page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

বদ্ধ ‘রুম’ ও খোলা জগৎ

স্পিলবার্গের ‘ই.টি দ্যা এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’কে বাইরে থেকে দেখলে খুবই সাধারণ বলে মনে হয়, যদিও এর কারণটা যে নির্মাতাদের দিক থেকে একেবারেই সচেতন এক সিদ্ধান্ত—তা অনস্বীকার্য। তবে একটু ভালো করে না দেখলে একটা ব্যাপার চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। আর সেখানেই যা কিছু ‘অসাধারণ’, সব ঠেসে দেওয়া—ছবিটি আগাগোড়া একটা ১০ বছরের শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণ করা হয়েছে।

room-2015-c

রুম ছবিতে ব্রি লারসন ও জ্যাকব ট্রেম্বলে

এই দৃষ্টিকোণ বা ‘পয়েন্ট অফ ভিউ’ এর ব্যাপারটা বরাবরই চলচ্চিত্রের মুখপাত্র সেজে থাকে। যেন নির্মাতা নিজে দায় নিতে ভয় পাচ্ছেন কিংবা নিরপেক্ষতার একটা গর্তে ঢুকে নিরাপত্তা খুঁজছেন। তবে ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে জিনিসটা যে চলচ্চিত্র-ব্যাকরণের সবচেয়ে শক্তিমান অনুষঙ্গ হতে পারে—তা আগেও দেখা গেছে; ২০১৫ সালের হলিউড ছবি ‘রুম’-এ আবারো দেখা গেল।

একটা বদ্ধ পরিসরে কয়েকটি চরিত্র লম্বা সময় ধরে আটকা পড়ে আছে—মোটামুটি এমন কাঠামোতে বানানো চলচ্চিত্র খুব বেশি না হলেও অপরিচিত কিছু নয়। স্মৃতিচারণে যে দু’টি ছবির কথা মনে পড়ে, সেগুলি হলো মেক্সিকান ‘দ্যা ক্যাসেল অফ পিওরিটি’ আর গ্রীক ‘ডগটুথ’। দুই ছবিতেই মানুষের আদিম সব আচার খুব ভালোমত ঘেঁটে দেখা হয়েছিল।

‘রুম’ ঠিক সেই রাস্তায় ঢোকে নি, তবু যেসব জিনিস নাড়াচাড়া হয়েছে সেগুলি ঠিক দস্তুর না হলেও বহু পুরনো, একেবারে সৃষ্টির শুরু থেকেই চলছে।

movie-review-logo

ছবির শুরু হয় জ্যাক-এর ৫ বছরের জন্মদিনে। মা জয়-এর একমাত্র সন্তান সে। জন্ম, বেড়ে ওঠা, শুরুর কিছু পড়ালেখা—সবই একটা রুমের ভেতর। মানে ৫ বছরের জীবনের পুরোটাই কাটছে একটা ছোট রুমের ভেতর। প্রতিদিন রাতে ওল্ড নিক নামের একটা লোক এসে যদিও তার মায়ের সাথে ঘুমায়, তবুও সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে মা জয় ছাড়া আর জীবন্ত কেউ জ্যাকের সাথে থাকে না।

অবশ্য জ্যাকের কাছে সব কিছুর মতই ‘জীবন’-এর ধারণাটাও একটু বেশিই আপেক্ষিক।

সে রুমের প্রতিটি আসবাবের সাথেই বন্ধুত্ব পাতিয়েছে। তার প্রশ্নগুলিতে সেসব আসবাবের নীরব থাকাটাও মেনে নিয়েছে সহজে। প্রতিটা জিনিসকে এভাবে প্রাণ দানের প্রক্রিয়াটা আবার শুরু হয়েছে তাদের ঘর, মানে ‘রুম’ থেকেই। খেয়াল করলে শোনা যায়, মা আর ছেলের কেউই ‘রুম’ এর আগে ‘দ্যা’ বা এই ধরনের কিছু বসায় না। কথোপকথনের সময় তাই কিছু সংলাপ আমাদের কানে অসংলগ্ন লাগে। আর সে কারণেই মনে করি, ছবিটি চলে তার নিজস্ব বাস্তবতায়।

room-2015-a

রুম ছবিতে ব্রি লারসন ও জ্যাকব ট্রেম্বলে

হ্যাঁ, ছবির প্রোডাকশন ডিজাইনারদের একেবারে ঘরোয়া সব জিনিস দিয়ে রুমটা সাজাতে হয়েছে। ডিমের খোসা ঝুলিয়ে জয়-এর ঘর সাজানো, জ্যাক-এর আঁকা ছবি দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখা—এগুলোয় অর্বাচীন নরম হাতের ছোঁয়া স্পষ্ট। দেড় মাসের শুটিংয়ে প্রতিদিন নাকি রুমের জিনিসগুলি বারবার ঠিক জায়গায় রাখার দিকে নজর দিতে হয়েছে বেশি। তবু এত সবকিছু বাস্তবতার নিরিখে মেপে নেওয়ার প্রবণতা এই ছবির শুধু উপরিতলেই। গভীরে তাদের বাস্তবতা পুরোদমে স্বকীয়।

সেই বাস্তবতায় কিছুটা চির ধরে দ্বিতীয়ার্ধে এসে, যেখানে বিশেষ করে একটি দৃশ্যে নির্মাতাদের আস্থাহীনতা লক্ষ্যণীয়। যেন তারা হুট করে দর্শকদের ভয় পেতে থাকেন, আর তাই মা জয়ের দু’একটি পরস্পরবিরোধী মানসিক অবস্থান সম্বন্ধে আমাদের ঠিকমতো বুঝিয়ে দেবার একটা চেষ্টা নেওয়া হয়। সেই বোঝানোর প্রক্রিয়াটা আবার খুবই সস্তা—একেবারে সংলাপ দিয়ে। সেই সংলাপেও যাতে একদম সঠিক শব্দগুলি ব্যবহার করা যায়, তাই সেগুলি বের করা হয় একজন সাংবাদিকের মুখ দিয়ে। থোড়াই কেয়ার দেখানো ছবিটির এই খণ্ডকালীন তোষামোদ প্রচণ্ড বিব্রত করেছে, তবে লজ্জিত হই নি।

ল্যানি অ্যাব্রাহামসন

পরিচালক ল্যানি অ্যাব্রাহামসন, অভিনেতা-অভিনেত্রীকে দৃশ্য বোঝাচ্ছেন।

এদিকে অবশ্য জ্যাক বেচারা লজ্জিত হতে থাকে বারবার, আর সেই লজ্জা পুরো ছবিটা ভাগাভাগি করে নেয়। এখানেও সেই ‘পয়েন্ট অফ ভিউ’-এর কারবারই কারণ। কুব্রিকের ‘দ্যা শাইনিং’ (১৯৮০) বা সাম্প্রতিক ট্যারান্টিনোর ‘দ্যা হেইটফুল এইট’ (২০১৫)-এ যথাক্রমে একটা আবাসিক হোটেল আর কেবিনের ব্যাপারে যেমনটা দেখা গেছে—বাইরের গড়নের চেয়ে ভেতরের জায়গাটুকু একটু বেখাপ্পাভাবে বড়—এই ছবিতেও বদ্ধ রুমটার বেলায় তেমন কিছু করার সুযোগ থাকলেও করা হয় নি পয়েন্ট অফ ভিউ-এর খাতিরেই। ধরুন জ্যাকের আঙুলের এক্সট্রিম ক্লোজ-আপ থেকে একটা এরিয়াল লং শটে যাওয়া হলো, এখানে আপনার দৃষ্টিসীমা যতটা বিস্ফারিত হওয়ার কথা ততটা হয় না। আমাদের কাছে রুমটাকে ছোটই লাগে। ‘আমাদের’ আর ‘জ্যাক’-এর দেখার মাঝে এই যে পার্থক্য, সেটা এসেছে চিত্রনাট্যেও।

room-book-1

এমা ডনাহুর বই রুম (২০১০)। এই বই থেকেই ছবিটি বানানো হয়েছে।

জ্যাক জানে রুমটা আসল, আবার টিভিতে যা কিছু দেখা যায়, তার কিছুই বাস্তবে নেই। সাধারণভাবে দেখলে তার ধারণাটা কিন্তু ঠিক। তবে তাদের আটক জীবনের বিশেষ পরিস্থিতিটাকে আমরা যখন তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে দেখি, তখন কিন্তু তার ধারণার বিপরীতটাকেই বাস্তব মনে হয়—ঐ বদ্ধ ঘরটা তো গোটা পৃথিবী না, আর টিভির ভেতরের সবকিছুই তো আর নকল না। খবর, সিনেমা—এগুলিতে যাদের দেখা যায়, তারা তো সত্যিকার মানুষদেরই প্রতিনিধি।

emma-donahue1

কানাডায় বসবাসরত আইরিশ লেখিকা এমা ডনাহু (জন্ম. ১৯৬৯)

এইভাবে শুধু একপাশে দাঁড়িয়ে কোনও কিছুর দুই দিক বোঝার যে চেষ্টা, সেটাই এই ছবির মূলে। মা আর তার সন্তানের বোঝাপড়াগুলি বারবার শুধু সন্তানের দিক থেকেই দেখা হয়েছে, যেটা আরো স্পষ্ট হয় যখন জয় আর তার মায়ের দ্বন্দ্বে শুধু জয়-এর দিকটাই বড় করে দেখা হতে থাকে। আবার যখন জ্যাকের সাথে জয়-এর একটা মীমাংসার উপলক্ষ আসে, তখন হুট করেই জয় গায়েব!

আবারো জ্যাক লজ্জিত।

প্রচলিত সব বিশ্বাস এসেছিল আমাদের জীবনধারাকে সহজ করতে। অথচ শক্তির কোনও মহাজাগতিক রূপান্তরে যেন একসময় আমাদের জীবনধারাই সেই বিশ্বাসগুলিকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে। এখন ফল হিসেবে আমরা ভুগছি অনিশ্চয়তায়। কিংবা হয়তো শুরু থেকেই এমনটা ছিলাম। সেদিক থেকে ‘রুম’-এর জ্যাক আমাদের প্রতিনিধিত্বই করে, তবে এতসব ভুল বোঝাবুঝির মাঝেও নির্মাতাদের বক্তব্যটা কিন্তু স্পষ্ট।


ছবির অফিসিয়াল ট্রেইলার (২০১৫)

উইলিয়াম এইচ মেসি আর জোয়ান অ্যালেন-এর মত ঝানুরা থাকলেও ছবিটির আসল দুই যাত্রী কিংবা চালক ছিলেন জয়-এর চরিত্রে অভিনেত্রী ব্রি লারসন আর তার ছেলের ভূমিকায় জ্যাকব ট্রেম্বলে। পরিচালক লেনি অ্যাব্রাহামসনকে দুই হাজার ছেলে থেকে জ্যাকব ট্রেম্বলেকে খুঁজে বের করতে হয়েছিল। সাবাশিটা কার বেশি প্রাপ্য বুঝছি না, কাচদের মাঝে হীরা বের করায় পরিচালকের, নাকি খোদ ট্রেম্বলের—যার সব অভিব্যক্তিতেই ‘না-অভিনয়ের’ ছাপ জুড়ে দেওয়া।

vri-larson-8

ব্রি লারসন

লেখিকা এমা ডনাহু তার নিজের উপন্যাস থেকেই ছবিটার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। তবে এই বই থেকে চলচ্চিত্র, মানে এক শিল্পকে আরেক শিল্পে পাল্টানোর তাদের যে প্রক্রিয়া—তা সফল হবার পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক ছিলেন ব্রি লারসন। ৫ বছর ধরে রোদ-হাওয়া-তুষারকণার ছোঁয়াহীন মানুষের দেহমনের যান্ত্রিকতা বুঝতে পুষ্টিবিদদের কাছে যাওয়া, অপহৃতদের মানসিক জঞ্জাল জানতে কিডন্যাপড ভিক্টিমদের সাক্ষাৎকার নেওয়া, আটক জীবনে মানিয়ে নিতে এক মাস পুরো একাকী কাটানো, মা-বাবার কাছ থেকে দূরে থাকার তীব্রতা কল্পনার মাঝে গুছিয়ে রাখা—এর সবই ছিল লারসনের বাড়ির কাজ।

সাহায্য করেছিলেন অ্যাব্রাহামসন। ছবিটাও হয়তো তাই।

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন