page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

বিমানভ্রমণে বিরক্তিকর জেট ল্যাগ ঠেকাতে বাজারে আসছে নতুন গেজেট!

দীর্ঘ উড়োজাহাজ ভ্রমণের ফলে সৃষ্ট জেট ল্যাগ থামানোর একটি উপায় বের করেছেন বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের একদল গবেষক বলেছেন ভ্রমণকারীদেরকে ঘুমানোর সময় অল্প ক্ষণের জন্য ফ্লাশিং লাইট বা তীব্র আলোকের আওতায় রাখলে আর জেট ল্যাগ হবে না।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন জেমি জেইটজার। তিনি বলেছেন, এখনকার দিনে পরিবর্তিত সময়ের সাথে অ্যাডজাস্ট হওয়ার জন্য যে সকল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, সেগুলির চেয়ে এই নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে আরো দ্রুত অ্যাডজাস্ট হওয়া যাবে।

 

টাইম জোন ক্রস করা

jetl3

কোনো ভ্রমণকারী যদি তিন বা তার চেয়ে বেশি টাইম জোন পার হয় তাহলে সাধারণত জেট ল্যাগ ঘটে।

কোনো ভ্রমণকারী যদি তিন বা তার চেয়ে বেশি টাইম জোন পার হয় তাহলে সাধারণত জেট ল্যাগ ঘটে। আরো বেশি টাইম জোন ক্রস করলে জেট ল্যাগের অবস্থা আরো খারাপ হয়। জেট ল্যাগের কারণে পশ্চিম দিক অভিমুখে ভ্রমণকারীদের চেয়ে পুব দিক অভিমুখে ভ্রমণকারীদের সমস্যা বেশি হয়।

মানুষের শরীর সাধারণত একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নের সাথে অভ্যস্ত হয়ে থাকে, তাই সে যখন নতুন কোনো জায়গায় ভ্রমণ করে যেখানে আলো অন্ধকারের শিডিউলের সাথে তার শরীর অভ্যস্ত নয় তখন জেট ল্যাগ ঘটে। জেট ল্যাগের ফলাফল হিসেবে লেথার্জি, অবসাদ, ঘুমে সমস্যা, হজমে সমস্যা ইত্যাদি হয়ে থাকে।

নতুন এই পদ্ধতি অনুসারে উজ্জ্বল আলোর সামনে কয়েক ঘণ্টা টানা বসে থাকতে হবে, এতে শরীর নতুন জায়গার টাইম জোনের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।

 

বায়োলজিক্যাল হ্যাকিং

এর আগে প্রফেসর জেইটজারের করা গবেষণায় বলা হয়েছিল লাইট থেরাপি রাতে ভালো কাজ করে কারণ, দিন এবং রাতের সাথে শরীরের যে বৃত্তাকার ছন্দ সেটা ঘুমের সাইকেল নিয়ন্ত্রণ করে, এই ঘুমের সাইকেল আলোর প্রতি এতই সেনসিটিভ যে এটি চোখ বন্ধ রাখলেও বন্ধ চোখের পাতা ভেদ করে ভিতরে চলে যায়।

 

jetl2

জেইটজার তার ল্যাবরেটরিতে ফ্লাশিং লাইট বসিয়েছেন।

এই পদ্ধতির মাধ্যমে শরীরের বায়োলজিক্যাল চক্রটিকে বোকা বানানো হয়। এই পদ্ধতিতে যা করা হয় তা হলো, অন্ধকার সময়ে ঘুমে থাকলেও আলো জ্বালিয়ে রেখে বায়োলজিক্যাল সাইকেলকে এর বিপরীত সাইকেলের সাথে অ্যাডজাস্ট করা হয়।

এখন গবেষকরা বলছেন রাতের বেলা দীর্ঘক্ষণ আলোর সামনে থাকার চেয়ে অল্প ক্ষণ থাকা বেশি কার্যকরী।

৩৯ জন ভলান্টিয়ার নিয়ে পরীক্ষাটি করা হয়েছে। তাদেরকে টানা এক ঘণ্টা আলোর সামনে রাখা হয়েছিল এবং ২.৫ সেকেন্ড থেকে ২৪০ সেকেন্ড রেন্জের মধ্যে দুই মিলি সেকেন্ড করে লাইট ফ্লাশ বা তীব্র আলোর আওতায় রাখা হয়েছে।

দেখা গেছে, ১০ সেকেন্ড ব্যবধানে লাইট ফ্লাশ দেওয়ার কারণে ঘুম দুই ঘণ্টা পিছিয়ে যায়, আর টানা ৩৬ মিনিট আলোর আওতায় থাকলে এই একই ফলাফল পাওয়া যায়।

