পুনরায় নিজের খাবারের উপর দখল নেয়া, ইন্ডাস্ট্রি এবং সায়েন্সের হাত থেকে একে মুক্ত করাটা কোনো ছোটখাটো ব্যাপার না।

লেখক ও সাংবাদিক মাইকেল পোলান মানুষ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি নিয়ে লেখালেখি করেন। ২০০৮ সালে প্রকাশিত তার বই ইন ডিফেন্স অফ ফুড-এ তিনি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড খাবারের বদলে রিয়েল ফুড অর্থাৎ প্রক্রিয়াজাতহীন প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তার মতে, মানুষের উচিৎ বাজার থেকে না কিনে খাদ্যের বেশিরভাগটুকু নিজেই উৎপাদন করা। সেই সাথে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার নিয়মগুলিও পুনরায় আবিষ্কার করা। ইন ডিফেন্স অফ ফুড এর নির্বাচিত অংশের অনুবাদ করছেন দীপ্র আসিফুল হাই।

সত্যিকারের খাবারের কাছে ফিরে যাওয়ার উপায়

মাইকেল পোলান

মাইকেল পোলান
জোন গাসাউ (জন্ম. ১৯২৮, আলহামব্রা, ক্যালিফোর্নিয়া, ইউএসএ)

“জাস্ট ইট ফুড” এই উপদেশটি আমি প্রথম শুনি পুষ্টিবিদ ও লেখক জোন গাসাউ এর একটি বক্তৃতায়। উপদেশটি শুনে আমি কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। আপনি তো অবশ্যই ফুড, অর্থাৎ যা খাদ্য তাই গ্রহণ করবেন। খাদ্য ছাড়া আর কীই বা খাবেন আপনি? গাসাউ নিজের খাবার নিজেই উৎপাদন করেন হাডসন নদীর পাড়ে বন্যা-প্রবণ ভূমিতে। আর বাজারে খাদ্যদ্রব্য হিসেবে পরিচিত বেশিরভাগ পণ্যকেই তিনি ‘খাদ্য’ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। তিনি বলেন, “আমি গত ৩৪ বছর যাবৎ খাবারের পুষ্টি নিয়ে কাজ করছি। আমি দেখছি যে বাজারে এবং মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভাসে সত্যিকারের খাবারের উপস্থিতি ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে।” তার জায়গা দখল করছে অসংখ্য বিকল্পজাত খাদ্যদ্রব্য। এই খাদ্য দ্রব্যগুলি উৎপাদন করার পিছনে কাজ করে ভয়াবহ রকমের সীমিত জ্ঞান ও বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার ইচ্ছা।

তবে সত্যিকারের খাবার এখনো টিকে আছে এবং উৎপাদিতও হচ্ছে। এমনকি মাঝে মধ্যে সুপারমার্কেটগুলিতে এসব বিক্রিও হয়। এবার এসব খাবার চিনে নেয়ার এবং কীভাবে এদের সদ্ব্যবহার করা যায় তার কিছু পদ্ধতি শিখে নেয়া যাক।

আপনার গ্রেট-গ্র্যান্ডমাদার যেটাকে খাদ্য হিসেবে চিনতে পারবেন না, তা খাবেন না!
তা আপনার গ্রেট-গ্র্যান্ডমাদার, অর্থাৎ আপনার প্রমাতামহীর কথা আসছে কেন? কারণ বর্তমান দুনিয়ায় আপনার মা, এমনকি আপনার নানিও সম্ভবত আমাদের মত একই সংকটে আছেন। তাই ঝুঁকি এড়াতে আমাদের ফিরে যেতে হবে কমপক্ষে দুই প্রজন্ম আগের এমন এক সময়ে যখন বেশিরভাগ আধুনিক খাবারের আবির্ভাবই হয় নি। কিছু পুষ্টিবিদ তো আরো পিছনে ফিরে যাওয়ার পক্ষপাতী। ব্রিটিশ পুষ্টি বিশেষজ্ঞ জন ইউদকিন, যার রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেটস বা শর্করার পরিশোধন সংক্রান্ত আগাম সতর্ক বার্তাকে ৬০ এবং ৭০ এর দশকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় নি, একবার একটি উপদেশ দিয়েছিলেন: “এমন কিছুই খাবেন না যা আপনার নিওলিথিক পূর্বপুরুষেরা খাদ্য হিসবে চিনতেই পারবে না। আর এটাই হল ভাল থাকার উপায়।”

মাইকেল পোলান
পোর্টেবল লো ফ্যাট ইয়োগার্ট: দই, কি না আগে শুধুমাত্র দুধ থেকেই তৈরি হত, এত জটিল হয়ে উঠল কবে?

তো বাজারে কেনাকাটা করার সময় এই পদ্ধতি কীভাবে কাজে লাগাবেন? কল্পনা করুন যে আপনার প্রমাতামহী আপনার পাশে আছেন। আপনারা দুজনেই একটা ডেইরি কেবিনেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার প্রমাতামহী একটা গো-গার্ট পোর্টেবল ইওগার্ট টিউব হাতে তুলে নিলেন। তিনি জানেনই না এটা কী হতে পারে। এটা কি কোনো খাদ্যবস্তু? নাকি টুথপেস্ট? আপনি তাকে বলতে পারেন যে এটা হলো ইওগার্ট, মানে দই। তবুও যদি তিনি এর উপাদানগুলির তালিকা পড়েন, তাহলেও তার এই বস্তুটি সত্যিই দই কি না তা সন্দেহ করার পিছনে যথেষ্ট কারণ থেকে যাবে।

নিশ্চিতভাবেই এতে দই আছে। কিন্তু একই সাথে এতে আরো প্রায় ডজনখানেক উপাদান আছে যা ঠিক দই এর সাথে যায় না। এমন সব উপাদান যাকে তিনি খাদ্য হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবেন না। যেমন, হাই-ফ্রাকটোস কর্ন সিরাপ, মডিফাইড কর্ন স্টার্ক, কশার জেলাটিন, কেরাজিনান, ট্রাই-ক্যালসিয়াম ফসফেট, প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম অনেক স্বাদ, ভিটামিন এবং আরো অনেক কিছু। দই, যা কি না আগে শুধুমাত্র দুধ থেকেই তৈরি হত, এত জটিল হয়ে উঠল কবে? গো-গার্ট পোর্টেবল ইওগার্ট কি আসলেই সম্পূর্ণ খাদ্যবস্তু? আসলেই এক ধরনের খাবার?

হেলথ ক্লেইম দাবি করে এমন খাবার এড়িয়ে চলুন
প্যাকেটের গায়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানোর বা একদমই নেই এমন আশ্বাস সেঁটে দেয়ার আগে পণ্যটির নিজেরই একটি প্যাকেজের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাই শুরুতেই ধরে নেয়া যায় যে এসব পণ্য আসলে প্রক্রিয়াজাত খাবার। সত্যি কথা বলতে, শুধুমাত্র বড় বড় ফুড কোম্পানিগুলিই সত্যিকার অর্থে তাদের পণ্যের জন্যে হেলথ ক্লেইম বা স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকারক নয় এমন অনুমোদন দাবি করতে পারে। কেউ কেউ আবার তাদের পণ্যে সুস্বাস্থ্যবর্ধক উপাদান আছে বলে দাবি করতে শুরু করেছে। ধারণা করা যায় এরা নিজেদের সব অর্থ জড়ো করবে নিজেদের পণ্যের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্যে।

কারণ সব শস্যেই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। আর এইসব গবেষণা এমন কিছু খুঁজে পেতে বদ্ধপরিকর যার উপর ভিত্তি করে হেলথ-ওরিয়েন্টেড মার্কেটিং ক্যাম্পেইন চালানো যাবে। কিন্তু এই বিষয়ে সবচেয়ে বড় দাবিগুলি করে ফুড সায়েন্স বা খাদ্য বিজ্ঞান। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা অসম্পূর্ণ নয়ত ভ্রান্ত বিজ্ঞান। ভুলে যাবেন না ট্রান্স-ফ্যাট-রিচ মার্জারিনের দাবি ছিল, যে প্রথাগত খাবারের জায়গা এটি দখল করেছে, তার থেকে এটি বেশি স্বাস্থ্যকর। অথচ পরবর্তীতে আবিষ্কৃত হয় ট্রান্স-ফ্যাট-রিচ মার্জারিন খেলে হৃদরোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়। অথচ এরা ছিল প্রথম দিককার ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফুড বা বাণিজ্যিক খাবারগুলির মধ্যে অন্যতম, যাদের দাবি তাদের পণ্য সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত।

বাজার বিমুখী হোন
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত, আয়ুবিনাশী ওয়েস্টার্ন খাবারের হাত থেকে দূরে থাকার সবচেয়ে ভালো উপায় হল এগুলি যেখানে রাজত্ব করে বেড়ায়, অর্থাৎ সুপার মার্কেট, ফাস্ট-ফুড আউটলেট বা কনভিনিয়েন্স স্টোর এসব থেকে দূরে থাকা। সরাসরি ফারমার্স মার্কেট থেকে, কিংবা সাপ্তাহিক ভেজিটেবল বক্স থেকে কিংবা নিজের বাগানে চাষ করা খাবার খাওয়াটা আসলেই কঠিন কাজ। এটা সত্যি যে বেশিরভাগ ফারমার্স মার্কেট মৌসুম নির্ভর। আর এখানে প্রয়োজনীয় সকল উপাদানই পাওয়া যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে এতে করে আপনি বার বার প্রক্রিয়াজাত, বিশাল লম্বা উপাদানের তালিকা সম্বলিত, বার্ধক্য ত্বরান্বিত করা খাবারের হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছেন।

এমনকি মৌসুম মেনে খাবার খেলে আপনার খাদ্যাভাসেও বৈচিত্র্য আসবে। যেমন স্ট্রবেরি, ব্রোকোলি বা আলু চাইলেই আপনি ১২ মাস কিনতে পারবেন না। একেক মৌসুমে একেক ধরনের শস্য বাজারে আসে। তাই কোন মৌসুমে কোন সবজি পাওয়া যাচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে আপনার খাদ্যাভাস নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে পারেন। সাপ্তাহিক ভেজিটেবল বক্স আরো ভাল। এতে করে ডেলিভারি হয়ে আপনার কাছে এমন সব ভাল ভাল খাবার আসবে যা নিজে হলে হয়ত কোনোদিনই কিনতেন না।

খাবারে রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ে সন্দেহ হলে কৃষককে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন কীভাবে তারা সার ব্যবহার করে থাকেন। এটাই খাদ্যের গুণগত মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার সবচেয়ে ভাল উপায়। সুপার মার্কেটের থাবা থেকে বের হওয়ার সেরা পদ্ধতি। আপনারা যারা খাদ্য উৎপাদন করেন, তাদের কাছ থেকেই খাবার কিনুন।

বেশি করে শাক সবজি খান
শাক সবজি খাওয়া ভাল কেন এই নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এগুলিতে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে বলে? নাকি ফাইবারের উপস্থিতির জন্যে? না কি ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড? কিন্তু এই বিষয়ে সবাই একমত যে শাক সবজি আপনার স্বাস্থ্যের জন্যে খুবই উপকারি এবং কোনো অবস্থাতেই আপনার ক্ষতি করবে না। এগুলি খেলে ভিটামিন সি এবং জরুরি পুষ্টি উপাদান, যা মানুষ অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে অথচ মানবদেহের জন্য যা প্রয়োজনীয়, লাভ করা যায়। অন্য অ্যান্টি অক্সিডেন্টের মতই ভিটামিন সি দুইভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যে উপকারি ভূমিকা পালন করে।

কোষীয় বিপাক, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি সহ দেহের অন্যান্য নিত্যনৈমিত্তিক কর্মকাণ্ডের ফলে তৈরি হয় ‘অক্সিজেন রেডিক্যালস’। এগুলি হল অতিরিক্ত একক ইলেকট্রন বিশিষ্ট অক্সিজেন পরমাণু। এই অতিরিক্ত ইলেকট্রনটি অক্সিজেন পরমাণুগুলিকে বাধ্য করে অন্যান্য অণুর সাথে বিক্রিয়া করে নানান জাতের স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে। এর ফলে এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। ভিটামিন সি এর মত অ্যান্টি অক্সিডেন্টগুলি এসব র‍্যাডিকেলসগুলিকে শোষণ করে নেয় কোনো সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই।

এছাড়াও অ্যান্টি অক্সিডেন্টগুলি আমাদের জন্যে আরো কিছু কাজ করে থাকে। এরা যকৃতকে উদ্দীপিত করে প্রয়োজনীয় এনজাইম নিঃসরণের জন্যে যা অ্যান্টি অক্সিডেন্টগুলিকেই ভেঙে দেয়। এই এনজাইমগুলি একবার নিঃসৃত হলে অন্যান্য যৌগগুলিকেও ভেঙে দিতে থাকে। এমনকি যেসব টক্সিন অ্যান্টি অক্সিডেন্টের মত কাজ করে সেগুলিকেও। কেন বেশি করে শাক সবজি খাওয়া উচিৎ তার পিছনে এই হল একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এদের মধ্যে প্রচুর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে যা দেহকে সাহায্য করে বিভিন্ন টক্সিন দূর করতে।

নিরামিষ খাওয়ার একটা অন্যতম সুফল হল এগুলি আপনার বাদবাকি খাবারের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম অ্যানার্জি-ডেনস। নিরামিষ খেলে ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ হবে কম। এই কম ক্যালরি গ্রহণের ফলে আপনি আবার বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষিত থাকবেন।

মাংসের কথা বলতে গেলে, আমাদের আসলে মাংস খাওয়ার দরকারই নেই। আমাদের শুধু দরকার মাংসে উপস্থিত ভিটামিন বি-১২। মাংসে উপস্থিত সব ধরনের নিউট্রিয়েন্টই অন্য কোনো না কোনো উপায়ে গ্রহণ করা যায়। আমাদের জন্যে প্রয়োজনীয় অতি সামান্য পরিমাণ বি-১২ পেতে হলে বেশি কষ্ট করতে হয় না। সব প্রাণির খাবারেই এটি উপস্থিত থাকে। ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে এটি উৎপাদনও করা যায়। তবে মাংস খেলে সব ধরনের এমিনো এসিড এবং সেই সাথে অনেক ভিটামিন ও মিনারেলসও পাওয়া যায়।

আরো পড়ুন: মাংস খাওয়ার কারণেই মানুষ হতে পেরেছি আমরা

তাই বলা যায়, ওয়েস্টার্নরা যে ব্যাপক পরিমাণে মাংস খায় সেটা খুব একটা ভাল কাজ নয়। বিশেষ করে যখন এটি আসে হাইলি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড ফুড চেইনের মাধ্যমে। একাধিক গবেষণায় এই ফলাফল উঠে এসেছে যে আপনার খাদ্যাভাসে যত বেশি পরিমাণে মাংস, বিশেষ করে রেড মিটের উপস্থিতি থাকবে, ততই আপনার হৃদরোগ ও ক্যান্সারের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে। থমাস জেফারসন সম্ভবত ঠিকই বলেছেন যে মাংসকে ‘নিরামিষ রান্নার একটা মসলা’ হিসেবেই ব্যবহার করা ভাল।

প্রাকৃতিক খাদ্য গ্রহণ করুন
দুনিয়ার সবচেয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ দুটি উদ্ভিদ হচ্ছে ফ্যাট-হেন উইডস (ল্যাম্বস কোয়ার্টারস নামেও পরিচিত) এবং পারস্লেইন। আর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভাসের মত স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাসগুলির একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে সবুজ উদ্ভিদ। এগুলিতে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড রয়েছে।

ল্যাম্বস কোয়ার্টারস
ফ্যাট-হেন উইডস বা ল্যাম্বস কোয়ার্টারস

 

পারস্লেইন
পারস্লেইন

বন্য প্রাণীও আপনার খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে লক্ষ্য রাখবেন এই তালিকায় যেন কোনো বিপন্ন প্রাণী না থাকে। গৃহপালিত কিংবা খামারে উৎপাদিত প্রাণীর তুলনায় বন্য প্রাণীতে চর্বির পরিমাণ কম থাকে, কিন্তু দেহের জন্যে প্রয়োজনীয় ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড বেশি থাকে। কারণ বেশিরভাগ বন্য প্রাণীই মাঠে উৎপাদিত শস্যের বদলে নানান জাতের গাছগাছড়া খেয়ে বড় হয়। চাষ করা মাছের তুলনায় প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছে অধিক পরিমাণে ওমেগা-৩ থাকে। জাপানের মত মৎস-খাদক সংস্কৃতি থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় প্রতি সপ্তাহে কিছু পরিমাণ প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ খেলে হৃদরোগের আশঙ্কা হ্রাস পায়, আয়ু বৃদ্ধি পায়, এবং সুখে থাকার প্রবণতা বেড়ে যায়।

প্রথাগত ডায়েটে কোনো ফায়দা নেই
কী কারণে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভাস এত স্বাস্থ্যকর সেটা খুঁজে বের করার জন্যে চেষ্টার কোনো অভাব হয় নি। এটা কি অলিভ অয়েল ব্যবহারের কারণে? মাছ? সবুজ উদ্ভিদ? রসুন? না কি বাদাম? গবেষকেরা যখন ডায়েট থেকে যে কোনো একটা খাদ্যবস্তু বেছে নেন, তখন তারা সাধারণত বুঝতে ব্যর্থ হন কেন এই ডায়েট অনুসরণ করা মানুষ বেশি দিন বাঁচে। কিংবা কেন তাদের হৃদরোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কম। তাই ডায়েট থেকে আলাদা করে কোনো উপাদানকে বেছে না নিয়ে বরং পুরো ডায়েটই অনুসরণ করা উচিৎ।

কম খান
আমরা বর্তমানে যে পরিমাণ খাই, বিজ্ঞানীদের মতে আমাদের উচিৎ তার চাইতেও কম পরিমাণে খাওয়া। এক্ষেত্রে আপনার ওজন বেশি কি না সেটা ব্যাপার না। নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যালোরি গ্রহণ করলে প্রাণীর বয়স্ক হয়ে পড়ার গতি হ্রাস পায়। কিছু গবেষকের মতে ডায়েটে ছোটখাটো কিছু চেঞ্জ আনলেই ক্যান্সার প্রতিরোধ অনেক সহজ হয়ে পড়ে।

“কম খাও” কথাটা বলা যত সহজ, মেনে চলা ততটা সহজ নয়। কারণ আমাদের সংস্কৃতিতে বেশি খাওয়ার চল আছে। তবে এমন আরো অনেক সংস্কৃতি আছে যাদের নিয়ম আমাদের থেকে আলাদা। আমরা তাদের অনুসরণ করতে পারি। অকিনাওয়ার অধিবাসীরা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ আয়ুষ্কাল প্রাপ্ত এবং সুস্বাস্থ্যবান জাতি। তারা একটা নিয়ম মেনে চলে। পাকস্থলির ৮০ শতাংশ না ভরা পর্যন্ত খাও, এর বেশি খেও না।

তা আপনি কী করে বুঝবেন যে আপনার পেটের ৮০% ভরে গেছে? এক্ষেত্রে আপনাকে নিজের সেন্সের উপরে নির্ভর করতে হবে। প্রফেসর ব্রায়ান ওয়ানসিংক একবার একটা রেস্টুরেন্টে এমন কিছু স্যুপের বাটি নিয়ে হাজির হন যেগুলি স্যুপ শেষ হয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবার ভরে ওঠে। রেস্টুরেন্টে খেতে আসা লোকজনদের মধ্যে যাদের এমন বাটিতে করে স্যুপ দেয়া হয়েছে তারা সাধারণ স্যুপের বাটিতে যারা খেয়েছে তাদের তুলনায় ৭৩ শতাংশ বেশি স্যুপ খেয়েছে। যখন এই বেশি খাওয়া লোকদের একজনকে জিজ্ঞেস করা হল স্যুপটা কেমন, তিনি উত্তর দেন, “এটা বেশ ভালো, আর সহজে শেষ হয় না।”

