page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

মাছের জীবন

আমাদের বাসায় একটা গোল্ডফিশ ছিল। তার ভাগ্যের ফেরে আইসা পড়ছিল আমাদের বাড়িতে।

প্রথমে আমার বোনের মেয়ে কড়ি বায়না ধরছিল মাছ পালবে। তার যে কোন বায়না মানার জন্য কড়ির বাবা মা এবং আমার বাবা মা অ্যাটেনশন হইয়া থাকে। এইখানেও সেইরকম হইলো। আশিক দুইটা মাছ কিনা নিয়া আসলো। সেই মাছেদের নামকরণও হইছিলো—একটার নাম হ্যাঙ্কি আরেকটার নাম প্যাঙ্কি।

luna 2 a logo

কেনার সময় কড়ি প্রমিজ করছিলো যে মাছেদের দেখাশোনা ও নিজেই করবে। তবে বাড়িতে আনার পরে সেই দায়িত্ব তার মায়ের ঘাড়ে দিয়ে সে মনের আনন্দে কড়িগিরি কন্টিনিউ করতে থাকলো। ইফা আমাদেরকে আইসা তার এইসব কাণ্ডকারখানার কথা বলতো। আমরা বলতাম – ঠিকই আছে, কড়ি তো মাছের মা!

তো মাছের নানি কিছুদিন তাদেরকে পালার পরে নিজের মায়ের কাছে প্রমোশন দিলো মাছেদেরকে। তারা আমাদের বাড়িতে আইসা উঠলো একটা গোল ফিশ-বোলের মধ্যে।

আমি আম্মারে বললাম, দেখো তুমি কত লাকি! নাতিন এর ঘরের পুতিনেরা আইসা তোমার ঘর আলো কইরা ফেললো।

আম্মা কয়, হুম! একদম ভ্লাদিমির পুতিন!

তো কিছুদিন তারা আমাদের বাড়িতে ফিশ-বোলের ভিতরে ছিলো। মাঝে মাঝে আম্মা পানি বদলাইয়া দিতো। সানিয়া এই কাজেও আম্মার হেল্পার। আমি যেহেতু জন্মের থিকাই ফাঁকিবাজ, দূর থিকা ওদেরকে উৎসাহ দিতাম। মাঝে মধ্যে ফিশ বোলে দুই একটা টোকা দিয়া মাছেদেরকে টেরোরাইজ করতাম। একটা মাছ একটু বেশি খাওয়া দাওয়া কইরা তাড়াতাড়ি বড় হইয়া যাইতেছিলো আরেকটা বাড়তেছিলো না। এই নিয়া আম্মা আর সানিয়া বইসা বইসা আলাপ করতো, সেইগুলাও শুনতাম।

আর মাঝে মাঝে একা একা ডাইনিং টেবিলে বসলে দেখতাম তারা সমানে সাঁতরাইতেছে, একই পানিতে গোল গোল ঘুরতেছে। ভাবতাম এরা কি টের পায় যে আসলে কোথাও যাইতেছে না? নাকি ফিশ-বোলটা গোল বইলা ওদের মনে হইতে থাকে এই পানি অনন্ত, তারা কই থিকা কই না জানি পৌঁছাইয়া গেলো। একটা মাছ আরেকটার পিছে দৌড়ানি দিলে আমরা বলতে থাকতাম, দেখো মাছগুলা খেলতেছে! আসলে হয়তো ওরা জন্মের শত্রু, মোটেই খেলতো না, একটা মেবি বল্লম নিয়া তাড়া করতো আর আরেকটা ভয়ের চোটে দৌড়াইতো। কিন্তু খেলতেছে ভাবতেই আমাদের ভালো লাগতো। যেমন ওরা পানিতে দাপাদাপি করলে মনে হইতো খুব খুশি আছে। আসলে হয়তো ওদের বন্দি লাগতো্‌, হতাশ হইয়া ওইরকম করতো, কে জানে!

ওদের মধ্যে একজন মারা গেলো গত বছরের ১৭ই জানুয়ারি। সেইদিন সুচিত্রা সেনও মারা গেছিলেন। এই কারণে মাছটা সেলিব্রিটি স্টেটাস পাইলো এবং তার মৃত্যুদিবস আমার মনে থাকতেছে। তারে আমাদের ক্যারাম ডাউন্সের বাড়ির ব্যকইয়ার্ডে কবর দেয়া হইলো। সেইদিন আব্বা যথারীতি তার স্টাডিতে ছিল।

আম্মা কান্না কান্না চেহারায় ঘরে ঢুকে বললো, শিবলীর বাপ, আমার মাছটা মারা গেছে।

আব্বা – আহা রে, মরা ঠিক হয় নাই।

আম্মা – তুমি একটা কাগজে ওর ডেথ সার্টিফিকেট লিখো।

আব্বা লিখে দিলো—“আজ ১৭ই জানুয়ারি, আমার গোল্ডফিশটা মারা গেছে।”

সেই ডেথ সার্টিফিকেট আমাদের ফ্রিজের পাল্লায় ম্যাগনেট দিয়া লাগানো ছিলো। আর পাল্লার ভিতরেই ফ্রিজারে প্রায়ই ফ্রোজেন মাছ থাকতো, সেইগুলারে আমরা রান্না কইরা খাইতাম, তাই বইলা এই মাছের মৃত্যুতে শোক যে আনরিয়েল ছিলো তা কিন্তু না।

এর মধ্যে আম্মার অসুখ হইলো। বাসার অন্যান্য আর সব কাজের সাথে মাছের দায়িত্বও সানিয়ার উপরে পড়লো। আমি আর সানিয়া মন খারাপ কইরা ডাইনিং টেবিলে বইসা বইসা মাছটার লোনলিনেস নিয়া কথা বলতাম। আমি ভাবতাম ও হয়তো একা একা সাঁতরাইতে সাঁতরাইতে মইরা যাওয়া সঙ্গীর জন্য কানতেছে। যদি এইটা বাংলা সিনেমা হইতো, এইখানে একটা গানও থাকতে পারতো। কিন্তু আসলে তো এমনও হইতে পারে যে এই মাছই ওইটারে মাইরা রাখছিলো? তারপরে আবার সাঁতার কাটতেছিলো, জানি কিছুই হয় নাই। পারে না? ওইটা অবশ্য থ্রিলার হইয়া যাবে।

তো তারে এই শোক থিকা উদ্ধার করার জন্য আশিক আর ইফা আরো দুইটা মাছ নিয়া আসলো, সাথে বড় একটা অ্যাকুয়ারিয়াম। এই মাছেদের কোন নাম রাখা হইলো না। তিনটা মাছের তো আর ছোট ফিশ বোলে জায়গা হবে না। মাছেদের এই নতুন বাসস্থান অনেক খোলামেলা। কাচের উপরে নীল রঙ, তাই ভিতরের পানিও নীল লাগে। আবার একটা প্লাস্টিকের মাছ আছে, তার গায়ে লেখা—নো ফিশিং। একটা প্লাস্টিকের গাছও আছে। আর তলায় অনেক পিচ্চি পিচ্চি পাথরের টুকরা। এতদিনে বাংলা মুভির সেট সম্পূর্ণ হইলো। মাছেরা ওই গাছের চারিধারে সাঁতরা-সাঁতরি করে আর আমি ভাবতে থাকি একটা হইলো নায়ক, আরেকটা নায়িকা, আরেকটা ভিলেন। অবশ্য এই থার্ড ফিশ সিঙ্গুলার নাম্বার নিয়া সবসময় সমস্যায় থাকি, সে ভিলেনও হইতে পারে, নায়কের বন্ধুও হইতে পারে, নায়িকার অ্যাডমায়ারার হইতে পারে আবার কিছুই নাও হইতে পারে—মহাকালের সাক্ষী, যদিও গোল্ডফিশ, সাক্ষী হইয়াও তার লাভ নাই, ভুইলাই যাবে সব একটু পরে।

আম্মা ও অ্যাকুয়ারিয়াম – লেখক

সানিয়া মাঝে মাঝে খুশি মনে আমারে বলতো যে মাছগুলা ওরে হয়তো চিনতে পারে। ও অ্যাকুয়ারিয়ামের কাছে গেলেই মুখ হা কইরা পানির কিনারে আসে। আর বলতো ‘আমারে দেখলেই সবার খালি খাওয়ার কথা মনে হয়’। এরপরে আরো কিছুদিন কাটলো সুখে দুঃখে। কখন যে মাছেরা মরতে শুরু করলো মনে নাই। সবাই তো আর সেলিব্রিটি না, কেউ কেউ এমনেই মারা যায়। এমনকি আমি এখন এইটাও ভুইলা গেছি যে আরো দুইটা মাছ আনা হইছিলো কিনা। তাই অবশিষ্ট মাছটা চার নম্বর মাছ ও হইতে পারে আবার ছয় নম্বরও হইতে পারে। মনে আছে এক সময় সানিয়া আশিক আর ইফারে বলছিলো আর মাছ না আনতে, কারণ এরা খালি মারা যায় আর তখন মন খারাপ লাগে।

তো এই অবশিষ্ট মাছটার কোন নাম ছিলো না। হ্যাঙ্কি-প্যাঙ্কির আর কোন চিহ্নও নাই এতদিনে। এ একা একাই ঘুইরা বেড়াইতো অ্যাকুয়ারিয়ামে। আমি আর সানিয়া মাঝে মাঝে বলাবলি করতাম – মাছটার বোধহয় একলা লাগে, ক্লান্ত লাগে। এ হইলো মাছেদের দুনিয়ার রবিনসন ক্রুসো অথবা জীবনানন্দ দাশ।

আমরা যখন ক্যারামডাউন্সের বাড়ি ছাইড়া ক্লডেল স্ট্রিটে আসলাম, তখন আমি আর সানিয়া একদিন রাতের বেলায় মাছটারেও নিয়া আসলাম। বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস ঘটনা ছিল সেইটা। অত বড় পানি ভর্তি অ্যাকুয়ারিয়াম তো বহন করা যাবে না তাই মাছেরে আবার ফিশ বোলে রাখলো সানিয়া। তারপরে গাড়ির পিছনের সিটগুলার পায়ের কাছে একটা বাক্সের মধ্যে ফিশ বোলটা রাখছিলো যাতে ঝাঁকি না লাগে। আমিও আমার ৯৭ মডেলের টয়োটা ক্যামরি একটা ঠেলাগাড়ির মতন আস্তে আস্তে চালাইলাম…অথচ তবুও মাছটা সমানে লাফ ঝাপ দিতে থাকলো। সানিয়া ওর জন্য দুশ্চিন্তায় শেষ, হয়তো ভয় পাইতেছে মাছটা। অথচ মাছেরা তো একদমই অন্যরকম, বিড়াল হইলেও নাহয় কথা ছিলো, তারে জড়াইয়া ধরা যাইতো। মাছেরে কেমনে অভয় দেয়া যায়?

সেইদিন মাছের লম্ফ ঝম্প শুনতে শুনতে তারে বাসায় নিয়ে আসতে আসতে রাত বারোটা বেজে গেছিল। এই বাড়িতে মাছের জায়গা হইলো ওয়াশিং রুমের বেঞ্চটপে। ওইটা অবশ্য পারমানেন্ট জায়গা হওয়ার কথা ছিল না। আমরা ভাবছিলাম বাসা গোছাইয়া নেয়ার পরে ওর জন্যেও একটা স্পট ঠিক করা হবে। কিন্তু আমাদের বাসা তো জীবনেও গোছানো হয় না। এই বাড়িতেও এক বছরের বেশি সময় হইলো। মাছটা বেশির ভাগ সময়েই আমার চোখের আড়ালে থাকতো, ভুইলাও যাইতাম প্রায়ই যে সে ও আছে আরেকটা প্রানী। হঠাৎ হঠাৎ ওয়াশিং রুমে গেলে দেখতাম অনর্গল সাঁতরাইতেছে, আমি বলতাম ‘কেমন আছেন মৎস্য সাহেব?’

সে কিছুই বলতো না। তার কমলা শরীরটা ঘুরতো ফিরতো শুধু।

আজকে আম্মা আমার অফিসে ফোন করে বললো মাছটা মারা গেছে। সানিয়া নাকি সকালে তারে খাওয়াতে গিয়ে দেখে যে আর নড়ে না, ভেসে উঠছে। বললো সানিয়ার মনটা খারাপ হইছে।

আমি সানিয়ারে বললাম, “তুই তো আদরেই রাখছিলি।” বলার সময় আমারো খুব মন খারাপ লাগতেছিল। কিন্তু একটা গোল্ডফিশের জন্য কানলে তো লোকে হাসবে।

ভাবলাম ওর জীবনটা কি ভালো কাটলো? দিনরাত একই জায়গায় চক্কর দিতে দিতে। নিয়ম মতো সকাল বিকাল একটু খাবার আর প্রতি সপ্তাহের পানি বদল, আর সারাটা সময় একা একা একা। কোনো ভয়, প্রতিদ্বন্দ্বীতা, অনিশ্চয়তা ছাড়া? বাসা বদলের সময়ের সেই এক ঘণ্টার অ্যডভেঞ্চার ওর কি মনে ছিল? অথবা যেদিন সারারাত ওর সঙ্গীর লাশ ভাসছে ওর সাঁতারের পানিতে সেই স্মৃতি কতটা ভয়াবহ ছিল?

মাছেরা তো আর আমাদের মতন ভাবে না বোধ হয়। গোল্ডফিশ সব ভুইলা যায়। আমরাও তাদেরে মনে রাখি না।

About Author

লুনা রুশদী
লুনা রুশদী

জন্ম ২৪ অক্টোবর, ১৯৭৫, করোটিয়া। শৈশব কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার্সে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে লেখাপড়া নবম শ্রেণী পর্যন্ত, তারপর ১৯৮৯ থেকে সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে লা-ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, পরবর্তীতে বৃত্তি নিয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং এ স্নাতোকত্তর লেখাপড়া সিডনির ইউ.টি.এস বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে চাকরি নিয়ে দশ বছর নিউজিল্যান্ড থাকার পর বর্তমানে মেলবোর্ন প্রবাসী। মেলবোর্নে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লেখার মাধ্যমে লেখালেখির শুরু - প্রথম বাংলাদেশি পত্রিকা ‘অঙ্কুর’ সম্পাদনা ছাত্রজীবনে। বাংলায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৯৪ সালে। এরপর বিভিন্ন বাংলাদেশি ও ভারতীয় পত্রিকায় লেখালেখি। প্রথম প্রকাশিত ইংরেজি গল্প নিউজিল্যান্ডের ‘লিসেনার’ পত্রিকায় ২০১১ সালে। প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ অরুন্ধতি রায় এর ‘দ্যা ব্রোকেন রিপাব্‌লিক’ (২০১২), উপন্যাস ‘আনবাড়ি’ (২০১৩) প্রকাশক শুদ্ধস্বর।