বায়ু দূষণ

তুলনামূলক অল্প শিক্ষিত পুরুষেরা এর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দূষিত বায়ুতে নিঃশ্বাস গ্রহণ যেমন আপনার আয়ু কমিয়ে দিতে পারে, তেমনি আপনার বুদ্ধিমত্তাও হ্রাস করে দিতে পারে। নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে বায়ু দূষণের ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ব্যাপক হারে হ্রাস পায়। এই বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পাওয়ার পরিমাণ পড়াশুনায় একবছর পিছিয়ে পরার সমতুল্য। গবেষণায় আরো দেখা গেছে পুরো বিশ্বের শহুরে জনগোষ্ঠীর শতকরা ৯০ ভাগই দূষিত বায়ুতে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

চায়নার গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন, ব্যাপক হারে বায়ু দূষণের ফলে ভাষা ও গণিত বিষয়ক পরীক্ষার ফলাফল বেশি খারাপ হয়। বয়সের সাথে সাথে এই ক্ষতিকর প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। তুলনামূলক অল্প শিক্ষিত পুরুষেরা এর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমেরিকার ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথ এর গবেষক দলের একজন শি চেন বলেন, “দূষিত বায়ুর কারণে প্রত্যেকেই পড়াশুনায় একবছর করে পিছিয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমরা জানি, বয়স্কদের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে যাদের বয়স ৬৪ এর উপরে এবং যাদের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের হার কম। আমরা যদি তাঁদের বুদ্ধিমত্তা হ্রাসের পরিমাণ হিসাব করি তাহলে সেটা শিক্ষা ক্ষেত্রে কয়েক বছর পিছিয়ে পড়ার সমানও হতে পারে।

বায়ু দূষণকে বলা হয় ‘অদৃশ্য ঘাতক’। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশান এর মতে, বায়ু দূষণের ফলে পুরো বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক সাত মিলিয়ন মানুষ অকালে মারা যায়। তবে আমাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার উপর এর প্রভাবের কথা এতদিন খুব অল্পই জানা গিয়েছিল।

সর্বশেষ গবেষণায় বিশেষজ্ঞরা চায়নার ২০,০০০ লোকের গাণিতিক ও ভাষাগত দক্ষতা যাচাই করেন। পরে তাঁরা এই পরীক্ষার ফলাফলকে তুলনা করেন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড ও সালফার ডাই অক্সাইডের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া দূষণের পরিমাণের সাথে। কার্বন মনোঅক্সাইডের ফলে সৃষ্ট দূষণকে এই গবেষণায় রাখা হয় নি।

বিজ্ঞানিরা আবিষ্কার করেন, মানুষ যত বেশি দূষিত বায়ু গ্রহণ করে তত বেশি তাঁদের বুদ্ধিমত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গাণিতিক দক্ষতার চাইতেও ভাষাগত দক্ষতা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নারীদের তুলনায় পুরুষেরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

বিজ্ঞানিরা জানান, নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কের মধ্যকার পার্থক্যের কারণে সম্ভবত এই তারতম্য হয়ে থাকে। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকেরই বয়স ছিল দশ। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরবর্তী কয়েক বছর তাঁদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করা হয়। তাঁদেরকে ২৪টি গাণিতিক প্রশ্ন ও ৩৪টি ভাষাগত প্রশ্ন দেয়া হয়। যেহেতু তাঁদের উপর কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য রাখা হচ্ছিল, তাই তাঁদের জিনগত পার্থক্য ও বয়সের কারণে বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পাওয়ার মত বিষয়গুলো সম্পর্কে বিজ্ঞানিরা সতর্ক ছিলেন।    

বায়ু দূষণের ফলে বুদ্ধিমত্তার উপর স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী উভয় ধরনের প্রভাবই পড়তে পারে। ড. শি চেন এর মতে, পরিক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের উপর স্বল্পমেয়াদী প্রভাবের ফলাফলও ব্যাপক হতে পারে। বয়স্ক এবং অল্প শিক্ষিত পুরুষেরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার একটা কারণ হতে পারে এরা সাধারণত খোলা জায়গায় কাজ করে। ফলে বেশি করে দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে আসে।

গবেষণায় আরো দেখা যায়, বায়ু দূষণের ফলে বিভিন্ন ডিজেনারেটিভ রোগ ও ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিশক্তিজনিত রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স্ক লোকেরা যে দূষণের ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন এই ব্যাপারটি উদ্বেগজনক। কারণ জীবনের শেষ দিকে এসে অনেকেরই গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

গবেষণাটি দূষণ ও পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু এখনো এর কারণ ও প্রভাব খুঁজে পায় নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দূষণ সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে। পূর্বের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে উচ্চ হারে বায়ু দূষণের সাথে মানুষের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, নিউরোইনফ্লেমেশন ও নিউরোডিজেনারেশন এর সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয় ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স এর জার্নালে।