বিল গেটসের ৭ ভবিষ্যদ্বাণী…

বিল গেটসের শরীর হয়তো বর্তমানে থাকে, কিন্তু তার মস্তিষ্ক সবসময়ই বাস করে ভবিষ্যতে। জনকল্যাণে নিয়োজিত এই বিলিয়নিয়ার তার ক্যারিয়ারজুড়ে কম্পিউটার, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে বেশ কয়েকবার সফল ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়া ও স্মার্টফোন সম্পর্কে তিনি অনেক আগেই আমাদের ধারণা দিয়ে রেখেছিলেন, যা পরবর্তীতে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এই ৭টি ব্যাপারেও তার অনুমান সত্য হবার সম্ভাবনা প্রচুর।
ভবিষ্যৎ পৃথিবী নিয়ে গেটসের ভাবনা এরকম—

১.

বায়ো-টেরোরিজম এক বছরের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন কোটি প্রাণ কেড়ে নিতে পারে
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মানির এক কনফারেন্সে বিল বলেন, জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলির মাঝে একটি হলো বায়ো-টেরোরিজম। বায়ো-টেরোরিস্টরা এক ধরনের বায়ুবাহিত প্যাথোজেন প্রকৃতিতে ছেড়ে দিতে পারে। সিন্থেটিক জাতীয় গুটিবসন্ত কিংবা কোনো সুপার-ফ্লু হতে পারে এই রোগ। যা কিনা সাধারণ রোগবালাইয়ের চাইতে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর।

গেটসের বক্তব্য: “রোগবিজ্ঞানীদের মতে, আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে বিশ্বে এরকম মহামারী দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক।” যদি সন্ত্রাসীরা সঠিক প্যাথোজেনটা বেছে নেয়, তাহলে এক বছরে তা প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে।
এই কারণে বিল গেটস তার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নানা রোগের প্রতিষেধককে বিশ্বব্যাপী সহজলভ্য করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।

২.

খাবারের ক্ষেত্রে আফ্রিকা একসময় স্বনির্ভর হয়ে উঠবে
২০১৫ সালে বিল গেটস বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষিখাতে আফ্রিকার উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৫০% বৃদ্ধি পাবে। ফলে এই পুরো মহাদেশ খাদ্যের দিক থেকে হয়ে উঠবে স্বনির্ভর।
বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৫০০০ কোটি ডলারের খাদ্য আমদানি করে—যদিও উপ-সাহারীয় আফ্রিকার অধিবাসীদের শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ কৃষিকাজের সাথে সরাসরি জড়িত।


এই ব্যাপারে গেটস লেখেন, “আগামী ১৫ বছরে কৃষিকাজে নতুন অনেক কিছু উদ্ভাবন হওয়ায় তারা এই প্রহসনমূলক অবস্থা থেকে বের হয়ে আসবে। ইতোমধ্যেই পৃথিবীতে এমন অনেক সার ও ফসল উদ্ভাবন করা হয়েছে যা আরো বেশি উৎপাদনক্ষম, পুষ্টিকর এবং উচ্চ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। এই প্রযুক্তিগুলির সহায়তায় কৃষকরা তাদের ফসলের পরিমাণ দ্বিগুণ করে ফেলতে পারবে।”

৩.

মোবাইল ব্যাংকিং গরিব জনগণের জীবন পাল্টে দেবে
আফ্রিকান যেসব দেশ অর্থসংকটে ভুগছে—বেশিরভাগ সময়ই সেখানকার লোকজন স্বাস্থ্য, খাদ্য, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসা ক্ষেত্রে উপযুক্ত উপায়ে ব্যয় করার সুযোগ পায় না।

ব্যাংকিং অবকাঠামো তেমন উন্নত নয় বলেই এমনটা হয়ে থাকে বলে মন্তব্য করেন গেটস। ‘এম-পিইএসএ’ এর মতো ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস কেনিয়া ও উগান্ডাতে ডিজিটাল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যবস্থা করছে।

যাদের আগে ব্যাংক একাউন্টের সুবিধা ছিল না তারা এখন এই ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবহার করতে পারছে সহজেই।

“২০৩০ সালের মধ্যে আরো ২০০ কোটি মানুষ তাদের ফোন ব্যবহার করে টাকা জমা করে রাখতে পারবে। ততদিনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কর্মকর্তারা তাদের গ্রাহকদেরকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকের সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া শুরু করবে। সেভিংস একাউন্ট থেকে শুরু করে ক্রেডিট, ইন্স্যুরেন্স—সবই থাকবে এতে।”

৪.

