page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ফ্রেডি গ্রের মৃত্যু, ৬ পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ও বাল্টিমোর রায়ট

যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোর প্রদেশে পুলিশের নির্যাতনের ফলে এক কৃষ্ণাঙ্গের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ১৮ এপ্রিল ২০১৫-তে বাল্টিমোর পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সামনে কয়েকশ মানুষ আন্দোলন শুরু করে।

এরপর প্রতিদিনই এই আন্দোলনকে ঘিরে আরো উত্তেজনা বাড়তে থাকে। প্রথমে পুলিশ আন্দোলনে বাঁধা দিলেও, পরে এই আন্দোলন পুলিশের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এই আন্দোলন বাল্টিমোর ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। গত কয়েকদিন ধরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তালিকায় ছিল বাল্টিমোরের ঘটনা।

ফ্রেডি গ্রে

যা ঘটেছিল বাল্টিমোরে
১২ এপ্রিল, ২০১৫ তারিখে বাল্টিমোরের পুলিশ ফ্রেডি কার্লোস গ্রে নামে ২৫ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ ভ্যানে নিয়ে যাওয়ার সময় ফ্রেডি কোমাতে চলে যান। এরপর তাকে ট্রমা সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯ এপ্রিল  সেখানেই মারা যান ফ্রেডি। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তার মেরুদণ্ডের স্পাইনাল কর্ডে আঘাতের কথা।

প্রথমে মৃত্যুর এই কারণ নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়। পরে প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের বক্তব্য থেকে জানা যায় যেসকল পুলিশ অফিসার ফ্রেডিকে গ্রেপ্তার করেছিল তারা ফ্রেডিকে গ্রেপ্তারের সময় তার ওপর অপ্রয়োজনীয় জোর প্রয়োগ করেছিল।

মাদক এবং ছোটোখাটো অপরাধ সংক্রান্ত ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল ফ্রেডি গ্রে’র। ফ্রেডি ২০টির মত মামলায় জড়িত ছিলেন, এর মধ্যে ৫টি মামলা তার মৃত্যুর সময়ও সচল ছিল।

মাদক পরিবহনের কারণে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্রেডির ৪ বছরের জেল হয়। ২০১১-তে তিনি প্যারোলে মুক্তি পান। প্যারোলের শর্ত ভঙ্গের কারণে ২০১২ সালে ফ্রেডি আবার গ্রেপ্তার হন, কিন্তু তাকে আর জেলে পাঠানো হয় নি। ২০১৩-তে ফ্রেডি প্যারোল শেষ হলে আবার জেলে যান এবং এক মাস পর শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে জেল থেকে মুক্তি পান।

বাল্টিমোর পুলিশের বক্তব্য অনুসারে, ২০১৫ এর ১২ এপ্রিল বাল্টিমোর পুলিশের লেফটেন্যান্ট ব্রায়ান ডব্লু রাইস, অফিসার এডওয়ার্ড নিরো এবং অফিসার গ্যারেট ই. মুলার বাইসাইকেলে টহল দিচ্ছিলেন। বাল্টিমোরের গিলমার হোমস হাউজিং প্রজেক্টের কাছে একটি রাস্তায় সকাল ৮টা ৩৯ মিনিটে ফ্রেডি গ্রে’র সাথে তাদের চোখাচোখি ঘটে।

পুলিশ দেখেই ফ্রেডি পালানোর চেষ্টা করেন। পুলিশের ভাষ্যমতে ফ্রেডিকে কোনোরকম জোর প্রয়োগ না করেই কাস্টডিতে নিয়ে আসা হয়। পুলিশ জানায় এসময় তারা ফ্রেডির সাথে থাকা একটি ছুরি আবিষ্কার করে, এবং এ ধরনের ছুরি অনুমতি ছাড়া বহন করা আইনগতভাবে নিষেধ। কিন্তু বাল্টিমোর সিটির স্টেট অ্যাটর্নি জানিয়েছেন ফ্রেডির কাছে যে পকেট নাইফ বা ছোট ছুরিটি ছিল সেটি আইনগতভাবে বৈধ।

তবে প্রত্যক্ষ্যদর্শীরা জানিয়েছে ফ্রেডি গ্রেকে পুলিশ ব্যাটন দিয়ে আঘাত করা হয়। এবং পুলিশেরা তার পায়ে আঘাত করায় ফ্রেডির পা ভেঙে যাওয়া মনে হচ্ছিল। ফ্রেডি এসময় জোরে চিৎকার করছিল এবং হাঁটতে পারছিল না। পুলিশেরা এসময় তাকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলতে থাকে।

পুলিশের বক্তব্য অনুসারে গ্রেফতার হওয়ার ৩০ মিনিট পর মেডিক্যাল ইমার্জেন্সির কারণে প্যারামেডিকরা তাকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করে। কোমায় চলে যাওয়ার কারণে ৯টা ৪৫ মিনিটে ফ্রেডিকে ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ড আর অ্যাডামস কাউলি শক ট্রমা সেন্টারে ভর্তি করা হয়।

ফ্রেডির পারিবারিক ভাষ্যমতে, ফ্রেডির ভার্টিব্রাতে তিনটি ফ্র্যাকচার, ভয়েস বক্সে কয়েকটি আঘাত এবং তার ঘাড়ের স্পাইন ৮০% মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ফ্রেডি কোমা থেকে আর চেতনা ফিরে পান নি, ১৯ এপ্রিল ২০১৫-তে ফ্রেডি মারা যান। পুলিশ নিশ্চিত করে তার স্পাইন কর্ডের আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।

পরবর্তী ঘটনা
ফ্রেডির গ্রেপ্তারের ঘটনায় জড়িত ৬ পুলিশ অফিসারকে বাল্টিমোর পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ফ্রেডি গ্রে’র মৃত্যুর পরেই সাসপেন্ড করে। বাল্টিমোর পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কমিশনার অ্যান্থনি বাট বলেন, আমরা জানি আমাদের পুলিশ সদস্যরা তাকে সময়মত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, গ্রেপ্তারের পর ফ্রেডি গ্রেকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য সঠিক আচরণ করতে পুলিশ সদস্যরা ব্যর্থ হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস এই কেসের জন্য তদন্ত শুরু করে।

আন্দোলন
ফ্রেডির মৃত্যুর একদিন আগে থেকেই অর্থাৎ ১৮ এপ্রিল থেকে বাল্টিমোর পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সামনে কয়েক শ’ মানুষ আন্দোলন শুরু করে। তিনদিন পরে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ভাষ্যমতে, শত শত বিক্ষোভকারী ফ্রেডি গ্রের মৃত্যুর প্রতিবাদে বাল্টিমোরে জড়ো হয়েছে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের চার্লস এম. ব্লো তার এক কলামে বলেন এই আন্দোলন এত তীব্রতা ধারণ করেছে কারণ এই আন্দোলনকে শক্তি যোগাচ্ছে বর্ণবাদ সংক্রান্ত সমস্যা।

এপ্রিলের ২৫ তারিখ আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের সহিংসতা বেশ বড় আকার ধারণ করে। এসময় আন্দোলনকারীরা আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের দিকে পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে। আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে কমপক্ষে ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৬ জন পুলিশ আহত হয়।

এপ্রিলের ২৭ তারিখ ফ্রেডি গ্রের ফিউনারেলের দিনে আন্দোলন ও সহিংসতা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। ২৭ এপ্রিল বাল্টিমোরের মেয়র সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বাল্টিমোরে কারফিউ ঘোষণা করেন। ২৮ তারিখে বাল্টিমোর সিটির স্কুলগুলি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বাল্টিমোরের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরগুলিতেও তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। ২৯ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক সিটির ইউনিয়ন স্কয়ার থেকে যানবাহন আটকানো ও আন্দোলনের স্থান পরিবর্তনে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে ১৪৩ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয়। একই দিনে ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউজের বাইরে ৫০০ বিক্ষোভকারী আন্দোলন করতে শুরু করে। এছাড়া শিকাগো, মিয়ামি, ফিলাডেলফিয়া, পোর্টল্যান্ড, সিয়াটল সহ অন্যান্য জায়গায় আন্দোলনকারীরা একত্রিত হয়ে আন্দোলন শুরু করে।

প্রশাসনিক পদক্ষেপ
২০১৫ এর মে’র ১ তারিখে বাল্টিমোর স্টেট অ্যাটর্নির অফিস রুল জারি করে যে ফ্রেডি গ্রের ঘটনাটি খুন এবং গ্রেপ্তারের ঘটনায় জড়িত ৬ জন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার সব রকম কারণই তাদের রয়েছে।

বাল্টিমোর সিটির স্টেট অ্যাটর্নি ম্যারিলিন মোসবি বলেন, কোনো অপরাধ না করলেও ফ্রেডি গ্রেকে গ্রেপ্তার করার কারণ প্রতিষ্ঠা করতে পুলিশ অফিসারেরা ব্যর্থ হয়েছেন।

মে’র ১ তারিখে সেই ৬ জন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। সেই ৬ জন অফিসার ইতোমধ্যে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে নির্ধারিত ২৫ হাজার থেকে ৩৬ হাজার ডলারের বিনিময়ে জামিন নিয়েছেন।

ফ্রেডি গ্রে’র সৎ বাবা রিচার্ড শিপলি জানিয়েছেন ৬ জন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ব্যাপারে ফ্রেডি গ্রে’র পরিবার সন্তুষ্ট।

রিচার্ড শিপলি আরো জানান তাদের পারিবারিক উকিল উইলিয়াম মারফি আশা করেন এই মামলা থেকে জাতীয় দায়িত্ব সংক্রান্ত বিষয়গুলিতে আরো বড় পরিবর্তন আসবে এবং পুলিশি নীতির নতুন সংস্কৃতি শুরু হবে।

ইউটিউব ভিডিও – Man who recorded Freddy Gray being captured speaks out

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক