সমসাময়িক অন্যান্য মানুষদের চেয়ে তার অর্জন এত বেশি কীভাবে হলো? এই প্রশ্নের উত্তর তার দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে।

বেনজামিন ফ্র্যাংকলিন আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতাদের একজন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবেই তাকে সবচেয়ে বেশি মনে রাখা হয়। তবে এর বাইরেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সফল একজন মানুষ ছিলেন। তার জীবনের অনেক অর্জন মানুষ আজ আর মনে রাখেনি।

ফ্র্যাংকলিন তার ৮৪ বছরের জীবনে অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ করে গেছেন। পদার্থবিজ্ঞান আর জনমিতির উপর তার উল্লেখযোগ্য অনেক গবেষণা আছে। তিনি লাইটনিং রড কিংবা বিদ্যুৎ পরিবাহী বাজকাঠি আবিষ্কার করেন। সেই সময়কার অনেক জনপ্রিয় বইয়ের লেখক ছিলেন ফ্র্যাংকলিন। এছাড়াও তিনি সঙ্গীত রচনা করার সাথে সাথে গিটার, বীণা কিংবা ভায়োলিন বাজানোতে দক্ষ ছিলেন। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সহ অনেক নাগরিক সংস্থাও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। তার জীবনের উল্লেখযোগ্য আরো অনেক গৌণ অর্জনও আছে।

সবার মতো তার দিনেও ২৪ ঘণ্টা সময়ই ছিলো। তাহলে সমসাময়িক অন্যান্য মানুষদের চেয়ে তার অর্জন এত বেশি কীভাবে হলো? এই প্রশ্নের উত্তর তার দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে।

ফ্র্যাংকলিন তার রুটিন তৈরি করার আগে নিজের জীবন পরিচালনা করার জন্য কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলেন। দৈনন্দিন কাজকর্মে শৃঙ্খলা আনার জন্য মোট ১৩টি আদর্শের একটা লিস্ট তিনি তৈরি করেছিলেন।
সেই ১৩টি আদর্শ হলো:

১. মিতাচার: বেশি বেশি পানাহার বাদ দেয়া উচিৎ। এতে করে দেহে অলসতা আসে।

২. স্বল্পভাষিতা: নিজের বা অন্যের উপকারে আসবে না, এমন কথাবার্তা বলা উচিৎ না। তুচ্ছ কথা বলে সময় নষ্ট করাও অনুচিত।

৩. শৃঙ্খলা: আপনার সব জিনিসের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করুন। একইভাবে আপনার সব ধরনের কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে রাখুন।

৪. সঙ্কল্প: দায়িত্ব অনুযায়ী আপনার সঙ্কল্প ঠিক করুন। তাতে করে ব্যর্থতার ভয় ছাড়াই আপনি উদ্দেশ্য অনুযায়ী কাজ করে যেতে পারবেন।

৫. মিতব্যয়: নিজের বা অন্য কারো উপকারে আসে না, এমন খরচ বাদ দিন। অপব্যয় করবেন না।

৬. পরিশ্রম: সময় নষ্ট করবেন না। ফলদায়ক কোনো কাজে সবসময় ব্যস্ত থাকুন। অদরকারী সবরকম কাজকর্ম পরিহার করুন।

৭. আন্তরিকতা: কারো সাথে প্রতারণা করবেন না। বিশুদ্ধ মনে ন্যায্যভাবে চিন্তা করুন। কথা বলার সময় মেপে কথা বলুন।

৮. ন্যায়পরায়ণতা: কর্তব্যে অবহেলা করবেন না, ফাঁকি দিবেন না। অন্যায় কিছু করবেন না।

৯. মধ্যপন্থা অবলম্বন: চরমপন্থা পরিহার করুন। বেশি মাত্রায় প্রতিক্রিয়াশীল হবেন না।

১০. পরিচ্ছন্নতা: বাসস্থান, কাপড়চোপড় কিংবা দেহে অপরিচ্ছন্নতা রাখবেন না।

১১. সংযম: লাম্পট্য পরিহার করুন। প্রজনন কিংবা স্বাস্থ্যগত কারণ ছাড়া আপনার কামভাব নিয়ন্ত্রণে রাখুন। কারো সম্মানহানির ঘটনা দেখে চুপচাপ বসে থাকবেন না।

১২. স্থিরতা: ছোটখাটো বিষয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। সাধারণ আর প্রচলিত দুর্ঘটনার সময় শান্ত থাকুন।

১৩. নম্রতা: সক্রেটিস বা যিশুর মতো বিনয়ী হওয়ার ব্যাপারে বলতেন ফ্র্যাংকলিন।

প্রত্যেকটা আদর্শের গুরুত্ব অনুসারে ক্রমান্বয়ে এই তালিকা সাজিয়েছিলেন বেনজামিন ফ্র্যাংকলিন। একইসাথে সবগুলির ব্যাপারে খেয়াল রাখার বদলে তার নীতি ছিলো একটা একটা করে আগানো। একটা আদর্শ নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার পরই কেবল আরেকটার দিকে খেয়াল করতেন। সেজন্য নিজেকে সময় বেঁধে দিতেন তিনি।

একটা আদর্শের কতটুকু বাস্তবায়ন হলো, তার খেয়াল রাখতে তিনি সঙ্গে একটা ছোট্ট ডায়েরি রাখতেন। প্রত্যেকটা আদর্শের জন্য ডায়েরির একটা করে পৃষ্ঠা বরাদ্দ ছিল। দিনশেষে কোনো আদর্শের বিপরীত কোনো কাজ করলে সেই আদর্শের পৃষ্ঠায় একটা দাগ দিয়ে রাখতেন।

সপ্তাহের শেষে তিনি ভুলগুলি হিসাব করে দেখতেন। যেই আদর্শটা চর্চা করছেন, সেই পৃষ্ঠায় যদি কোনো দাগ না থাকতো, তাহলেই তিনি পরের আদর্শ বাস্তবায়ন করা শুরু করতেন।

নিজের জীবন চালানোর জন্য কিছু মানদণ্ড ঠিক করে নেয়ার ফলে ফ্র্যাংকলিনের দৈনন্দিন রুটিন মেনে চলা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। তাতে তার সবটুকু সময় আর শক্তি যথাযথ কাজেই ব্যয় হতো।

ফ্র্যাংকলিন একবার বলেছিলেন, “তুমি দেরি করতে পারো, কিন্তু সময় কখনো দেরি করবে না।” তার আত্মজীবনীতে কার্যক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তৈরি করা তার দৈনিক রুটিনের উল্লেখ ছিল।

সেখান থেকে নেয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি শিক্ষা:

#০১. সিম্পল থাকুন

ফ্র্যাংকলিনের রুটিনে সবার প্রথমেই যা চোখে পড়ে, তা হলো এর সরলতা বা সিম্পলিসিটি। তিনি প্রতিটা দিনের সময় ৬টা টাইম ব্লকে ভাগ করে নিতেন। যার একটা বরাদ্দ থাকতো ঘুমের জন্যে। তার রুটিনে অনেক রকম কাজের ভিড় থাকত না। অপরিহার্য আর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলিই তিনি নোট করে রাখতেন। খালিচোখে কার্যক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সিম্পল পরিকল্পনা গ্রহণ করার কোনো লাভ হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে না। তবে বাস্তবে এমন রুটিনই কাজ করার সময় সবচেয়ে ভালো ফল দেয়।

#০২. প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমান আর ঘুম থেকে উঠুন।

ফ্র্যাংকলিনের অন্যতম বিখ্যাত উক্তি ছিলো, “আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ মেইকস এ ম্যান হেলদি, ওয়েলদি অ্যান্ড ওয়াইজ।” তিনিও তার উক্তি অনুযায়ী জীবনযাপন করতেন। প্রতিদিন ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠতেন আর রাত ১০টায় ঘুমাতে যেতেন। এতে করে প্রতিরাতে তার সম্পূর্ণ ৭ ঘণ্টা ঘুম হতো।

