নিতেও বাধ্য করবে আসলে।

এমন যদি হয় এই ক্লান্তি আপনার দীর্ঘকালীন, তাহলে দেহের ওজন পরিমিত রাখার দিকেও নজর দিন। খালি শুয়ে না থেকে শরীরকে তার প্রয়োজনমতো পরিশ্রম করতে দিন।

৭. ঘন ঘন পিপাসা লাগা

অতিরিক্ত পিপাসা লাগা, বিশেষ করে খাওয়ার পর ঘন ঘন পিপাসা লাগা প্রিডায়াবেটিসের লক্ষণ হতে পারে।

শরীর রক্ত থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ বের করে দিতে পানি ব্যবহার করে। তাতে প্রস্রাবের সাথে শরীরে থাকা অতিরিক্ত সুগার বেরিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ব্যবহারের জন্যে শরীর তার নিকটবর্তী কোষগুলি থেকে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করে। তখন সেই কোষগুলি পানিশূন্য হয়ে পড়ে আর আপনি দীর্ঘ সময় ধরে পিপাসার্ত থাকেন।

এরপর যতই পানি পান করেন না কেন, পিপাসার এই চক্রে একবার পড়ে গেলে যেকোনো মুহূর্তেই আপনি পানিশূন্যতায় ভুগতে পারেন। অবশ্য নিয়মিত পানি পান করে শরীর আর্দ্র রাখলে প্রিডায়াবেটিস আর টাইপ-টু ডায়াবেটিস ঠেকানো সম্ভব। পানি পান আর রক্তে গ্লুকোজের নিয়ন্ত্রিত মাত্রা, একে অন্যের সম্পূরক।

প্রিডায়াবেটিসকে আপনার জন্যে একধরনের সতর্কবার্তা বলতে পারেন। লাইফস্টাইলে দ্রুত পরিবর্তন আনার সতর্কতা। এই তালিকায় আলোচিত একাধিক লক্ষণ যদি নিজের মধ্যে দেখেন, উদ্বিগ্ন না হয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। প্রিডায়াবেটিস কোনো স্থায়ী রোগ না, এই অবস্থা থেকে সুস্থ জীবনে ফিরে আসাও অত কঠিন না। ছোটখাটো কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন খুব কাজে দিবে এক্ষেত্রে। বেশি বেশি পানি খাওয়া, লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা, কোমল পানীয় বা ফাস্ট ফুড বর্জন করা, নিয়মিত ব্যায়ামের জন্যে একজন পার্টনার খুঁজে বের করার মতো ছোটখাটো অভ্যাস প্রিডায়াবেটিসের ঝুঁকি এড়াতে অনেক বেশি সাহায্য করবে আপনাকে।