page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

বিষণ্নতার কিছু নিরীহ অন্য রকম কারণ!

বিষণ্নতার যে সব সাধারণ কারণগুলি আমরা জানি সেগুলি হলো মানসিক আঘাত, শোক, আর্থিক সমস্যা, বেকারত্ব ইত্যাদি। এসব ছাড়াও আপনি একদমই অজানা কারণে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন। বিষণ্নতার জন্য সে সব কারণ সরাসরি দায়ী নাও হতে পারে। এরকম কিছু আপাত নিরীহ কারণ থেকে ১২টি নিচে থাকছে।

 

১. উষ্ণতা

শীতপ্রধান দেশে প্রচণ্ড শীতের কারণে লোকজন প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় পড়ে। শীতের শেষে গরমের সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে অনেকেই বিষণ্নতার শিকার হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শীতে মানুষ কম পরিশ্রম করে ফলে শরীর ও মন হঠাৎ গরম আবহাওয়ার সাথে মিশ খেতে পারে না–যা একসময় বিষণ্নতায় রূপ নেয়।

২. ধূমপান

ধূমপানের সাথে বিষণ্নতার সম্পর্ক গভীর। যদিও ধূমপান বিষণ্নতার কারণ না ফলাফল এ নিয়ে তর্ক রয়েছে। তবে বিষণ্ন লোকেরা সাধারণত ধূমপায়ী হয়ে থাকে। সিগারেটের নিকোটিন মানুষের মস্তিষ্কে উদ্দীপনা তৈরি করে, যা অনেক ক্ষেত্রে মানসিক অবসাদ দূর করে। তাই ধূমপান দিয়ে বিষণ্নতা দূর করা নেশায় আসক্ত হওয়ার মত, এর থেকে দূরে থাকাই ভালো।

৩. থাইরয়েডের সমস্যা

বিষণ্নতা হাইপোথাইরয়েডিজম-এর একটি লক্ষণ। হাইপোথাইরয়েডিজম হল থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরয়েড হরমোনের স্বাভাবিক উৎপাদন কমে যাওয়া। থাইরয়েড হরমোন আমাদের শরীরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে মস্তিষ্কের কাজ ঠিক রাখা। তাই ঠাণ্ডা, পরিশ্রম অথবা অন্য কোনো কারণে থাইরয়েড হরমোন কমে গেলে বিষণ্নতা ভর করতে পারে। এতে ভয় পাবার কিছু নেই, ওষুধে হাইপোথাইরয়েডিজম ভালো হয়।

৪. ঘুমের স্বল্পতা

ঘুম কম হলে মেজাজ খিটখিটে হয়। শুধু তাই না, কম ঘুম মানুষকে বিষণ্ন করে। ২০০৭ সালের গবেষণায় দেখা গেছে সুস্থ-স্বাভাবিক হয়েও যারা পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারে না, তারা বিষণ্ন ব্যাক্তির মতো আচরণ করে। গবেষক ম্যাথু অ্যাডলান্ড তার পাওয়ার অফ রেস্ট বইয়ে লিখেছেন, “আপনি যদি না ঘুমান এবং আপনার স্নায়ুগুলিকে সতেজ হবার সুযোগ না দেন, তবে আপনার মস্তিস্ক স্বাভাবিকভাবে কাজ করবে না এবং আপনি বিষণ্নতায় ভূগবেন।”
the-power-of-rest

৫. অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহার

অনেকক্ষণ ধরে ফেসবুক বা অন্য কোন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চ্যাট করলে আপনাকে বিষণ্নতা ভর করতে পারে। অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা বেশি দেখা যায়। ইন্টারনেটে আসক্ত ব্যক্তি বাস্তব জীবন থেকে অনেক দূরে সরে যায় এবং তারা জীবন সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা পায়, তাদের মন হয়ে ওঠে বিষণ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে এটা ‘ফেসবুক বিষণ্নতা’। ২০১০ সালে এক জরিপে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ৫১ বছর বয়সীর মধ্যে শতকরা ১.২ ভাগ মানুষ যারা ইন্টারনেটে অনেক বেশি সময় কাটায় তারা অতিমাত্রায় বিষণ্নতায় ভোগে। যদিও এই বিষয়ে সন্দেহ আছে যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বিষণ্নতায় ভোগে, নাকি বিষণ্ন ব্যক্তিরাই বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

৬. বিনোদনের প্রভাব

প্রিয় কোনো টিভি প্রোগ্রাম বা মুভি যখন শেষ হয়ে যায় তখন অনেকেই বিষণ্ন বোধ করে। ২০০৯ সালে অ্যাভাটার  ছবির অনেক ভক্ত বিষণ্নতার শিকার হয়েছিলেন, এমনকি অনেকে আত্মহত্যার কথাও চিন্তা করেছেন। কেননা ছবিটিতে একটি মিথ্যা জগৎ দেখানো হয়েছে। হ্যারি পটার সিরিজের শেষ ছবির বেলায়ও দর্শকের একই অনুভূতি হয়েছে। কেউ কেউ বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান সিনেমার মতো আশা করেন আর তা না হলে মানসিক ভাবে অবসাদগ্রস্থ হন।

৭. বাসস্থান

মানসিক অবস্থা অনেকটাই বাসস্থানের উপর নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের মানুষের চেয়ে শহরের মানুষ শতকরা ৩৯ ভাগ বেশি মানসিক চাপে থাকে। বিখ্যাত জার্নাল Nature, ২০১১ সালে প্রকাশ করে যে, শহুরে মানুষের অতিরিক্ত কাজের চাপ মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। আর অধিক মানসিক চাপ এক সময় মানসিক রোগের সূচনা ঘটায়। একটি দেশের আর্থিক অবস্থানের উপরেও সে দেশের মানুষের মানসিক অবস্থা নির্ভর করে। সাধারণত ধনী দেশের মানুষের চেয়ে গরিব দেশের মানুষ কম বিষণ্ন হয়, আবার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতর স্থানের মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

৮. পছন্দের জিনিস বাছাই

কোনো ব্যক্তিকে যখন অনেকগুলি জিনিসের মধ্যে একটা পছন্দ করতে দেয়া হয় তখন সে এক ধরনের মানসিক চাপে পড়ে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে যারা প্রথমেই পছন্দের একটা কিছু বেছে নেন, তাদের বেলায় এই সমস্যা হয় না। আর যারা সবচেয়ে ভালোটা বেছে নিতে দ্বিধায় পড়েন অথবা অন্য কাউকে অনুকরণ করতে চান তারা বিষণ্নতায় ভোগেন ।

৯. মাছ কম খাওয়া

মাছে ওমেগা-৩ নামে এক ধরনের তেল থাকে, যা বিষণ্নতা দূর করতে সাহায্য করে। ফিনল্যান্ডে এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মহিলারা মাছ কম খায়, তারা বেশি বিষণ্ন থাকে। তবে পুরুষদের বেলায় এমন কিছু পাওয়া যায় নি। মাছের তেল মস্তিষ্কে উদ্দীপনা তৈরি করে। দোকানে ক্যাপসুল আকারে যে মাছের তেল পাওয়া যায়, তাও বিষণ্নতা দূর করতে সক্ষম।

১০. ভাই-বোনের সাথে দূরত্ব

যে কারো সাথে সম্পর্কের দূরত্ব মানুষের মনকে বিষণ্ন করে দিতে পারে। তবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যারা ২০ বছরের আগেই নিজেদের ভাইবোনের থেকে দূরে সরে যায়, তারা সাধারণত বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়। তবে বিষণ্নতার সাথে সহোদরের কী সম্পর্ক, সেটা এখনও পরিষ্কার না। এটা হতে পারে যে ছোটবেলাতেই মানুষ ভাইবোনের সাথে সামাজিকতার শিক্ষা পায়। আবার সারাক্ষণ ঝগড়া-কোলাহলের মধ্যে থাকলে ৫০ বছর বয়সের আগেই কেউ বিষণ্নতার শিকার হতে পারে।

১১. জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি

অন্য যে কোনো ওষুধের মতই জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি গ্রহণের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়িতে যে হরমোন আছে তার কারণে মহিলাদের মধ্যে বিষণ্নতা লক্ষ করা যায়। কোনো কোনো গাইনিকোলোজিস্টের মতে, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি গ্রহণে সব মহিলার বিষণ্নতা ভর করে না, তবে যারা এটা গ্রহণ করে তাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা যায়।

১২. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

অনেক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে বিষণ্নতা। যেমন, ব্রনের চিকিৎসায় Accutane নামের একটি ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তবে বিষণ্নতা বা আত্মহত্যার প্রবণতা কিছু মানুষের মধ্যে আগে থেকেই থাকে, ওষুধ গ্রহণের ফলে তা প্রকাশ পায়। দুঃশ্চিন্তা কমানোর বা ঘুমের ওষুধ, প্রেসারের ওষুধ, কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ বিষণ্ন হওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। তাই ওষুধ খাওয়ার আগে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পড়ে দেখুন এবং কোনো ধরনের সমস্যা হলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

 

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক