page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

মধ্যবিত্তকে ক্ষ্যাপাইবেন না সরকার

যে কোনো দেশের সরকারের জন্য মধ্যবিত্ত হইল তার চিত্ত। শরীরে অসুখ থাক, চিত্তে আনন্দ থাকলে তা আমলে নেওয়া হয় না। আবার চিত্ত যদি কষ্ট পায় তাইলে ব্যামোবিহীন শরীরও উৎকণ্ঠার কারণ হয়।

এটা বাংলাদেশের জন্য না, ইন্ডিয়া বলি, পাকিস্তান বলি, মিসর বলি অথবা আমরা নিরানব্বই ভাগ বইলা দাবি করা মার্কিন নাগরিক বলি সবার জন্য সমান। এমনকি বারাক ওবামার দেশে তার যত সমালোচনা সব মধ্যবিত্তের সমস্যা নিয়া। মিডল ইস্টে গেলেও সেখানে মধ্যবিত্তের সুখ লাভ বিনা শান্তি থাকে না। আজকে সিরিয়ার যে অবস্থা, এরও শুরু সেখানকার মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক টানাপড়েন নিয়ে। এবং শরণার্থী হয়ে যারা গেছে ইউরোপে তাদের বেশিরভাগই মিডল ক্লাস।

সরকারকে দেশ চালাইতে গেলে, গণতন্ত্র আছে দেখাইতে হইলে, সমর্থন দেখাইতে হইলে তাই মিডল ক্লাসকে শান্তিতে থাকতে দিতে হবে।

salahuddins1

মিডল ক্লাসের তেমন পয়সা নাই। ক্ষমতাও দূর হস্ত। আছে শিক্ষা, ইজ্জত, শিল্পকলা আর ভদ্র স্বভাব। দেশের মিডিয়া, শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং ভোক্তা ঐ মিডল ক্লাস। বড়লোকেরা এসবের মালিক আর ছোটলোকেরা তলারটা খাওয়ার আশায় বসে থাকে। দেশে যে ঘুষ, দুর্নীতির বিরোধিতা এটা মিডল ক্লাসের চাওয়া। তারা একটা গুড সিস্টেম চায়। পায় না বলে তারা নিজেরাও এতে যুক্ত হয়ে যায়। তাদের সাধ আর সাধ্যের বিস্তর ফারাক তৈরি হয়। গুড গভর্নেন্সের দাবি এই শ্রেণীর দাবি। এদের কেন্দ্র করে আছে এনজিও। মিডল ক্লাস বিনে এনজিও চলবে না। নেটিভ ছোটলোকেদের কাছে তখন যাবে কে?

আমাদের এখানে তো মিডল ক্লাসের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ বড়লোকেরা এখানে বেশির ভাগই দেশের লগে প্রায় সম্পর্ক রাখেন না। টাকাও রাখেন না, পোলা-মাইয়াদেরও না। ইন্ডাস্ট্রিও করেন না। ক্ষমতায় যারা থাকেন তারা বেশিরভাগেই নানা উপায়ে সমালোচিত। ভোটবিনে এদের বেশিরভাগেরই গ্রহণযোগ্যতা নাই। ফলে মিডল ক্লাস এখানে একটা আত্মসম্মান নিয়া বাইচা থাকতে পারে। তাদের জ্ঞানের বড়াই। সেই জ্ঞানের বেইজ্জতি তো আর সরকারের করা ঠিক না।

আওয়ামী লীগ যে ইদানিং চাইতেছে শেখ মুজিবুর রহমান দলের বাইরে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠুক, সেটাও মিডল ক্লাস ছাড়া সম্ভব না।

অতএব মিডল ক্লাসকে চটানো যাবে না। তাদের খুশি রাখতে হবে। তাদের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাব্যয় বাড়ানোর ডিসিশন ভুল প্রমাণিত হবে। একই সঙ্গে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সব কিছুর দাম বাড়াইলে কেমনে হবে? সব মিডল ক্লাস তো আর সরকারি চাকরি করে না। বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে তেমন নাই। সেখানকার মালিকদের বিষয়ে কোনও কড়া ডিসিশনে আসতে পারলে ভালো হবে। মিডলক্লাস তখন খুশি থাকবে। তাদের খুশি রাইখা কিন্তু ক্ষমতা পোক্ত করা যায়।

তাদের কিনবার ক্ষমতা বাড়ান। কিনবার ক্ষমতাই এখন মৌলিক অধিকার বিবেচ্য। এই অধিকারে সন্তুষ্ট থাকলে মিডল ক্লাসের পলিটিক্যাল সমস্যা তৈরি হয় না বলে দেখা যায়।

vat-321

ভ্যাট বিরোধী ছাত্র সমাবেশ। ছবি. আকিব আহমেদ ২০১৫

শাহবাগের আন্দোলনও মিডল ক্লাসের অবদান। যার উপর ভর করে সরকার ক্ষমতায়। মিডল ক্লাসই সবচেয়ে বেশি জঙ্গিবিরোধী। তারাই ব্লগার ছিল। ইউএস, ইন্ডিয়া বিষয়ে তাদের ধারণা বেশি। এই মিডল ক্লাসের কাছ থিকা সরকার বরং বুদ্ধি নিতে পারে নানা সময়ে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে না ভিড়তে দিতে তারা সরকারকে সমর্থন দিছে যেমন।

এবার বুদ্ধির সঙ্গে সরকার যদি এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাট তুইলা নেয়, তাইলে কিন্তু সরকারেরই লাভ। একটা কাজ করতে পারেন তারা, এ বছর ভ্যাট প্রশাসন দিবে আর পরের বছরের বাজেট থিকা সেই ভ্যাট তুইলা নেওয়া হবে, এমন বুদ্ধি করলে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হবে আশা করি। অথবা এসব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্টুডেন্টদের থিকা আরও যেসব বাড়তি ফি নেয় সেগুলা কর্তন করতে পারেন। মোট কথা পুরা টিউশন ফিটা নিয়া সরকার বসেন। দেখেন সেখান থিকা কিছু বাদ দেওয়া যায় কিনা। যাবে মনে হয়। তাতে ভ্যাটের একটা সুরাহা সম্ভব।

মিডল ক্লাস অর্থনীতিবাদী আন্দোলন নিয়াই শুরুতে মাঠে নামে। পরে সেটা সেন্টিমেন্টাল হয়ে যায়। আর এমন হয়ে যাওয়াতেই সরকারের সমূহ বিপদ থাকে।

নব্বইয়ের নুর হোসেন কিন্তু ছোটলোক গুষ্ঠীর। তবে তারে পিক করছে মিডল ক্লাস, ধরে রাখছে মিডলক্লাস। বাহান্নর একুশ ফেব্রুয়ারির ঘটনাও ধরেন না কেন, সেখানেও গরীবের পোলার অভিভাবক হয়ে গেছে মিডল ক্লাস। ফলে সিরিয়াস কিছু হয়ে গেলে এর জন্য ইতিহাসে কিন্তু মিডল ক্লাসের হাতেই পস্তাইতে হয় দেখা গেছে।

অতএব, মিডল ক্লাসের সঙ্গে খাতির রাখুন হে সরকার।

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।