page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

বিড়ালেরা কেন বাকসো ভালোবাসে

মন খারাপ হইলে অথবা মন ভালো হইলেও আমি বিড়ালের ছবি দেখি, ভিডিও দেখি। সুযোগ থাকলে আসল বিড়াল দেখি। আর যখন কিছুই দেখা যায় না, তখন নিজে নিজেই মিঁউ মিঁউ করি। ইউটিউবে কয়েক লাখ ভিডিও আছে বিড়ালের। তারমানে দুনিয়ায় আমি একলাই বিড়ালপ্রেমিক না!

প্রায়ই দেখা যায় বিড়ালেরা বাক্সে ঢুকতেছে বা বাক্সের থেকে বাইর হইতেছে। নিউজিল্যন্ডে যখন ছিলাম। আমার একটা বিড়াল ছিল। সেও চান্স পাইলেই দুনিয়ার সবচেয়ে পিচ্চি পিচ্চি বাক্সের মধ্যে চাইপা চুইপা ঢুকে যাইতে চাইতো। ওর কারণে, জুতার বাক্স, ড্রয়ার, নুডলস এর বাক্স কিছুই সেইফ ছিলো না।

luna rushdi logo

একবার তো রান্নাঘরের আলমারির মধ্যে সারাদিন বইসা ছিলো, আমি আর বিড়াল খুঁইজা পাই না। পরে হলুদ বাইর করতে গিয়া দেখি বিড়াল বাইর হইছে। সুকুমার রায় কইছিলেন রুমালের কথা, আমি তো দেখি বরবটি থিকা নিয়া বাঁধাকপি পর্যন্ত সবারই বিড়াল হওয়ার পোটেনশিয়াল আছে (পোটেনশিয়ালে যদিও একটা শিয়াল ঢুইকা আছে।)

box cat 7সেইদিন অনলাইনে পড়লাম বিড়ালদের বাক্সপ্রেমের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা নাকি চলতেছে। বাহ! তাইলে তো ইন্টারনেটে বিড়াল খোঁজাটা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে লাগানো গেছে।

ইউট্র্যাক্টট ইউনিভার্সিটির ভেটেরিনারি বৈজ্ঞানিকরা কয়েকদিন আগে অ্যাপ্লাইড অ্যানিমাল বিহেভিয়র সায়েন্স জার্নালে একটা আর্টিকেল ছাপাইছেন। লেখার নাম ছিলো ‘লুকানোর জন্য একটা বাক্সের ব্যবস্থা থাকলে কি শেল্টারে আশ্রিত বিড়ালদের মানসিক চাপ কমবে?’

ক্লোডিয়া ভিনকে নামের একজন বৈজ্ঞানিক আর তার টিম একটা পরীক্ষা করছেন বিড়ালদের উপরে। একটা শেল্টারে নতুন আসা বিড়ালগুলারে দুইদলে ভাগ করা হইছিল। এক দল বিড়ালরে বাক্স দেয়া হইছে খেলার জন্য, আরেক দলরে দেয়া হয় নাই। তারপরে দুই সপ্তাহ তাদের আচার আচরণের উপর নজর রাখা হইছে কেসকার অ্যান্ড টার্নার ক্যাট স্ট্রেস স্কোরস বা সংক্ষেপে সি.এস.এস নামে একটা পরীক্ষার মাধ্যমে (হ্যাঁ এই নামের জিনিসও নাকি আছে দুনিয়ায়!)। এই পরীক্ষার পরে গবেষকেরা জানাইছেন যে লুকানোর বা খেলার জন্য একটা বাক্স থাকলে শেল্টারে আশ্রিত বিড়ালদের মানসিক চাপ কমে, অন্তত অল্প সময়ের জন্য।

box cat 3বিড়াল নিয়া কাজ কারবার আমারে তো বিনা পয়সায় করাইলেও করবো। তবে এতে বিড়ালদের আসলেই উপকার হইতেছে মনে হয়। অন্তত নতুন কোন জায়গায় তাদেরকে নিয়া যাওয়া হইলে চরম মানসিক চাপে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। আমার মনে আছে আমার বিড়াল নিয়া বাড়ি বদলাইছিলাম একবার। তো প্রথম দিন নতুন বাড়িতে যাইতে যাইতে সন্ধ্যা হয়ে গেছিল। তার মধ্যে ইলেকট্রিসিটিওয়ালারা ভাবছিলো পরের দিন কানেকশন দিতে হবে। তাই বাসাভর্তি অন্ধকার। অবশ্য বিড়ালের তো অন্ধকারে কিছু যায় আসার কথা না। ওরা না অন্ধকারে ভালো দেখে? ছোটবেলায় বিড়াল সম্পর্কে এইগুলাই তো শিখছিলাম।

তবে ছোটবেলায় বিড়াল সম্পর্কে জানতাম তারা নাকি খুব দুধ খায় আর মাছের কাঁটা খায়। বাচ্চাদের বইয়ে সব বিড়ালের নাম থাকত মিনি আর তার সামনে একটা দুধের বাটি। পরে দেখছিলাম আমার বিড়াল কোনদিনই দুধ খায় না! পানির বদলে তারে দুধ খাইতে দিলে আমার দিকে বিরক্ত হইয়া তাকাইত! আমি মনে মনে তার হইয়া ডায়লগ বলতাম “এই ঘোলা পানি দেয়ার কারণ কী? আমি কি ঘোলা পানিতে মাছ ধরবো? মাছও তো নাই!” আর মাছের কাঁটা দিলে সে ফর শিওর আমারে কামড়াইতে আসতো।

তো যাই হোক, বলতেছিলাম নতুন বাসায় গিয়া বিড়াল খুব স্ট্রেসড হইছিলো। সে কিছুতেই আমার কাছছাড়া হইতেছিলো না এবং যে কোন কোনায় ঘাপটি দিয়ে থাকতে চাইতেছিলো। সবসময় তার কান ছিলো অ্যান্টেনার মতন খাড়া। বিপদের ভয়ে সজারুর মতন দেখতে হইছিল। সে ছিলো একলা এবং মহা আহ্লাদী বিড়াল তারপরেও তার এই দশা। শেলটারে যে বিড়ালদেরকে নেয়া হয়, তাদের তো ঘরবাড়ি বাপ মা নাই। আর বিড়ালরা অন্য এত রকম বিড়ালের মধ্যে থাকতে পছন্দ করে না। তাদের মানসিক চাপ তো আরো ব্যপক হওয়ার কথা। আর্টিকেলে পড়লাম গবেষকেরা নাকি বলছেন যে তারা এতই স্ট্রেসড থাকে যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় আর অনেক রকম সংক্রামক রোগ হইতে শুরু করে তাদের।

ড. ক্লোডিয়ার পরীক্ষায় দেখা গেছে তিনদিনের মধ্যেই বাক্সওয়ালা বিড়ালদের সি.এস.এস অনেক কম আর তাদের মধ্যে অস্থিরতায় কমে গেছিলো। কিছু কিছু বিড়াল অবশ্য বাক্স ছাড়াও ঠিক ছিলো (আমার মতন বলো বীর টাইপের বিড়াল যেগুলা)। তবে অন্যদের মানসিক চাপ বাক্স-ওয়ালা বিড়ালদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। অবশ্য সময়ের সাথে সাথে সবকিছুই স্বাভাবিক হইছে। ১৪ দিনের দিন বাক্সে আর না-বাক্সে কোন পার্থক্য বুঝতে পারা যায় নাই মানসিক অবস্থার দিক থেকে।

box cat 6পরীক্ষাটা করা হইছে মাত্র ১৯টা বিড়াল নিয়ে। তারপরেও গবেষকরা বলছেন “দেখা যাচ্ছে এই বাক্সগুলো কোন নতুন শেলটারে পৌঁছানো বিড়ালদের জীবন অন্তত প্রথম সপ্তাহের জন্য সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করে।” উনারা পরে আরো লম্বা সময় নিয়ে এবং আরো বেশি সংখ্যক বিড়াল নিয়ে এই পরীক্ষা চালাইতে চান। তখন একবাড়িতে অনেকগুলা বিড়াল রাখা হইলে সেইরকম স্যাম্পলও থাকবে।

অবশ্য বিড়ালদের বাক্সপ্রীতির রহস্য জানতে হইলে আরো কঠিন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দরকার। এই নিয়েও কিছু থিওরি আছে অবশ্য। যেমন গরম জায়গা বিড়ালদের পছন্দ। এমনিতে তারা নিজের মতন থাকতে পছন্দ করে। বাক্স থাকলে নিজের বাক্সে ঢুইকা বইসা থাকা যায়, হুদাই সামাজিক হইতে হয় না। (আমি যেমন আমার ঘর থিকা বাইর হইতে চাই না, বিশেষ করে মেহমান আসলে, আর তারা যদি কাজের দিনে আসে, আবার না বইলাই হাজির হয় এবং তাদেরকে চা দেয়া লাগে যদি!)

এই গবেষণায় অবশ্য বিড়ালদের সাথে সাথে কিছু কিছু চ্যারিটিওয়ালাদেরও উপকার হইছে। উনারা বিড়ালদের জন্য ক্যাসল কিনতে হবে বইলা টাকা তুলতে শুরু করছেন এখন। তো এই হইলো অবস্থা আর কি। দেখা যাইতেছে আমারও বিড়ালের ছবি দেখা খুব বৈজ্ঞানিক কাজ। আসেন মনের সুখে আরো কিছু ছবি দেখি!

box cat 8

 

box cat 5

box cat 2

box cat 13

box cat 10

box cat 9

About Author

লুনা রুশদী
লুনা রুশদী

জন্ম ২৪ অক্টোবর, ১৯৭৫, করোটিয়া। শৈশব কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার্সে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে লেখাপড়া নবম শ্রেণী পর্যন্ত, তারপর ১৯৮৯ থেকে সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে লা-ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, পরবর্তীতে বৃত্তি নিয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং এ স্নাতোকত্তর লেখাপড়া সিডনির ইউ.টি.এস বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে চাকরি নিয়ে দশ বছর নিউজিল্যান্ড থাকার পর বর্তমানে মেলবোর্ন প্রবাসী। মেলবোর্নে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লেখার মাধ্যমে লেখালেখির শুরু - প্রথম বাংলাদেশি পত্রিকা ‘অঙ্কুর’ সম্পাদনা ছাত্রজীবনে। বাংলায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৯৪ সালে। এরপর বিভিন্ন বাংলাদেশি ও ভারতীয় পত্রিকায় লেখালেখি। প্রথম প্রকাশিত ইংরেজি গল্প নিউজিল্যান্ডের ‘লিসেনার’ পত্রিকায় ২০১১ সালে। প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ অরুন্ধতি রায় এর ‘দ্যা ব্রোকেন রিপাব্‌লিক’ (২০১২), উপন্যাস ‘আনবাড়ি’ (২০১৩) প্রকাশক শুদ্ধস্বর।