page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

বাংলার বিদ্বৎ সমাজের অমিত সমস্যা

অমিত ধর লোকটারে আমি শুরুতে জানতাম অমিত ঠাকুর নামে। কারণ সবাই ওরে ঠাকুর নামে ডাকত।

আমিও অমিতদা বা ঠাকুর নামে ডাকতাম। ওর লগে খাতিরের অনেক পরে জানছি ও ঠাকুর না, ধর—অমিত ধর। তাইলে তারে ঠাকুর নামে ডাকা হইত কেন? এই চিন্তা মাঝে দুই-একবার করছি। ও হিন্দু আর বিদ্বান তাই হয়ত। মানে ও ঠাকুর নামেই পরিচিত ছিল জাহাঙ্গীরনগরের সমাজে। আরও বিদ্যানুরাগীরা তারে ঠাকুরই বলত, অমিত বলত কদাচিৎ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ওর লগে আমার খাতির একেবারে শেষ দিকে। শুরুর দিকে চিনাচিনি হইছিল। ক্যাম্পাসে আমি ঠিক বিদ্যার্থী ছিলাম না কোনও অর্থে, এমনকি লিফলেট বা দাবিনামার বাইরের লেখকও ছিলাম না।

salahuddins1

অমিতের লগে ফলে আমার যোগাযোগ ছিল পলিটিক্যাল। ওর লগের পাঠচক্রের সদস্যরাও পলিটিক্যালি আমার লগে ইনভলব ছিল। কোনও সাহিত্যিক বা দার্শনিক সম্পর্ক তাগো লগে আমার ছিল না। যে কারণে সেই অর্থে মাখামাখিও ছিল না। অমিতের লগের সম্পর্কটা পরে যে পাল্টাইল তাও পলিটিক্যাল কারণেই।

সেটা একটা যৌন নির্যাতন বিরোধী আন্দোলনের সময়। আমি আবার তখন অ্যাপলিটিক্যাল হয়ে পড়ছি। লিফলেটের বাইরে লেখালেখি করতেছি মনে মনে, সঙ্গোপনে। তখন একটা পত্রিকা বাইর করত শাওনসহ আরও কিছু পোলাপানে। ওদের কাছে লেখা দিতাম, আড্ডা দিতাম।

অমিতসহ আমাদের বিশাল সার্কেল, কখন কার লগে দেখা হয় আলাপ হয় ঠিক নাই। আমি পুরাই বেকার, যেহেতু পলিটিক্স ছাইড়া দিছি। সেসময় অমিতের বাংলা বিভাগের এক মাস্টারের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে। তাদের পোলাপান আন্দোলন করতেছে। আমি যাই না সেখানে। আলাপেও থাকি না। ততদিনে আমি জানি মাছ শিকারীদের কায়দা-কানুন। এই আন্দোলোনেরও গোপন ইন্ধন বিষয়ে আমার জানা হয়ে গেছিল আগেই। সিনিয়র বা পলিটিক্যাল হওয়ার কারণেই মনে হয়, আগাম খবর আমি পাইতাম। সব বিবেচনায়, এই আন্দোলনে আমি নাই এমন ডিসিশান নিয়া নির্ভার ঘুইরা বেড়াইতেছিলাম।

amit-dhar

অমিত ধর

তখন দুইটা ডাক পাই আমি। একটা অমিতের, আরেকটা সেসময়ের ছাত্রদল সভাপতির। একটা বন্ধুত্বের, আরেকটা প্রচ্ছন্ন হুমকির। দুই ডাকেই আমারে সাড়া দিতে হইত। একটা সামাজিক কারণে, অন্যটা হলে আমার নিরাপদে থাকার দরকারে।

যে মাস্টারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের লোক। ফলে ছাত্রদল তথা প্রশাসনের দরকার ছিল এই আন্দোলনের। আমি গুটি হইতে চাই নাই, কিন্তু উপায়ও ছিল না তখন। তো অমিতের লগে আমার প্রাত্যহিক যোগাযোগ তখন থিকা শুরু হইল আর কি।

দিনে-দুপুরে সারাক্ষণ ওর লগে আছি। রাইতেও কী হবে, কী করা যাবে এসব নিয়া ফন্দি আঁটা হইত। ও আমারে খুব বিশ্বাস করত, আস্থা পাইত। অমিত জানত এসব সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট নিয়া নানা লোকের ধান্দার খবর। মুখে বলত না। আমিও বলতাম না। দুজনে মুখামুখি বুইঝা নিতাম কী হইতেছে, কী করা দরকার তখন।

