• তদন্তে দেখা গেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার মানসিকতা হল ‘যে কোনো মূল্যে জিততে হবে’
  • তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট ভারসাম্য হারিয়েছে
  • ৪২ পরামর্শের মধ্যে ৩৪টির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

‘দুর্বিনীত’ ও ‘নিয়ন্ত্রক’ ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

এ বছর বল টেম্পারিং স্ক্যান্ডালের জন্যও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে আংশিকভাবে দায়ী করা হচ্ছে। স্ক্যান্ডালের পর অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

এ বছরের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় টেস্ট ম্যাচের সময় অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ক্যামেরন ব্যানক্রফট বল টেম্পারিং করেন। এবং সেটা টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। সাম্প্রতিককালে সেই ঘটনা পুনরায় তদন্ত করা হয়। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতির উপর একটা নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন এটা। এই প্রতিবেদনে সেই টেম্পারিং এর সিদ্ধান্তকে বলা হয়েছে ‘শক্তিশালী সিস্টেমেটিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ইনপুট’।

যেই তদন্তকারীরা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের ইন্টারভিউ নিয়েছেন তারা বলেছেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের গভার্নিং বডি ক্রিকেটারদের মধ্যে অন্য দলের খেলোয়াড়দের ‘বুলি’ করা বা উত্ত্যক্ত করার স্বভাব ঢুকিয়ে দিয়েছে এবং ‘যে কোনো মূল্যে জিততে হবে’ এমন মানসিকতা তৈরি করেছে। এই কারণেই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের আচরণ এমন।

প্রতিবেদনে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে এমনভাবে সমালোচনা করা হয়েছে যে এখানে প্রচ্ছন্নভাবে স্টিভ স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার ও ক্যামেরন ব্যানক্রফটের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া নিজেদের ছাড়া আর কাউকে সম্মান করে না

বল টেম্পারিং এর ওই ঘটনার পর স্মিথ ও ওয়ার্নারকে ১২ মাস এবং ব্যানক্রফটকে ৯ মাস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওয়ার্নারকে অতিরিক্ত শাস্তি দেওয়া হয়েছে যে সে কোনোদিন জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন হতে পারবে না।

১৪৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে বারবার ‘দুর্বিনীত’ ও ‘নিয়ন্ত্রক’ বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হচ্ছে, সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হল এই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া নিজেদের ছাড়া আর কাউকে সম্মান করে না। খেলোয়াড়দের মনে হবে যেন, তারা পণ্য। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট তার ভারসাম্য হারিয়েছে… এবং খুব বাজেভাবে হোঁচট খেয়েছে। ক্রিকেট খেলার যে সুনাম তা এই পুরুষদের খেলার ক্ষেত্রে কলঙ্কিত হয়েছে। নারীদের বেলায় তা এখনো অক্ষুণ্ণ আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার নিউল্যান্ড গ্রাউন্ডে ঘটে যাওয়া বল টেম্পারিং এর ঘটনাকে  নৈতিক ঙ্খলন হিসাবে দেখা যায়… তবে সেভাবে দেখলে ভুল হবে। আমরা প্রমাণ পেয়েছি, এই এলিট ক্রিকেট যে কাঠামোর মধ্যে বেড়ে উঠেছে সেখানে জেতাটাই মুখ্য বিষয়, এর বিনিময়ে কী মূল্য দিতে হবে সেটা বিবেচনা করা হয় না।

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের অন্য দলের খেলোয়াড়দের প্রতি বাজে আচরণের বিষয়টিরও ব্যাপক সমালোচনা করা হয়েছে এখানে। বলা হয়েছে, জেতার জন্য যে তাড়না দেওয়া হয় তার অর্থই হল খেলোয়াড়দেরকে খেলার পাশাপাশি আচরণগতভাবেও আক্রমণ করার তাগাদা দেওয়া।

ডেভিড পিটারের দায় স্বীকার

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার চেয়ারম্যান ডেভিড পিটার এই প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় যা হয়েছে তার তিনি দায় স্বীকার করছেন।

পিটারের কথায়, আমরা জানতে চেয়েছি সমস্যা কী ছিল এবং আরো ভালো কী করতে পারতাম। ইচ্ছা করেই এই তদন্ত অনুমোদন করেছি অামরা কারণ আমরা আয়নার দিকে তাকাতে চেয়েছি।

তবে পিটার তার পদত্যাগ করার আহ্বান নাকচ করে দিয়ে বলেছেন তিনি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহী হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন।

বদলি অধিনায়ক টিম পেইনের বক্তব্য

অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলে স্মিথের বদলি অধিনায়ক টিম পেইন বলছেন, খেলোয়াড়দের মাঠের ব্যবহার নিয়ে যেসব বিষয় তদন্তে উঠে এসেছে সেগুলি তার কাছে পরিষ্কার। এই জিনিসগুলি এখন এই প্রতিষ্ঠানটিকে খেলোয়াড়দের সাথে একটা চুক্তিতে নিয়ে যাবে। আর এই চুক্তিতে বলা থাকবে অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়রা নিজেদের ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে কীভাবে মাঠে খেলবে।

প্রতিবেদনে যে বলা হয়েছে খেলোয়াড়েরা ‘একটা বুদ্বুদের ভিতর বাস করেছে’, সেটা পেইনকে মোটেই অবাক করে নি।

পেইনের বক্তব্য অনুসারে, সত্যিকার অর্থে আমরা নিজেদের গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারটাতে একটু আবদ্ধ থাকি। আমরা সৌভাগ্যবান যে আমরা অস্ট্রেলিয়ার জন্য খেলছি। এটা আমাদের ক্রিকেট দল না, এটা অস্ট্রেলিয়ার দল এবং আমার মনে হয় কিছু সময়ের জন্য ব্যাপারটা আমরা ভুলে গেছিলাম।

তবে শেষ পর্যন্ত তার দলের শাস্তি পাওয়া খেলোয়াড়দের পক্ষে সহানুভূতি আদায় করা এই প্রতিবেদনের উচিৎ হবে কিনা সে ব্যাপারে পেন কিছু বলেন নি।

তার কথায়, আমার মনে হয় না কাউকে দোষ দেওয়ার কথা এখানে বলা হচ্ছে। প্রত্যেকেই স্বীকার করেছে গত এক বছরে ভুল হয়েছে। এখানে বসে কাউকে দোষ দেওয়াটা কোনো কাজে অাসবে না।

ভাইস ক্যাপ্টেন জশ হ্যাজেলউড অধিনায়ক পেইনের মত একই সুরেই কথা বলেছেন। তার কথায়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদেরকে আবার খেলতে দেখলে আমাদের ভাল লাগবে, কিন্তু এটা আমাদের সিদ্ধান্তের বিষয় না।

অন্যদিকে পিটার জানিয়েছেন ওই তিনজনের উপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে।

প্রতিবেদনের পরামর্শ বিষয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

প্রতিবেদনটিতে ৪২টি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এগুলির মধ্যে আছে এথিকস কমিশন তৈরি করা এবং সিনিয়র খেলোয়াড়দের আবশ্যিকভাবে নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দেওয়া।

আরো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কোনো খেলোয়াড়কে অ্যালান বোর্ডার পদক দেওয়ার ক্ষেত্রে পারফরমেন্সের পাশাপাশি তার চরিত্র ও আচরণও যাতে বিবেচনা করা হয়, এবং দল গঠনের সময়ও নির্বাচকেরা যেন খেলোয়াড়ের দক্ষতার পাশাপাশি তার চরিত্র বিবেচনা করেই তাকে নির্বাচন করেন।

ভাইস ক্যাপ্টেনই যে আপাতভাবে ক্যাপ্টেনসির উত্তরাধিকার সেটা বিবেচনা করেই ভাইস ক্যাপ্টেনের ভূমিকা নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর মৌখিকভাবে আক্রমণ বা স্লেজিং বন্ধ করার জন্য হয়রানি-বিরোধী আইনটাকেও বদলাতে বলা হয়েছে।

এই ৪২ পরামর্শের মধ্যে ৩৪টির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। ৭টি নিয়ে তারা চিন্তা-ভাবনা করছে ও ১টা পরামর্শ পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে। বাতিল করা পরামর্শটি ছিল, খেলোয়াড়েরা ইচ্ছা করলে আন্তর্জাতিক টি-২০ ম্যাচ না খেলে শেফিল্ড শিল্ড বা গ্রেড ক্রিকেট খেলতে পারবেন।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে সম্পাদনা করা হয়েছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া অবশ্য জানিয়েছে মানহানির ঝুঁকি এড়ানোর জন্য বাইরের আইনজীবীদের উপদেশেই এটা করা হয়েছে, তবে প্রতিবেদনটির মূল বক্তব্য একই আছে।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here