page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

মলাট খুলে অতীত—সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রি

ধরা যাক একটা পেপার ওয়েট, কাচের বুদ্বুদ, ভিতরের রঙ বিভিন্ন আঙ্গিকে ছিটকে আছে। এই পেপারওয়েট দুইভাবে দেখা যায়, বাইরে থেকে আর তা পেরিয়ে ভিতর থেকে। বাইরে থেকে দেখলে কী দেখা যায়? নিটোল, কাচের গোলক। বেশ ভারি, কাগজ চাপা দেওয়ার কাজে লাগে। আর আলোর মধ্যে তুলে ধরে ভিতর দিকে তাকালে কী দেখা যায়? বর্ণচ্ছটা।

ভাবতে অদ্ভুত লাগে, একটা তুচ্ছ পেপারওয়েট, অথচ অক্লান্ত ভাবে দুই রকম নূর সরবরাহ করছে। ঠিক এইভাবেই এই শহরকে বাইরে পেরিয়ে ভিতর থেকে দেখতে চাইলে অন্য এক আভাস পাওয়া যায়।

sreya-thakur-logo

কলোনিয়ালিজমের হ্যাং ওভার কাটিয়ে উঠতেই পারে নি যে শহর, তার সঙ্গে জুড়েছে পোস্ট কলোনিয়ালিজমের অম্বল, সেই শহর ছাপিয়েও একটা নস্টালজিক মুখ উঁকি দেয়।

আমি যখন এই ব্লগ লিখতে শুরু করি, আমার মাথায় ছবির মত একটাই, এবং একটাই ভাবনা ছিল—‪আমার চেনা শহর তুলে ধরবো, আমি যে পথে চিনেছি, যে ভাবে ভালোবেসেছি আর কখনো ঘেন্না করেছি। আমার বিশ্বাস, অটুট… সমস্ত শহর এক মস্ত চকচকে মলাট পরে বসে আছে।

gothik

গথিক স্ট্রাকচার।

সে মলাট এত সূক্ষ্ম আর নিপুণ, খুলে ফেলা সহজ নয়। কিন্তু এখনো একটা দুটো তিনটে জায়গা বেঁচে আছে শহরের বুকে, যেখানে মলাট ঈষৎ দুর্বল, একটু কষ্ট করলে খানিক খুলে ফেলা যায়, আর নস্টালজিয়া নামের শহরটার আধো চেনা রাস্তায় পা রাখা যায়।

এমন অনেক জায়গার মধ্যে সবচেয়ে সেয়ানা , হ্যাঁ সেয়ানাই বলবো, সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রি।

কেন সেয়ানা?

বাইরের অসম্ভব ব্যস্ত এবং সফিস্টিকেটেড রাস্তা,পাশের ঝাঁ চকচকে নার্সিং হোমের ডিসইনফেক্ট্যান্টের গন্ধ সবকে অনায়াসে ডজন গোল দিয়ে এক টুকরো কলোনিয়ালিজম ধোঁয়ার মত নিজের বুকে রেখে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে।

বাইরে থেকে কিচ্ছুটি টের পাওয়ার উপায় নেই, কিন্তু গেট পার হয়ে ঢুকলে বাইরে যে সদাব্যস্ত পার্ক স্ট্রিট তা আর মনে রাখার উপায় নেই।

south-c1সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রি পৃথিবীর প্রথম নন চার্চ সেমেট্রিগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৭৬৭ সালে এর স্থাপন হয় মূলত শহরের মধ্যের সেন্ট জন’স চার্চ বেরিয়াল গ্রাউন্ডকে স্বস্তির নিঃশ্বাস দেওয়ার জন্য। ১৭৬৭ থেকে এর ব্যবহার শুরু হয়, খাঁটি ইউরোপিয়ানরা ১৭৯০ থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়, আর অ্যাংলো আর বাঙালি খ্রিস্টানরা বন্ধ করে ১৮৩০ এ। বর্তমানে কলকাতার অন্য হেরিটেজ সাইটগুলোর মত এটাও আর্কেওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

এ তো গেল প্রাথমিক ইতিহাস, কিন্তু বাকি গল্প? অনুভূতি? অথবা হয়ত খানিক সত্যির মিশেল দেওয়া অতীত?