অমিতরে এখন আমার খুব পলিটিক্যাল মনে হয়। ওর হয়ত পার্টি করার বাসনা ছিল। একেবারে শুরুর দিকে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনেও ও বেশ সক্রিয় ছিল। আর ছিল খুব আমুদে। শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল ওর। অন্যান্য কিছু শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে। আর ছিল পড়ার স্বভাব। খুব পড়ত ওরা। আরও কিছু পোলাপান মিলে তাদের পড়ালেখা চলত।

amit-dhar-2

অমিত, সেরু, অনিক, পাঠান। মনে হয় বটতলায়।—লেখক

কিন্তু লেখত না। অমিতরে আমি কোনওদিন লেখতে দেখি নাই। পড়তে দেখছি বিস্তর। কী কী পড়ত এখন আর মনে নাই। ফিলসফি, ফিল্ম, লিটারেচার পড়ত। ঢাকায় ক্লাস করত। নানা ভাষা শিখত। যে কোনও বিষয়ে অমিত তর্জনি উঁচায়া সেটা নাচায়া হাসিমুখে কথা কইত। একটা মেয়ের লগে ঘুরত সে। প্রেম করত হয়ত। আমি জানি না এ বিষয়ে দুজনেরে একলগে ঘুরতে দেখার চাইতে বেশি কিছু। ক্যাম্পাস ছাড়ার পর আবার অমিতের লগে দেখা নাই মেলা দিন।

ওরে লোকে ‘আবদুর রাজ্জাক’ নামেও ডাকত দেখতাম। বিদ্বান কিন্তু যদি না লেখে তারে আবদুর রাজ্জাক বলে। তিনি জাহাজ, তার কাছ থিকা একটু একটু নিয়া অনেকেত তীরে ভেড়ে। অমিতের প্রতি এমন রেসপেক্ট জাহাঙ্গীরনগরে ছিল।

বাংলার বুদ্ধিজীবী সলিমুল্লাহ খানের পাঠচক্রে ভিড়ছিল সে মনে হয়। পলিটিক্যালি সে-মুখী ছিল যতদূর তার স্ট্যাটাস-কমেন্ট পইড়া বুঝতে পারছি। বারদুই সামনাসামনি দেখা হইছিল। তারে লিখতে বলছিলাম মনে আছে। কী করে জানতে চাইলে কী উত্তর দিছিল মনে নাই। “কিছু করি না” জাতীয় কোনও উত্তর দিতে পারে। বিনয়ী ছিল সে, অন্যরে মর্যাদা দিতে জানে। একটা আশা রাখে অন্যের প্রতি। ও যদি তার বিভাগের সেই আন্দোলনে না থাকত, তাইলে কিছু মেয়ে-ছেলে সামাজিক আর একাডেমিক বিপদে পড়ে যাইত। এটা আমি খুব কাছ থিকা বুঝতে পারছিলাম। বিভাগের স্টুডেন্টরাও তারে খুব রেসপেক্ট করত।

কিন্তু অমিত লিখল না। তার লগের আরও কিছু বিদ্বান আছেন, তারাও লিখলেন না। লেখার চাইতে পড়ার দিকে তাদের ঝোঁক বেশি। কী পড়েন কেউ জানতে পারে না। আড্ডায়, তর্কে হয়ত তারা সরব থাকেন। আশপাশের লোকেরা কম পড়ে বইলা তাদের কিছু বাড়তি ওজন তৈরি হয়। লোকে জ্ঞানী ভাবতে শুরু করে তাদের। তবে অমিত আবার এমন ছিল না, সে কিছু ফলাইতে আইত না। কিছু একটা বলার সাহস তার ছিল না কি না জানি না, কিন্তু বলত না। তার না বলাবলি সঙ্গীদের উপরও ভর করছে। যে কারণে তারাও বলে না, লেখে না। অমিতের বন্ধুদের কেউ কেউ লেখে, খুব খারাপ লেখা।

amit-dhar-3

অমিতের সাথে কয়েকজন বন্ধু। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরাতন কলাভবনের রাস্তায়।—লেখক

অথচ সে লিখল না। সে লিখলে একাডেমিক্যালি কিছু ভালো লেখা পাওয়া যাইত। ওর দেখাদেখি ওর অনুসারীরাও লিখত নিশ্চয়। ও লিখলে খারাপ করত না। চিন্তার শার্পনেস ছিল। লজিক্যাল থাকতে পারত। মুখে মুখে সমালোচনা করত। বিরাগভাজন হয়ে পড়ার অজুহাতে লিখতে চাইত না। এসব সমস্যা অনেকের মধ্যেই দেখি আমি। লেখার নানা ভীতি তাদের মধ্যে কাজ করে। ভাষাটা খুঁইজা পায় না অনেক সময়। বড় কিছু লেইখা ফেলবে এমন তাগাদা ফিল কইরা আর লেখাই হয় না তাদের।

ওর এই সমস্যাটা বাংলায় আছে খুব। অনেকেই আছে দেখবেন লেখার কথা, তারপরও লিখতেছে না, বা পারতেছে না। আবার যার লেখা খারাপ সে দিব্যি লেইখা যাইতেছে। এই ‘অমিত সমস্যা’ একটা বড় সমস্যাই বলতে গেলে।

কেন লেখে না অমিত, এমন একটা প্রশ্ন মনে থাইকাই গেল শেষ পর্যন্ত। এর উত্তর আর অমিত দিবে না আমারে। কারণ সে মারা গেছে। প্রায় আমার বয়সী সে। এত জলদি চলে যাওয়াটা তো ঠিক হইল না। এমন চইলা যাওয়াটাও বোধগম্য হইছে কী কারুর, আমার মনে হয় না।

কারণ অমিত নিজেরে লুকাইত। নিজেরে গোপন করার এই স্বভাব যে কেন তারে দিলেন খোদায়।

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।