১.
মা কখনো ট্রেনে চড়ে নি, বাবা চড়েছে। খাটে বসে একদিন প্ল্যান করলাম সবাই মিলে জামালপুর যাব। ঘুরে-ফিরে অাবার বিকেলে চলে আসব। ট্রেনে করে কোথাও বেড়াতে যাব তেমন আত্মীয় নাই। সেই পরিকল্পনাও সফল হল না। কী কারণে সেটা স্পষ্ট মনে নাই।

আমি ঢাকা চলে আসলাম। মা-বাবা বলত আমি চাকরি করলে তারা বেড়াতে আসবে। মা’র আগেই আমি ট্রেনে চড়েছি। বাড়ি যাব, তখন গ্রীষ্মকাল। কাঁঠাল পেকেছে সাথে আমও। আমাদের আমগাছ না থাকলেও আমাদের ছাদের পাশে দাদার বোনের একটা আমগাছ আছে। সেখান থেকে বলে না বলে আম পেড়ে খেতাম। তাছাড়া অন্যদের গাছ থেকেও। নানুর বাড়ি থেকেও আম আসত। তবে কাঁঠাল গাছ আব্বা কিনত। যখন কাঁঠাল বড় হতে থাকে তখনই গাছ কিনত চুক্তিতে। শুধু কাঠাঁল খেতে পারব। গাছ মালিকেরই থাকবে।

ফুপাত ভাই কামরুল আর আমি বাড়িতে যাওয়ার জন্য কমলাপুর রেলস্টেশনে গেলাম। ও আগে ট্রেনে চড়েছে কিনা জিজ্ঞেস করি নি। আমরা স্টেশনের গেট দিয়ে ঢুকতেই দালাল হাজির। এর আগে দালালের নাম শুনেছি, তাদের কাজ সম্পর্কেও ধারণা আছে। তবে আমার সাথে স্টেশনেই প্রথম দালালদের সাথে কথা হয়। এরা এমন ভাবে বলে যেন তারা পরোপকারী। সাদা মনের মানুষ। বলছে, টিকিট কাটতে হবে না, আপনারা আসেন আমার সাথে। ট্রেনে বসিয়ে দেই, ভাড়া কম লাগবে। তার কথা শুনে গেলাম। দেখি অনেক ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। কোন লাইনের ট্রেন ময়মনসিংহ যায় আমরা জানি না। ওই দালালই আমাদের ট্রেনে উঠিয়ে দেয়।

ট্রেনের পরিবেশ ভাল লাগে নি। মুতের গন্ধ, নোংরা। একটা ভয় ছিল টিকিট কাটি নাই, যদি টিটি ধরে। দুইজনে পরামর্শ করে সাদা পোশাকের একজন টিটিকে জিজ্ঞেস করলাম। টিকিট ছাড়া ভ্রমণ করলে কোনো সমস্যা হবে কিনা? টিটি বলল জরিমানা ডাবল। তাছাড়া আটকেও রাখে। ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে অনেককেই দেখেছি জেলখানার মত ঘরে আটকে রাখে। তাদেরকে পিটায় কিনা জানি না। তবে খারাপ ভাষায় কথা বলে।

আমরা দেরি না করে টিকিট কাটতে এলাম। এসে দেখি দীর্ঘ লাইন। কিছুক্ষণ লাইনে দাঁড়ানোর পর শুনি ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। পরে আর কোন আন্তঃনগর ট্রেন নাই। একটা ট্রেন আছে, লোকাল রাত ১০টায়। বাড়ি যেহেতু যাব সেহেতু  অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নাই। চানাচুর খাচ্ছি, বাদাম খাচ্ছি। এদিক-সেদিক বসে সময় পার করছি।

লোকাল ট্রেনের টিকিট আগেভাগেই কেটে নিলাম। ১০টা বেজে গেছে, কোন লাইনে ট্রেন এবারও জানি না। দৌড়াদৌড়ি করে লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে ট্রেনের খোঁজ পেলাম। এবার আরো আজব ঘটনা। পা ফালানোর জায়গা নাই। লোকজনের ভিড় ঠেলে আমাদের সিটে গিয়ে দেখি সিট দখল। তারা উঠবে না সিট থেকে। তর্ক করার পরে একটু জায়গা দিল আমাদের। তবে সিট থেকে ওঠেনি। ট্রেন ছাড়ল। যাত্রাপথে একটু পরপরই থামে। আর এক গাদা লোক ওঠে।

ময়মনসিংহ স্টেশনে রেল থামল রাত ২টায়। নেমে দেখি লোকজন বসার জায়গায় ঘুমাচ্ছে। কিছু লোক সজাগ। চায়ের দোকান খোলা। তবে ফেরিওয়ালারা নাই। চারদিন থাকলাম। ফুপু যাবার সময় বলেছিল ধানের খৈ যেন নিয়ে আসি। সাথে কাঁঠাল। মা একটা বস্তায় ভরে ধানের খৈ দিয়েছিল। আমরা স্টেশনে আসলাম। কামরুলকে বললাম, তুই টিকিট কাট আমি এদিকে দেখি। খৈ-এর বস্তা ফ্লোরে রেখে ওর সাথে কথা বলে পিছন ফিরে দেখি বস্তা নাই। এদিক সেদিক দেখলাম, কোথাও নাই।

২.
১৩৫ বছর আগে, বৃটিশ আমলে, ময়মনসিংহের বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট নিয়ে যাওয়ার জন্যে সিঙ্গেল ট্রেন লাইন চালু করা হয়। ১৮৮৫ সালে বিখ্যাত ঢাকা স্টেট রেলওয়ে ময়মনসিংহ টু ঢাকা টু নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ১৪৪ কিমি দীর্ঘ মিটারগেজ রেললাইন বসায়।

ময়মনসিংহ রেল স্টেশনের মোটামুটি চারটি লাইন দিয়ে ট্রেন যাওয়া-আসা করে। আরেকটি লাইন তেমন সচল না। আর বাকি যে লাইনগুলা আছে সেগুলা অচল। যাত্রীছাউনি আছে তিনটা। একটা ফুট ওভার ব্রিজ। অচল লাইনগুলাতে লাল রঙের অকেজো মালগাড়ি পড়ে আছে অনেকগুলা। মালগাড়ির ফাঁকে ফাঁকে কচু লতাপাতা ঘিরে আছে। এলাকার লোকজন লতি তোলে। পেছনের দিকটায় একটা বড় পুকুর। স্টেশনের দুই পাশ ফাঁকা। স্টেশনের গেটের সামনে পাম গাছের সারি।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশন এর সামনের অংশ

 

প্রধান প্রবেশ ও বাহির পথ

 

টিকেট কাউন্টার

 

দ্বিতীয় লেনের কিছু দোকানপাট

 

ময়মনসিংহ-জামালপুর রোড

 

ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশন স্টেশন

 

ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশন স্টেশন

 

ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের নামফলক

 

ফুটওভার ব্রিজ

 

ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশন স্টেশনের পশ্চিম দিক

 

অকেজো মালগাড়ি

 

পুরনো ভবন

 

স্টেশনের বাহিরে খাবার দোকান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here