page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

বজ্র, টারজান ও দস্যু বাহরাম

বজ্র’র বয়স কত? নানা রকম হিসাব আছে ওর। এক হিসাবে, আমার চেয়ে ও এক বছর তিন মাসের বড়। তবে সর্বশেষ হিসাবে ও-ই আমার চেয়ে তিন মাসের ছোট। বজ্র কিছুটা গাঁইগুঁই করলেও এই হিসাবটাই আমি গ্রাহ্য করে চলছি আপাতত। তবে বজ্রকে যাঁরা চেনেন তাঁরা স্বীকার করবেন বয়সে ও আমার কম-বেশি সমান হলেও গায়েগতরে দেড় গুণ বড়। এটা সেই ছোটবেলা থেকেই।

একই পাড়ায় বড় হয়েছি এক সঙ্গে সেই পাঁচ-ছ’ বছর থেকে। খেলাধুলা হৈহুল্লোড় সব একসঙ্গে। আমাদের আকুরটাকুর পাড়ার ফুটবল দল গড়ে চ্যামপিয়ন হওয়া, আশপাশের কোদালিয়া, শিবপুর, বাথুলি, ঘারিন্দা থেকে শিল্ড-কাপ নিয়ে আসা—এ সবে আমার কৃতিত্ব ছিল শুধু দু’ আনা-চার আনা চাঁদা দেয়া আর নিপুণ লক্ষ্যভেদী শট দিয়ে গোল করা, বাকি বেশির ভাগ কাজ বজ্র’র -সাংগঠনিক খুঁটিনাটি থেকে চীনের মহাপ্রাচীর হয়ে গোল ঠেকানো পর্যন্ত সব।

sazzad-kadir-logo

গায়ে যেমন শক্তি, তেমন ক্ষমতা। এক ডুবে পার হয় পাড়ার সব পুকুর। আম জাম লিচু তাল সুপারি নারিকেল গাছের মগডালে চড়ে বসে যখন তখন। কালী সিনেমায় মরনিং শো-তে টারজান-ছবি দেখে এসে পাড়ার জলা-জঙ্গল দাপিয়ে মেতে ওঠে টারজান-টারজান খেলায়। সাইকেল নিয়ে বোঁ-বোঁ চক্কর দেয় উলটাপালটা। ময়মনসিংহ রোডে অপেক্ষমাণ মুড়ির ডিব্বা বাসের চাকা খুলে উধাও হয়ে যায় মুহূর্তে। আবার আমরা যখন টাঙ্গাইল শহরের ঐতিহ্যবাহী করোনেশন ড্রামাটিক ক্লাব (সিডিসি)-কে চ্যালেঞ্জ করে একের পর এক মঞ্চায়িত করেছি নীহাররঞ্জন গুপ্তের ‘উল্কা’, আলী মনসুরের ‘পোড়োবাড়ি’, কল্যাণ মিত্রের ‘দায়ী কে’ প্রভৃতি নাটক—তখন পরদার আড়ালে বেশির ভাগ খাটা-খাটুনি করেছে ও-ই। সবাই বলতো ওকে গোঁয়ার, হাজট।

বজ্র’র সেই শক্তি-ক্ষমতা এই ৭০-এ পা দিয়েও এতটুকু যায় নি মনে হয়। সেদিন তো এক রিকশাওয়ালাকে তার রিকশায় চড়িয়ে ও নিজে সেই রিকশা চালিয়ে নামাজ পড়তে গেল মতিঝিল থেকে বায়তুল মোকাররম!

kader-siddiq

“বজ্র’র সেই শক্তি-ক্ষমতা এই ৭০-এ পা দিয়েও এতটুকু যায় নি মনে হয়।”—লেখক

হ্যাঁ, আমার বাল্যবন্ধু বজ্র কিংবদন্তির মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। শৈশব-কৈশোরে সাংগঠনিক নেতৃত্ব দিতে যে শক্তি-ক্ষমতার চর্চা ও করেছিল তার অনেকখানিই ওর জীবনসত্য হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধকালে। ১১ই ডিসেম্বর মুক্ত টাঙ্গাইল শহরে ও যখন প্রবেশ করে তখন যেন গগনস্পর্শী হয়ে উঠেছিল ওর মহিমা। তাই তো কাগমারীর মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম খান (কবি রফিক আজাদ) ছুটে গিয়ে আভূমি নত হয়ে সালাম করেন ওকে, নিজে স্যার (শিক্ষক) হয়ে ওকে স্যালুট ঠুকেন ‘স্যার’ সম্বোধন করে, তারপর ঘোষণা করেন, ‘আমার প্রথম পিতা রবীন্দ্রনাথ, আর কাদের সিদ্দিকী আমার দ্বিতীয় পিতা।’

