page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

বসন্ত এসেছে বটে

টি এস এলিয়টের ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতার প্রথম লাইন কইতে না পাইরা ভাইবা বোর্ডে নাকানি চুবানি খাইছিল আমার এক সহপাঠী। পরে অবশ্য সে ‘এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ’ মনে করতে পারছিল। ততক্ষণে এক্সটারনাল বইলা ফেলছেন যে এইটা না পারলে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী হিসাবে নিজেরে দাবি করারা কোনো যোগ্যতা তার নাই। ইংল্যান্ডে বসন্ত আসে এপ্রিল মাসে। বসন্ত কালরেই ক্রুয়েলেস্ট বলছেন কবি। শীতের দেশে বসন্ত একটা আশীর্বাদ, সেই কবিতায় বিশেষ কারণে বসন্তরে নিষ্ঠুর আখ্যা দেওয়া হইছে ।

গরমের দেশে বরং শীতকালই মানুষ উদযাপন করে, শীতকালে যাত্রা , কনসার্ট, পিকনিক— এইসব করে, পিঠাপুলি খায়, বিয়াশাদীর উৎসব হয়। আর কোকিলের ডাক থাকা সত্ত্বেও বসন্ত বরং খারাপ—নিদারুণ একটা রোগের নাম হইল বসন্ত।

আমার দাদির গায়ের রঙ নাকি এক সময় সুন্দর ছিল, আমরা কোনোদিন দেখি নাই, বসন্তের দাগওয়ালা মুখ দেইখ্যা বুঝার উপায় ছিল না সেইকথা। আমার নানিরও নাকি ভয়ানক রকমের বসন্ত হইছিল, বাঁচার কথাই ছিল না।

বসন্ত কেন খুব আহামরি তা নিয়া আগে তেমন কিছুই ভাবি নাই। জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসের বীভৎস শীত কাটাইবার পরে বসন্ত যে কত আনন্দের সেইটা আমি টের পাইছিলাম। তার আগে কোনো দিনই বুঝি নাই রবীন্দ্রনাথ কেন বলছেন “আনন্দ বসন্ত সমাগমে।”

গত বছর বর্ষাকালে আমার ইচ্ছা করল ‘আনন্দ বসন্ত সমাগমে’ গানটা শুনতে। মোবাইল ফোনে ডাউনলোড করলাম কয়েকটা ভার্সন, কিন্তু পছন্দ হইল না। রবীন্দ্রনাথের অনেক গান আছে বৃষ্টির। কিন্তু আমার বসন্তের গানের জন্যেই, এবং এই একটা গানের জন্যেই মাথা খারাপ হইয়া গেল।

গত বছরের (২০১৬) মার্চে, মানে বসন্তকালে আমরা গেলাম সিরাজগঞ্জ। আমার সহকর্মী আবদুল্লাহ আল মুক্তাদিরের বাড়িতে। তখন আবহাওয়া অতি মনোরম, লোকাল বাস হইলেও যাত্রায় কোনো অসুবিধাই হয় নাই। মুক্তাদিরদের বাড়ি থাইকা ৭০/ ৮০ গজ হাঁটলেই যমুনা নদীর বান্ধানো পাড়। ওদের বাড়ির কেউ চা খান না, প্রতিবার আমরা চা খাইতে গেলাম যমুনা নদীর ধারে।

“যমুনা নদীতে তন্ময় আর মুক্তাদির।” – লেখক

আগে একবার আমি যমুনা নদী দেখছিলাম আমার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়া। কিন্তু সেইটা তেমনভাবে দেখা না, খালি নৌকায় বইসা নদীর চেহারা দেখা। ভাবলাম এইবারে বেশ ভালোমত যমুনা নদী দেখব। যমুনার পানিতে গোসল কইরাও আসব।

যমুনা লইয়া বাংলা সাহিত্যে কবিতা গল্প গানের অন্ত নাই। ছোটকালে সাদী মুহাম্মদের একটা অ্যালবাম আমার খালার বাসায় ছিল। খালা বলতেন হারানো দিনের গান। আমরা খালাত বোনেরা মিল্যা সেই গানগুলা শুনতাম। সেইখানে “যমুনায় জল আনতে যাচ্ছ সঙ্গে নেই তো কেউ, তুমি কাদের কূলের বউ?” গানটা ছিল।