William-Jones-Grave

উইলিয়াম জোন্সের সমাধি।

নাহ, হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, স্যার ইলাইজে ইম্পে বা এশিয়াটিক সোসাইটির স্যার উইলিয়াম জোন্সের গল্প নয়। সে তো যে কোনো ইতিহাস বই তুলে নিলে, গুগল করলে পাওয়া যাবে। তাই তাদের কবর খানিক ঝালমুড়ি খেতে খেতে বিখ্যাত মনুমেন্টের সামনে সেলফি তোলার তালিকায় পড়ে যাচ্ছে।

গল্প তো সেই মানুষটার , যার কবরে শুধু এপিটাফ আছে। নাম নেই, তারিখ নেই। শুধু খোদাই করা ‘আ ভার্চুয়াস মাদার (১৮২৫)’।

গল্প তো সেই মানুষগুলোর, যাদের নামটাই সময়ের স্রোতে নেই, শুধু রয়ে গেছে কিছু ওবেলিস্ক , মসোলিয়াম, ওলেরডোলানা… অথচ তাদের ওপরে খোদাই করা নাম কষ্ট করেও, রুমাল দিয়ে শতবার মুছেও আর পড়া যায় না।

মাদার টেরেসা সরণির আর এ.জে.সি বোস রোডের কোণায় অবস্থিত এই সেমেট্রি দেখলে কিন্তু বিশ্বাস হয় না, একসময় এখানে জলাভূমি আর জঙ্গল ছিল। কথিত আছে, লর্ড ক্লাইভ বাঘ শিকার করতেন এই অঞ্চলে। যে বিশপকে এই সেমেট্রির দায় দেওয়া হয়েছিল, তাকে আলাদা করে অ্যালাওয়েন্স দেওয়া হত, ঘোড়ার গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য।

Elijabeth-Jane-Barwell-Grave

এলিজাবেথ জেন বারওয়েলের সমাধি।

শহর তখন ছিল শুধুই উত্তর, আর খানিক মধ্য কলকাতা ঘিরে। এত দূরে সেমেট্রি স্থাপনের কারণও বোঝা যায়। কলকাতা শহর তখন ছিল ম্যালেরিয়ার আড়ত, সদ্য আগত ব্রিটিশরা খাপ খাওয়াতে তখনো পারে নি আবহাওয়ার সঙ্গে। ফলত, মৃত্যুর হার ছিল সাংঘাতিক। বর্ষাকাল এতই ভয়ানক ছিল ব্রিটিশদের কাছে, যে প্রতিবছর বর্ষার শেষে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফিস্ট রাখা হতো। এমত অবস্থায় শেষ যাত্রা প্রতিদিন শহর দেখবে? নাহ, সে তো ভয়ানক মানসিক বৈকল্য! অগত্যা, শহর থেকে অনেক দূরে জঙ্গলের মধ্যে তৈরি হলো ‘দা গ্রেট সেমেট্রি’।

তৎকালীন যুগে কবর দেওয়া হত রাতের বেলায়, লোক চক্ষুর অন্তরালে।

এই সেমেট্রির প্রথম কবর জন উড নামক এক ব্যক্তির, ১৭৬৭ সালে যাকে সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু তার সমাধি এখন আর পাওয়া যায় না, আসলে সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রি এখন নাম হলেও, আদত নাম হয়ে উঠেছিল পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রি। অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চ টাওয়ারের চার পাশ, মল্লিকবাজারের মোড় সবটুকুই ছিল এর অন্তর্গত। কিন্তু শহর বাড়ানোর কলকাঠিতে, তার উত্তর দিক সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এ জি টাওয়ারের কাছে শুধু রয়ে গেছে রবার্টসন মনুমেন্ট। ওয়ান অ্যান্ড অনলি সারভাইভড গ্রেভ অফ দ্যাট রিজিয়ন। সেই ধংসের চক্রান্তেই মাটিতে মিশে গেছে জন উডের সমাধি।

robetson-manumnet

রবার্টসন মনুমেন্ট।

পড়ে আছে এখন শুধু একটুকরো দক্ষিণের অংশ।আর সেই অংশে সবচেয়ে পুরোনো হিসেবে গন্য হয় সারা পিয়ারসন(১৭৬৮), মাত্র উনিশ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়েছিলেন তিনি। এই আট একরের দক্ষিণের অংশে মোট ১৭০০ ইউরোপিয়ানের সমাধি আছে। আর এই সমাধির মসোলিয়াম গুলো গথিক আর ইন্দো সারাসেনিক স্টাইলে অনবদ্য। ব্রিটিশদের সো কল্ড ক্লাসি অ্যান্ড এক্সেলেটিক স্টাইলের প্রমাণ দেয়। একটা গল্প প্রচলিত আছে, বিখ্যাত লোকেদের সমাধির মসোলিয়াম দেখন শোভার হবে এবং বড় হবে সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু একদম অচেনা বা সাধারণ মানুষের সমাধিও এখানে অদ্ভুত ভাবে বড় এবং কারুকার্যময়। কেন এমন?

Derozio-Grave

ডিরোজিওর সমাধি।

আসলে তখন একটা ধারণা ছিলো, মসোলিয়াম যত বড় হবে, তত ট্রপিক্যাল রোগের জীবাণু সমাধি ছেড়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারবে না। এতে বোঝা যায়, ম্যালেরিয়া কিভাবে জুজুর ভয় দেখিয়ে রেখেছিলো আমাদের কলোনিয়াল প্রভুদের! কিছু কিছু ক্ষেত্রে সস্তার অহংকার ও মূল উপজিব্য অবশ্যই।

বিখ্যাত সমাধির মধ্যে স্যার উইলিয়াম জোন্স, এশিয়াটিক সোসাইটির প্রবক্তা, অ্যাংলো ওয়েলশ ফিলোলজিস্ট, স্যার হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, ইয়াং বেঙ্গল মুভমেন্টের জনক, লেফটেনান্ট ওয়াল্টার স্যাভেজ ল্যান্ডর ডিকেন্স, চার্লস ডিকেন্সের চতুর্থ সন্তান, মেজর জেনেরাল চার্লস স্টুয়ার্ট, যিনি নিজের হিন্দু ধর্মের প্রতি আগ্রহের জন্য হিন্দু স্টুয়ার্ট নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। আছে তৎকালীন বিখ্যাত সুন্দরী এলিজাবেথ জেন বারওয়েলের সমাধি। যিনি নিজের ষোল জল পাণিপ্রার্থীকে বিভিন্ন ভাবে হ্যারাস করে আনন্দ পেতেন। এবং মাত্র তেইশ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন।

Derozio-Grave-(2)

ডিরোজিওর সমাধি ফলক।

যদিও খাতায় কলমে ১৭৯০ তে সমাধিস্থ করা বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু খাতায় কলমের বাইরে ১৯০৩ সালে পাঁচ মাসের ডোরিস আলান রথওয়েলের সমাধি এখানে পাওয়া যায়।

সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রির ভূতের গল্প বেশ বিখ্যাত, সাদা অথবা ফিকে রঙের পোষাকে এক সুন্দরী মহিলাকে প্রায়ই নাকি সন্ধ্যের পর ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, অনেকেই বলেন ঐ নামহীন “আ ভার্চুয়াস মাদার” সমাধির মালকিন তিনি। তবে, কখনোই কোনো ভয়ানক ভয়ের কিছু আভাস পাওয়া যায়নি।

এ শহরের বুকে আছে আরেক শহর, প্রতি শহরের মধ্যে লুকিয়ে আছে না বলা কোনো দীর্ঘশ্বাস। অদ্ভুতভাবে টের পাওয়া যায় এখানে। যখন দুইপাশে গথিক সমাধির মাঝখানের সুঁড়িপথ ধরে হাঁটে মানুষ, আর দেখে দুপাশে শুয়ে আছে তারই বয়সের মানুষ। তাদের অনেক না বলা গল্প, কষ্ট, চেপে যাওয়া আকাঙ্ক্ষা। সড়সড় করে জারুল গাছের মধ্যে হাওয়া বয়, নিঝুম পায়রার ডাক, একা লাগে, আরো একা। কেউ একজন বসার বেঞ্চে কালো রঙে লিখে দিয়েছে রেস্ট ইন পিস। পাশ ফিরতে ইচ্ছে হয় তবু, বড় ক্লান্ত ছিলো যে জীবন, তা নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে।

Cemetery-er-math

cemetry-m

সেমেট্রির মাঠ।

চার্লস ডিকেন্সের ছেলে লেখক হতে চেয়েছিলেন, বাবার মত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে চাকরি করা তার কাছে ছিলো অভিশাপ। কোথাও মিল পাই, আমাদের হতে চাওয়া আর না হতে পারার মধ্যে। একই সাথে মা আর সন্তানের সমাধি ছুঁয়ে অনুভব করতে ইচ্ছে হয়, যন্ত্রণা ঠিক কেমন ছিলো?

“Death arrives among all that sound
like a shoe with no foot in it, like a suit with no man in it,
comes and knocks, using a ring with no stone in it, with no
finger in it,
comes and shouts with no mouth, with no tongue, with no
throat.
Nevertheless its steps can be heard
and its clothing makes a hushed sound, like a tree.”
Pablo Neruda

About Author

শ্রেয়া ঠাকুর
শ্রেয়া ঠাকুর

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে মাস্টার্স করার পর বর্তমানে ডেভেলপমেন্টাল স্টাডিজে মাস্টার্সের জন্য এন্ট্রান্স পরীক্ষার্থী। বাড়ি কোলকাতা থেকে কিছু কিলোমিটার দূরে, হুগলীতে। লেখালিখি একটা নেশার মত, বই পড়াও। এই দুটো ছাড়া আমার এক্সিস্টেন্স নেই। মূলত কবিতা এবং মুক্ত গদ্য লিখতে পছন্দ করি, এবং অনুবাদ করতে। অ্যাম্বিভার্ট হলেও ট্রাভেলিং এবং সোশ্যাল ওয়ার্ক ব্যতীত কোনো এক্সট্রোভার্ট চরিত্র নেই। ফোটোগ্রাফির ইকুইভোকাল শখ আছে।ওভার থিঙ্কার এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিক্ট। :)