এই গবেষণায় যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, গান্জফেল্ড ডোমের মধ্যে একটি জেনন বাল্ব দিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের সামনে আলোর ফ্লাশ দেওয়া হয়। জেইটজার বলেন, এই ডোমটি একটি পিং পং বলের মত, যেটির মধ্যে আপনি আপনার মাথা ঢোকাবেন। এই পিং পং বলের মধ্যে মাথা ঢোকানোর পরে আপনি যেখানেই তাকাবেন সেখানেই আলোর তীব্রতা সমান থাকবে।

অংশগ্রহণকারীদের চোখ বন্ধ থাকলেও তাদের চোখের পাতা ভেদ করে আলো প্রবেশ করে এবং তাদের মস্তিষ্কের সাথে ইন্টার‍্যাকশন ঘটে। মস্তিষ্ক বা ব্রেইন এতে বিভ্রান্ত হয়, সে মনে করে এখনো দিন রয়ে গেছে।

আপনি যদি বিছানায় যাওয়ার পরেও আলোর ফ্লাশ তৈরি হয় তাহলে শরীর মনে করে দিন লম্বা হয়ে গেছে। ফ্লাশিং লাইটকে শরীর দিনের আলো মনে করে, ফলে শরীর ধরে নেয় দিনের দৈর্ঘ্য বেড়ে গেছে।

 

শিফট ওয়ার্কার্স

প্রফেসর জেইটজেট বলেছেন দুইটি কারণে হয়ত ফ্লাশিং লাইট ভালো কাজ করে। এক হলো, একটানা আলোর মধ্যে থাকলে রেটিনার কোষগুলি শরীরের বায়োলজিক্যাল সাইকেলে যে তথ্য সরবরাহ করে ফ্লাশিং লাইট একবার জ্বালালে তা অনেকক্ষণ ধরে না থাকলেও তথ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখে। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো, দুইবার লাইট ফ্লাশের মধ্যবর্তী সময় চোখের পিগমেন্ট অকার্যকর অবস্থা থেকে সক্রিয় অবস্থায় চলে যায় এবং তা চালু থাকে।

jetlag3গবেষকরা বলেছেন, দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণকারীদেরকে সাহায্য করার পাশাপাশি যারা রাতের বেলা কাজ করে তাদেরকেও সাহায্য করবে এই পদ্ধতি, যদি তারা ছুটির দিনগুলিতে দিনের বেলাটুকু উপভোগ করতে চায়, এই পদ্ধতি তাদের সাহায্য করবে।

জেট ল্যাগ থামানোর জন্য এখন সাধারণত উপদেশ দেওয়া হয়ে থাকে, ভ্রমণের কয়েক দিন আগে থেকে আপনার ঘুমের রুটিন পরিবর্তন করুন, ভ্রমণের আগে যথেষ্ট পরিমাণে ঘুমান।

নতুন জায়গায় গেলে খাওয়া এবং ঘুমের ব্যাপারে সেই জায়গার রুটিন অনুসরণ করুন, আপনি যে জায়গা থেকে এসেছেন সে জায়গার রুটিন নয়।

নতুন টাইম জোনে গেলে সেখানে ঘুমানোর সঠিক সময় না আসা পর্যন্ত জেগে থাকুন, তন্দ্রা বা খণ্ডকালীন ঘুমানোর অভ্যাস পরিহার করুন।

আপনার শরীরকে নতুন জায়গার আলো-অন্ধকারের প্রাকৃতিক রুটিনের সাথে অভ্যস্ত করার জন্য দিনের আলোতে বাইরে সময় কাটান।

 

প্রযুক্তিগতভাবে এর প্রয়োগ

একটি পিং পং বলের মত যন্ত্রের মধ্যে মাথা ঢোকানো কোনো প্রযুক্তিগত সমাধান না, তাই জেইটজারের কিছু ছাত্ররা এই লাইট থেরাপি ভোক্তাদের জন্য বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে।

jetl4

লুমোস টেক নামের একটি কোম্পানি চোখের একটি মাস্ক তৈরি করেছে।

jetl10

লুমোস টেক নামের একটি কোম্পানি চোখের জন্যে ‘স্মার্ট স্লিপ মাস্ক’ তৈরি করেছে। এটি চোখে পরলে এটি ভিতর থেকে ফ্লাশিং লাইট তৈরি করতে পারবে। এই মাস্কটি নিয়ন্ত্রিত হবে স্মার্টফোনের একট অ্যাপে প্রবেশ করানো তথ্যের মাধ্যমে।

এই অ্যাপে লিঙ্গ, বয়স, ঘুমানোর সময়, আপনি রাতে জাগেন কিনা বা ভোরে ওঠেন কিনা ইত্যাদি তথ্য প্রবেশ করানো যাবে। এই অ্যাপটি মাস্কের এলইডি লাইটকে বলবে কখন লাইট ফ্লাশিং দিতে হবে।

এই মাস্কের চূড়ান্ত দাম এখনো নির্ধারণ হয় নি, তবে কোম্পানিটি প্রতিটির জন্য ১৭৫ ডলারের বিনিময়ে অগ্রিম অর্ডার নেওয়া শুরু করেছে।

 

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক