page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

বদলে যায় জীবন

আমেরিকায় এসে প্রথম কিছুদিন অনেক ঝামেলায় ছিলাম সব কিছু নিয়েই।

নিজেকে খুব ইংরেজি জানা মানুষ ভাবতাম। কিন্তু দেখা গেল আসল ইংরাজির দেশে এসে আমি পুরাই ধরা। ওদের কথা বুঝি না, আমার কথা ওরা বোঝে না উচ্চারণের ভিন্নতার কারণে। সব কিছু মাথার উপর দিয়ে যেতে লাগল।

খুব বেশি শীত লাগে, এমন কি গরম কালেও শীত লাগে। কারণ সব বাস, ট্রেন, কাজের যায়গা—সবখানেই এত ঠাণ্ডা করে এসি চালিয়ে রাখে শীতে আমার কাঁপুনি ধরে যায় টি-শার্ট পরা হাল্কা পাতলা কাঠামোর শরীরে। অনেক পরে বুঝেছিলাম নারী-পুরুষ সবাই কেন গরমকালেও সাথে হালকা জ্যাকেট রাখে!

murad hai 3 logo

খাবার খেতে গিয়েও অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর অবস্থা। দেশে চাইলেও মজার কিছু একবারের বেশি দুইবার খাওয়ার জন্য পাওয়া যেত না। কিন্তু এখানে খাবারের পরিমাণ কারো বাসায় কিংবা রেস্টুরেন্টে এত বেশি দেয় যে খেয়ে শেষ করা যায় না আবার ফেলে দিতেও খারাপ লাগে।

আমাদের সময়ে দেশে তখন এত চ্যানেলসহ দিবারাত্রি ২৪ ঘণ্টা টিভি দেখার ব্যবস্থা ছিল না। সাদা কালো বিটিভি ছাড়া আর কোনো চ্যানেল ছিল না। তাও রাত বারোটার আগেই জাতীয় সঙ্গীত বেজে শেষ হয়ে যেত। বাজলেই কী? আমাদের বাসায় তো কোনো টেলিভিশনই ছিল না। পাশের বাসায় গিয়ে দেখা লাগত।

ম্যানহাটানের সাবওয়ে স্টেশনে লেখকের সঙ্গে বায়ে ছোট ছেলে রায়ান ও ডানে বড় ছেলে রেশাদ, ২০১৫।

ম্যানহাটানের সাবওয়ে স্টেশনে লেখকের সঙ্গে বায়ে ছোট ছেলে রায়ান ও ডানে বড় ছেলে রেশাদ, ২০১৫।

টেলিফোন থাকলেও সেটা বাবার রুমে তালা বন্ধ অবস্থায় ঘুমাতো । কদাচিত সেটা বাজতো কিন্তু কখনোই কোন আউট গোইং কল করা হতো না। আমি কাউকে নিজেদের বাসার নাম্বার দিতাম না ভয়ে । কারন কল আসলে বাবা বলে দিত , বাসায় নাই ।

টেলিভিশন নাই, হাতের কাছে ফোন নাই। তাহলে তো রাত জাগার আর আর কোনো উপকরণ ছিল না বলা যায়। তবুও অনেক রাত করে ঘুমানোর অভ্যাস ছিল। রাত জেগে গল্পের বই পড়ার মারাত্মক নেশা ছিল।

রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর, দস্যু বাহরাম, সেবা প্রকাশনীর কুয়াশা, একটু বড় হলে নিজেকে প্রমোশন দিয়ে মাসুদ রানা, জেমস বন্ড পড়া শুরু হল। এছাড়া নীহাররঞ্জন গুপ্ত, আশুতোষ, শরৎচন্দ্র , সমরেশ কিছুই বাদ যেত না। ঈদসংংখ্যা বিচিত্রা, চিত্রালী, পূর্বানী তো ছিলই। কোথাও পেলে সবাইকে লুকিয়ে কামনা, বাসনা নামের পত্রিকায় একটু সুড়সুড়ি দেয়া ছবি দেখতেও ছাড়তাম না।

