• প্রায় ৬৫টি দেশে এই দিবস পালন করা হয়
  • প্রথম পালিত হয় কানাডায়, ১৯৯২ সালে
  • জনপ্রিয় রীতি কাঁচি দিয়ে ক্রেডিট কার্ড কেটে ফেলা
কেনাকাটা না করার দিন

বাই নাথিং ডে হল কিছুই না কেনার দিন। কনজ্যুমারিজমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি পদক্ষেপ হিসেবে আমেরিকাসহ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬৫টি দেশে এই দিবস পালন করা হয়।

আমেরিকা, ব্রিটেন, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনে সাধারণত থ্যাংসগিভিং ডে’র পরের দিন অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ শুক্রবারে বাই নাথিং ডে পালন করা হয়। নভেম্বরের শেষ শুক্রবারটি আবার ব্ল্যাক ফ্রাইডে হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু অন্যান্য দেশগুলিতে এটি পালিত হয় তার পরের দিন, অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ শনিবারে।

পশ্চিমা দেশগুলিতে ওভার-কনজাম্পশন বা অতিরিক্ত খরচ করার প্রবণতা থেকে ক্রেতাদের সরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে কানাডিয়ান শিল্পী টেড ডেইভ ‘বাই নাথিং ডে’ চালু করেন। পরবর্তীতে কানাডা ভিত্তিক এডবাস্টার্স ম্যাগাজিন বাই নাথিং ডে-কে খুব অল্প দিনের মধ্যেই জনপ্রিয় করে তোলে। এডবাস্টার্স ম্যাগাজিন আরো অনেক জনপ্রিয় প্রথা বিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রচারণার জন্যে বিখ্যাত, যেমন ‘টিভি টার্ন অফ ডে’ এবং ‘অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ ইত্যাদি।

যেভাবে শুরু হয়েছিল

প্রথম বারের মত ‘বাই নাথিং ডে’ পালিত হয় কানাডায়, ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সাল থেকে ‘বাই নাথিং ডে’ উদযাপন করা হয় ব্ল্যাক ফ্রাইডে’র সাথে একই দিনে। ব্ল্যাক ফ্রাইডে হল আমেরিকার সবচেয়ে বড় কেনাকাটার দিন। এই একই দিনে বাই নাথিং ডে উদযাপন করার মাধ্যমে কনজ্যুমারিজম বিরোধীরা ক্রেতাদেরকে ক্রমশ ভোগবাদী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়া সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে চান।

ব্ল্যাক ফ্রাইডে হল আমেরিকার সবচেয়ে বড় কেনাকাটার দিন
কাঁচি দিয়ে ক্রেডিট কার্ড কেটে ফেলা

বিশ্বজুড়ে নানান ধরনে ও রীতিতে ‘বাই নাথিং ডে’ উদযাপন করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল ক্রেডিট কার্ড কেটে ফেলা। অংশগ্রহণকারীরা শপিং মল বা শপিং সেন্টারে কাঁচি আর একটি পোস্টার নিয়ে উপস্থিত হন। পোস্টারের বিষয়বস্তু হল সেইসব মানুষকে সাহায্য করা যারা পাহাড় সমান ঋণের বোঝা কিংবা ইন্টারেস্ট রেট এর থাবা থেকে মুক্তি চান। সোজা কথায় অংশগ্রহণকারীরা এইসব মানুষকে সাহয্য করেন কাঁচি দিয়ে তাদের ক্রেডিট কার্ড কেটে দিয়ে।

জম্বি ওয়াক ও হুইর্ল মার্ট

আরেকটি জনপ্রিয় রীতি হল ‘জম্বি ওয়াক’। উদযাপনকারীরা শপিং সেন্টারের ভিতরে ‘ওয়াকিং ডেড’ মুভির জম্বিদের মত চোখেমুখে শূন্যতা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। তাদেরকে এমন অদ্ভুত ভঙ্গি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা ‘বাই নাথিং ডে’র উদ্দেশ্য ও গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।

২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের রাস্তায় ব্ল্যাক ফ্রাইডের বিরোধিতায় জম্বি ওয়াক

জম্বি ওয়াকের মতই আরেকটি আজব রীতি হল ‘হুইর্ল মার্ট’। ‘বাই নাথিং ডে’ উদযাপনকারীরা মার্কেটের ভিতরে খালি ট্রলি নিয়ে ঘুরাঘুরি করেন কোনো কিছু না কিনেই। সাধারণত এতে অংশগ্রহণকারীরা লম্বা একটা সারিতে দলবদ্ধভাবে খালি ট্রলি নিয়ে মার্কেটের ভিতরে ঘুরতে থাকেন।