২০৩৫ সালের ভেতর দরিদ্র দেশ বলে কিছু থাকবে না
২০১৪ সালে তার বার্ষিক পত্রে গেটস পূর্বাভাস দেন যে, বিদেশি সাহায্যের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় কোনো দরিদ্র রাষ্ট্রেরই অস্তিত্ব থাকবে না। তার ফাউন্ডেশন পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক সাহায্যের বাজেট নিয়ে দুঃশ্চিন্তা প্রকাশ করলেও হিসাব অনুযায়ী গেটসের এই ভবিষ্যদ্বাণী এখনো সত্য হতে পারে বলে তারা আশাবাদী।

তার সেই পত্রে গেটস বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী দারিদ্র্য চিহ্নিত করেছেন; যা কিনা বিশ্বের ৩৫ টি দেশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ (যাদের দৈনিক বাজেট মাত্র ১.৯০ মার্কিন ডলার)।

গেটসের ব্যাখ্যা ছিল এরকম—“প্রায় প্রতিটা দেশ নিম্ন-মধ্যম আয় কিংবা তার উপরে অবস্থান করবে। কারণ দরিদ্র দেশগুলি তাদের প্রতিবেশী দেশ থেকে শিক্ষা নেবে। প্রতিষেধক, উন্নতমানের বীজ ও ডিজিটাল বিপ্লবের মতো নতুন সব উদ্ভাবনের সাহায্য নিয়ে এগিয়ে যাবে তারা।”

৫.

২০৩০ সালের মধ্যে গোটা পৃথিবীকে চালিত করবে পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য শক্তি
বিল গেটস আশাবাদী যে—বায়ু, সৌর কিংবা অন্য কোনো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সংগৃহীত শক্তি দিয়েই আগামী দিনের পৃথিবীর অধিকাংশ চালিত হবে।

২০১৬ সালের বার্ষিকপত্রে তিনি লেখেন, “আমাদের এই চ্যালেঞ্জটা অনেক বড়। এর ব্যাপকতা হয়ত অনেকেই কল্পনা করতে পারছেন না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, এই সুযোগটাও ঠিক ততটুকুই বড়।” অনেক দরিদ্র দেশ ভ্রমণে গিয়ে বিল দেখেছেন, সেখানে পানির ব্যবস্থা বা বিদ্যুৎ কিছুই নাই। তার মানে রাতের বেলা তারা অন্ধকার বাড়িতে থাকে; দরকারি কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অথবা মেডিকেল সেন্টারও চালু রাখতে পারে না।

বিল লিখেছিলেন, “আমরা যদি কম মূল্যে কোনো পরিবেশবান্ধব শক্তির সন্ধান পাই, তাতে ক্লাইমেট চেঞ্জ বন্ধ হওয়া ছাড়াও অনেক উপকার হবে। লাখ লাখ গরিব পরিবারের জীবন পাল্টে যাবে পুরোপুরি।”

৬.

স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবস্থা বা অটোমেশনের ফলে বহু চাকরির সু্যোগ কমে যাবে
আগামী বিশ বছরে কলকারখানা ও গুদামঘরগুলিতে মানুষের অনেক কর্মসূচি অটোমেটেড রোবটদের দখলে চলে যাবে। অন্তত হাজার হাজার কায়িক শ্রমের সুযোগ শেষ হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সংখ্যা কয়েক লাখও হতে পারে—নির্ভর করছে কোন ইন্ডাস্ট্রি অটোমেশনে প্রাধান্য দিচ্ছে আর কোনগুলি দিচ্ছে না তার ওপর।


“নির্দিষ্ট কিছু পদ খুব তাড়াতাড়িই রোবটদের কাছে চলে যাবে। এই সীমা অতিক্রম করতে একদমই সময় লাগবে না”, এক সাক্ষাৎকারে বলেন বিল গেটস।

এই রোবটগুলির উপর কর আরোপ করে আয়করের প্রক্রিয়া চালু রাখা হবে বলে আশা রাখেন তিনি।

৭.

২০৩০ সালের ভেতর পুরো পৃথিবী থেকে পোলিও নির্মূল করা যাবে
২০১৬ সালের হিসাব থেকে জানা যায়, সারা বিশ্বে পোলিও রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭। এই সংখ্যা ১৯৮০ দশকের শেষদিকে ছিল প্রায় ৪০০। সব মিলিয়ে এখনো পৃথিবীতে এর পরিমাণ কয়েকশো’র চাইতে বেশি হবে না। বিল গেটস মনে করেন, গুটিবসন্তের পর দ্বিতীয় রোগ হিসাবে পোলিও সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদ করা সম্ভব হবে।

২০১৫ সালের বার্ষিকপত্রে বিল বলেন, “বিশ্ব পোলিও কমিউনিটি তাদের বিস্তারিত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলছে যাতে আগামী ছয় বছরে আমরা পোলিও উচ্ছেদের কাজ পুরোপুরি শেষ করে ফেলতে পারি।” এই উদ্যোগের ফলে সাধারণ প্রতিষেধকের ক্ষেত্রেও গণসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন তিনি।

“যে রোগ একসময় প্রতি বছর প্রায় চার লাখ শিশুকে কাবু করে ফেলত—সেই রোগ নির্মূলীকরণ আমাদের চিকিৎসাবিদ্যার ধারাকে নিয়ে যাবে আরো বহুদূর।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here