ছোটবেলায় আম্মা ঠাকুরমা’র ঝুলি থেকে গল্প শুনাইত। সেই সময় একেকটা শব্দ কানের মধ্যে গেঁথে যাইত। যেমন ছিল ‘হাড়মুড়মুড়িব্যারাম’। শুনলেই মনে হইত হাড্ডিগুলা সব চানাচুরের মতন মচ মচ করতেছে, জানতাম এই ব্যারাম শুধু শয়তান সুয়োরানিদের হয়। আমার ধারণা ছিল সুয়োরানিরা সারাদিন শুইয়া থাকে বইলাই তাদের হাড্ডি মট মট করে। বড় হইয়া অবশ্য বুঝছিলাম যে কেস তো পুরাই অন্য। তবে সেই কাহিনী আরেক দিন বলব। আজকে বলি বাস্তব জীবনে গল্পের কেমন আছর হইছিল সেই ঘটনা।

আমি তখন ক্লাস ওয়ান বা টু’তে পড়ি। সেই সময় আমাদের পাশের বাসায় নতুন এক পরিবার আসল। ওদের নাকি সৎ মা। সৎ মায়েরা যে কী ডেনজারাস হয় তা তো তখন রূপকথার গল্পে জানতেই পারছি। একদিন খুব আগ্রহের সাথে সৎ মা পরিদর্শনে গেলাম পাশের বাসায়।

ওরা তিন বোন আর তিন ভাই। তাদের মায়েরে দেইখা বেশ হতাশ হইলাম, সাধারণ মায়েদের মতনই দেখতে। আমি আর আগ্রহ ধইরা রাখতে না পাইরা ছোট মেয়েটার কাছে জানতে চাইলাম এইটাই ওদের সৎ মা কিনা। সে বললো, “আগে খালা ছিল, এখন উনিই আমাদের মা।”

জিজ্ঞেস করলাম অত্যাচার করে কিনা, তাতেও ওরা বললো যে মোটেই না। তো এত ফ্লপ সৎ মা দেইখা মন খারাপ কইরা বাসায় ফিরলাম।

তার কয়েকদিন পরে পাশের বাসার ছোট দুই বোন আসল আমাদের বাসায় বেড়াইতে, দুপুরবেলা। সেই সময় আব্বা ইউনিভার্সিতে আর আম্মা ঘুমাইতেছিল। আমি ওদেরকে ঢুকতে দেইখাই দৌড়াইয়া রান্নাঘর থিকা ফুলের ঝাড়ু নিয়া বারান্দা ঝাড়ু দেয়া শুরু করলাম খুব দুঃখী চেহারায়। ওরা জানতে চাইল কী করি। আমি জানাইলাম, “আর বইল না, সৎ মা তো আমার, বাসার সব কাজ আমার করতে হয়, এখন দেখো আরাম কইরা ঘুমাইতেছে, আর আমি ঝাড়ু না দিলে ঘুম ভাঙলেই আইসা আমার পিঠে বেত ভাঙবে।”

ওরা আমার কষ্টে অনেক কষ্টিত হইল। আব্বার কাছে কেন এই অত্যাচারী স্বৈরিণী মহিলার মুখোশ উন্মোচন কইরা দেই না জানতে চাইল। আমিও বেদনাতুর মুখে জানাইলাম যে সে দিন নাই, সৎ মা হইল সুয়োরানি, আব্বা তার যাদুতে ভুলছে এখন অন্য কারো কথাই আর বিশ্বাস করবে না।

ওরা আরো কিছুক্ষণ আমারে সান্ত্বনা দেয়ার পরে সেইদিন বাসায় ফিরা গেল আম্মার ঘুম ভাঙার আগেই।

তার কিছুদিন পরে বড় বোনসহ একদিন তিনজনেই আসল আমাদের বাসায়, আম্মার সাথে গল্প করতে। তো কথা বলতে বলতে এক সময় বড় আপা জানতে চাইল, “আচ্ছা লুনার আপন মা যখন মারা গেছেন, লুনা কতটুকু ছিল?”

আম্মা কতক্ষণ তার দিকে তাকাইয়া থাইকা বলল, “এই কথা কে বলছে তোমাদেরকে?”

“লুনাই তো বলল।”

আম্মা তখন তার স্বভাবমতন হাসির চোটে ভাইঙ্গা পড়তে পড়তে বলল, “ছোটই ছিল।”

এর আরো বেশ কয়েকদিন পরে ওরা আসল ঘটনা জানতে পারছিল আর তখন আমারে যেইখানে সেইখানে ক্ষেপাইত, “তোমার আম্মু না তোমার সৎ মা?”

এদের ক্ষেপানির চোটে বুঝলাম এইরকম মৌখিক গল্প বইলা সুবিধা করা যাবে না। উপন্যাস লিখতে হবে। ততদিনে মনে হয় ক্লাস ফাইভে উঠছি। খুব গম্ভীর মুখে কয়েক দিস্তা কাগজ আর একটা টুল নিয়া বারান্দার মেঝেতে বসতাম। তখন থিকাই জানতাম যত গম্ভীর তত ভাল লেখক! কী যে লিখছিলাম এখন আর মনে নাই, তবে উপন্যাসের প্লট মনে আছে। এক বিশাল ধনবান বৃদ্ধ তার বাড়ির লনে বইসা বইসা অতীতচারণ করতে থাকবে, সেই সময়ের কথা ভাববে যখন সে খাইতেও পাইত না। এখন শুধু লিখিত অংশের দুইটা শব্দ মনে আছে ‘কৃত্রিম ঝর্না’ আর বৃদ্ধের বউয়ের নাম — প্রেমা।

সর্বমোট এক প্যারাগ্রাফ লিখছিলাম এবং টের পাইছিলাম উপন্যাস লেখা কঠিন কাজ। সেই বুঝ আমার এখনো আছে।

আমাদেরকে তখন পড়াইতে আসতেন নিলম আপা। একবার জন্মদিনে আমারে একটা বই দিলেন উনি। বইয়ের নাম খুব সম্ভবত ‘অহংকারী বিড়াল’, লেখকের নাম মনে নাই। এই বই পাইছিলাম আমার বিড়াল প্রেমের অনেক বছর আগেই, তখন বরং খুব ভয় পাইতাম বিড়াল দেখলে। ভয় থেকে ভালবাসা কেমনে হইল সে গল্প আরেক দিন বলব।

নিলম আপার দেয়া বইটারে সত্যিই ভালোবাসছিলাম। বইটা আমি সাথে নিয়া ঘুরতাম কিছুদিন। আর ছবি দেখতাম। একটা ছবির ফ্রেমের বিড়াল নিয়া ছিল গল্পটা।

বিড়ালের ছবি প্রদর্শনীতে ছিল, যে দেখে সেই প্রশংসা করে, বিড়াল ভাবল, বাহ, আমি এত জোস, এই ফ্রেমের মধ্যে আছি কী করতে? বাইর হইয়া যাই। তো সে এক রাত্রে চুপি চুপি ফ্রেম থিকা বাইর হইল, এবং তারপরে তার অহংকারের ঠেলায় যেই কাগজে তারে আঁকা হইছে সে তারে ছাইড়া গেল, তারপরে গেল রঙ, যখন রেখাগুলাও ভাঙতে শুরু করছে তখন তার মনে হইল আরে এগুলারে ছাড়া তো আমি কিছুই না!

বইটায় কতগুলা ছবি ছিল এত সুন্দর! একটা ছিল রঙগুলা উইড়া যাইতেছে আর মাত্রই কাগজ এবং রঙহারা স্বচ্ছ বিলাই তাকাইয়া তাকাইয়া দেখতেছে ব্যাপারটা। খুবই মায়া লাগত দেইখা তারে তখন।

তখন থেকেই হয়তো বই-বই করতে করতে পাগল হওয়া শুরু করলাম। ভাবছিলাম বই পড়ে দুনিয়া উল্টাইয়া দিব। এই সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার ফলাফল স্বরূপ হাজারে বিজারে বই কেনা হইছে। তারমধ্যে অনেক বই বাড়ি, পাড়া, শহর এমনকি দেশ বদলানোর ধকল সহ্য করার পরেও বহাল আছে।

আমার নিউজিল্যান্ড থাকার সময়টুকুতে মেলবোর্নে ফেইলা যাওয়া বইদের অনেকেই গ্যারেজে জায়গা পাইছিল। তাদের বেশ বেহাল দশা। বৃষ্টির পানি, পোকা-মাকড়, ধুলা-বালি এবং গ্যারেজে বাড়তে থাকা অন্যান্য ‘এখন লাগতেছে না তবে পরে হয়ত কোনোদিন লাগবে’ টাইপের না ফেইলা দেয়া-না রাইখা দেয়া অভাগা জিনিসপাতির চাপে বহুদিন ধইরা নাজেহাল হওয়ার পরে আমি ফেরত আইসা তাদের উদ্ধার করছি।

কয়েক মাস আগে আমরা সপরিবারে বাড়ি বদল করলাম। সেই সময় বইয়ের গাট্টি বান্ধতে বান্ধতে কসম খাইছিলাম যেগুলা অলরেডি আছে সেইসব না পইড়া আর ইহজনমে বই কিনব না। একেকটা দশ কেজি ওজনের বাক্স সিঁড়ি দিয়া তুলতে তুলতে কুস্তিগীর হইয়া গেলাম।

আগেই দুইটা বইয়ের তাক ছিল আমার। নতুন ঘরের পরিধি পুরান ঘরের চেয়ে বড় হওয়াতে আরো দুইটা বুকশেলফ ঢুকানো হইছে। আমি যেহেতু সব কাজ অনেক ডিটেইলে করতে চাই, তাই কোনো কাজই করা হয় না। মনে করছিলাম বইগুলার ক্যাটালগ বানাব প্রথমে, তারপরে বাছাই করব কোন বই আমার ঘরে থাকবে আর কোনগুলারে নিচতলার বসার ঘরে পাঠানো যাইতে পারে (নিচতলার ঘরেরগুলা অন্যদেরকে ধার দেয়া যাবে, আমার ঘরেরগুলায় কেউ হাত দিতে আসলে হাত খুইলা রাখা হবে)।

বই
গ্রেট ওশেন রোড ধইরা ফিরতেছিলাম।… একখানে দেখি একটা মেয়ে একদম স্থির দাঁড়াইয়া আছে। সে এক দৃষ্টে প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ কইরা কী দেখতেছিল কোনোদিন জানা হবে না।

মাঝে মাঝেই বিশাল আয়োজনে ক্যাটালগিং করতে বসার পরে খালি ঘুম আসে। কাজেই এখনো আমার বইয়ের চারভাগের তিনভাগ অসূর্য্যস্পর্শা হইয়া বাক্সের গহ্বরে দিনাতিপাত করতেছে। বাকিরা শেলফে শুইয়া বইসা আছেন। ঘরের জানালা না খুইলা থাকতে পারি না বইলা ধুলাবালি আসে সমানে। বুকশেলফে বেশ পুরু ধুলার আস্তরন, আমি অবসর সময়ে সেইদিকে তাকাইয়া প্ল্যান করি কবে এবং কীভাবে আমি সমস্ত শেলফ মুইছা ঝকঝকা তকতকা কইরা ফেলব, আর সমানে হাঁচি দেই।

আমার মামাত বোনের খুব ঘর সাজানোর শখ। সে আমার ঘর দেইখা বলছে বইগুলা সব মলাটের রঙ মিলাইয়া মিলাইয়া সাজাইতে হবে। আর ছিঁড়াবিড়া বই তাকে রাখা যাবে না! আমি কইলাম মলাটের মধ্যে কিছু লেখা না থাকলে প্রবলেম আছে? সে বলছে কোনোই অসুবিধা নাই, রঙ মিললেই হইল। তার কথায় অবশ্য ভয় পাইছি একটু, আমার বইগুলা তাইলে কি আঁতেল-হওনেচ্ছুদের বসার ঘরে সাজাইয়া রাখা রবীন্দ্র রচনাবলী অথবা এনসাইক্লোপিডিয়ার কপাল নিয়া আসছে দুনিয়ায়? তাদেরে দেখা হবে, পড়া হবে না?

হিসাব করে দেখলাম যত বই জমাইছি — কাগজের কপি, কিন্ডল কপি, পিডিএফ মিলাইয়া কয়েকশো বছর খালি বই পড়তে থাকলেও শেষ হবে না। এইরকম ভাবলে কেমন দমবন্ধ লাগে না? এত লোকে এত কিছু বইলা ফেলছে, ভাইবা ফেলছে, কত রকম জীবন বাঁইচা ফেলছে, সেইসব জানানোও হইয়া গেছে তাদের, অথচ আমি জানি না। এবং এই না জানাতে কিছুই আসে যায় না।

এমনিতে লাইব্রেরি আমার খুব প্রিয় জায়গা। আমি কারণ ছাড়াই সেইখানে ঘুর ঘুর করি। বইয়ের মলাট দেখি, মাঝে দুই এক প্যারাগ্রাফ পড়ি, শেলফে শেলফে ঘুরি। এইসব ভাল্লাগে। আবার মাঝে মাঝে লাইব্রেরিতে ঢুকলে মনে হয় নিঃশ্বাস নিতে পারতেছি না, যেন এত এত মলাটের ভিতরের সমস্ত কথা, সমস্ত চরিত্র, অক্ষর, প্রশ্নবোধক, অট্টহাসি, কান্না সব আমার দিকে ছুইটা আসতেছে। আমি তখন তাড়াতাড়ি লাইব্রেরির থিকা ভাগি। এইরকম কি আমার একারই হয়?

আমার এক বন্ধু একবার বলছিল যদি একটাই বই থাকে তাইলে পড়তে ভাল লাগে, ঘরভর্তি বই দেখলে সব ফেইলা সাইকেল নিয়া ঘুরতে ইচ্ছা করে। এই রকম হয়ত সব ক্ষেত্রেই, যে কারণে কোনো কিছুতেই ডুবতে পারা যায় না — বই, প্রেম বা আর কিছু, সবই কেমন ভাসা ভাসা, তাড়াহুড়ার, চলতি ট্রেনের জানালা থিকা দেখার মতন। চলন্ত ট্রেন বা গাড়ি থেকে এই রকম কত দৃশ্য ঠিক ঠাক দেখতে শুরু করার আগেই পার হইয়া গেছি তারে।

একবার গ্র্যাম্পিয়ান গেছিলাম বেড়াইতে। মেলবোর্ন শহর থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে। সেইখানে দুইদিন থাকার পরে গ্রেট ওশেন রোড ধইরা ফিরতেছিলাম। গাড়ির জানালা কত কিছু পার হইল — পাহাড়, সমুদ্র, ভেড়ার পাল। একখানে দেখি একটা মেয়ে একদম স্থির দাঁড়াইয়া আছে। সে এক দৃষ্টে প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ কইরা কী দেখতেছিল কোনোদিন জানা হবে না।

মেলবোর্ন, ১০ নভেম্বর ২০১৪

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here