যতদিন না আমরা নিজেদের স্নায়ু ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হব, ততদিন পর্যন্ত আমাদের অন্যান্য বাহ্যিক ব্যাপারের উপর নির্ভর করতে হবে। এই ব্যাপারে ওয়ানসিংক এর পরামর্শ হল: ছোট থালায় খাবার পরিবেশন করুন, ছোট কন্টেইনারে করে খাবার ও পানীয় সরবরাহ করুন, খাবারের উচ্ছিষ্টগুলি টেবিলে ফেলে রাখুন, যেমন খালি বোতল, হাড় এবং অন্যান্য যা কিছু খেয়েছেন। এর ফলে আপনি বুঝতে পারবেন আপনি কতটুকু খেয়েছেন ও পান করেছেন। এমন গ্লাস ব্যবহার করুন যেগুলি দৈর্ঘ্যে লম্বা কিন্তু প্রস্থে চিকন। কারণ লোকজন স্কোয়াট গ্লাসে বেশি পানীয় ঢালে।

ইট মিলস
এটা অনেকটা “ইট ফুড” এর মতই আজব শোনায়। কিন্তু কথাটা সঠিক। আমরা আজকাল বেশি বেশি স্ন্যাক্স খাই, একসাথে বসে মিল গ্রহণ করি কম। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন দিনে তিনবেলা খাওয়া, অর্থাৎ ব্রেক ফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনারের সাথে সাথে আমেরিকানরা চতুর্থ আরেকটা যোগ করেছে। এই চতুর্থ ধরনের খাওয়াটা চলে সারাদিন যাবৎ। যেমন টিভি দেখতে দেখতে, গাড়ি চালাতে চালাতে। একটা গবেষণায় দেখা গেছে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়স্ক আমেরিকানরা এমনকি দিনে পাঁচ বার খায়। এই পঞ্চমটির বেশিরভাগই সম্পন্ন হয় গাড়িতে।

মিল এর পক্ষে ওকালতি করাকে অনেকে দুঃখজনক মনে করতে পারেন। তা কে ভেবেছিল যে একদিন ভাল খাবারের জন্যেও ওকালতি করতে হবে? এটা মাথায় রাখা উচিৎ যে ডিনার টেবিলেই আমরা আমাদের সন্তানদের সামাজিক ও সভ্য হওয়ার শিক্ষা দিয়ে থাকি। ডিনার টেবিলে অভিভাবকেরা পর্যাপ্ত পরিমাণ ও আদর্শ খাবার কী তা নির্ধারণ করে দিতে পারেন। শিখাতে পারেন পান করার নিয়মকানুন। লোভ এবং অপচয় বিষয়ে সমাজের ধারণা কী তা শিক্ষা দিতে পারেন। সবাই মিলে একসাথে খাওয়াটা আসলে শুধুমাত্র শরীরকে শক্তি জোগানোর চাইতেও বেশি কিছু। এটা হল মানুষের একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে আমরা ভাষার বিকাশ ঘটাই। আর এটাকেই বলে সংস্কৃতি।

খাওয়ার সময় টেবিল ব্যবহার করুন
উঁহু, ডেস্ক নয়। টেবিলের কথা বলছি।

একা খাবেন না
যদিও গবেষণায় দেখা গেছে যারা কম খায় তারা অন্য মানুষের সাথে খেতে বসলে বেশি খায়। সম্ভবত অনেকের সাথে খেতে বসলে একটু বেশি সময় টেবিলে থাকতে হয় বলেই খাওয়াটাও বেশি হয়। আবার যারা বেশি খায় তারা অনেকের সাথে খেতে বসলে কম খায়। কারণ আমরা চাই না অন্যরা দেখুক আমরা কত বেশি  খাই। এই কারণেই ফুড মার্কেটিং এমনভাবে সাজানো হয় যেন আমরা টিভি দেখতে দেখতে বা গাড়ি চালানোর সময় খাই। এতে খাবারের প্রতি আমাদের মনোযোগ থাকে কম, ফলে আমরা খেয়ে ফেলি বেশি।

নিজস্ব বাগানে চাষ করুন, নিজে রান্না করুন
আমার সবজি বাগানটা বেশ ছোট। ২০ ফুট বাই ১০ ফুট। কিন্তু এতে প্রচুর পরিমাণ ফসল জন্মে। এত বেশি শস্য জন্মে যে গ্রীষ্মের সময় আমাদের সাপ্তাহিক ভেজিটেবল বক্সের জন্যে অর্ডার করতে হয় না। শুধু সামান্য পরিমাণে ফল কিনতে হয় ফারমার্স মার্কেট থেকে। যদিও আমরা ছোট্ট একটা শহরের একটুখানি জমির উপরে থাকি, তবুও এই সামান্য জমিতেই কয়েকটা ফল গাছ লাগানোর মত জায়গা রয়েছে। যেমন একটা লেবু গাছ, একটা ডুমুর গাছ কিংবা একটা পারসিমন (ব্রিটেনে থাকলে হয়ত কিশমিশ বা চেরি গাছ লাগাতাম)। উচ্চ গুণসম্পন্ন জৈব উৎপাদনের সবচেয়ে সোজাসাপ্টা পদ্ধতি হল বাগান করা। আপনি নিজে যে খাবারটা উৎপাদন করবেন সেটি বাজার থেকে কেনা খাবারের তুলনায় বিশুদ্ধ হবে। আর এতে সময় ও অর্থ খরচ একেবারেই সীমিত। সপ্তাহে এক বা দুই ঘণ্টা সময় দিতে হবে আর কয়েক প্যাকেট বীজ কিনতে হবে।

ছেলে আইজ্যাকের সঙ্গে বাগানে মাইকেল পোলান

যখন আপনার ফসল কাটা জমি কিচেন কাউন্টারের পাশেই, যখন আপনি যা রান্না করবেন তা পরিষ্কার করে কাটতে শুরু করেন তখন আপনি একইসাথে প্রায় ডজনখানেক বিষয় চিন্তা করেন। কী রান্না করবেন, কীভাবে করবেন ইত্যাদি। কিন্তু যা রান্না করবেন তা কতটা পুষ্টিগুণ সম্পন্ন বা স্বাস্থ্যকর সে বিষয়ে বোধহয় খুব একটা ভাবেন না। এটা সত্যি যে এইসব শস্যের ক্ষেত্রে পুষ্টিগুণ ও রাসায়নিক উপাদান নিয়ে চিন্তা করাটা কঠিন। কিন্তু এটা তো খাদ্য। তাই এটা যতই ফ্রেশ হবে ততই ভাল হবে। খাবারের রঙ এবং গন্ধ দেখেই এই ব্যাপারগুলি বুঝে নিতে হয়।

আরো পড়ুন: মাইকেল পোলান এর মত করে রান্না করবেন যেভাবে

পুনরায় নিজের খাবারের উপর দখল নেয়া, ইন্ডাস্ট্রি এবং সায়েন্সের হাত থেকে একে মুক্ত করাটা কোনো ছোটখাটো ব্যাপার না। আসলে আমাদের সময়ে নিজে রান্না করাটা এবং নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করাকে দেখা হয় বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড হিসেবে। আর কোন জিনিসটাকে এটা ধ্বংস করে? নিউট্রিশনিজমকে। নিউট্রিশনিজম হল এই বিশ্বাস যে খাদ্য মানেই হল পুষ্টি সংক্রান্ত ব্যাপার। আর পুষ্টিবিজ্ঞান এতই জটিল যে শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ ও ফুড ইন্ডাস্ট্রিগুলিই ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাই যখন আপনি নিজের উৎপাদিত তাজা খাবার রান্না করেন তখন এটাকে পণ্য বা জ্বালানি বা একগাদা রাসায়নিক উপাদানের সমষ্টি হিসেবে ধরে নেয়ার ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেঁচে যান।