মাস খানেক পর রফিক আজাদ একটা ১২০ সিসি মোটর সাইকেলের জন্য আবেদন জানান বজ্র’র কাছে। ওই আবেদনপত্রে জোর করেই আমাকে দিয়ে সুপারিশ লেখান তিনি। বজ্র সে আবেদনপত্র পড়ে হেসে ওঠে, মোটর সাইকেল? আমার কাছে হেলিকপটার চাইলে তা-ই দিতাম।

rafik-azad-3

রফিক আজাদ, ১৯৬৪

কিছু দিন পর বাংলা একাডেমিতে রফিক আজাদের চাকরির ব্যবস্থা করে দেয় বজ্র, আর আমাকে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিতে বলে করটিয়া’র সা’দত কলেজে। ওর চিরকুট নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বায়েজিদের মোটর সাইকেলের পিছনে বসে, টাঙ্গাইল থেকে করটিয়ায় গিয়ে যোগ দিই কথামতো। সেদিন ১১ই ফেবরুয়ারি, ১৯৭২।

উচ্ছল চঞ্চল বায়েজিদ কী অসুখে ভুগে মারা গেছে কবে, কিন্তু ঢাকা-টাঙ্গাইল যাওয়া-আসার পথে করটিয়া এলাকায় আসা মাত্র স্পষ্ট দেখতে পাই ওকে—ছুটছে ৫০ সিসি মোটর সাইকেলে, উড়ছে মাথার চুল – পরনের জামা, এখনই যেন বাসের জানালায় আমাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠবে, নামেন স্যার… সামনেই আমার বাড়ি… আজ থাইক্যা যান!

আমার সঙ্গে বজ্র’র বরাবরই তুই-তুই সম্পর্ক। এ সম্পর্কের স্বজন এখন হাতে গোনা মাত্র ক’জন আছে আমাদের। তাই এর মূল্য অপরিসীম বলে ভাবি আমরা। এজন্যই সেই ১৯৭৮-৮০ সালে আমি যখন ভাষাবিশেষজ্ঞ হিসেবে রেডিও পিকিং-এ কর্মরত, আর ও নির্বাসিত জীবন যাপন করছে ভারতে, তখন প্রায়ই দিল্লি থেকে ফোন করতো পেইচিং-এর চুয়ানচিয়া লৌ (বিশেষজ্ঞ ভবন)-এ আমার কাছে।

‘রেডিও পিকিং’ পরে ‘রেডিও পেইচিং’ হয়ে এখন ‘চুংক্যো ক্যোচি কুয়াংপো তিয়েনথাই’ (চায়না রেডিও ইনটারন্যাশনাল)। আরও একটা ব্যাপার আছে—বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মিলবে না সম্ভবত। ছোটবেলায় বারবার আমরা একই অসুখে পড়েছি একসঙ্গে। শেষ যে অসুখে পড়ি তাতে আমাদের মৃত্যুসংবাদ চাউর হয়ে গিয়েছিল শহরে। লোকে বলতো কলেরা, ডাক্তার বলেছিলেন ‘স্ট্রং ডায়রিয়া’। সেটা ১৯৫৯ সাল, পড়ি ক্লাশ এইটে।

বিদায়ী প্রধান শিক্ষক দানেশ স্যার ও নবাগত প্রধান শিক্ষক নিজাম স্যার দু’জনে মিলে। সামনে ছিল বার্ষিক পরীক্ষা। আমার অস্থিচর্মসার শারীরিক অবস্থা দেখে তাঁরা বললেন, পরীক্ষা দিতে হবে না। অটোপ্রমোশন সেইম পজিশনে।

অর্থাৎ ফার্স্ট বয় ছিলাম, ফার্স্ট বয়-ই থাকবো—পরীক্ষা না দিয়ে ক্লাশ নাইনে উঠেও। তবুও পরীক্ষা দিয়েছিলাম, আর গণিতের খাতা দেখে ডাক্তার বাবু স্যার বলেছিলেন, বিশ্বাস করি না!

কত নম্বর পেয়েছিলাম তা স্যার আর আমিই জানি, আর কেউ পারে নি জানতে। এখনও না জানুক কেউ।

স্কুলের ডাক্তার হলেও স্যার সকল ক্লাশেই পড়াতেন, ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক, পরিচিত ছিলেন বীরেন স্যার হিসেবেও, সাইকেলে আসা-যাওয়া করতেন শহরের উপকণ্ঠ ছাড়িয়ে ঘারিন্দা গ্রাম থেকে। ক্লাশ এইটের ছিলেন ক্লাশ টিচার। একাত্তরে শহিদ হয়েছেন তিনি আসলে একবার ফার্স্ট বয় হয়ে গেলে সেকেন্ড বয় হওয়া হয়ে পড়ে বড্ড কঠিন। অসুখে ভুগে-ভুগে শরীর থাকতো কাহিল। তারপর ছিল ‘আউট’ (অপাঠ্য) বই পড়ার নেশা। এ নেশা শুরু হয়েছিল ১৯৫৫ সালে ক্লাশ ফোরে থাকতেই। কিন্তু লেখাপড়ায় ভাল, পরীক্ষায় ফার্স্ট হই—তাই কেউ বলতো না কিছু। নাহলে ‘গোল্লায় গেল’ বলে চেঁচামেচি শুরু হতো সব মহল থেকে।

প্রথম দিকে কী-কী আউট বই পড়েছি অস্পষ্ট মনে আছে এখনও। প্রায় বানান করে পড়েছিলাম ‘দস্যু বাহরাম’। এটি সিরিজের প্রথম বই। মাস কয়েক পরে সিরিজের দ্বিতীয় বই ‘বন্দিনী সুফিয়া’ পড়েছিলাম ভাল ভাবেই। তত দিনে অবশ্য একটা চাপ তৈরি হয়ে গিয়েছিল যারা বইটি পড়ে নি তাদের ওই বইয়ের গল্প শোনাবার। তাই ভালমতো বুঝে না পড়লে রীতিমতো পড়তে হতো মুশকিলেই। বাসায়, পাড়ায়, এমনকি স্কুলে ক্লাশে ও ক্লাশের বাইরে আমাকে না পড়ুয়াদের শোনাতে হতো বইয়ের গল্প। আর সে গল্প ‘চ্যাপটার বাই চ্যাপটার’ বলতে না পারলে শুনতে হতো নানা রকম দুয়ো। পরে ছবি নিয়েও এ অবস্থায় পড়তে হয়েছিল আমাকে। কালী সিনেমায় নতুন কোনও ছবি মুক্তি পেলে সেটা কোনও না কোনও ভাবে দেখতে হতো আমাকে, তারপর সে ছবির গল্প ‘সিন বাই সিন’ শোনাতে হতো অন্যদের। সেই সঙ্গে কখনও-কখনও খরখরে গলায় ভাঁজতে হতো কোনও-কোনও সিনে মাত্র একবার শোনা গানের সুরও!

শশধর দত্তের দস্যু মোহন সিরিজের অনুকরণে লেখা হলেও কাজী আবুল কাসেমের দস্যু বাহরাম সিরিজ কম জনপ্রিয় ছিল না সেকালে। মোহনের যেমন রমা, বাহরামের তেমন সুফিয়া। ‘রণরঙ্গিনী সুফিয়া’ সহ সিরিজের প্রথম এগারোটি বই আমি পড়ে ফেলেছিলাম এক-দেড় বছরেই। সম্ভবত ১৯টি বই বেরিয়েছিল এ সিরিজে। সেগুলোও পড়েছি একে-একে।

সিরিজটির প্রকাশক ছিল ওসমানিয়া বুক ডিপো (৬৮ বেচারাম দেউড়ী)। এর স্বত্বাধিকারী ছিলেন মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম। মানিকগঞ্জের মানুষ। কালচারাল প্রেস নামের ছাপাখানা এবং ইসলাম ব্রাদার্স ট্রান্সপোর্ট এজেন্সী নামের লঞ্চ কোমপানিরও স্বত্বাধিকারী ছিলেন তিনি। তাঁর দুই পুত্র আজিজুর রহমান বুলি ও মাহমুদ কলি চলচ্চিত্র জগতের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।

প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠানটি কলকাতায় থাকতে পরিচিত ছিল ‘ওসমানিয়া লাইব্রেরী’ নামে। ‘দোভাষি বাংলা’য় লেখা বহু পুঁথি তাঁরা ছেপেছেন সেকালে। জঙ্গনামা, শহীদে কারবালা, ইউসুফ জোলেখা, গাজী কালু চম্পাবতী, আমির সদাগর ভেলুয়া সুন্দরী, সূর্যউজাল বিবি, সোনাভান, হাতেম তাই সাত সওয়াল, ইমাম হানিফা প্রভৃতি পুঁথির কথা মনে আছে এখনও। সর্বভুক পাঠক হিসেবে এগুলো পড়েছিও সে সময়। তবে উপন্যাসের প্রকাশক হিসেবেও যথেষ্ট খ্যাতি ছিল তাঁদের। আনোয়ারা, মনোয়ারা, কালো মেয়ে, গরীবের মেয়ে, সালেহা প্রভৃতি ছিল তাঁদের সেরাকাটতি উপন্যাস। ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি আত্মপ্রকাশ করে ওসমানিয়া বুক ডিপো নামে।

tangail-2

টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুল সংলগ্ন দিঘি

দস্যু বাহরাম সিরিজের জনপ্রিয়তায় সেকালে আবির্ভাব ঘটেছিল আরও অনেক দস্যুর। গোয়েন্দা কাহিনীর জনপ্রিয় লেখক কুয়াশা (আবু হায়দার সাজেদার রহমান নামে পরিচিত গীতিকার হিসেবে, গায়ক খুরশীদ আলমের পিতৃব্য) শুরু করেছিলেন দস্যু তারিক সিরিজ। দু’ খণ্ডের পর অগ্রসর হন নি আর। পাকিস্তান বুক ডিপো’র দস্যু বেনজির সিরিজের লেখক-প্রকাশক ছিলেন বদরুদ্দিন আহমেদ (সাংবাদিক বোরহান আহমেদের অগ্রজ)। সেবা প্রকাশনীর কুয়াশা সিরিজের নামও আসে এ তালিকায়। কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে প্রকাশিত হলেও সিরিজটি লিখতেন রাহাত খান। শেষে সবাইকে টেক্কা মারে রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর সিরিজ।

বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খানের ‘ওজারতির দুই বছর’ বইটি কালচারাল প্রেস থেকে মুদ্রিত ও ওসমানিয়া বুক ডিপো থেকে প্রকাশিত হলেও এর উল্লেখ ছিল না কোথাও। তবে ওই সূত্রে তিনি আকৃষ্ট হন রাজনীতির প্রতি। ১৯৭০ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর আত্মগোপন করেন প্রথমে, পরে ভারতে পালাতে গিয়ে সীমান্তে ধরা পড়েন পাকি বাহিনীর হাতে।

রাজনৈতিক কারণেই মোহাম্মদ নূরুল ইসলামের জীবনে ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে আসে নানা বিপর্যয়। স্বাধীনতার পর প্রায় নেপথ্যে চলে যান তিনি। ধীরে-ধীরে রোগ-ব্যাধিও গ্রাস করে তাঁকে। মারা যান ১৯৯৮ সালে।

পঞ্চাশ-ষাট দশকের সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ওসমানিয়া বুক ডিপোর। তাঁদের মানসম্পন্ন প্রকাশনা তখন ছিল অন্যদের আদর্শ। প্রবীণদের পাশাপাশি নবীন লেখকদেরও অনেক বই প্রকাশ করেছেন তাঁরা। এখানে উল্লেখ করছি তেমন কিছু বইয়ের নাম—

  • আতাউর রহমান খান (১৯০৫-১৯৯১): ওজারতির দুই বছর (স্মৃতিকথা; বেনামী প্রকাশনা, ১৯৬৩)।
  • আবদুর রাজ্জাক (১৯২৬-১৯৮১): কন্যাকুমারী (১৯৬০; আদমজী পুরস্কার, ১৯৬১)।
  • ইসহাক চাখারী (১৯২২-২০০৯): পরাজয় (১৯৬১); মায়ের কলঙ্ক (১৯৬২; ভূমিকা: শামসুদ্দীন আবুল কালাম); মেঘবরণ কেশ (১৯৬৩)।
  • কলিম আনোয়ার: বহ্নি-সীমান্ত।
  • জোবেদা খানম (১৯২০-১৯৮৯): দু’টি আঁখি দু’টি তারা (১৯৬২)।
  • মনিরউদ্দিন ইউসুফ (১৯১৯-১৯৮৭): রুমীর মসনবী (অনুবাদ, ১৯৬৬)।
  • মোহাম্মদ আবদুল আজিজ: গাঁয়ের নাম পলাশপুর।
  • মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্ (১৯৩৬-২০১৩)। নজরুল ইসলাম ও আধুনিক বাংলা কবিতা (প্রবন্ধ, ১৯৬৩); বাংলা কাব্যে মুসলিম ঐতিহ্য (প্রবন্ধ, ১৯৬৫)।
  • শওকত আলী: পিঙ্গল আকাশ (১৯৬৪)।
  • শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-১৯৯৭): কাশবনের কন্যা (১৯৫৪); দুই মহল (১৯৫৫); কাঞ্চনমালা (১৯৫৬); জীবন যৌবন।
  • হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩): মূল্যবোধের জন্যে (প্রবন্ধ, ১৯৭০)।

যদ্দুর মনে পড়ে কাজী আবুল হোসেন (১৯০৯-?)-এর ‘কালো বউ’ (১৯৫৯), কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ (১৯২১-১৯৭৫)-এর ‘অমর যৌবনা’, ‘চর ভাঙা চর’ (১৯৫১), ‘নীড় ভাঙা ঝড়’ (১৯৬১) প্রভৃতি উপন্যাসও ছাপা হয়েছিল এ প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠান থেকে।

ওসমানিয়া বুক ডিপো প্রকাশিত ‘পকেট পঞ্জিকা’রও যথেষ্ট কাটতি ছিল সে সময়। তবে তাঁদের প্রকাশিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা ‘পূবালী’ (১৯৬০-৬৭) সাড়া জাগিয়েছিল ষাটের দশকে। ‘বাংলা সাময়িকপত্র: পাকিস্তান পর্ব’ গ্রন্থে ড. ইসরাইল খান লিখেছেন, “… ‘পূবালী’ পত্রিকাটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবধারার ছিল নামেই প্রমাণ। পূর্বপূর্বী একটা ভাব ‘পূবালী’ নামের মধ্যে অবশ্যই ছিল। উদ্দেশ্য এবং প্রচেষ্টার মধ্যেও সাহিত্য ও সমাজসেবার খাঁটি একটা প্রেরণা ছিল, দেশের সমাজ সংস্কৃতি ও সাহিত্যিক পরিস্থিতির পরিবর্তন করে নতুন অবস্থায় উন্নতকরণের প্রেরণা এর সর্বত্র লক্ষণীয়।…”

মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ (১/১/১৯৩৬ - ২৯/১২/২০১৩)

মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ (১৯৩৬ – ২০১৩)

পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে মোহাম্মদ নূরুল ইসলামের নাম থাকলেও আসল সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্। শান্তশিষ্ট হাসিখুশি মানুষ হলেও সম্পাদক হিসেবে ছিলেন বেশ কড়া। কলকাতা থেকে সংগ্রহ করে আনা নরেন্দ্রনাথ মিত্রের তাড়াহুড়া করে লেখা একটি আধখেচড়া গল্প ছাপতে অস্বীকার করেছিলেন তিনি। টাঙ্গাইল থেকে ডাকযোগে কবিতা-গল্প পাঠিয়ে-পাঠিয়ে হতাশ তরুণ আবু কায়সার শেষে বিষ্ণু দে’র ‘ব্লাডপ্রেসার’ কবিতাটি কপি করে পাঠিয়েছিলেন নিজের নামে। মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্ ঠিকই ধরে ফেলেন ওই চন্দ্ররেণুবৃত্তি, আর সে কথা জানিয়ে কড়া চিঠি দেন তাঁকে, তিরস্কারও করেন সামনে পেয়ে। পরে তাঁর লেখা ভাল কবিতা পেয়েও ছাপেন নি তিনি, আশঙ্কা করতেন নকল কি না! ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় লেখক হিসেবে আবু কায়সারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় যথেষ্ট। ‘কণ্ঠস্বর’-এ সমরেশ বসু’র ‘বিবর’ উপন্যাস প্রভাবিত ‘গুহা’ গল্পটি ছাপা হলে ওই ক্ষুণ্নতা যেন ভিত্তি পেয়ে যায় আরও। এ থেকে আর মুক্তি পান নি তিনি।

আমার চেনাজানা অনেকেই অন্যের কবিতা কিঞ্চিৎ এদিক-সেদিক করে নিজের নামে ছাপিয়ে কবেই চড়ে বসেছেন খ্যাতির শীর্ষে, সে ক্ষেত্রে তাঁদের তুলনায় অনেক বেশি মৌলিক এবং ভাব ভাষা নির্মাণে প্রাগ্রসর হয়েও আবু কায়সার (সম্পর্কে আমার ‘নীলু মামা’) হয়েছেন বলির শিকার!

রফিক আজাদ কিছুটা সম্পর্কিত ছিলেন ‘পূবালী’র সঙ্গে, তবে ‘রফিকুল ইসলাম খান’ নামে। তবে কবিতায় সুবিধা না হওয়ায় শুরু করেছিলেন গদ্যচর্চা। শহীদ সোহরাওয়ার্দি’র অগ্রজ, শিক্ষাবিদ কবি ভাষাতত্ত্ববিদ শিল্প সমালোচক ও কূটনীতিক শাহেদ সোহরাওয়ার্দি (১৮৯০-১৯৬৫)-র মৃত্যুতে লিখেছিলেন এক শোকনিবন্ধ।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘নাগরিক’ ছদ্মনামে লিখতেন ‘ঢাকায় থাকি’ কলাম। সেখানে ‘রাগীর দল’ শীর্ষক লেখাটিতে তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষায় সমালোচনা করেন স্যাড জেনারেশন, স্বাক্ষর, সাম্প্রতিক, সপ্তক, কণ্ঠস্বর প্রভৃতি সঙ্কলনের কবি ও লেখকদের। একটি গোষ্ঠী উল্লেখ করে এঁদের ‘পালের গোদা’ বলে চিহ্নিত করেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ওই সমালোচনাকে এক ধরনের স্বীকৃতি বলে মেনে নিলেও ‘পালের গোদা’ নির্ণয়কে গুরুতর ভুল বলে ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত হন কেউ-কেউ। বিশেষ করে ‘স্যাড জেনারেশন’ ও ‘স্বাক্ষর’-এর রফিক আজাদ ও অন্য কয়েকজন। তাঁদের আন্দোলনের নেতৃত্ব অন্য কাউকে দিতে নারাজ তাঁরা। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নেতৃত্ব দূরে থাক, সংশ্লিষ্টও ছিলেন না এই ছিল তাঁদের অভিমত।

About Author

সাযযাদ কাদির
সাযযাদ কাদির

কবি ও বহুমাত্রিক লেখক। জন্ম: ১৯৪৭, টাঙ্গাইল। পেশা: সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা। সাবেক সহকারী সম্পাদক, বিচিত্রা; দৈনিক সংবাদ। ভাষা-বিশেষজ্ঞ, রেডিও পেইচিং, গণচীন। পরিচালক, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট। বই— কবিতা: যথেচ্ছ ধ্রুপদ; রৌদ্রে প্রতিধ্বনি; দূরতমার কাছে; দরজার কাছে নদী; এই যে আমি; জানে না কেউ; বিশ্ববিহীন বিজনে; মণিমালা সিরিজ; বৃষ্টিবিলীন; কবিতাসংগ্রহ। গল্প: চন্দনে মৃগপদচিহ্ন; অপর বেলায়; রসরগড়; গল্পসংগ্রহ। উপন্যাস: অন্তর্জাল; খেই; অনেক বছর পরে; জলপাহাড়: চার চমৎকার; আঁচ। প্রবন্ধ-গবেষণা: ভাষাতত্ত্ব পরিচয়; হারেমের কাহিনী: জীবন ও যৌনতা; রবীন্দ্রনাথ: মানুষটি; রবীন্দ্রনাথ: শান্তিনিকেতন; বাংলা আমার; সহচিন্তন; বিচলিত বিবেচনা; চুপ! গণতন্ত্র চলছে...; ম্যাঙ্গো পিপল উবাচ; সহস্রক; রমণীমন; রাজরূপসী; নারীঘটিত; সাহিত্যে ও জীবনে রবীন্দ্র-নজরুল। শিশুতোষ: মনপবন; রঙবাহার;এফফেনতি; উপকথন; উপকথন আরও; উপকথন আবারও; উপকথন ফের; উপকথন তেপান্তর; উপকথন চিরদিনের; ইউএফও: গ্রহান্তরের আগন্তুক; সাগরপার; মহাবীর হারকিউলিস; জানা-অজানা বাংলা; তেনালি রামন। ভাষান্তর: লাভ স্টোরি; রসচৈনিক। স্মৃতিকথা: নানা রঙের দিন। সম্পাদনা: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা; দুষ্প্রাপ্য প্রবন্ধ; এই সময়ের কবিতা; এই সময়ের কবিতা ২০১৪; এই সময়ের কবিতা ২০১৫; শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেমের কবিতা।