বড় ভাই Reader’s Digest পড়তো। ভাইয়ের পড়া শেষ হলেই আমরা ছোট দুই ভাই কাড়াকাড়ি করে পড়া শুরু করতাম। আরো বড় হলে গুলিস্থানের ফুটপাথ থেকে পুরনো News week, Time কিনে আনতাম। রাত দশটার ইংরেজী সংবাদে শামীম আহমেদ-এর খবর পড়ার স্টাইল নকল করতাম দুই ভাই মিলে। বিদেশে পেন ফ্রেন্ডশিপ করে চিঠি লেখালিখি করে হাত পাকাতাম।

Diodorant কী জিনিস ধারণাই ছিল না। একবার রাশিয়া থেকে ভাইয়ের পাঠানো ডিওডোরান্ট স্টিক পেয়ে বুঝছিলাম না এটা কোথায় লাগাতে হয়। আফটার শেভ-এর মত গন্ধ লাগায় শেভ করে গালেই ঘষে দিয়েছিলাম না জেনে। Deodorant spray খালি গায়ে স্প্রে না করে তখন শার্টের উপর সেন্টের মত ব্যবহার করতাম। তাও যদি বুঝতাম ওসব ছেলেদের না মেয়েদের জন্য। আসলে তখন এসব প্রসাধনী যা কিছু পাওয়া যেত সবই মেয়েদের জন্য ছিল। কিন্তু ছেলে আর মেয়েদের প্রসাধনী যে আলাদা সেটা কল্পনার অতীত ছিল। ইন ফ্যাক্ট, বিদেশে আসার আগে পর্যন্ত এসব আমরা কেউই জানতাম না। দেশে তখন পাওয়া যেতো Please call me maxi, Prophecy এসব পারফিউম। মনে আছে ভাবির রুম থেকে নিয়ে কত ব্যবহার করেছি এসব। তারপর একদিন দেখি বড় ভাই’র বন্ধু বিদেশ থেকে ওনাকে এনে দিয়েছে Brut, Jovan for men। তখন সুযোগ পেলেই ওসব স্প্রে করে নিতাম।

আমাদের সময়ে এলিফ্যান্ট রোড ছিল কাপড়-চোপর, জুতা কেনার সবচেয়ে অভিজাত মার্কেট। রেডিমেইড বিদেশী জিন্স তখনো খুব পাওয়া যেত না। অল্প কিছু পাওয়া গেলেও দাম ছিল অনেক বেশি। তার চেয়েও বড় সমস্যা ছিল আমি অনেক বেশি লম্বা এবং চিকনা ছিলাম। আমার মাপে কোনো প্যান্টস পাওয়া যেত না।

বলাকা বিল্ডিং-এ তখন এলো ‘ইব্রাহিম টেইলর’। ওরাই প্রথম জিন্স প্যান্টে প্রেসড বাটন লাগানোর মেশিন আনলো। গোল্ডেন সুতা দিয়ে ডাবল স্টিচের, পিছনে প্যাচ পকেট লাগানো জিন্স প্রথম সেলাই করা শুরু করলো। Wrangler তখন খুব হট ওয়েস্টার্ন জিন্স ব্রান্ড। ইব্রাহিম ঐ জিন্সের আদলে প্যান্ট সেলাই করে দেশের সব ইয়ং জেনারেশনের মাথা খারাপ করে দিল। সবচেয়ে বড় কথা হল, আমি জীবনের প্রথম জিন্স প্যান্ট পড়তে পেরেছি ইব্রাহিম টেইলরের কারণে।

লেখকের ছেলেবেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. খোকন।

লেখকের ছেলেবেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. খোকন।

এছাড়া আমাদের সখের কাপড়ের যোগানদার ছিল গুলিস্থানের নিক্সন মার্কেট যেখানে বিদেশ থেকে সাহায্য হিসাবে আসা পুরনো কাপড় বিক্রি হত। আমরা পছন্দের শার্ট প্যান্ট কিনে এনে নীলক্ষেতের টেইলর দিয়ে অল্টার করে নিয়ে পরতাম। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করলে অবলীলায় বলতাম বিদেশ থেকে আংকেল পাঠিয়েছে। বিশ্বাস না করলে made in USA, made in Italy লেখা কাপড়ের ট্যাগ দেখিয়ে দিতাম। অনেকে বুঝে হাসতো, অনেকে বুঝতো না।

মনে আছে, চার্লস ব্রসননের ওয়েস্টার্ন মুভি দেখে বানিয়েছিলাম কনুইতে চামড়ার প্যাচ লাগানো টুইডের ব্লেজার। অর্থের যোগান সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্ত ম্যানেজ করে ফেলতাম। তারপর আনন্দের সীমা থাকত না। শীতকালে এই কোট ছিল আমার একমাত্র অভিজাত পোশাক।

আমাদের স্পেশাল খাবার বলতে তখন ছিল হাতে গোনা কয়টা চাইনিজ রেস্তোরাঁ। কাটাবনের মোড়ে ‘টুং কিং’ আর মৌচাক মার্কেটের কাছে ‘চাংপাই’ রেস্তোরাঁ। এসব রেস্তোরায় ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের জন্য ভাল ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা ছিল। বন্ধু লেবু অকেশনালি আমাদের এই চাইনিজ খাওয়ার নাম দিয়েছিল
‘ইমপ্রুভড ডায়েট’। তখন এই খাবার আমাদের কাছে অনেক বেশি প্রিয় আর মজার লাগলেও অনেক পরে সত্যিকারের চাইনিজ খাবার খেয়ে জেনেছি চাইনিজ বলে চালালেও আসল চাইনিজ খাবারের রেসিপির সাথে আমাদের দেশের খাবারের কোনই মিল নাই। কোনো চাইনিজ মানুষ যদি জানে এটা চাইনিজ খাবার বলে চালানো হচ্ছে তাহলে ওরা হাসতে হাসতে মরে যাবে।

আমার সময়ের কথা বলি। তখন ছিল স্কুলের পড়া মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগলে দিয়ে নম্বর পেয়ে পাশ করে উপরের ক্লাসে উঠে যাওয়া। তারপর নতুন বই কিনে আবার আগের নিয়মে চিৎকার করে পড়া মুখস্থ, অতঃপর পরীক্ষা। এর বাইরে একজন মানুষের বড় হবার সময়ে অন্য সব জানার বিষয়ে কেউ কোনো শিক্ষা দিতো না। বাবা মা’র সাথে সন্তানের দূরত্ব ছিল বিস্তর। বড় ভাই কখনো বন্ধু নয়, বরং হতো ডিক্টেটর। বড় বোন আচরণ করতো স্কুলের মাষ্টারনির মত, যার কাজ ছিল শুধুই ধমক দেয়া। আজ আমাদের সংসারজীবনে আমরা যা দেখি, যা কিছু করি আমাদের সন্তানের জন্য—এসব কিছুই পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল আমাদের জীবনে। তাই বলা যায়, বই মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাশ করে সার্টিফিকেট নেয়া ছাড়া আর কিছু কেউ শিখি নাই পরিবার কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। আমাদের যা কিছু শেখা সব দেখে দেখে কিংবা বন্ধুদের কাছ থেকে কিংবা বই পড়ে আর মুভি দেখে।

মনে আছে আমি আমার স্কুলজীবনের সব চেয়ে প্রিয় বন্ধু খোকনের হাতের লেখা নকল করে ওর মত সুন্দর ঝরঝরে করে লেখার চেষ্টা করতাম। কলেজ ইউনিভার্সিটি জীবনের বন্ধু রহমত ছিল আমার জীবনের অনেক কিছু অনুকরনের আদর্শ। এর পাশাপাশি আমি সব সময় আমার বড় ভাই’র মত হতে চাইতাম।

লেখকের বড়ভাই ও দুই ছেলে

লেখকের বড়ভাই ও দুই ছেলে

বড় ভাই ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিল। ঐ সময়ের হাতেগোনা মাত্র কয়েকটা ক্যাডেট কলেজে পড়তে পারা রীতিমত অনেক প্রেসটিজের ব্যাপার ছিল। বড় ভাই যখন হোস্টেল থেকে সামরিক কায়দার হলুদ খাকি ইউনিফর্ম আর পাখির পালক লাগানো আর্মি ক্যাপ পরে বাসায় আসতো আমি খুব গদ গদ হয়ে গর্বের সাথে ভাইয়ের সব কিছু দেখতাম। খুব ফিটফাট আর রাগী ভাই আমাকে ইংরেজি পড়াতো এবং ভুল করলেই দয়ামায়াহীন ভাবে মাইর দিত।

ক্যাডেট কলেজের সামরিক কায়দার কড়া নিয়মকানুন একজন কিশোরকে শক্ত, স্মার্ট, সত্যিকারের সুশিক্ষায় শিক্ষিত যুবকে পরিণত করে সমাজের উঁচু স্তরে পৌঁছে দিতে বিশাল অবদান রাখে তার উজ্জ্বল প্রমাণ হলো আমার বড় ভাই। এই জীবনে আমি অনেক মানুষের সাথে মিশেছি, পড়েছি, কাজ করেছি কিন্তু আমার ভাইয়ের মত এত বিচক্ষণ, স্মার্ট, সত্যিকার শিক্ষিত ভাল মানুষ আমি জীবনে খুব বেশি দেখতে পাই নাই। আমার ভাই ও তার ক্যাডেট কলেজের সহপাঠীরা সবাই তাদের জীবনে দেশ-বিদেশের ভাল জায়গায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শুধু তাই নয়, আমার কাছে অনেক বেশি ঈর্ষণীয় লাগে তাদের দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্বের অনেক গভীরতা আর শক্ত ভীত দেখে। আমি অনেক চেষ্টা করেছি আমার ভাইকে অনুকরণ করতে। কিন্তু তার তুলনায় বলা যায় আমি জীবনে কিছুই করতে পারি নাই, মানে যেমন হতে চেয়েছিলাম।

সেই আমি একদিন আমেরিকায় পাড়ি দিলাম। একবারও ভাবি নাই ভাষা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে। ভাবতাম আমি খুব ইংরাজি জানি। কিন্তু বাস্তবে নিউ ইয়র্ক এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন অফিসারের প্রশ্নের উত্তর দিতে হিমশিম খেয়ে গিয়েছিলাম। আমার ইন্ডিয়ান অ্যাকসেন্টের ইংরেজি উত্তর বুঝতে বেটাও ভ্রু কুচকে, বিরক্ত হয়ে বহুবার জিজ্ঞেস করে করে হয়তো যা বোঝার বুঝেছিল, না হয় কিছু না বুঝে বিরক্ত হয়ে আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল।

ইউনিভার্সিটির হলে থেকে এক বাংলা ভাষাই বিভিন্ন জেলার মানুষকে ভিন্ন উচ্চারণে বলতে দেখেছি। প্রথম দিকে বুঝতে অসুবিধা হলেও বন্ধুদের কল্যাণে আমরা সবাই সবার আঞ্চলিক ভাষার সাথে ভালো ভাবে পরিচিত হয়ে গেছি।

আমেরিকায় এসে রাস্তাঘাটে, দোকানপাটে মানুষ যে চলতি ইংরেজি বলে সেটা বোঝা অত সহজ ছিল না আমার জন্য। আমি ইংরেজি বলতে শিখেছি ফুল গ্রামার দিয়ে যা শুনলে মনে হবে কারো সাথে কথা বলতেছি না, বরং মনে হবে কোনো চাকুরির আবেদনপত্র পড়তেছি। আমাদের দেশের ইংরাজি ব্রিটিশ স্টাইল কিন্তু ইন্ডিয়ানদের মত উচ্চারণ। অনেক পরে বুঝেছি ইন্ডিয়ান ইংরেজির উচ্চারণ আমেরিকানদের কাছে হাস্যরসের বিষয়। আমার কথা শুনে ওরা অনেক হাসে, তাই একান্ত দরকার না হলে কারো সাথে কথাই বলতাম না লজ্জায়।

রাস্তার চলতি ইংরেজি, সেটা আবার জাত, বর্ন ভেদে আরো ভিন্ন হয়। সাদারা এক রকম বলে, কিন্ত্ কালোদের কথা শুনলে মনে হবে কথা বলতেছে না বরং চোখ রাঙাচ্ছে। স্প্যানিশরা বলে আরেক রকম। ওদের ভিতর দেশভেদে কথাও ভিন্ন হয়ে যায়। আফ্রিকার একেক দেশের মানুষের একেক রকম উচ্চারণ, ক্যারবিয়ানরা তো ইংরাজি বলে না, যেন কাওয়ালি গায়। পাকিস্তানিরা বলে ঢিসুম ঢিসুম করে, ইন্ডিয়ান যারা আমাদের মত নতুন এসেছে ওদের কথা বুঝি কিন্তু যারা এদেশে জন্মেছে তারা আবার জটিল আমেরিকান অ্যাকসেন্ট ব্যবহার করে।

অনেক শব্দের অর্থ বা নাম আমি যেমন জেনে এসেছি এখানে এসে দেখি ওসব ব্যবহার হয় না। অনেক শব্দের বানানও ভিন্ন। কোনো শব্দে কিছু কিছু হরফের উচ্চারণ এতই ভিন্ন যে ভুল উচ্চারণ করলে সম্পূর্ন অর্থই পালটে যায়। আসলে আমাদের দেশে সব কিছু ফলো করা হয় ব্রিটিশ কারিকুলামে, আমেরিকায় সেটা বলা যায় ঠিক উলটা।

সব্জির নামের পার্থক্য দেখুন—বেগুনের ইংরাজি জেনে এসেছি ব্রিঞ্জাল, এখানে বলে এগ প্ল্যান্ট। ঢেড়স অর্থ জানি লেডিস ফিঙ্গার, এরা বলে ওকরা। ক্যাপসিকামকে বলে বেল পেপার। মাটনকে বলে গোট মিট। ডালকে পালস না বলে লেন্টিল স্যুপ বলে। টিফিন কথাটা একেবারেই শুনি না, বরং শুনি স্ন্যাক। টিফিন ক্যারিয়ার হয়ে গেছে লাঞ্চ বক্স।

গাড়ি লেফট হ্যান্ড ড্রাইভ। বাতির সুইচ নিচ থেকে উপরে ওঠে অন করতে। নরমাল বাসাবাড়ির ব্যবহারের ইলেক্ট্রিসিটির ভোল্টেজ হল ১১০। সব কিছুই আমাদের দেশের বিপরীত ব্যবস্থা।

কোনো শব্দ লিখতে বা বলতে Z এর বদলে J কিংবা G লিখলে বা হরফের সঠিক উচ্চারণ না হলে কথা বোঝানো অনেক মুশকিল হয়ে পড়ে। জেডকে বলে ‘যি’। আসলে জানার কোনো শেষ নাই জানতে চাইলে। আর পথ চলতে গেলে না যেনে উপায়ও নাই। ঠিক জিনিসটা জানতে পারলে নিজের কাছেও স্বস্তি লাগে।

murad-hai104

লেখকের সঙ্গে বন্ধু মুনীর।

যাই হোক, প্রথম কিছুদিন নিজেকে খুব অসহায় মনে হত। মাঝে মাঝে মনে হত পালিয়ে দেশে চলে যাই। ভাষার জটিলতা ছাড়াও সমস্যা ছিল। দেশে তো কাউকে কোনো দিন থ্যাঙ্ক ইউ বলি নাই। সালাম দিয়েছি শুধু। এছাড়াও যে আরো কত রকম সম্বোধন হয়, বলতে হয় জানতে হয়েছে শুনে শুনে। ম্যানার আর মুখের ভাব যে কত ইম্পর্ট্যান্ট সেটা বুঝতে সময় লেগেছে। মুখে থায়ঙ্ক ইউ বলার সাথে হাসি না দিয়ে মুখ গোমরা করে রাখলে বলে বসে আমি রাগ করে আছি কী জন্য, কী সমস্যা!

জানার পর বুঝতে পেরেছি ভাল ম্যানার, হাসি মুখ দেখালে অনেক কাজ হয়ে যায়। কিন্তু দেশ থেকে তো কিছু শিখে আসি নাই। শিখে এসেছি শুধু নিজেকে বড় ভাবা, বনেদি পরিবারের মানুষ ভাবা, অন্য সবাইকে অবজ্ঞা করা, ব্যঙ্গ করা। শিখে এসেছি মিথ্যা কথা বলা, ফাঁকি দেয়া, সুযোগ পেলে কিছু হাতিয়ে নেয়া। কিন্তু এই দেশের পরিবেশ, মানুষ, মানুষের ভাল ম্যানার, খারাপ মানুষের রূপ সব কিছু দেখে আমার মনে হয়েছে আমি যেন এত দিনে মাত্র স্কুল থেকে পাশ করে বের হলাম। তার মানে এই নয় যে এখানে সবাই ফেরেশতা। বদের হাড্ডি এখানেও ভরা। কিন্তু আইনের মারপ্যাচে ধরা পড়লেই চৌদ্দ শিকের ভিতর যেতে হয় দেখে মানুষ ভয় পায়।

এই দেশে শুধু ম্যানার শিখেছি তা নয়, শিখেছি কীভাবে আইনকে সন্মান করতে হয়। না করে যে কোনো উপায় নাই। শিখেছি কেউ তাকিয়ে না দেখলেও নিজের দায়িত্ব, কর্তব্য যথাযথ পালন করা। আমি কিছু ভুল করে বসলেও আমার ছেলেরা আমাকে সাথে সাথে ধরে ফেলে। বলে ফেলে, আমি ভুল করেছি, আর কখনো যেন এমন না করি। কোথায় আমি ওদের শেখাবো, তা না উলটা ওরাই আমাকে শুধরে দিচ্ছে।

দেশ থেকে যা কাপড় বানিয়ে এনেছিলাম, এখানে কিছুই পরতে পারি না। সব কিছু খুব পাতলা মনে হয়, শীত লাগে। এসেছিলাম সেপ্টেম্বর মাসে। তখন শীত পড়তে শুরু করেছে মাত্র। তাতেই আমার ত্রাহি অবস্থা।

একদিন প্যান্ট কিনতে GAP-এ গেলাম। ছেলে আর মেয়েদের শার্ট প্যান্ট যে আলাদা ধরনের হয় এটা আমি আগে জানতাম না। আসলে জানার দরকার হয় নাই কোনো দিন।

আমার সময়ে ঢাকায় এমন কোনো ক্লোদিং স্টোর ছিল না যেখানে ছেলেমেয়ের জন্য আলাদা সেকশন ছিল। তাছাড়া ঢাকায় মেয়েদের শার্ট প্যান্ট পরে বাইরে বলা যায় দেখাই যেত না।

যাই হোক, ঐ স্টোরে ঢুকে আমি আমার মাপের প্যান্ট খুঁজতে লাগলাম। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করছিলাম না পাছে কথা বোঝাতে না পারি এই ভয়ে। কেমন করেই বা বোঝাব যেখানে আমি জানি একটাই কথা —প্যান্ট। কিন্তু প্যান্টের কত রকম নাম আছে সেটা তো জানা ছিল না। জিন্স প্যান্টকে শুধু জিন্স বলে, সুতি প্যান্টস হল ‘খাকি’, ‘চিনোস’। ড্রেস প্যান্ট আলাদা। অনেক খুঁজে একটা খাকি রঙের প্যান্ট পছন্দ করে ট্রায়াল রুমে গিয়ে পরে দেখি সুন্দর ফিট করেছে। সামনের দিকে কুচিও দেয়া আছে, দেশে ড্রেস প্যান্টে যেমন থাকে। কিনে নিয়ে বাসায় চলে এলাম। পরদিন ঐ প্যান্ট পরে কাজে গেলাম।

আমার সাথে অনেকগুলি মেয়ে কাজ করত। ওরা আমার প্যান্ট দেখে নিজেদের ভিতর কানাঘুষা করে হাসাহাসি শুরু করল। আমি বুঝি নাই হাসার কারল যে আমি। বোকার মত ওদের দিকে তাকালে একজনের দয়া হল। সে আমাকে ডেকে নিয়ে বলে তুমি মেয়েদের প্যান্ট পরছো কেন! শুনে আমি কী বলব খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কারণ আমি তো জানতামই না যে মেয়েদের আবার আলাদা প্যান্ট হয়। তখন সেই মেয়ে আমাকে পিছনে ডেকে নিয়ে বোঝালো নিজের প্যান্ট দেখিয়ে আমার প্যান্টের সাথে তুলনা করে। বোঝালো মেয়ে আর ছেলেদের ফিগার ভিন্ন, তাই প্যান্টসের শেইপ ভিন্ন হয়। মেয়েদের কটন প্যান্টে কুচি থাকে, ছেলেদের নয়। মেয়েদের প্যান্টের বাটন ডান দিক থেকে আর ছেলেদের বাম দিক থেকে বন্ধ করতে হয়।

কুইনসের ওকল্যান্ড গার্ডেনে লেখকের বাসস্থান।

কুইনসের ওকল্যান্ড গার্ডেনে লেখকের বাসস্থান।

তখন সব বুঝলাম। মেয়েটাকে বললাম, আমি তো আমার মাপের কোনো প্যান্ট কোথাও খুঁজে পাই না। সে আমাকে সাথে করে ক্লোদিং স্টোরে নিয়ে মেনস সেকশন থেকে কেমন করে নিজের মাপমত কাপড় কিনতে হয় শেখালো। মজার ব্যাপার হলো, ওই প্যান্ট যে মেয়েদের আমার আগে আসা বন্ধুরাও সেটা বুঝতে পারে নাই।

তখন কোনো ঠিকানায় যেতে বোকার মত অ্যাড্রেস ঠিক মত না বুঝে বরং মনে রাখার চেষ্টা করতাম আশেপাশে কী আছে যা দেখলেই চিনে ফেলব। কারণ, ঠিকানা জানলেও কেমন করে খুঁজতে হয় বুঝতাম না। সব জটিল মনে হতো। এখনো অনেকেই এমন করে। ধরুন, কেউ হয়ত নিউ জার্সির কোনো হসপিটালে ভর্তি হয়েছে। এখন আমি যদি নিউ ইয়র্ক থেকে ড্রাইভ করে ওখানে যেতে চাই তাহলে আমাকে ওই হসপিটালের রাইট অ্যাড্রেস জানতে হবে জিপিএস দিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ওখানকার কাউকে অ্যাড্রেস জিজ্ঞেস করলে সোজা নাম নাম্বার না বলে বলবে ওনার বাসা থেকে ডাইনে গিয়ে পাঁচ মিনিট ড্রাইভ করলেই হাতের ডান দিকে পড়বে হসপিটাল। এখন আমি কেমন করে ওটা বুঝব!

অনেক আগের একটা ঘটনার কথা বলি। বন্ধু মুনির ম্যানহাটান থেকে সোশাল সিকিউরিটি কার্ড বানিয়ে এনেছে। জিজ্ঞেস করলাম, ওই অফিস কোথায়, কেমন করে খুঁজে পাবো। মুনির আমাকে বোঝালো, ট্রেন থেকে নেমে উপরে উঠে দেখবি একটা বিরাট বড় গরুওয়ালা বিল্ডিং, তার ১৭ তলায়। গরুওয়ালা বিল্ডিং মানে , ঐ বিল্ডিং-এর দেয়ালে গরুর ছবি দেয়া কোনো বড় বিল বোর্ড ছিল। ঠিক ওভাবেই খুঁজে বের করে ফেলেছি এদিক ওদিক তাকিয়ে, কাউকে কিছু না জিজ্ঞেস করে।

আমি জানতে চেয়েছি, শিখতে চেয়েছি, বুঝতে চেয়েছি তাই পেরেছি। দেশের খারাপ জিনিসগুলি ভুলে ভাল জিনিসগুলি শিখে নিয়েছি এবং সেটা ব্যবহার করি। নিজেকে পালটে ফেলেছি পরিবেশের কারণে, নিজের প্রয়োজনে। চাইলেই বদলানো যায়, ভাল মানুষ হয়ে সৎ জীবন বেছে নেয়া যায়।

আবার চাইলে কুকুরের মত লেজ বাঁকা করে রয়ে যাওয়া যায়। তখন হয়ত এই দেশের জীবন অত নির্ঝঞ্ঝাট হয় না। মাঝে মাঝে চৌদ্দ শিকের বেড়ায়ও যেতে হয় হাতে হাতকড়া পরে।

চয়েস নিজের কাছে—পালটে গিয়ে আসলে কি জীবনের শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ হব, তারপর নিজের শিক্ষার প্রতিফলন অন্যের উপর দেয়ার চেষ্টা করবো নাকি যেমন আছি তেমনি রয়ে যাবো, শুধু যেমন করে পারি অনেক টাকার মালিক হব।

আমার কাছে মনে হয়েছে পাল্টানো অনেক জরুরি। আগে নিজেকে সংশোধন করা দরকার, সামাজিক ভাল মন্দ বিচার করার বুদ্ধিসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া দরকার। তার আগে বোকার মত অন্যকে বিচার করতে যাওয়া ঠিক নয়।

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

About Author

মুরাদ হাই
মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।