২০০৯ সালে ‘বাই নাথিং ডে’তে অংশগ্রহণকারীরা ব্যতিক্রমী একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এ দিন ২৪ ঘণ্টা ধরে কোনোকিছু না কেনার পাশাপাশি তারা বাসার লাইট, টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ইত্যাদি বন্ধ করে রেখেছিলেন। এমনকি অনেকে এদিন গাড়ি নিয়েও বের হন নি।

কনজ্যুমারিজমের বিপক্ষে সমাজতাত্ত্বিকদের অবস্থান

কনজ্যুমারিজম বিরোধিতার ইতিহাস বেশ পুরনো। বিশেষ করে উনিশ ও বিশ শতকের বামপন্থী সমাজতত্ত্বে কনজ্যুমারিজমের বিরোধিতার মূল খুঁজে পাওয়া যায়। এই ধারার সমাজতাত্ত্বিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন নরওয়েজিয়ান-আমেরিকান সমাজতাত্ত্বিক থরস্টেইন ভেবলেন। তার ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘এ থিওরি অব লিজার ক্লাস: অ্যান ইকনোমিক স্টাডি অব ইন্সটিটিউশনস’ বইয়ে তিনি দাবি করেন অবকাশ ও বিলাসিতা নিয়ে আধুনিক ধ্যান-ধারণা হল ‘সামন্ততান্ত্রিক অবশেষ’ বা ‘ফিউডাল হোল্ডওভারস’।

ব্ল্যাক ফ্রাইডে কবে থেকে চালু হল তা নিয়ে মতবিরোধ আছে। কারো কারো মতে এটি শুরু হয়েছিল ১৯৫১ সালে, ফিলাডেলফিয়ায়। তবে ব্ল্যাক ফ্রাইডে উন্মাদনার তুঙ্গে ওঠে ২০১১ সালে। সে বছর অনেক বড় বড় দোকান যেমন টার্গেট, কোল’স ও ম্যাসি’স মধ্যরাতের দিকেই ক্রেতাদের জন্যে প্রবেশদ্বার খুলে দেয়। সে বছর ক্রেতাদের এত বেশি ভিড় ছিল যে মধ্যরাতে দ্বার খুলে না দিলে সবার পক্ষে কেনাকাটা করা অসম্ভব হত।

বাই নাথিং ডে সম্পর্কে ভিন্ন অভিমত

বাই নাথিং ডে নিয়ে অনেক সমালোচনাও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন এটি একটি শূন্যগর্ভ কাজ। এদের মতে বাই নাথিং ডে একদিনের জন্যে কিছু সংখ্যক ক্রেতাকে কেনাকাটা থেকে দূরে রাখলেও আসলে এতে বাজারের ওপরে বড় মাপের কোনো প্রভাব পড়ে না। পণ্যের কেনাবেচা সম্পর্কে ক্রেতাদের মনোভাব পরিবর্তনেও বাই নাথিং ডে’র সাফল্য খুবই সীমিত।

আরো পড়ুন: মাইকেল পোলান এর ‘ইন ডিফেন্স অফ ফুড’ থেকে

আবার অনেকেই মনে করেন বাই নাথিং ডে উদযাপনে যারা অংশগ্রহণ করছেন তারাই আবার পরের দিন একই শপিং মলে শপিং করতে যাবেন। তাহলে আর একদিনের জন্যে কোনো কিছু না কিনে বসে থাকার মানেটা কী!

২৩ নভেম্বর, ২০১৮ সালের বাই নাথিং ডে
সমর্থকদের যুক্তি

তবে বাই নাথিং ডে’র সমর্থকদের যুক্তি হল, এটি উদযাপনের মাধ্যমে কিছুটা হলেও কনজ্যুমারিজমের লাগাম টেনে ধরা যায়। একদিনের জন্যে হলেও এটি বাজার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ক্রেতা সম্প্রদায়কে তাদের সত্যিকার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

এডবাস্টার্স এর মতে, এটি শুধুমাত্র একদিনের জন্যে অভ্যাস পরিবর্তন নয়, বরং এটি হল সারাজীবনের জন্যে সীমিত ক্রয় করার ও অপব্যয় হ্রাস করার প্রতিজ্ঞা।

অক্যুপাই এক্সমাস

২০১১ সালে এডবাস্টার্স দিবসটির নাম পরিবর্তন করে রাখে ‘অক্যুপাই এক্সমাস’ যা ‘অক্যুপাই মুভমেন্ট’ এর সাথে দিবসটির সামঞ্জস্যকে নির্দেশ করে। এটি ‘বাই নাথিং ক্রিসমাস’ হিসেবেও পরিচিত।

বাই নাথিং ডে ২০১৮
চলতি বছরের বাই নাথিং ডে পালিত হতে যাচ্ছে ২৩ নভেম্বর।

Facebook Comments
দীপ্র আসিফুল হাই

অনুবাদক ও ফিচার লেখক। পড়াশুনা. ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটি, সিলেট।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here