আপনি কখন ঘুমাতে গেলেন আর কখন ঘুম থেকে উঠলেন, তা কোনোব্যাপার না। খেয়াল রাখার বিষয় হলো আপনার ঘুম পরিপূর্ণ হচ্ছে কিনা আর রুটিনের সাথে আপনার ঘুমের সমন্বয় হচ্ছে কিনা।

তবে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমালে আর ঘুম থেকে উঠলে আপনার অভ্যাস বদলাবে। ফলে ঘুমের সময় আপনার মস্তিষ্ক খুব দ্রুত আপনাকে ঘুমাতে সাহায্য করবে। আর আপনার ঘুমের গভীরতাও এতে বাড়বে।

#০৩. নিরবতায় কিছুক্ষণ সময় কাটান

ঘুম থেকে ওঠার কিছুক্ষণ পরেই ফ্র্যাংকলিন গোসল করতেন। আর তারপর ভালো আর মঙ্গলজনক চিন্তাভাবনায় কিছুক্ষণ সময় ব্যয় করতেন। অন্যকথায়, তিনি কিছুক্ষণ সময় ধ্যান বা মেডিটেশনে কাজে লাগাতেন। প্রতিদিন এভাবে কিছুক্ষণ সময় একা থাকার অভ্যাস ফ্র্যাংকলিনকে পরিষ্কারভাবে চিন্তাভাবনা করতে সাহায্য করেছিল।

#০৪. সারাদিনের উদ্দেশ্য আর পরিকল্পনা দিনের শুরুতেই ঠিক করে ফেলুন

কাজে বের হবার আগে প্রতিদিন সকালে ফ্র্যাংকলিন তার সারাদিনের উদ্দেশ্য ঠিক করে ফেলতেন। নিজেকে জিজ্ঞেস করে নিতেন, “আজ সারাদিনে কোন কোন ভালো কাজ আমি করবো?” এরপর তিনি তার আদর্শের তালিকা থেকে একটা আদর্শ নির্বাচন করতেন। আর সারাদিনের কাজকর্মের একটা পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলতেন।

দিনের শুরুতে সারাদিনের সব কাজকর্মের উদ্দেশ্য আর পরিকল্পনা ঠিক করে ফেললে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি মাথায় থাকে। ছোটখাটো কাজগুলি করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের ব্যাপারে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এতে কাজের প্রতি মনোযোগও ঠিক থাকে।

#০৫. নতুন কিছু শেখার জন্যে সময় বরাদ্দ রাখুন

ফ্র্যাংকলিনের দৈনিক রুটিনের কিছু সময় তার ব্যক্তিগত পড়াশোনার জন্য বরাদ্দ থাকত। তার এই ধরনের পড়াশোনার বিষয় পেশার সাথে সম্পর্কিত ছিল না। সাধারণত বই অথবা পত্রিকা পাঠ করে তিনি এই সময়টুকু ব্যয় করতেন। আপনি শেখার জন্য বরাদ্দ সময়টুকুতে নতুন কোনো ভাষা শিখতে পারেন। এছাড়া সঙ্গীত চর্চা করে অথবা আপনার শখের কাজগুলি করে সময় ব্যয় করতে পারেন।

#০৬. গুরুত্বপূর্ণ আর হালকা কাজের জন্য আলাদা আলাদা সময় নির্দিষ্ট করে রাখুন

রুটিন বানানোর সময় ফ্র্যাংকলিন তার দিনের মোট সময় ভাগ করে নিয়েছিলেন। এতে করে একটা কাজের সময় অন্য কাজগুলির অযাচিত চিন্তাভাবনা তার মাথায় আসত না।

কাজের সুবিধার জন্য তিনি পুরো দিন চার ঘণ্টা করে দুটো ভাগে ভাগ করে নিয়েছিলেন। সকাল ৮টা থেকে বেলা ১২টা আর দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তিনি দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি করতেন।
মাঝের সময়টুকু, অর্থাৎ বেলা ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দুপুরের খাবার খেতেন। এর ফাঁকে তিনি অর্থনৈতিক হিসাবনিকাশ চেক করার মতো কম গুরুত্বপূর্ণ আর হালকা কাজগুলি করতেন।

এভাবে সময় ভাগ করে নেয়ার ফলে দিনের যেই সময়টুকুতে তিনি চাঙ্গা থাকতেন, সেই সময়টুকু গুরুত্বপূর্ণ কাজের পিছনে ব্যয় করতে পারতেন।

#০৭. কাজ শেষে সবকিছু গুছিয়ে রাখুন

সারাদিন কাজ করার পরে অনেকে কাজের জায়গা এলোমেলো রেখেই বেরিয়ে যায়। ফলে পরের দিন সকালে এসে সবকিছু ঠিকঠাক করতে গিয়ে অনেক শক্তি আর কাজের সময় অপচয় হয়। যেই সময়টুকু গুরুত্বপূর্ণ কাজের পিছনেও ব্যয় হতে পারত।

এই ধরনের সমস্যা সমাধান করতে ফ্র্যাঙ্কলিন কাজের পরে তার অফিস গুছিয়ে পরিষ্কার করে বের হতেন। এতে করে তিনি পরদিন অনেক বেশি অ্যানার্জি নিয়ে কাজ শুরু করতে পারতেন।

#০৮. অবসরের জন্য সময় বরাদ্দ রাখুন

প্রতিটা কর্মদিবসের শেষে ফ্র্যাংকলিন তার অফিস গুছিয়ে রাতের খাবার খেতেন। বাকি সময়টুকু অবসরে গান শুনতেন কিংবা বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতেন। অবসরে কাটানো সময় আসলে সময়ের অপচয় নয়। এর ফলে পরের দিনের কাজকর্মের জন্যে দেহ আর মন প্রস্তুত থাকে।

#০৯. দিনশেষে সারাদিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে চিন্তা করুন

ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফ্র্যাংকলিন তার সারাদিনের কাজকর্ম নিয়ে ভাবতেন। নিজেকে তিনি প্রশ্ন করতেন, “আজ সারাদিনে আমি কী কী ভালো কাজ করেছি?” ভালো আর খারাপের হিসাব মেলানোর পর তিনি ভাবতেন কীভাবে পরের দিনের রুটিন আরো উন্নত করা যায়।

দিনশেষে সারাদিনের কাজকর্মের একটা জরিপ আপনার টাইম ম্যানেজমেন্টে সাহায্য করবে। ফলে আপনার সময়ের অপচয় কমবে। আর আপনার একবার করা ভুলগুলি ভবিষ্যতে না হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

#১০. পারফেকশনের জন্যে আফসোস করবেন না

ফ্র্যাংকলিন নিজেও সবসময় তার রুটিন অনুযায়ী চলতে পারতেন না। অনেক সময় দিনের কর্মসূচি ঠিক করতেও হিমশিম খেতেন তিনি। তার ছাপাখানার ব্যবসার উন্নতি হওয়ার ফলে অনেকসময় রুটিনের কাজগুলি বাদ পড়ে যেত।

তবু তিনি খুঁতহীনতা বা পারফেকশনের জন্য ব্যস্ত হতেন না। তার কথায়, “আমি নিজের ভুলগুলির দিকে তাকালে অবাক হয়ে যাই। আমার কল্পনার চেয়েও বেশি ভুল করি আমি। তবে ভুলগুলি শোধরানোর সময় মনে অনেক সন্তুষ্টি আসে।” পারফেকশনের চেয়ে আপনার ব্যক্তিগত উন্নয়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

***

কার্যক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বেনজামিন ফ্র্যাংকলিনের এই দৈনন্দিন রুটিন খুবই সরল আর কার্যকরী জিনিস। যদিও প্রায় ৩০০ বছর আগে এই রুটিন তৈরি হয়েছিল। তবু আজকের পৃথিবীর নানান রকম জটিলতার মধ্যে শৃঙ্খলা আনতে এর থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলি সমান কার্যকর।

রুটিন বানানোর সময় প্ল্যানে কী থাকলো, তা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ না। বরং প্ল্যান বানানোর সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বেনজামিন ফ্র্যাংকলিন যেমনটা বলেছেন, “ইফ ইউ ফেইল টু প্ল্যান, ইউ আর প্ল্যানিং টু ফেইল।”