রাধাকৃষ্ণের পৌরাণিক কাহিনীর কারণে যমুনা বিখ্যাত, কিন্তু যমুনা শুনলেই আমার চক্ষে যে ছবিখান ভাসে সেইটা বদ্রাওনের নবাব গোলাম কাদের খাঁয়ের মহলের বাইরের একটা যুদ্ধক্ষেত্র। গোলাম কাদের খাঁয়ের কন্যা যে হিন্দু সেনাপতি কেশরলালের প্রেমে পইড়া মহল থাইক্যা বাইর হইয়া আসছিল আর আহত সেনাপতিরে পানি খাওয়াইতে গিয়া তার জাত নষ্ট করার দোষে চটকনা খাইয়া হতভম্ব হইয়া গেছিল সেই দৃশ্যটা আমি দেখতে পাই । কেশরলাল আর তার ভৃত্য একটা ডিঙ্গি নৌকায় কইরা বিশাল যমুনায় ভাইসা যাইতেছেন আর নবাবজাদী বিহবল হইয়া চাইয়া রইছেন —কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এমন একটা দৃশ্য আমার মনে পড়ে, যেন সিনেমায় দেখা কোনো দৃশ্য। গল্পটার নাম ‘দুরাশা’, সেইখানে যমুনারে ডাকা হইছে জাহ্নবী। যমুনার আরেক নাম কালিন্দী। বলা হয় যমুনার জল কালো। কিন্তু আগের বার দেইখ্যা আমার কাছে মনে হইছিল ঝকঝকা নীল।

“জাহাঙ্গীরনগরের এক পয়লা ফাল্গুনে আমি আর রুবানা। সেইদিন বিভাগে কালো কাপড় পিন্দা গেছিলাম, মাশরুর স্যার বলছিলেন, আজকে তো কোনো শোকের দিন না। পরে পাল্টাইয়া রঙিন শাড়ি পরছিলাম। বন্ধু কৃষ্ণেন্দু বলছুইল এইটা বুয়াদের শাড়ি। আসলেই শাড়িটা ট্রান্সপোর্ট থাইকা ২৫০ টাকা দিয়া কিনা।” – লেখক

এইবার বসন্তকালে যমুনা দেখতে গিয়া মহা হুজ্জত পোহাইতে হইল। শুকনার দিন দেইখ্যা মুক্তাদিরদের বাড়ির কাছের ধারাটায় কোনো পানি নাই, দুই এক জায়গায় ডোবামত হইয়া রইছে। সেই পানিরেই যমুনার জল ভাইবা সান্ত্বনা নিয়া আমি আর আমার কন্যা তাতে গোসল করলাম। কিন্তু আসল যমুনা দেখবার খায়েশ তাতে মিটল না। পরদিন বাচ্চা কাচ্চা মুক্তাদিরের আম্মার জিম্মায় রাইখা বাইর হইলাম যমুনা দেখতে।

হাঁটতে হাঁটতে কত সময় পার হইল বুঝলাম না, কিন্তু মনে হইল অনেকক্ষণ হাঁটছি। পথিমধ্যে আবার নামল বৃষ্টি। একটা কুঁড়েঘর ছিল, সম্ভবত রবিশস্য সংগ্রহ করার জন্যে বানানো। সেইখানে বইসা বিশ্রাম নিলাম। কুঁড়েঘরের মালিকের মোবাইলেও জোরে জোরে গান বাজতেছিল। পরিবেশ রোমান্টিক হইতে গিয়াও হইতে পারল না। বৃষ্টি থামলে আমরা আবার হাঁটতে ধরলাম। কিন্তু যমুনার দেখা নাই।

মনে একটু সন্দেহও হইল, মুক্তাদিররে জিগাইলাম সত্যি সত্যি সেইখানে নদী আছে না কি সে রাস্তা ভুইলা অন্য কোনো পথে নিয়া যাইতেছে আমাদেরে।

পায়ের নিচের বালি দেইখা অবশ্য মনে হইতেছিল সেইটা নদীর চরের বালি। আর তাছাড়া যে বান্ধানি পাড় থাইকা আমরা রওনা হইছি সেইটা ত নদীর পাড় হইবারই কথা।

সত্যি সত্যি যমুনার পাড়ে পৌঁছানের আগে টের পাইলাম। পায়ের নিচে বিভিন্ন উদ্ভিদ যেগুলা পড়তেছিল সেইগুলা কমতে থাকল। শুধু বালুময় ধু ধু এলাকা। আশেপাশে লোকজন একেবারেই নাই। আমার মনে হইল কোনো সমুদ্র সৈকতে আইসা পড়ছি।

মুক্তাদিরের একটা কবিতার বই বাইর হইছে ১৬ সালের একুশে বইমেলায়, বইয়ের নাম ‘অন্য গাঙের গান, সমুদ্রসমান’। সে যমুনার পাড়ের মানুষ,তাই গাং বলতে আসলে যমুনারে উল্লেখ করছে ধইরা নিতে অসুবিধা হয় না। যমুনার পানি দেখতে পারার পরে বুঝলাম যে আসলেই এই গাং সমুদ্র সমানই। দিগন্ত পর্যন্ত পানি ছাড়া আর কিছু দেখতে পাওয়া যাইতেছে না। মনে আফসোস হইল, বাড়তি কাপড় জামা কেন আনলাম না। সত্যিকার অর্থেই যমুনার জলে স্নান করতে পারা যাইত তাইলে। বসন্ত কালেই যমুনার এই রূপ, বর্ষায় সে কেমন হইতে পারে কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু কল্পনাশক্তিতে কুলাইল না।

তখন বসন্তকাল হইলেও আমার মনে পড়ল বর্ষার গান —‘এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’। রবীন্দ্রনাথ বসন্তকাল নিয়া অনেক রোমান্টিক গান লিখছেন কিন্তু আমার মনে হয় এই অঞ্চলের জন্যে রোমান্টিক ঋতু আসলে বর্ষা। রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানগুলিতে বিরহ বেশি প্রাধান্য পাইয়া গেছে, মিলনের ঋতু ধরা হইতেছে বসন্তকালরে। ‘এ ভরা বাদর’ গানটা সম্ভবত বিদ্যাপতির লেখা। আমার কাছে যে বৈষ্ণব পদাবলী আছে সেইটাতে খুঁইজা গানটা আমি পাই নাই। সেই বসন্তের দুপুরবেলায় আমার কেন বর্ষার আর বিরহের গান মনে পড়ল তাও ঠিক বুঝলাম না। সম্ভবত যমুনার যে চিরকালীন রোমান্টিক একটা ইফেক্ট আছে সেইটা আমার অচেতন মনে কাজ কইরা থাকতে পারে।

যমুনার মিথোলজিক্যাল গুরুত্ব রাধাকৃষ্ণের কারণে হইছে, আর রাধাকৃষ্ণের কাহিনীটা বিয়োগাত্মক। সেই হিসাবে বর্ষা ঋতু বিরহের সময় আর অতি রোমান্টিক বইলা যমুনার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। একটা ঐতিহাসিক নদীর সামনে দাঁড়াইয়া সত্যিকার অর্থেই এক ধরনের শিহরণ অনুভব করলাম। যদিও আমার বাড়ি ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে, সেইটারও মিথোলজিক্যাল ইম্পর্ট্যান্স আছে। কিন্তু রাধাকৃষ্ণের মিথ তো অন্য ব্যাপার। এর সঙ্গে কিছুরই তুলনা চলে না। আমার আম্মা বলেন, “কানু বিনে গীত নাই।” কোন ব্যক্তি বা বিষয় সব সময় উপস্থিত থাকলে এই প্রবাদ বলা হয়। যেমন, কিছুদিন আগে সব নাটক সিনেমায় জয়া আহসানরে দেখা যাইতেছিল, তখন আম্মা এই কথা কইছিলেন।

“আমার খালা শাশূড়ির ফ্যাশন হাউজের নাম আনন্দ বসন্ত, এই ফটোশুট হইছিল পয়লা বৈশাখের আগে, কিন্তু শাড়িটা পয়লা ফাল্গুনের উপযোগী, ছবিটা তন্ময়ের তোলা।” – লেখক

রাধাকৃষ্ণ নিয়া অনেক আসাধারণ গান আছে, তবে ইদানিং শোনা গানগুলির মধ্যে শুভা মুদ্গালের গাওয়া ‘মথুরানগরপতি’ শুইন্যা আমি যার পর নাই মুগ্ধ। ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘রেইনকোট’ ছবিতে সম্ভবত গানটা ব্যবহার করা হইছিল (আমি নিশ্চিত না)। ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ছবিতে ‘এ ভরা বাদর’-এর যে ভার্সন আছে সেইটা খুঁজতে গিয়া ইউটিউবের সাজেশনে গানটা শুনলাম, শুইন্যা খানিকক্ষণ ঝিম ধইরা থাকলাম, তারপরে আবার শুনলাম।

বহুদিন এত ভাল গান শুনি নাই বইলা মনে হইল। গানের কোথাও কোনো ঋতুর উল্লেখ আছে কি না মনে নাই। তবে শুনতে থাকলে শ্রাবণ মাসের আকাশের মতন মন ভার হইয়া আসে।
কেউ প্রেমে থাকুক বা না থাকুক, এইসকল গান শুনলে গানের কারণে অবশ্যম্ভাবীভাবে বিরহের অনুভূতিতে আক্রান্ত হবে।

এলিয়ট এই দেশে জন্মাইলে হয়ত লিখতেন, “শ্রাবণ ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ”। শাওন মাসরে নিষ্ঠুর বললে আবার বিশেষণটা ঠিক মানানসই হয় না। বিরহে কাতর হইয়া কষ্ট পাইলেও শাওন মাস মায়াময়। আবার এই দেশের হিসাব অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে বসন্ত আসে দেইখা ফেব্রুয়ারিরেও ক্রুয়েলেস্ট বলতে পারতেন। বসন্তরে আমার কাছে খুব একটা মায়াময় মনে হয় না, আবার নিষ্ঠুর বইলাও টের পাই নাই। অনেক মানুষের মধ্যে অবশ্য ম্যাসোকিজম থাকে, তারা কষ্টে থাকাটাই উপভোগ করেন। সেই জন্যেই শচীন কর্তা গান গাইছেন—‘বিরহ বড় ভাল লাগে’। সেই গানে একটা লাইন আছে “বেদনা সাজায় মোরে গেরুয়া রঙ দিয়ে, সে রঙেরে ছুপাই আমি বাসন্তী রঙ দিয়ে।” বাসন্তীরে উনি আনন্দের সময় না ধরলেও বাসন্তী রঙরে সুখের রঙ ধরছেন।

রবীন্দ্রনাথ লিখছেন “মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে।” তবুও বসন্তের সঙ্গে বিরহের একটা সম্পর্ক আছে বইলা আমার মনে হয়। মিলনের জন্যে কাতর হইয়া থাকা মানুষের কপালে যখন সঙ্গী জোটে না তখন ব্যাপারটা মনে হয় আরো বেশি ভয়াবহ। সেই হিসাবে ক্রুয়েলেস্ট ত হইতেই পারে।

পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে ক্যালেন্ডারের হিসাবে ঋতু পরিবর্তন হয় কিনা আমি জানি না। বাংলা হিসাবে হয়। এই দেশে ফাল্গুনের পয়লা দিনে বসন্তের আগমন পালন করার রীতি হইছে বেশ কয়েক বছর ধইরা। পয়লা বৈশাখের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হইয়া গেছে মনে হয় পয়লা ফাল্গুন। সম্ভবত পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন’স ডে বইলা তরুণেরা এক ধরনের ওয়ার্ম আপ করার সুযোগ পান এই উৎসবে। ।

কিন্তু একটা জিনিস আমার মাথায় ঢোকে না, ইংরেজিতে লিপ ইয়ার আছে, ইংরেজিতে সেই বছরে ৩৬৬ দিন। কিন্তু বাংলায় এই ধরনের কিছু আছে বইলা শুনি নাই। তাইলে প্রতিবছর ১৩ ফেব্রুয়ারি পয়লা ফাল্গুন হয় কেমনে? পঞ্জিকাতেও কি চার বছর পর পর কোন একটা মাসে এক দিন বেশি থাকে? সেই মাসটা কোনটা?

“এই পথে যাইতে যাইতে আমার মনে হইতেছিল আসলে সামনে কোন নদী নাই।” – লেখক

ফাল্গুনের আরেকটা ব্যাপার নিয়া আমার মনে খটকা আছে। আল মাহমুদের কবিতায় আছে, “ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ দুপুর বেলার অক্ত, বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথায় বরকতেরই রক্ত/ হাজার যুগের সূর্য তাপে জ্বলবে এমন লাল যে, সেই লোহিতেই লাল হয়েছে কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে।” কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষ্ণচূড়া ফুটে না, এপ্রিল মাসে ফুটে। পোয়েটিক লাইসেন্স দিয়া দিলে এই নিয়া কথা কওয়া উচিৎ না। ফাল্গুন শুরু হইবার আগেই যে পলাশ ফুটতে থাকে আর ফাল্গুন শেষ হইবার আগেই শিমুল গাছে আগুন ধইরা যায় সেইটা ঠিক।

আমি অফিস যাইবার পথে পয়ত্রিরিশখান শিমুল গাছ দেখতে পাই। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থাইকা শুরু কইরা ক্যাম্পাসের বড় রাস্তা দিয়া ধানক্ষেতগুলির মাঝেমধ্যে পর্যন্ত, একদিন বাসে বইসা গুনছিলাম। এত শিমুল দেইখা আমার রবি ঠাকুরের আরেক নারী চরিত্রের নাম মনে পড়ছে, ‘স্ত্রীর পত্রে’র মৃণালিনী। সে কইতেছিল, “তোমাদের অন্দরমহলে কোথাও জমি এক ছটাক নেই। উত্তরদিকের পাঁচিলের গায়ে নর্দমার ধারে কোনো গতিকে একটা গাবগাছ জন্মেছে। যেদিন দেখতুম সেই গাবের গাছের নতুন পাতাগুলি রাঙা টক্ টকে হয়ে উঠেছে, সেইদিন জানতুম, ধরাতলে বসন্ত এসেছে বটে।”

আমিও ইদানীং বসন্ত টের পাই লোকজনের পয়লা ফাল্গুনের প্রস্তুতি দেইখা। পৌষ মাসের শীতের মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা হইতেছিল, এক ছেলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের পরীক্ষা দিতে আসছিল সুন্দর একটা কমলা লাল পাঞ্জাবি পিন্দা। কমলা রঙের কাপড়ের উপরে লাল হরফে রবীন্দ্রনাথের বসন্তের গানগুলি লেখা। ‘এ কী লাবণ্যে পূর্ন প্রাণ’, ‘বসন্তে ফুল গাঁথল আমার জয়ের মালা’, ‘দিয়ে গেনু বসন্তের এ গানখানি’, ‘আহা আজি এ বসন্তে’, এরকম আরো কয়েকটা। দেইখা আমার মনে হইল এই প্রজন্মের মানুষের সংস্কৃতি কী রকম ভাবে পাল্টাইয়া গেছে। জামা কাপড়ে লিখ্যা তাদের মনে করতে হয় বসন্ত আইছে। ব্যাপারটা অনেকটা গরুর ছবি আইকা নিচে’গরু’ শব্দটা লিখ্যা দেওনের মতন—না লিখলে যদি চিনা না যায়!

About Author

উম্মে ফারহানা
উম্মে ফারহানা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত। জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, ৬ অক্টোবর ১৯৮২। প্রকাশিত গল্পগ্রস্থ: দীপাবলি। shahitya.com-এ ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন: লৌহিত্যের ধারে।